
মোঃ কামরুল ইসলাম, রাংগামাটি প্রতিনিধি: রাঙামাটি জেলার লংগদু উপজেলার পাকুয়াখালির বেদনার্ত স্মৃতি আজও দগদগে ঘায়ের মতো বুক চিরে বয়ে বেড়াচ্ছে বাঙালি পরিবারগুলো। ১৯৯৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর জেএসএস-এর সশস্ত্র শাখা শান্তিবাহিনীর হাতে নৃশংসভাবে প্রাণ হারান ৩৫ নিরস্ত্র কাঠুরিয়া। কেবল অলৌকিকভাবে বেঁচে গিয়েছিলেন একজন—মোহাম্মদ ইউনুস মিয়া। তার জবানবন্দি দিয়েই প্রকাশ্যে আসে গণহত্যার ভয়াল চিত্র।
কিন্তু দীর্ঘ ২৯ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়নি। তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও তার রিপোর্ট আজও আলোর মুখ দেখেনি। স্বপ্ন দেখেও বারবার ভেঙে গেছে বেঁচে থাকা একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী ইউনুস মিয়ার আশা।
এমন প্রেক্ষাপটে মঙ্গলবার সকালে লংগদু উপজেলা কনফারেন্স কক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র পরিষদ (পিসিসিপি) কেন্দ্রীয় কমিটির উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় শোকসভা, দোয়া ও কবর জিয়ারত কর্মসূচি।
বিচার না পেয়ে চোখের পানি শুকিয়ে গেছে শোকসভায় বক্তারা বলেন।
২৯ বছর ধরে দেশের আদালতে ন্যায়বিচারের জন্য কাঁদতে কাঁদতে চোখের পানি শুকিয়ে গেছে নিহত কাঠুরিয়া পরিবারের। কিন্তু আজও কোনো বিচার হয়নি।
তারা আরও বলেন, প্রতি পরিবার থেকে অন্তত একজনকে সরকারি চাকরি, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন এবং গণহত্যার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
ইউনুস মিয়ার বেঁচে ফেরার গল্প সেদিন ৩৬ জন কাঠুরিয়ার মধ্যে ৩৫ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। একমাত্র বেঁচে যান মোহাম্মদ ইউনুস মিয়া। তিনি কৌশলে পালিয়ে প্রাণ রক্ষা করেন। তার বেঁচে ফেরা এবং সাক্ষ্যের মাধ্যমেই হত্যাযজ্ঞের প্রকৃত সত্য প্রকাশিত হয়।
কিন্তু ২৯ বছর কেটে যাওয়ার পর আজ তিনি নিজেই হতাশ। তিনি বলেন, আমি ভেবেছিলাম একদিন সরকার বিচার করবে। কিন্তু এখন আর বিশ্বাস হয় না। হয়তো এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার পরও বিচার হবে না।
পিসিসিপি কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি শাহাদাৎ হোসেন কায়েস সভায় বলেন, পাকুয়াখালি গণহত্যা কেবল ৩৫ পরিবারকেই ধ্বংস করেনি, বরং বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসে বিচারহীনতার এক ভয়াবহ অধ্যায় রচনা করেছে। আমরা সরকারের কাছে জোর দাবি জানাই, অবিলম্বে বিচার কার্যকর করতে হবে।
সভায় আরও বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক রাসেল মাহমুদ, চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতি গিয়াস উদ্দীন, রাঙামাটি জেলা শাখার সভাপতি তাজুল ইসলাম, লংগদু উপজেলা সভাপতি সুমন তালুকদারসহ বিভিন্ন স্তরের নেতৃবৃন্দ।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারদের অশ্রু হত্যাযজ্ঞের শিকার ৩৫ কাঠুরিয়া পরিবারের সদস্যরা আজও ভাঙা ঘরে দুঃখের বোঝা বয়ে চলেছেন। অনেকেই আর্থিক অভাবে সন্তানের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারছেন না। কেউবা দিনমজুরির কাজ করে টিকে আছেন।
লংগদু উপজেলার বাসিন্দা রুহুল আমিন বলেন, আমার বাবা সেদিন মারা গিয়েছিলেন। আমরা কোনো সাহায্য পাইনি। আজও অভাব-অনটনে দিন কাটছে। বিচার তো দূরের কথা, রাষ্ট্র থেকেও কোনো সহানুভূতি পাইনি।
কর্মসূচিতে নিহতদের পরিবারের সদস্য ছাড়াও স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অন্তত তিন শতাধিক মানুষ অংশ নেন। দোয়া মাহফিল শেষে কবর জিয়ারত করেন সবাই।
উপস্থিত ছিলেন বাস্তবায়ন কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ও জেলা সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর হোসেনসহ পিসিসিপি’র বিভিন্ন ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙতে হবে বক্তারা বলেন, পাকুয়াখালি গণহত্যার বিচারহীনতা শুধু ভুক্তভোগী পরিবারের নয়, গোটা জাতির জন্যই লজ্জার। তারা মনে করেন, একদিন না একদিন এই অপরাধের বিচার হবেই।
শাহাদাৎ হোসেন কায়েস সভায় ঘোষণা দেন, আমরা শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত পাকুয়াখালি গণহত্যার বিচার ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অধিকার আদায়ের সংগ্রাম চালিয়ে যাব।



