জাপানীরা কেমন পর্ব–১৬
মনে হল জাহাঙ্গীর আমার জন্যে বড় চিন্তিত। রোকসানা বেডের পাশে দাঁড়িয়ে একাধারে চোখের জল ফেলছে আর বিড়বিড় করে কোরানের আয়াত, দুয়াদরুদ পড়ছে। জাহাঙ্গীর বলল, ‘মামা আমি যেমন করেই হোক আপনাকে এখান থেকে বের করব! গুনমা হাসপাতালটি অনেক ভাল ওখানে আমার বন্ধুর সাথে কথা বলেছি। সে গুনমা হাসপাতালে যোগাযোগ করেছে!’
জাহাঙ্গীর এবং রোক্সানা যে আমার জন্যে ব্যাকুল হয়ে কিছু করছে তা বুঝতে পারছিলাম। কিছুক্ষণ পর তারা দু’জনে চলে গেল। তারপর আমার স্ত্রী প্রবেশ করল। হাতে তার একটি পুটলা। বলল, ‘বনি এটি তোমাকে দিতে বলেছে। সে সকালের ফ্লাইটে চলে গেছে। ব্যাগ থেকে কিছু পত্রিকা বের করে রাখল। বলল, ‘আজ আমি বেশিক্ষণ থাকতে পারবো না। কাল আবার আসবো।’
সে চলে যাওয়ার পর দু’জন নার্স আসল। তাদের একজন বলল, ‘ মুহাম্মদ সান পুটলাটির ভিতরে কি আছে খুলে দেখবো কি?’
বললাম, ‘আমার ছেলে আমাকে এটি দিয়ে চলে গেছে টোকিও। ভিতরে কি আছে জানি না। তোমরা খুলে দেখতে পারো।’
নার্স দু’জন পুটলাটি খুললো। তার ভিতর থেকে দু’ ইঞ্চি পাশের কটনের তৈরী চারটি সাদা রঙের বেল্ট বের করল। আমি দেখে আবাকই হলাম। কারণ, এগুলি দেয়ার মানে বুঝলাম না! সঙ্গে আরেকটি বস্তু। দেখতে প্রায় গুলাকৃতি এবং সেটিও কাগজে মুড়া ছুট আরেকটি পোটলাতে রয়েছে। তারা সেটি খুলে আমাকে বলল, ‘ডেঞ্জারাস! দেখো এটি কী?’
মহাবিস্ময়ে লক্ষ করলাম সেটি একটি তাজা ডিনামাইট। সেটার সঙ্গে হাতে লেখা একটি চিঠি। তাতে আমার ছেলে বনি লিখেছে।
“বাবা,
এ হাসপাতালের লোকগুলি অনর্থক তোমাকে বন্দী করে রেখেছে। তারা ভাল না। আমি কিছু বেল্ট দিলাম আর এই ডিনামাইট তোমাকে দিলাম। যদি পার ডিনামাইটে বিস্ফুরণ ঘটিয়ে হাসপাতালটি উড়িয়ে দাও। আর আহত ডাক্তার আর নার্সদের বেল্টগুলি দিয়ে বেঁধে তুমি ঘরে ফিরে আসো!
ইতি
বনি।”
চিঠির বক্তব্য বুঝে মহা চিন্তায় পড়লাম। তৎক্ষণাৎ আমার মুখদিয়ে কোন কথা বের হলনা। নার্স দু’জন চিঠি পড়ে বলল, “সত্যি ডেঞ্জারাস! এ বেল্টগুলি দিয়ে আমাদের বাঁধার আগে আমরা তোমাকে এখন বেঁধে রাখবো।”
একথা বলামাত্র দু’জন নার্স বেডের রেলিং এর সাথে আমার হাত পা বাঁধার জন্যে এগিয়ে আসল। আমি বললাম, ‘আমাকে বাঁধার এমন কি প্রয়োজন তোমাদের! আমিতো বড় দুর্বল। কিন্তু তারা আমার কথায় কর্ণপাত করল না। জোরেশোরে আমার হাত পা বেল্টগুলি দিয়ে বেডের রেলিং এর সাথে বেঁধে চাবি দিয়ে লক করল। বলাই বাহুল্য যে বেল্টগুলিতে লক করার ব্যবস্থা রয়েছে। তাতে আমি অত্যান্ত ভয় পেলাম এবং চিৎকার করতে লাগলাম। কিন্তু নার্সগুলি সবাই চলে গেল। তারা কেউ পিছু ফিরে তাকালনা। আমি এখন কী করতে পারি ভাবতে লাগলাম। তানাকা অর্থাৎ সাতোকে ডাকতে লাগলাম।
বললাম, “তানাকা সান, তুমি দয়াকরে আমার বেল্টগুলি খুলে দাও আমি বড় কষ্ট পাচ্ছি!”
সাতো সান বলল, ‘সত্যি বলতে কি তোমার কষ্ট আমি অনুভব করছি। আর, তা শুধু মাত্র আমার অনুভবেই সীমিত থাকবে। কারণ, বেড থেকে উঠে গিয়ে তোমার বেল্টগুলি খুলে দেয়ার মতো শক্তি আমার একেবারে নেই। আমি বড় দুঃখিত, মুহাম্মদ সান!’
এমন সময় লক্ষ করলাম হাসপাতালের প্রধান ডাক্তার মিসেস কিমুরা করিডোরে দাঁড়িয়ে কয়েজন নার্সের সাথে কথা বলছেন। আমি তার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে রইলাম। কিন্তু তিনি আমার চিৎকার শুনে একটি বারের জন্যেও আমার দিকে তাকালেন না। মনে হল আমার এ কষ্টের কথা তিনি জানেন। কিন্তু আমার সাহায্যে তিনি আসলেন না। এ ভাবে কতো ঘন্টা পেরিয়ে গেল জানিনা। মনে হল রাত হয়েছে। রাতে একজন নার্স ডিউটিতে থাকে। এখানে নার্সগণ রাত দু’টা থেকে পরের দিন রাত দু’টা পর্যন্ত ডিউটি করে। এটা নাকি এখানের নিয়ম। রাতে নার্স পাশের রুমে চলে গেল। আর ভয়ার্ত আমি চিৎকার করতে লাগলাম। আমার চিৎকার শুনে পাশের রুম থেকে একজন বলল, ‘ এতো বেশি চিৎকার করবেনা অন্য রোগীদের ঘুমের ডিসটার্ব হচ্ছে!’
তারপর মনে হয় আমি সংজ্ঞা হারালাম। সকাল সাতটার দিকে একজন নতুন নার্স এলো। আমি তাকে বেল্টগুলি খুলে দিতে অনুরোধ করলাম। সে আমাকে অপেক্ষা করতে বলে বের হয়ে গেল। মনেহয় পাঁচ মিনিট পর সে ফিরে এসে হাসিমুখে বেল্টগুলির লক চাবি দিয়ে খুলে দিল। আমি কিছুটা স্বস্তি পেলাম।
এখন আরেক সমস্যা দেখা দিল। একটি বিশেষ পরিবর্তন লক্ষ করলাম। এখন নার্সগুলি রুমে এসে আমার সাথে তেমন ভালকরে কথা বলেনা। মনে হল তারা আমাকে অবজ্ঞার চোখে দেখছে। আর, তানাকার প্রতি বিশেষ নজর রাখছে বুঝতে পারলাম। কিন্তু তানাকা আমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্যে প্রতিবাদ করেই যাচ্ছে। বলল, ‘এ লোকটার প্রতি তোমাদের ব্যবহার বড় দুঃখজনক। তোমরা আমাকে আমার ঘরে পাঠিয়ে দাও। তোমাদের চিকিৎসার প্রয়োজন নেই। কারণ, তোমাদের উপর আমার বিশ্বাস বলতে কিছু নেই!’
এদিকে নার্সগুলি আমার বেডের পাশ দিয়ে যাওয়া আসা করছে। বড় ব্যস্ত তারা কিন্তু আমাকে ভালমন্দ কিছুই জিজ্ঞাসা করেনা। সেদিন বিকালের দিকে সে ডাক্তারটি আসলেন। আমি তাকে এ অবহেলার মানে কি বুঝিয়ে বলতে অনুরোধ করলাম। বললাম, ‘ডাক্তার সাহেব আপনারা কি আমার ব্যবহারে অসন্তুষ্ট হয়েছেন?’
ডাক্তারটি জবাবে যা বললেন তা আমার কল্পনার বাইরে ছিল। তিনি বললেন, ‘তারা মনে করে তুমি তাদের সন্মান করনা!’
বললাম, ‘ অসন্মানের এমন কী করেছি তা আমাকে বলা উচিত ছিল। আপনারা জাপানি, আর আমি একজন বিদেশী। তফাৎ এটুকুই। আপনাদের ভাল লাগেনা এমন কোন আচরণ যদি লক্ষ করে থাকেন তখন তা আমাকে বুঝিয়ে দেয়া উচিত নয় কি?’
আমার কথা শুনে হাসল ডক্তারটি। বলল, ‘ঠিক আছে আমি তাদের বুঝিয়ে বলব।’
বললাম, ‘এ আবার কেমন কথা। তাদের বুঝিয়ে বলার পূর্বে বলুন আমার দুষ কি?’
কিন্তু ডাক্তার আমার প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে গেলেন। বললেন, ‘ তোমার ছেলেটি কি আবার আসবে?’
বললাম, ‘তার কথা কেন বলছেন! সেতো জাপান ফিরে গেছে।’
বললেন, ‘তাকে আমি ভয় পাই!’
কেন?
কারণ, তাকে এ হাসপাতালে তোমাকে দেখতে আসার সময় বাঁধা দেওয়াতে সে আমার উপর ক্ষেপে আছে!’
বললাম, ‘বাঁধা তো গার্ডেরা দিয়েছিল বলেছে। আপনি কেন ভয় পাচ্ছেন?’
গার্ডদের তো আমরাই বলে দিয়েছি কাউকে ভিতরে যেনো আসতে না দেয়।’
প্রতিবাদ করে বললাম, ‘সন্তান বাবাকে দেখতে এসেছে তাকে বাধা দেওয়ার মানে কী বুঝিয়ে বলুন?’
ডাক্তারটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘সে আমাদের হত্যা করার জন্যে ডিনামাইট পাঠিয়েছে!’
বললাম, সেটি সে এদেশে কোথা থেকে পাবে বলুন আমাকে। এদেশে তো প্রথম এসেছে। ডিনামাইট কি ইচ্ছা করলেই কেউ টাকা দিয়ে কিনতে পারে? ক্যানাডা তো আইনের দেশ। এতো সহজে ডিনামাইট্ তার হাতে যাবেনা, ডাক্তার! এখানে কারো কারসাজী রয়েছে। আর, তদন্ত না করে আপনারা আমার প্রতি অবহেলা করবেন না! আপনি একজন ডাক্তার। রোগী আপনার সাহায্য চায়, দয়া চায়। রোগী কেন আপনাদের হত্যা করার পরিকল্পনা করবে? তা আপনাদের অদ্ভুত চিন্তা নয় কি?’
কিন্তু ডাক্তার আমার প্রশ্নের কোন জবাব না দিয়ে তানাকার বেডের নিকট চলে গেলেন। আমি নতুন চিন্তায় পড়লাম। এ কী এক সমস্যায় পড়লাম এখন! অনেক রকমের ভাবনা এসে মাথায় জটলা পাকালো! এমন যখন ভাবছিলাম তখন একজন কৃষ্ণাগিনী নার্স এসে কথা বলল। তার বয়স কম। ক্যানাডিয়ান ব্ল্যাক মনে করলাম কিন্তু চেহারা দক্ষিণ ভারতের মেয়েদের মতো মনে হল।
মেয়েটি বলল, ‘আমি একজন নার্স। আজ নতুন যোগদান করলাম।’
সে তার নাম বলল কিন্তু সে নাম ভুলে গেছি। কিন্তু চেহারাটি আজো মনে রেখেছি। স্লিম কালো প্রতিমার মতো তার চেহারার গঠন। আমার পাশের রুমটির মাঝে গ্লাসের দেয়াল। সে রুমেও দু’জন রোগী রয়েছে। তাদের সেবার কাজে কৃষ্ণাঙ্গিনী মেয়েটি অতি দক্ষতার সাথে কাজ করে যাচ্ছে। তার কাজ দেখে অবাক হলাম। আজ আবার অনুধাবন করলাম যে হাসপাতালটিতে ভিন্ন বর্ণের নার্স যোগদান করে কিছু পরিবর্তন এনেছে।
কিছুক্ষণ পর ডাক্তারটি এসে পুনরায় আমার বেডের নিকট বসলেন। কিন্তু কোন কথা বলছেন না। আমি প্রথমে কথা বললাম, ‘ ডাক্তার সাহেব, অনেক লোককে বলতে শুনেছি যে কোন রোগী রোগ যন্ত্রণায় কাতর হয়ে ডাক্তারের নিকট গিয়ে ডাক্তার হাস্যোজ্জ্বল মুখ দেখে তার রোগ যন্ত্রণা অনেক কমে যায়! কিন্তু আমি যখন আপনার চেহারা দেখি তখন আমার মন যন্ত্রণায় কাতর হয়ে উঠে!’
‘কেন? কেন?’ ডাক্তারটি জানতে চাইলেন।
বললাম, ‘ সে উত্তর আপনি নিশ্চয় জানেন!’
ডাক্তারটি আর কিছু বললেন না! চুপ করে রইলেন।
বললাম, ‘আমার কথার অর্থ বুঝেন নি?’
এবার হাসল ডাক্তার। বলল, ‘সবই বুঝেছি!’
মনে হল মৃত্যু দুয়ারে এসেও আমি সর্বপ্রথম তার হাসিটি শেয়ার করলাম। বললাম, ‘ ডাক্তার সাহেব, আপনি এখনো ইয়াং। একজন সার্থক ডাক্তারের সাফল্য কিন্তু ওখানেই, বুঝলেন? আশাকরি এখন থেকে রোগীর মনের কথা বুঝার চেষ্টা করবেন। একজন রোগী ডাক্তারের কাছ থেকে তার রোগযন্ত্রণা লাঘব হওয়ার প্রত্যাশা করে। বাঁচা মরা সব অদৃষ্টের লিখন। তবে একথাও সত্য যে একজন ভাল ডাক্তারের উপর সৃষ্টিকর্তার প্রতিফলন কম বেশি থাকে এবং তাহলেই একজন সার্থক ডাক্তার হওয়া যায়!’
কিছুক্ষণ পরে বিকাল তিনটার সময় আমার স্ত্রী এল। তাকে দেখে আমি অতিশয় ক্ষুবে বললাম, ‘ বনি যে পোটলাটি দিয়েছে সেটি আমাকে দেওয়ার আগে তাতে কি আছে তাকে জিজ্ঞাসা করনি?’
বলল, ‘না! আমি কিছু জিজ্ঞাসা করিনি। তাতে এমন কী ছিল?’
আমি তার কথা শুনে রেগে গেলাম। অবশ্যই তোমার জিজ্ঞাসা করা উচিত ছিল। অথবা, পোটলাটি খুলে দেখা উচিত ছিল। জান কি তোমার সে ভুলের প্রায়শ্চিত্ত আমাকে কতোটুকু করতে হয়েছে?’
তাকে সব ঘটনা খুলে বললাম। ডিনামাইটের কথাও বললাম।
বলল, ‘কিচ্ছুতেই একথা আমি বিশ্বাস করতে পারছি না! এগুলি সে সঙ্গে নিয়ে যেতে বলেছিল! তাতে তার শখের কিছু জিনিষ ছিল। অন্য কিছু নয়!’
বললাম, ‘তাই যদি হয় – সেতো এসব নিজেই সঙ্গে নিয়ে যেতে পারতো। আমাকে দেয়ার মানে কি ছিল?’
আমার কথার কোন প্রতিউত্তর দিতে পারলনা সে। সে আমার কষ্টের কথা অনুধাবন করেছে নাকি করেনি তা বুঝতে পারমাম না।
পাশের কামরায় একজন নতুন রোগী এসেছেন। নার্স বলল তিনি নাকি নামকরা একজন জার্নালিষ্ট। অসুস্থ হয়ে আই সি ইউ তে আছেন। তার কী রোগ তা জানার আগ্রহ থাকা সত্তেও জিজ্ঞাসা করলাম না। রোগীটির বয়স ষাটের কোঠায় মনে হল। সবচেয়ে বেশি আশচর্য হলাম তার একটি জিনিষ দেখে। তিনি শুয়া অবস্থায় লিখে যাচ্ছেন এবং সে লেখা প্রিন্টারে প্রিন্ট করে কোথাও ফ্যাক্স করছেন। ধারণা করলাম যে এখানেও তিনি তার সাংবাদিকতার কাজ হাসপাতালের বেডে থেকে চালিয়ে যাচ্ছেন। আমার খুব ইচ্ছা হল তিনি প্রতি সংবাদে কতো টাকা পান তা জানার। আর ভাবছিলাম এতো বড় রোগ নিয়ে এখানে থেকেও কেনো তাকে এতো কাজ করতে হচ্ছে! কিছুক্ষণ পর তাকে এক্সরে করার জন্যে নিয়ে গেল। তার লেখা কাগজ, প্রিন্টার এবং ফ্যাক্স মেশিন বেডের পাশে রয়েছে। নার্সকে বললাম, ‘তিনি কি হাসপাতালের সাংবাদিক?’
বলল, হ্যাঁ।
বললাম, ‘যদি কিছু মনে না কর তার প্রিন্ট করা কয়েকটি কাগজ এনেদিলে আমি পড়ব!’
নার্সটি আমার কথা শুনল এবং একটি মাত্র পৃষ্টা এনে আমার হাতে দিল! তা হল সংবাদের জন্য তার লেখা একটি বিল! লেখাটি এমনঃ
“আমার সংবাদ ছাপানোর জন্যে ৭% এবং আমার সংবাদ নির্দিষ্ট যে স্থানে ছাপানো হয়েছে সেখানে বিজ্ঞাপন থাকলে ২৫%। টোটাল ৭৫ ডলার আমার একাউন্টে যাবে।”
মনেমনে ভাবলাম, হয়তোবা খবর এ পদ্ধতিতেই বিক্রয় করা হয়। আর, যিনি লিখেন তাকে চৌকশ জার্নালিষ্ট হতে হয়। কিছুক্ষণ পর তাকে এক্সরে রুম থেকে নিয়ে আসা হল। সঙ্গে পাঁচ জন (সম্ভবত) রিসার্চ মেডিক্যাল ষ্টুডেন্ট। তারা তার ব্লাড স্যাম্পল নিয়ে চলে গেল। এখন জার্নালিষ্টটিকে দেখে খুব দুর্বল মনে হচ্ছেনা। তিনি রিপোর্ট লিখে যাচ্ছেন। তার সাথে আমার তফাৎ শুধু গ্লাসের ওয়ালটি। তাই ভিন্ন কামরায় থাকলেও তার চালচলন দেখতে পাচ্ছি।
কিছুক্ষণ পর সাতো ওরফে তানাকার জন্যে খাবার এল। একজন নার্স আমার স্যালাইন টিউবে সিরিঞ্জ থেকে লিকুইড খাবার ইনজেক্ট করল। তানাকার খাবার শেষ হওয়ার পর তার নাম ধরে ডাকলাম। ‘তানাকা সান!’
বলল, ‘কিছু বলবে?’
হ্যাঁ বলব।
তাহলে বল!
বললাম, ‘ যদি কিছু মনে না কর তাহলে আমার একটি প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিবে কি?’
‘অবশ্যই সঠিক উত্তর দিবো।’
‘তাহলে বল তুমি তোমার নাম এবং বয়স বদলিয়ে ছিলে কেন?’
আমার প্রশ্ন শুনে তানাকা অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। কোন জবাব দিলনা। আমি আগ্রহের সাথে তার জবাবের আশায় সময় ক্ষেপণ করছিলাম।
‘তানাকা সান!’ আবার ডাক দিলাম।
এবার তানাকা কথা বলল। বলল, ‘শুন তাহলে, ঐ যে মহিলাটি আমাকে কয়েকদিন এসে বিরক্ত করেছে সে আমার তালাক দেওয়া স্ত্রী। আমার সম্পত্তির লোভে হন্যে হয়ে আমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে বলে আমি অসুস্থ হয়ে এ হাসপাতালে গোপনে এডমিশন নেই। কিন্তু দুঃখের কথা হল আমি জানতামনা যে সে এখানে কাজ করে। তবে পেশায় সে একজন নার্স।’
‘কিন্তু তার কথা শুনেতো মনে হয়নি যে সম্পত্তির লোভে তোমার সাথে কথা বলছিল। সে তোমাকে বারংবার জিজ্ঞাসা করছিল তাকে চিনো কী না। আর, তার সব কথা শুনে মনে হয়েছে মহিলা তোমাকে ভালবাসে, তোমার সম্পত্তিকে নয়!’
আমার এ কথা শুনে মনে হল তানাকা বিস্মিত হল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, ‘কিন্তু তাকে আমি ভালবাসি না।’
বললাম, ‘
বললাম, ‘আমার মনে হয় এই মহিলাকে তুমি ভয় পাও!’
আমার প্রশ্নের উত্তর দিল সে ভিন্ন ভাবে। বলল, ‘সে যাই হোক, সে আর আমার নিকট আসবে না।’
এ সময় সে ডাক্তারটি আবার আসলেন। আমার বেডের নিকট এসে বললেন, ‘তানাকা বেশি কথা বলে তাই না?’
বললাম, ‘নাহ! তেমন বেশি কিছু নয়। আমি তাকে কিছু প্রশ্ন করেছিলাম।’
ডাক্তারটি বললেন, ‘আমি তোমাদের সব কথাই শুনেছি। তুমি তার সাথে কথা বললে তোমার মাথা খারাপ হয়ে যাবে।’
এখন বিপাকে পড়লাম আমি। তাঁর কথার কী উত্তর দিব ভাবছিলাম।
এবার তানাকার ভারি কন্ঠ শুনলাম। “এই যে ডাক্তার এদিকে আসো!”
ডাক্তারটি তার কাছে যেতেই বলল, ‘আমাকে আজকের মধ্যে আমার ঘরে পৌছে দেওয়ার ব্যবস্থা করুন।আমি আপনাদের কিছুতেই সয্য করতে পারছি না!’
ডাক্তারটি জবাব দিলেন, ‘ এ অবস্থায় আপনাকে ঘরে পাঠালে পথেই তোমার মৃত্যু হবে। জান কি?’
তানাকা কোন জবাব দেবার আগেই ডাক্তারটি বললেন, ‘শুন তানাকা, তোমাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে। কিছুতেই এ অবস্থায় যেতে দিতে পারি না!’
এবার তানাকা উত্তর দিল। বলল। ‘আমার লাইফ সাপোর্টের দরকার নেই। আমি যা বলছি তাই করুন!’
ডাক্তার দু’জন নার্সকে নিয়ে এসে বললেন, ‘তানাকাকে ঘরে পাঠাতে হবে। তোমরা আমাকে সাহায্য কর!’
আগেরটির মতো নার্সদের সাহায্যে দু’তলা পাল্কীর মতো ষ্টীলের পাতি দিয়ে বানিয়ে তার উপর পাতলা কাপড় দিয়ে ঢেকে দিয়ে একটি ইঞ্জেকশন দিয়ে দ্রুত বের হয়ে গেলেন ডাক্তারটি। কিছুক্ষণের মধ্যেই তানাকার কথা বলা বন্ধ হয়ে গেল। সে গভীর ঘুমে অচেতন এখন।
হাসপাতালে আমার পাশের কামরায় যে জার্নালিষ্ট রোগীটি আছেন তার কাজ দেখে ভাবছি এই ‘আই সি ইউ’ তে সাংঘাতিক কোন রোগী ছাড়া কেউ আসে না। মারাত্মক কোন রোগে তিনি ভোগছেন তাতে সন্দেহ নেই। অথচ তিনি এখানে তাঁর কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁর বেডের পাশে একটি প্রিন্টার কাম ফ্যাক্স মেশিন আছে আর আছে একটি ল্যাপটপ। বিশাল এই হাসতালে রয়েছে হাজার হাজার কর্মচারি, হাজার হাজার নার্স আর শত শত ডাক্তার। সবাই কর্মব্যাস্ত। কারো দিকে তাকাবার সুযোগ কারো নেই। আমি কি এ যাত্রায় বেঁচে ঘরে ফিরে যাবো এ গ্যারান্টিও নেই। হঠাৎ লক্ষ করলাম কয়েকজন ছাত্র করিডোরে আনন্দ উল্লাস করছে। তাদের উল্লাস বড় অস্বাভাবিক লাগছে। কারণ, এই ওয়ার্ড তো উল্লাস করার জন্য নয়। এখান থেকে কেউ লাশ হয়ে ফিরে যায় আবার কেউ সুস্থ হয়ে ফিরে যায় অতি দুর্বল দেহটি নিয়ে।কারো মুখে হাসিটুকু পর্যন্ত থাকে না। সে যাই হোক, মনে হল ছাত্রগুলি রিসার্চ ষ্টুডেন্ট। তারা ভালমতো ইংরেজি বলতে পারে না অথচ তাদের একজন ছাত্রকে বলতে শুনলাম, “ভেরি ভেরি ড্যাঞ্জারাস ব্লাড স্যাম্পল!” তার হাতের ট্রেটিতে রয়েছে কিছু টেষ্ট টিউব।
একজন নার্সকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলাম, তারা কিসের উল্লাস করছে?
বলল, ‘জার্নালিষ্টের ব্লাড টেস্ট করে তারা জানতে পেরেছে তার ব্লাড ক্যান্সার।’
একথা শুনে আমি জার্নালিষ্টের বেডের দিকে তাকালাম। জার্নালিষ্ট এখন কাজ করছেন না, চোখ বুঝে নির্লিপ্ত ভাবে শুয়ে আছেন। মনে হল একথা শুনে মনে বড় আঘাত পেয়েছেন এবং সম্পূর্ণ ভাবে তিনি মনোবল হারিয়ে ফেলেছেন।
আমি নার্সটিকে বললাম, “রোগীর ক্যান্সার হয়েছে জেনে তারা উল্লাস করবে কেন?”
নার্সটি আমার প্রশ্নের কোন উত্তর না দিয়ে নিরবে অন্যত্র চলে গেল।
জানিনা ছাত্রগুলি কেনো এমন আচরণ করেছে। তবে তাদের প্রতি আমার রাগ এসে গেছে। তারাই যদি ভবিষ্যতে ডাক্তার হয় তখন রোগী তাদের কাছ থেকে কেমন আচরণ আশা করতে পারে। এসব হাবিজাবি চিন্তা এসে মাথায় বাসা বাঁধল। আমি কিছুক্ষণ চোখ বুঝে রইলাম।
এমন সময় তানাকাকে দেখতে একজন পুরুষ ভিজিটার এসেছেন। বয়স তার পঞ্চাশ হবে। তানাকার কাছে যেতেই সে লোকটিকে বলল, “আমাকে যতো শীঘ্র এ হাসপাতাল থেকে বের করে নাও।”
লোকটি নিম্ন কন্ঠে বলল, কেনো?
এখানের ডাক্তারগুলি ভাল না। তারা আমাকে ঘুমের ইঞ্জেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখে। পাশের বেডের মোহাম্মদের সাথেও তারা খারাপ ব্যবহার করছে। আমি সব কিছু লক্ষ করছি। সে বিদেশি বলে তাকে ভিন্ন নজরে দেখছে। এসব কথা আমি স্বাস্থ্য ডিপার্ট্মেন্ট এ গিয়ে বলে প্রতিবাদ করবো।
এমন সময় সেই ইয়াং ডাক্তারটি আসলেন। তিনি তানাকার সব কথাই শুনেছেন। প্রতিবাদ করে বললেন, “এখানে আমাদের চোখে সব রোগী সমান। কারো প্রতি বিন্দুমাত্র বৈষম্য দেখানো হয় না। তানাকা যা বলছে, তা সত্য নয়!”
তানাকা বলল, “সব সত্য কথা বলেছি। খামাখা মোহাম্মদের হাত পা বেল্ট দিয়ে না বাঁধলেই কি হতোনা? সে সারারাত চিৎকার করেছে। কেউ এসে তার বেল্টগুলি খুলে দেয়নি।”
তানাকা আরো বলল, “সে আমাকে বেল্টগুলি খুলে দিতে কতো অনুরোধ করেছে। কিন্তু আমার দেহে শক্তি থাকলে তার বাঁধন খুলে দিতাম।”
ডাক্তারটি তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “মিঃ তানাকা, তোমার বয়স এখন ৮৪ বৎসর। আর কতোদিন তুমি বেঁচে থাকবে। বড়জোর পাঁচ বছর। আর এই পাঁচ বছর তোমাকে অক্সিজেন সাপোর্টে থাকতে হবে, তাকি তুমি জানো?”
ডাক্তারটি চলে যাওয়ার পর আগন্তুক লোকটি বলল, “তানাকা, এখানে ভর্তি হলে নিজের ইচ্ছায় যাওয়া যায় না। ডাক্তারের ছাড়পত্র ছাড়া তোমাকে আমি নিয়ে যেতে পারবো না।”
তানাকা বলল, ‘এখানে আমার ভাল লাগছে না। ঘরে ফিরে যেতে চাই।’
লোকটি বলল, “এখন আমাকে যেতে হবে। তোমার জন্যে কাল কি কি আনতে হবে বল।”
তানাকা বলল, ‘মোহাম্মদ রোজ পত্রিকা পড়ে। আমাকে ডেইলি পত্রিকা পাবার ব্যবস্থা করে দিতে বল।’
এখন সন্ধ্যা। বাইরে লাখো লাখো বাতি জ্বলছে। এমন সময় হাসপাতালের একটি লোক এসে বলল, “মোহাম্মদ, এদেশে যতো অনিষ্ঠ ও সকল আইন বিরোধি খারাপ কাজের জন্যে এক শ্রেণীর লোক আছে। তারা ডেঞ্জারাস।
বললাম, ‘ তারা কে?’
সে বলল, ‘ তুমি তোমার পায়ের দিকে মাথা রেখে শুয়ে থাকো। একটু পরেই ওই পাহাড়ের কাছে কিছু আলামত দেখবে। আর যাকে দেখবে তাকে কিন্তু নজরে রাখবে। নইলে সে তোমার অনিষ্ট করতে পারে।’
লোকটি চলে যাওয়ার পর গ্লাসের জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। লাল নীল হলুদ বর্ণের অনেক বাতি জ্বলছে। একটি পাহাড়ের সারি দেখালাম। সেখানে বিশাল একটি হাতীর ডিজাইন দিয়ে একটি সাইন বোর্ড লক্ষ করলাম। সেটার নিচে ইংলিশে লেখা রয়েছে, “ EIGHT BANK LIMITED।” এমন ব্যাঙ্কের নাম কোথাও শুনেছি কিনা ভাবতে লাগলাম। মনে হল ইউরোপের কয়েকটি ব্যাঙ্ক মিলে নতুন এ ব্যাংকটি করেছে। চমৎকার এই সাইন বোর্ডটি যা সহজেই চোখে পড়ে। আর সেটি রাতের শহরটিকে আরো বেশি রহস্যময় করে তুলেছে।
তার পাশে ভিন্ন আরেকটি পাহাড় রয়েছে। সেটার উপর কালো আকৃতির বিশাল একটি মূর্তি এবং সেটার হাতে মস্ত বড় একটি ডিনামাইট! অনতিদূরে আরেকটি পাহাড়ের উপর একটি উঁচু টাউয়ার। সেটাতে অনেক ডিশ লাগানো আছে। বুঝলাম সেটা দিয়ে ব্রডকাষ্টিং এর কাজ করা হয়।
আগের লোকটি আবার আমার বেডের কাছে এসে বললো, “ঐ মূর্তিটিই সমস্ত অনিষ্টের কারণ। তার দিকে লক্ষ রাখো!”
বললাম, “তাহলে এদেশের পুলিশ তাকে ধরছে না কেনো?”
লোকটি বলল, “ দেখতে পাচ্ছোনা তার হাতে ডিনামাইট। পুলিশ তাকে সহজে ধরতে পারবে না।”
লোকটি আবার চলে গেলো।
একটু পরে ডাক্তার এসে বললেন, “তোমাকে পায়ের দিকে মাথা রেখে কে শুইতে বলেছে। ওদিকে মাথা রাখ!”
বললাম, ‘ঐ লোকটির উপর নজর রাখতে একজন লোক এসে বলে গেলেন আমাকে।’
হাসল ডাক্তার, “রোগীর বেডে শুয়ে সেটার দিকে নজর রেখে তুমি কি করতে পারবে, শুনি!”
আমি আবার ঠিক হয়ে শুইলাম।
আমি আবার পূর্বাবস্তায় শুইলাম বটে অথচ বেডে উঠে বসার শক্তিটুকু আমার নেই। এ কেমন করে হয়! রাতের অন্ধুকারে বিচিত্র রঙের লাইটের আলোতে জানালা দিয়ে দেখতে ভালই লাগছিল। অবচেতন মনে এসব দেখেছি কি?

সকালে আমার ওজন নিতে যন্ত্র নিয়ে এল একজন নার্স। তাকে বললাম, ‘আমি যে উঠে বসতে পারি না!’
“ঠিক আছে আমি তোমাকে উঠতে সাহায্য করবো। যুবতী নার্সটি বল প্রয়োগ করে আমাকে উঠাল। তারপর বলল, ‘এখন এই মেশিনটির উপর তোমাকে দাঁড়াতে হবে!’
‘কিন্তু আমিতো দাঁড়াতে পারবো না। পড়ে যাবো!’
নার্সটি বলল, ‘আমি তোমাকে ধরে দাঁড় করাবো, ভয় পেয়ো না!’
সে আমার বাহুতে শক্ত করে ধরে ওজন যন্ত্রটিতে আমাকে দাঁড় করাল। তখন আমার ভয় লাগছিল। মনে হচ্ছিল আমি পড়ে যাবো।
একটু পর ডাক্তার আসলেন। বললেন, ‘ওজন কতো পেয়েছ?’
নার্সটি বলল, ‘ মাত্র ৫৭ কিলোগ্রাম।’
ডাক্তার চোখ কপালে তুলে বললেন, ‘এই ক’দিনে ১৭ কিলোগ্রাম ওজন হারিয়েছে? না, তা হতে পারে না। আবার মাপতে হবে। আরেকটি ওজন মেশিন নিয়ে আসো!’ বিলম্ব না করে নার্সটি আরেকটি বড় আকৃতির ওজন মেশিন নিয়ে এল। এ মেশিনটিতে উঠে বসে ওজন নেয়া যায়।
ডাক্তার এবং নার্স দু’জনে আমাকে ধরে মেশিনটিতে বসালেন। এবার ডাক্তারের চেহারা দেখে মনে হল আমার সঠিক ওজন পেয়েছেন। সর্বমোট সাড়ে ১০ কিলোগ্রাম ওজন হারিয়েছি তিনি বললেন। তারপর একটু হেসে বললেন, ‘এতে ভয়ের তেমন কিছু নেই! আগের যন্ত্রে যে ওজন পাওয়া গিয়েছে তা সঠিক নয়।’
সেদিন রাত ৮টায় দু’জন নার্স সেই বেল্ট নিয়ে আবার এল আমাকে বেডের রেলিং এর সাথে বাঁধতে। আমি তাদের হাবভাব দেখে বুঝলাম। তারপর বললাম, “আমার দেহে এতোটুকু বল নেই। তোমরা আমাকে বাঁধবে কেনো?”
নার্স দু’টি আমার কথার কোন উত্তর না দিয়ে বেল্ট দিয়ে আমাকে বাঁধার উদ্যোগ নিল। তারা আমার কাছে আসতেই আমার যতটুকু বল আছে পা দিয়ে তাদের বুকে একের পর এক লাথি মারতে লাগলাম আর বললাম, “তোমরা আমাকে কষ্ট দিয়ে মারতে চাও কেনো?”
কিন্তু অতি সহজেই যুবতী নার্স দু’জন আমাকে কাবু করে ফেলল। শক্তিতে পেরে উঠলাম না তাদের সাথে। ওদিকে তানাকা বলে উঠলো, “ নার্স, মোহাম্মদের উপর কিন্তু তোমরা বেশি বাড়াবাড়ি করছো। তোমাদের বিরুদ্ধে আমি মন্ত্রণালয়ে নালিশ করবো!”
তারা দু’জন আমার হাত ও পা চারটি বেল্ট দিয়ে বেঁধে চলে গেল। আমি যন্ত্রণায় চিৎকার করতে লাগলাম।
ঘন্টা খানেক পর মনে হয় ঘুমিয়ে পড়লাম। এমন সময় একজন লোক এসে আমাকে বলল, ‘আমার সাথে চল। আমার সাথে গেলে তুমি তেমন কষ্ট বোধ করবে না। সে আমাকে নিয়ে একটি বড় নদীর নিকট গেল। সেখানে বড় একটি নৌকাতে পরিচিত একজন বাংলাদেশীকে দেখলাম। তার নাম আমজাদ আলী।
আমজাদ আমাকে দেখে বলল, “আরে ভাই, আপনি এখানে কেমনে আসলেন?”
বললাম ঐ লোকটি নিয়ে এসেছে। তখন মনে হচ্ছিল আমার হাতে বেল্ট বাঁধা নেই। আমজাদের মস্ত বড় নৌকা। সেটি যে নদীটির উপর মনে হল তা মেঘনা নদীর মতো। সে বলল, “উঠুন ভাই আমার নৌকাতে আপনাকে নিয়ে বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিবো।”
আমি তার নৌকায় উঠে বসলাম। দেখলাম একশত মণের উপর চাউল নৌকাতে বোঝাই করা আছে।
জিজ্ঞাসা করলাম, এতো চাউল কোথায় নিয়ে যাবে আমজাদ?
বলল, ‘দু’বাই নিয়ে যাবো!’
নৌকাটি বেশ বড়। তাতে ছোট দু’টি কামরা রয়েছে। একটিতে তার স্ত্রী ও দু’টি সন্তান থাকে। নৌকাটিতে মস্ত বড় তিনটি পাল লাগানো হয়েছে। সেটির ছাদের উপরেও বিভিন্ন মালামাল রয়েছে। দু’টি মাত্র দরজা রয়েছে। আমজাদ একটির পাশে দাঁড়িয়ে আছে আর অন্য দরজাটির পাশে আমি দাঁড়িয়ে আছি। নৌকার হাল ধরেছে কে তা দেখতে পাইনি। দ্রুত বেগে নৌকাটি সাগরের দিকে যাচ্ছে। এমন সময় আমজাদ বলল, “জানেন, আপনি যেদিকে দাঁড়িয়েছেন সেদিকের ছাঁদ ধ্বসে যেতে পারে। কারণ, উপরে ভারী মালামাল রয়েছে। তবে আমার দিক ধ্বসে যাবে না!”
আমজাদের এ কথার মানে কি হতে পারে বুঝলাম না। যেদিকে ছাঁদ ধ্বসে যেতে পারে সেদিকে আমাকে দাঁড়াতে দিল কেন? আমাকে তার তো বলা উচিত ছিল ওখান থেকে সরে দাঁড়াবার কথা। কিন্তু সে তা না বলে আমাকে এতো সহজ ভাবে এমন কথাটি কী করে বলল বুঝতে পারলাম না। তবে আমার যে দুর্ভাগ্য সেকথা সর্বক্ষণই মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। মনে হচ্ছে মৃত্যু দূত আজরাইল আমার ছায়ার সাথে হাঁটছে। আমার ভাগ্যে মন্দ ছাড়া ভাল কিছু ঘটবে না!
কিন্তু তার কথার উত্তর আমি দিলাম না। তাকে বরং ভিন্ন প্রশ্ন করলাম। “আচ্ছা, বলতো কেমনে বঙ্গোপসাগর পারি দিবে?”
আমজাদ একটি ম্যাপ দেখিয়ে বলল, “এই ম্যাপ অনুসারে আমরা যাবো। তবে মাঝে মাঝে পথে ডাকাতের আক্রমন হয়!”
বললাম, “একি কথা। তাহলে এ ব্যবসা করে লাভ কর কেমনে?”
জবাবে বলল, “দু’এক শত ডলার হাতে রাখি। তা নিয়ে চলে যায়!”
এতোটুকু বলে সে নজরুলের কবিতার মতো একটি কবিতা পাঠ করে শুনালো। তারপর বলল, “আপনি হয়তো ভাবছেন এটি নজরুল ইসলামের কবিতা, তাই না?”
বললাম, ‘হ্যাঁ, তাই ভাবছি!’
“ভুল করলেন। এটি হল আমার নিজের লেখা একটি কবিতা। ছোট বেলায় কবি নজরুলের কবিতা অনেকগুলি মুখস্ত করেছি। তারপর নিজেই লিখছি। কিন্তু আমার কবিতাপাঠ শুনে অনেকেই মনেকরে নজরুলের কবিতা।”
একটু থেমে আমজাদ বললো, ‘পঞ্চম শ্রেণী থেকেই কবিতা লেখার ঝোঁক আমার। কিন্তু অষ্টম শ্রেণীতে উঠে অর্থনৈতিক কারণে স্কুল ছেড়ে দিয়ে চাউলের ব্যবসা শুরু করি। প্রথমে বাজারে বেচতাম তারপর বিদেশে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করি। ভাল মোনাফা হয়। আমার সাথে আপনি করবেন এ ব্যবসা?”
বললাম, ‘আমার হাতে টাকা নেই। তাছাড়া আমি মুক্ত নই।’
আমজাদ চোখ কপালে তুলে বলল, “মুক্ত নন, এমন বলছেন কেনো?”
“আমি জানি না!”
মৃদু হাসল আমজাদ। তারপর বলল, “শুনুন, এ নৌকার চাউল সব আপনাকে বাকীতে দিবো। সামনে যে দ্বীপটি দেখছেন সেখানে আমার একটি ঘর আছে। আমি পরিবার নিয়ে সে দ্বীপে নেমে যাবো। আপনি এ নৌকা নিয়ে দুবাই চলে যান। ওখানে অনেক বাঙালি কাষ্টমার নগদ মূল্যে সব চাউল কিনে নিবে। আমাকে দশ হাজার ডলার ফিরে এসে পরিশোধ করবেন। আর, এর উপর যা থাকে তা আপনার!”
আমজাদের এ প্রস্তাবে আমি রাজী হলাম না। বললাম, ‘আমার ভাল লাগছে না। নদীর তীরে আমাকে নামিয়ে দাও। আমি ফিরে যেতে চাই!’
আমজাদ আমার কথা শুনল। নদীর তীরে আমাকে সে নামিয়ে দিল। তীরে নেমে আমি উলটো দিকে হাঁটতে লাগলাম। কিছুদূর যাওয়ার পর আবার সেই লোকটাকে দেখা গেল। লোকটি বলল, ‘ এখন চল আমার সাথে। রাতে আমরা কাওয়াগুয়ে সিটির একটি বাড়িতে থাকবো!”
আমরা অবলীলাক্রমে মুহুর্তে কাওয়াগুয়ে সিটির একটি রাস্তায় গিয়ে দাঁড়ালাম। ব্যস্ত রাস্তা। অনেক গাড়ির চলাচল। এমন সময় লক্ষ করালাম রাস্তাটির অপর পার্শে একটি দালানের একতলায় তানাকা বসে কাজ করছে।
অবাক হলাম তাকে দেখে। মনে করলাম সে একবার আমাকে বলেছিল যে কাউয়াগুয়ে সিটিতে তার অফিস আছে। তাহলে কী তানাকা তার অফিসে ভাল হয়ে ফিরে এসেছে? মনে মনে বললাম। এমন সময় লক্ষ করলাম, “তার অফিসে সাইন বোর্ডের মতো যা দেখা যাচ্ছে সেটি তার হার্টের মনিটর। যেটি হাসপাতালে দেখেছিলাম। এমন একটি মনিটর আমার বেডের পাশেও আছে! অবচেতন মনে এসব দেখছি না তো?
এমন সময় লোকটির ডাক দিল। বলল, “চল আমার সাথে।”
আমরা দু’জন হেঁটে একটি দু’তলা বিল্ডিং এর সিঁড়ির পাশে এসে দাঁড়ালাম। লোকটি বলল, “তুমি সিড়ির পাশে ঘুমিয়ে থাকো। আমি দু’তলায় ঘুমাবো!”
বলার সঙ্গে সঙ্গে ফ্লোরেই শুয়ে পড়লাম। সকালে সে লোকটির ডাকে জেগে উঠলাম। তখন হাত ও পায়ে আবার তীব্র ব্যথা অনুভব করলাম। লক্ষ করলাম আমার হাত পা সবই হাসপাতালের বেডের রেলিংয়ে বাঁধা রয়েছে। এতোক্ষণ যা দেখেছি সব অলৌকিক মনে হল! ( চলবে )





