সিরাজুল ইসলাম, সিংগাইর, মানিকগঞ্জ: কালের বিবর্তনে আধুনিক সেচযন্ত্রের ভিড়ে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী সেচ যন্ত্র “দোন”। শত শত বছর ধরে মানুষ কৃষি কাজে পানি সেচের জন্য বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করেছ। এর মধ্যে অন্যতম পদ্ধতি ছিলো এই “দোন”। যার সাহায্যে ফসলের ক্ষেতে অতি সহজে সেচ দেয়া যেতো ।
সারাদেশে প্রায় বিলুপ্ত হলেও মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার জয়মন্টপ ইউনিয়নের খেলেশ্বর গ্রামের কৃষক খৈমুদ্দিন তার ৩ বিঘা ধান ক্ষেতে এবং ছয়আনী গ্রামের প্রবীন কৃষক বহর আলী তার ১ বিঘা জমিতে সেচ দিয়ে যাচ্ছেন “দোন” দিয়ে।
এভাবে পানি সেচ দিলে খরচ অনেক কম হয়। ক্রস আকারে দুটি বাঁশের শক্ত খুঁটি মাটিতে পুঁতে তার সঙ্গে লম্বা অন্য একটি বাঁশ বেঁধে দেওয়া হয়। এক প্রান্তে দোনের মাথা অন্য প্রান্তে মাটির ভরা (ওজন) দিয়ে পানিতে চুবিয়ে তুললে পানি উঠে আসে। এভাবে অনবরত পানি সেচ দিলে দ্রুত সেচের কাজ হয়ে যায়।
আম অথবা কাঁঠালজাতীয় গাছের মাঝের অংশের কাঠ কেটে নিয়ে তার মাঝ খানে খোদাই করে ড্রেন তৈরী করে পানি সেচ দেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হতো। কোন কোন স্থানে নারিকেল, তাল, সুপারি গাছ দিয়েও এ দোন তৈরী করা হতো। আবার কেউ কাঠের তক্তা দিয়েও এই দোন তৈরী করতো।
দোন দিয়ে পানি সেচ দেয়া অবস্থায় কৃষক মো.বহর আলী (৭৪) জানান, ৩০-৪০ বছর আগেও এ এলাকার সকল কৃষক বোরো ধান খেতে দোন দিয়ে পানি সেচ দিত। সবাই বন্ধ করে দিলেও তিনি ঐতিহ্য হিসেবে আজও তার ১বিঘা জমিতে দোনের সাহায্যে পানি সেচ দিয়ে যাচ্ছেন। এতে একটু পরিশ্রম হলেও সেচ খরচ নেই। ফসলের উৎপাদন খরচ অনেক কম হয় বলেও তিনি জানান ।
বয়স্কদের কাছ থেকে যানা যায়, আগেকার দিনে ফসলি জমিতে পানি সেচের জন্য টিন ও বাঁশের তৈরী অথবা টিন ও কাঠের তৈরী দোন ব্যবহার হতো। নদী, খালবিল বা জলাশয় থেকে কৃষকরা ফসলি জমিতে পানি সেচের জন্য এই দোন ব্যবহার করতো। উঁচু-নিচু জমিতে পানি সেচ দিতে দোন ছিলো অতুলনীয়। গ্রাম বাংলার কৃষকদের আবিষ্কার ছিলো এই দোন।
বর্তমানে দিন যাচ্ছে দেশ আধুনিকতার ছোঁয়া পাচ্ছে। এখন থেকে প্রায় ৩০-৪০ বছর আগেও টিন ও কাঁঠের তৈরী দোন ব্যবহার করে ফসলি জমিতে পানি সেচ দেয়া হতো। এতে খরচ যেমন কম হতো তেমনি ভূগর্ভস্থ পানির উপর চাপ না দিয়ে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহারও হতো।
আধুনিক প্রযুক্তির সেচযন্ত্র যেমন,শ্যালো, ডিপ,এলএলপিসহ বিভিন্ন ধরণের সেচযন্ত্র আসায় সেই প্রাচীন যুগের কৃষকদের তৈরী গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী দোন প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আধুনিকতার ছোয়ায় নতুন নতুন সেচযন্ত্র তৈরী হয়েছে যার ফলে খরচাও অনেক বেড়ে গেছে। দেশে বর্তমানে সব জমি শতভাগ সেচের আওতায় আসায় দোন এর সাহায্যে সেচ দেওয়ার প্রয়োজন হয়না। ফলে কৃষকরা এখন আর “দোন” ব্যবহারও করে না।
সিংগাইর উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মো. হাবিবুল বাশার চৌধুরী বলেন, আধুনিক কৃষিতে এখন আর কেউ দোন দিয়ে পানিসেচ দেয় না। সিংগাইরে এর ব্যবহারের বিষয়টি আমার জানা নেই। তিনি আরও বলেন, এক সময়ে সারাদেশে খাল-বিল, নদী-নালাসহ প্রাকৃতিক জলাধার থেকে কৃষকেরা দোন দিয়ে জমিতে পানি সেচ দিত। এতে ভূ উপরিস্থ পানি ব্যবহার হওয়ায় পরিবেশের ওপর বিরুপ প্রভাব পড়ত না। ফসলের উৎপাদন খরচও হতো অনেক কম।



