sliderস্থানিয়

মুন্নি চক্রের ভয়াল ফাঁদ, সাগরে মালেশিয়ার পথে নিখোঁজ ১৪ যুবক

এইচ.কে রফিক উদ্দিন, উখিয়া: উন্নত জীবনের আশ্বাস দিয়ে সাগরপথে অবৈধভাবে মালেশিয়া পাঠানোর নামে মানবপাচার চক্রের অভিযুক্ত দালাল মুন্নির ফাঁদে পড়ে ১৪ যুবক নিখোঁজ হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

নিখোঁজদের পরিবারের অভিযোগ, ‘মুন্নী’ নামের এক নারী দালাল ও তার সহযোগীরা পরিকল্পিতভাবে এই যুবকদের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়ে তাদেরকে মৃত্যুঝুঁকিপূর্ণ সাগর পথে যাত্রা করায়। যাত্রার পর থেকে এখন পর্যন্ত তাদের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। নিখোঁজ যুবকরা উখিয়ার রাজাপালং ইউনিয়নের হাজম রাস্তা এলাকার বাসিন্দা বলে জানা গেছে।

তাদের পরিবার সূত্রে জানা যায়, পুরাতন রোহিঙ্গা নুরুল ইসলামের মেয়ে নারী দালাল মুন্নী নিজেকে প্রভাবশালী বিদেশগামী শ্রমিক সরবরাহকারী হিসেবে পরিচয় দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এলাকাবাসীর সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলে। সে দাবি করত, তার মাধ্যমে গেলে কোনো ঝামেলা ছাড়াই দ্রুত মালেশিয়া পৌঁছানো সম্ভব। তার কথায় বিশ্বাস করে জনপ্রতি ২ থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত প্রদান করেন ভুক্তভোগীরা।

গত মাসের শেষ সপ্তাহে যুবকদের টেকনাফ হয়ে সাগর পথে রওনা করানো হয় বলে পরিবারের সদস্যদের জানানো হয়। যাত্রার প্রথম দিকে কয়েকজন যুবকের সঙ্গে মোবাইল ফোনে সীমিত যোগাযোগ থাকলেও হঠাৎ করেই সব ফোন বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে একের পর এক দিন পেরিয়ে গেলেও তাদের কোনো সন্ধান মিলছে না।

নিখোঁজ এক যুবকের বাবা বলেন, ছেলেকে বিদেশ পাঠাতে শেষ সম্বল জমি বিক্রি করেছি। মুন্নী বলেছিল দুই সপ্তাহের মধ্যেই মালেশিয়া পৌঁছাবে। তবে গত কয়েকদিন আগে ফোন করে মায়ানমার প্রশাসনের হাতে আটক আছে বলে জানিয়েছেন তার ছেলে। এ বিষয়ে দালাল মুন্নির সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি আবারও টাকা খুজতে থাকে। টাকা না দিলে আমাদের পুত্রদের জেলে বন্দী থাকতে হবে বলে ফোন কেটে দেন।

আরেক নিখোঁজের মা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার একটি মাত্র পুত্র সন্তান ছিল। মুন্নি নামের নারী প্রলোভন দেখিয়ে আমার অজান্তে আমার ছেলেকে মালেশিয়া পাঠানোর নামে নৌকায় তুলে দেয়। মাঝপথে গিয়ে দালালের মোবাইল ফোন থেকে আমার ছেলে আমাকে ফোন করে জানায়, সে এখন জিম্মি অবস্থায় রয়েছে। প্রাণ বাঁচাতে বাধ্য হয়ে আমরা বসতবাড়ি বন্ধক রেখে দালালদের টাকা দিই। কিন্তু টাকা নেওয়ার পর তারা আমাদের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়।

আজ আমি নিঃস্ব। সবকিছু হারিয়েও আমি শুধু আমার সন্তানকে ফেরত চাই। প্রতিদিন সমুদ্রের কোনো দুর্ঘটনার খবর শুনলেই বুক কেঁপে ওঠে, চোখে ভাসে আমার ছেলের মুখ। সরকারের কাছে একটাই আকুল আবেদন, যেন আমাদের সন্তানদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হয়।

হাজম রাস্তা এলাকার বাসিন্দা বেলাল উদ্দিন বলেন, মুন্নি পরিবারসহ চার-পাঁচ বছর আগে এই এলাকায় বসবাস শুরু করে। তার আত্মীয়স্বজন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে থাকায় সেখানকার যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে মালেশিয়া পাঠানোর একটি চক্র গড়ে তোলে। এই সুযোগে অসংখ্য যুবককে অবৈধ পথে মালেশিয়ায় পাঠিয়েছে সে।

কিন্তু কিছুদিন আগে যে ১৪ জন যুবককে পাঠানো হয়েছে, লোকমুখে শোনা যাচ্ছে তাদের অনেকেই নিখোঁজ। সন্তান নিখোঁজ হওয়ার খবরে মা–বাবারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন, কান্নায় ভেঙে পড়েছেন পরিবারগুলো। দালাল মুন্নিকে আইনের আওতায় না আনলে নি:স্ব হবে অনেক পরিবার।

পরিবারগুলোর অভিযোগ, যোগাযোগ করা হলে মুন্নী কখনো বলে যুবকরা নিরাপদে আছে, কখনো বলে নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে যোগাযোগ হচ্ছে না। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সে আত্মগোপনে চলে গেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এ ঘটনায় নিখোঁজদের স্বজনরা মামলার প্রস্তিতি নিচ্ছে বলেন বলে জানিয়েছেন। তারা প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছেও সহায়তা চেয়েছেন। মানবপাচারকারী চক্রের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

উখিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ নুর আহমেদ জানিয়েছেন, নিখোঁজের ঘটনায় প্রাথমিক তদন্ত শুরু হয়েছে। ঘটনা সঠিক হলে মানবপাচার প্রতিরোধ আইনে মামলা গ্রহণ করা হবে। অপরাধীর ঠাই উখিয়ায় হবে না।

মানবপাচার প্রতিরোধ কাজে জড়িত দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা বলছে, অবৈধভাবে সাগর পথে বিদেশ যাত্রা দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। দালালচক্রের লোভনীয় প্রলোভনে পড়ে অনেক তরুণ প্রাণ হারাচ্ছেন বা নিখোঁজ হচ্ছেন। তারা সরকারের কঠোর নজরদারি ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেন।

উল্লেখ্য, প্রতিবছর উখিয়ার শত শত মানুষ সাগর পথে অবৈধভাবে মালেশিয়া যেতে গিয়ে মানবপাচার, নির্যাতন এবং মৃত্যুর ঝুঁকিতে পড়ছে। বারবার সতর্ক করার পরও দালালচক্রের তৎপরতা বন্ধ হচ্ছে না।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button