
শাহীন রাজা : আশির শুরুতেই। অবাক করা সংবাদ। দস্যু ফুলন দেবী। ভারতীয় সামন্ত সমাজ ব্যবস্থা’র বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। প্রতিরোধ। এবং সামন্তদের করেছে পরাভূত।
১৯৮১ সালে ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যে বেহমাই গাও নামক গ্রামে ২২ ঠাকুর হত্যা কান্ড ঘটে। অভিযোগ ওঠে দস্যু ফুলনের বিরুদ্ধে। ভারতের প্রতিটি সংবাদ পত্রে প্রধান প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় যে, দস্যু ফুলনের নেতৃত্বে ২২ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এরা সবাই ঠাকুর ( ঠাকুর হচ্ছে, অভিজাত বা সামন্ত গোষ্ঠী) পরিবারের সদস্য। এ-ই সংবাদে ভারতীয় সামন্তরা ভীত এবং কেপে ওঠে !
এই সংবাদ ঐ সময়ে চায়ের আড্ডা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে’র করিডর। এমনকি অভিজাত ক্লাবগুলোতেও আলোচনায় মুখর এই শহরের মানুষ। এ সময়, আমরা কজন। ভাঙ্গা রেকর্ডের মতোই স্বৈরাচার বিরোধী মিছিল প্রতিদিন, একবার করে। এ যেন প্রতিদিনকার চালচিত্র। ফুলনের কিস্যা,কাহিনী শুনে আমাদের ভেতর আবারও, আবারও বিপ্লবের স্পন্দন জেগে ওঠে।
স্বৈরাচার এরশাদ। সিভিল এবং সামরিক আমলা, কবি, বুদ্ধিজীবী এবং আলেমদের নিয়ে দেশে স্বৈরশাসন পোক্ত করে বসে। সাথে সহযোগী হিসেবে পায়, ঐ সময়কার প্রথিতযশা কয়েকজন সাংবাদিক। এই নিয়ে স্বৈরাচার এরশাদের পথচলা। এরশাদের সাথে, আমাদের সুবিধাবাদী সুশীল এবং রাজনৈতিক মোড়লরাও রাষ্ট্রের কাঁধে চেপে বসে। গোটা দেশ এইসব শকুনদের নখের আচঁড়ে ক্ষতবিক্ষত।
চারদিকে শুধুই মিরজাফর আর বিভিষন । এদের সম্মিলিত স্বৈরশাসনে, আমাদের আলো ঝলমল পৃথিবীটা ছোট হয়ে আসে। সমাজে আমাদের দিকভ্রান্ত যুবক হিসেবে পরিচিত করার ষড়যন্ত্রে নামে প্রচার মাধ্যম। সবসময়ই স্বৈরাচাররা তাই করে থাকে। এবং তাই করা হবে !
এমন সময় চম্বলের গহীন অরণ্য থেকে বেরিয়ে আসে, এক অরণ্য দেবী ! ফুলন দেবী ! সনাতনী ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। এবং প্রতিরোধ। বিহার থেকে উত্তর প্রদেশ। সবটাই তাঁর আতঙ্কে, আতঙ্কগ্রস্ত। দস্যু ফুলন দেবী !
ঐ অঞ্চলের সামন্ত প্রভু, ঠাকুরেরা নিরাপদ আশ্রয় খোঁজে ! নিরাপদ আশ্রয় নিতে ঠাকুরেরা একে, একে সবাই শহরমুখী হতে থাকে। অত্যাচারী ঠাকুরদের শান্তির ঘুম কেড়ে নেয়, ফুলন দেবী।
আমাদের বন্ধুদের মধ্যে একজন ছিল একটু বেশী ইঁচড়ে পাকা। এখন মার্কিন কোন এক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। হাতে স্টার সিগারেট এবং চারু মজুমদারের ভঙ্গি। সে বলে ওঠে, এই শতকে ফুলনই হচ্ছে স্পার্টাকাস। লেনিনের নতুন ভার্সন। আমাদেরকে-ও এরশাদ এবং তাঁর দোসরদের বিরুদ্ধে লড়তে হবে। এ সময় আমাদের আরেক বন্ধু (এখন সে যুক্তরাষ্ট্রে আইটি বিশেষজ্ঞ) ঠান্ডা মাথায় ব’লে, সাবধান। লড়তে যেয়ে আবার নিজেই ধরা খাইস না। সেনাপতির দিকে খেয়াল রাখিস, মাঝপথে প্রতিপক্ষের সুবিধার রথে চড়ে না বসে।
দ্বিধা এবং দ্বন্দ্ব দু’টো সাথে নিয়েই আমাদের উত্তেজনা। ফুলন পারলে, আমরা কেন পারবো না। এই সমাজ ভাঙতে হবে, নতুন সমাজ গড়তে হবে। এই মন্ত্র দিয়ে যাত্রা শুরু। তারপর মধ্যবিত্তের বিপ্লব থেকে একটা, একটা করে বিপ্লব ঝড়ে পড়তে থাকে। অবশেষে বিপ্লব একা এবং আকাশ পানে হাত বাড়িয়ে মুক্তি চায় !
বিশেষ দ্রষ্টব্য : চুয়াল্লিশ বছর পর আজকের আমি যা দেখলাম। ফুলন দেবী আসলেই এই শতাব্দীর স্পার্টাকাস। শ্রেণী সংগ্রামের একজন প্রকৃত যোদ্ধা। ফুলন কোন কুলীন বা অভিজাত পরিবারের সন্তান নয়। সে ছিল, ভারতে নিচুবর্ণ হিসেবে পরিচিত মাল্লা বর্ণের এক পরিবারে সন্তান। তা-ই সুবিধাভোগী মধ্যবিত্ত লেখক, সাংবাদিক এবং ইতিহাস লেখিয়াদের কাছে ডাকাত। যারা একটু ভিন্ন তারা উল্লেখ করতেন দস্যু। কিন্তু কখনোই সশস্ত্র সংগ্রামী বা প্রতিবাদী চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করেনি। বৃটিশ সময় থেকে নব্বই দশক পর্যন্ত। অভিজাত পরিবারের বাম এবং সশস্ত্র সংগঠকদের নানাভাবে বিপ্লবী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
একমাত্র সশস্ত্র সংগ্রামী ফুলন-ই ডাকাত হয়ে রইলো !
লেখক সিনিয়র সাংবাদিক




