
মো.নজরুল ইসলাম, মানিকগঞ্জ : “নয়ন সম্মুখে তুমি নাই,নয়নের মাঝখানে নিয়াছো যে ঠাই“ নি:শেষে প্রাণ যে করিবে দান,ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই“ বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান দেশপ্রেমিক লড়াকু সৈনিকদের মৃত্যু নেই; বৃটিশ শাসিত অখন্ড ভারত থেকে ১৯৪৭ সালের ১৪ ও ১৫ আগষ্ট পাকিস্তান ও ভারত স্বাধীনতা লাভ করে। তারপর দুই যুগ ধরে চলে আসা পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান নামে খন্ডিত পাকিস্তানের যাত্রায় নানা অনিয়ম ও বৈষম্যের কারনে বেশিদিন টিকতে পারেনি। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, ১৯৫৮ সালে জেনারেল আইয়ুব খান বিরোধী আন্দোলনসহ স্বধীকার আন্দালনের পটভূমিতে প্রথম সারি থেকেই নেতৃত্বের মধ্যমণি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এভাবে দীর্ঘ লড়াই সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে জন্ম হয় নতুন দেশ বাংলাদেশের।
বাঙালি জাতীয়তাবাদ থেকে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্মের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের মাইল ফলক হয়ে আছে গেল শতকরে ষাটের দশকটি। এই দশকেই এদেশের ছাত্র সমাজ গণবিরোধী শিক্ষা কমিশনের বিলটি বাতিলের দাবিতে দূর্বার আন্দালন গড়ে তোলে, এই দশকেই ধর্মবাদি পাকিস্তানি রাষ্ট্র ব্যাবস্থার বিপরীতে ভাষাভিত্তিক বাঙালী জাতীয়তবাদের উন্মেষ ঘটে। এই দশকেই আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসনের ’ম্যাগনাকার্ট’ হিসেবে পরিচিত ৬ দফা কর্মসূচি ঘোষিত হয়। এই দশকেই গণঅভুথ্থানের মুখে প্রবল প্রতাপশালী শাসক আইয়ুব খান বিদায় নিতে বাধ্য হন। বাংলাদেশের প্রগতিশীল রাজনৈতিক ও ছাত্র আন্দোলনও বিস্তৃতি পায় এই দশকটিতে। সেই সময় বামপন্থি কমিউনিস্ট আন্দোলন নিষিদ্ধ ছিলো এবং প্রগতিশীল রাজনৈতিক চর্চায় ছিলো বেশ প্রতিকূলতা। এই প্রতিকূলতাকে ছাপিয়ে ছাত্রলীগ হয়ে ওঠে রাজনীতির অন্যতম নিয়াম শক্তি।
রাজনীতির সেই অগ্নিগর্ভের সময়কালে মানিকগঞ্জের ঘিওর অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী বালিয়াখোড়া ইউনিয়নের কাউটিয়া গ্রামের একটি নামকরা কৃষিভিত্তিক পরিবারে ২৪ ডিসেম্বর ১৯৫০ সালে জন্মগ্রহন করেন জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযুদ্ধকালীন কমান্ডার যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা মনসুর আলম খান। তাঁর পিতা মৃত ফুল খান,মাতা মৃত মহিয়সী নারী মরিয়ম বেগম। রত্নগর্ভা মরিয়ম বেগম সাত পুত্র ও এক কণ্যা সন্তানের জননী। তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে শত্রুর হাত থেকে দেশ মাতাকে মুক্ত করার জন্য অনিবার্য্য মৃত্যু জেনেও তাঁর পাঁচ পুত্রকে যুদ্ধে পাঠিয়েছিলেন।
বীর মুক্তিযোদ্ধা মনসুর আলম খান ২৬ নভেম্বর ১৯৯৯ সালে বানিয়াজুরি বাসস্টন্ডে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তিনি তাঁর জগত জননী মা, সহোদর ভাই, ভাতিজা, স্ত্রী, তিন কন্যা ও একজন পুত্র সন্তানসহ অসংখ্য শুভাকাঙ্কীদের শোক সাগরে ভাসিয়ে পরপারে চলে যান।
সমাজ পরিবর্তনের লড়াকু যোদ্ধা মনসুর আলম খান শৈশব কাল থেকেই ছিলেন ডানপিটে। তিনি জাবরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণী ও বানিয়াজুরি ইউনিয়ন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে নিম্ব মাধ্যমিক পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। তিনি ছোটবেলা থেকেই রাজনৈতিক নানা প্রতিকুলতার কারনে মানিকগঞ্জ শিবালয় উপজেলাধীন জমদিয়ারা গ্রামে তাঁর মেঝ ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা মোক্তার হোসেন এর শ^শুরালয় থেকে শিবালয় উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। সেখান থেকেই ১৯৬৬ সালে দ্বিতীয় বিভাগে কৃতিত্বের সহিত ম্যাট্রিক পাশ করেন। তারপর তিনি ১৯৬৬ সালে মানিকগঞ্জ সরকারি দেবেন্দ্র কলেজে এইচএসসিতে ভর্তি হন। স্কুল জীবন থেকেই তাঁর চোখেমুখে সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন। তিনি সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন চেতান নিয়ে ছাত্রলীগের পতাকাতলে সামিল হয়ে তৎতকালীন পাকিস্তানের স্বৈরাচরি আয়ুব বিরোধী আন্দোলন সংগ্রামে নিজেকে নিবেদন করেন। সাধারন ছাত্রদের বাসভাড়া অর্ধেক করার দাবিতে দুর্বার ছাত্র আন্দোলনে তিনি প্রথম ১৯৬৭ সালে কারাবরণ করেন। এভাবে সকল প্রকার ছাত্র আন্দোলনে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৬ সালের ৬ দফা দাবি বাস্তবায়নে আওয়ামীলীগ ও ছাত্রলীগের তৎতকালীন নেতা খোন্দকার মাজাহারুল হক চান মিয়া, মোসলেম উদ্দিন খান হাবু মিয়া ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মফিজুল ইসলাম খান কামালের নির্দেশনায় তিনি আন্দোলন সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে ঝপিয়ে পড়েন।
তিনি ছোটবেলা থেকেই ডানপিটে ডাপুটে ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন লড়াকু থাকার কারনে তার বৈচিত্র্যময় জীবনে রয়েছে নানা ছন্দপতন। ১৯৬৬ সাল হতে আইয়ুব বিরোধী দুর্বার আন্দোলন সংগ্রামে জেল জুলুম হামলা মামলা ও হুলিয়া মাথায় নিয়েও নিজের একাডেমিক শিক্ষা থেকে পিছপা হননি। রাজনৈতিক নানা টানপোড়েনের কারনেই তিনি একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বেশিদিন থাকতে পারেনি। তারপর ১৯৬৯ সালে চট্রগ্রাম সিটি কলেজে বি,এ ভর্তি হন। সেখানেও তিনি ছাত্রলীগের নেতাদের খুজে বের করেন এবং পাকিস্তানের স্বৈরশাসক আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান ও জুলফিকার আলী ভূট্রোদের চাপিয়ে দেয়া অন্যয়ের বিরুদ্ধে দূর্বার গণআন্দোলন গড়ে তোলেন এবং সেটিই পরবর্তীতে গণঅভুথানে রুপ ধারন করে। এদিকে তিনি রাজনৈতিক হামলা মামলা ও হুলিয়ার কারনে চট্রগ্রামেও বেশিদিন থাকতে পারলেন না। এই কলেজে মানিকগঞ্জ দৌলতপুর উপজেলার রঘুকোষ গ্রামের মো.আফাজ উদ্দিন নামে একজন সহপাঠীকে খুজে পেয়েছিলেন। আফাজ উদ্দিন মূলত বামধারার ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতি করতেন এবং তুখোর ছাত্রনেতা ছিলেন। তখন থেকেই তাঁর বন্ধুর মাধ্যমে তিনি সমাজতান্ত্রিক চেতনায় উজ্জিবিত হন। মূলত ১৯৬৯ সালের সময়কাল ছিল বাঙালি জাতিরাষ্ট্র গঠনের তথা নতুন রাষ্ট্র বিনির্মানের উষাকাল। সারদেশেই রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করছে তাই বেশিরভাগ রাজনৈতিক সচেতন ব্যক্তিদের রাতের ঘুম হারম করে সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে হয়েছে। রাজনৈতিক নানা অস্থিরতায় ছাত্রলীগ নেতা মনুসর আলম খান ও তার বন্ধু ছাত্র ইউনিয়ন নেতা মো আফাজ উদ্দিন চট্রগ্রামে আর থাকতে পারলেন না। পরবর্তীতে তারা দুজনেই মানিকগঞ্জ সরকারি দেবেন্দ্র কলেজ থেকে বি এ পাশ করেন।
১৯৬৯ সালের গণ আন্দোলনে তুখোর ছাত্রনেতা মনসুর আলম খান ও তার বন্ধু ছাত্র নেতা আফাজ উদ্দিন বঙ্গবন্ধুকে কারমুক্ত করার জন্য ঘিওর- দৌলতপুর স্কুলে ধর্মঘট(হরতাল) পালনের জন্য বিভিন্ন উচ্চ বিদ্যালয়ে ছাত্র সংগঠনসহ মিছিল-মিটিং করতে থাকেন। উল্লেখ্য যে- হরতাল ছিলো তৎতকালীন মানিকগঞ্জ মহুকুমার সকল স্কুল কলেজে। সেদিন দৌলতপুর প্রমোদা সুন্দরী উচ্চ বিদ্যালয়ের হরতাল সফল করার দায়িত্ব তাদের ছিলো। কিন্তু যে বিদ্যালয়টি ইতিপূর্বে কখনই হরতাল পালিত হয়নি এবং তৎতকালীন প্রধান শিক্ষক খুবই কঠোর প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। তারপর এগুলো সবকিছু মাথায় নিয়েই কৌশলে ছাত্রনেতা মনসুর আলম খান ও আফাজ উদ্দিনের নেতৃত্বে ছাত্ররা ¯েøাগান ধরেন- “জেলের তালা ভাঙব, শেখ মুজিবকে আনবো, জাগো-জাগো বাঙালী জাগো, তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা-মেঘনা যমুনা“ ইত্যদি। তারপর প্রধান শিক্ষকের রুমে গিয়ে তিনি ও আফাজ উদ্দিন প্রধান শিক্ষক মহোদয়কে বলেন স্যার আপনি সম্মানের সহিত স্কুল ত্যাগ করেন। শ্রদ্ধেয় প্রধান শিক্ষক মহোদয় কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে বসে থাকেন এবং পরিস্থিতি বুঝতে পেরে কৌশলে স্কুল ত্যাগ করে বাসায় চলে যান।
এভাবে ছাত্রদের দাবির মুখে একটি সফল হরতাল পালিত হয়। সেদিন মানিকগঞ্জ মহুকুমার সকল স্কুলে- কলেজ এবং দেবেন্দ্র কলেজেও হরতাল পালিত হয়েছে। ছাত্র নেতা মনসুর আলম খান,আফাজ উদ্দিন,আব্দুল হাই. আব্দুর রাজ্জাক ষাটগাজী গ্রামের আব্বাস,চাষাভাদ্রার আবছার,মো.মমিন উদ্দিন খান,শাজাহান,মজিদ মোল্লা,আব্দুল কাদের, জমশেদ,বিমল,আশি^নি মন্ডলসহ শহিদুল্লাহ,কফিল উদ্দিন প্রথম দুজন ছাড়া পরের দুজন প্রাক্তন দশম শ্রেণীর ছাত্র এবং পরের সকলেই দশম শ্রেণীর ছাত্র ছিলেন। তারপর স্কুলের সকল ছাত্র এবং জনতাকে সাথে নিয়ে দৌলতপুর চাষাভ্রাদ্রা আডরাকুমেদ ও চকমিরপুর হয়ে দৌলতপুর মাঠে বিশাল গণসমাবেশের আয়োজন করা হয়। সেখানে দুই নেতা পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার পক্ষে জ¦ালাময়ী বক্তব্য রাখেন। সেই আন্দোলন চারিদিকে ছড়িয়ে পরে এবং দৌলতপুর স্কুলেও সফলভাবে হরতাল পালিত হয়। এদিকে খবর আসে ছাত্র জনতার দূর্বার আন্দোলন সংগ্রামে স্বৈরাচারি আয়ুব সরকার ১৯৬৯ সালের ফেব্রæয়ারী মাসে গণঅভুত্থানের মুখে আমাদের পূর্ব বাংলার অবিংসবাদী নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। তারপর ২৩ ফেব্রæয়ারী ১৯৬৯ সালে ছাত্র জনতা শেখ মুজিবকে বাংলার অবিংসবাদী নেতা হিসেবে রেসকোর্স ময়দানে ’বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। তখন শেখ মুজিবুর রহমান বাংলার অবিংসবাদী নেতা।
তারপর স্বৈরাচার আইয়ুব সরকারে পতনের পর তিনি ৭ ডিসেম্বর ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামীলীগ মনোনিত এম এন এ জনাব নুরুল ইসলাম ও এমসিএ জনাব মো.সিদ্দিকুর রহমান মাস্টার সাহেবের নির্বাচনি প্রচানণায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। নির্বাচনে আওয়ামীলীগ ও তার মিত্রদের বিজয়ের জন্য সার্বক্ষণিক নির্বাচনী প্রচার কাজে সক্রিয় কর্মীর ভূমিকা পালন করেন।
তৎতকালীন তুখোড় ছাত্র নেতা মনসুর আলম খান ও তার টিম ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষন পরপরই যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করে দেন। তারপর ২৬ মার্চের স্বাধীনতা ঘোষনার পর ১২-১৫ এপ্রিলের মধ্যে তিনি এবং কাউটিয়া গ্রামের মেধাবী ছাত্রনেতা গিয়াস উদ্দিন, উথলী গ্রামের মো.দেলোয়ার হোসেন মুজিব বাহিনীর হয়ে মুক্তিযুদ্ধের গেড়িলা প্রশিক্ষণের জন্য ভারতের দেরাদনে গমন করেন। ভারতের উত্তর প্রদেশের দেরাদুনের তান্ডুয়া মিলিটারি একাডেমি হতে বিএলএফ প্রশিক্ষণ গ্রহন করে মনসুর আলম খান ঘিওর থানা লিডার (কমান্ডার) ও মো. গিয়াস উদ্দিন দৌলতপুর থানার লিডার(কমান্ডার) হিসেবে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। তাঁর সাথে আরো ছিলেন কুস্তা গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা বিপ্লব কুমার সরকার,বালিয়াখোড়া গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা মো.জালাল উদ্দিন মাস্টার, বীর মুক্তিযোদ্ধা আফজাল হোসেন খান জকি,ধামশর গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মজিদ প্রধান। তাঁরা এলাকায় এসে দৌলতপুরের মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার সমসের উদ্দিন মাস্টারের সাথে দেখা করেন।
তারপর বীর মুক্তিযোদ্ধা বিএলএফ কমান্ডার মনসুর আলাম খান তাঁর সহযোদ্ধাসহ মুক্তিবাহীনির কমান্ডার সমসের উদ্দিন মাস্টার দুজনে মিলে এলাকার ছাত্র-যুবক শিক্ষক,কৃষক,সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে বিরাট মুক্তিবাহীনি গঠন করে বিভিন্ন রনাঙ্গনে পাক বাহিনীর সাথে যুদ্ধের পরিকল্পনা করেন। উল্লেখযোগ্য যুদ্ধের মধ্যে দৌলতপুর নিলুয়ার যুদ্ধ,শিবালয় নয়াবাড়ী মোল্লা বাড়ীর যুদ্ধ,ঘিওরে শুলাকুন্ডার যুদ্ধে ১ জন বেলুচ ক্যপ্টেন ও ১ জন মিলেটারি সৈন্য আহত হন এবং আত্মসমর্পন করতে বাধ্য হয়। তাদের সাথে দেশীয় রাজাকার দোসরেরা পিছু হটে ও পালিয়ে যায়। তারপর বীর মুক্তিযোদ্ধা মনসুর আলম খান এর বাহিনী স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধদের নিয়ে তেরশ্রী জমিদার সিদ্বেশ^র প্রসাদ রায় চৌধুরীর বাড়ীতে ক্যাম্প গড়ে তোলেন। দৌলতপুরে কোন এক যুদ্ধে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু বীর মুক্তিযোদ্ধা আফাজ উদ্দিন শাহাদাত বরণ করেন। তিনি এই প্রতিকুলতা নিয়েও শহীদের রক্ত বুকে ধারন করে তাঁর বাহিনী নিয়ে গেড়িলা যুদ্ধ অব্যহত রাখেন।
বিপ্লবী বীর মুক্তিযোদ্ধা মনসুর আলম খানের চোখে মুাখে ছিল সমাজ বিপ্লবের স্বপ্ন। তিনি ছোটবেলা থেকেই উদার মনের অধিকারী ও শিক্ষানুরাগী ছিলেন। এলাকার প্রান্তিক জনগোষ্ঠী তথা মেহনতী মানুষের মুখে হাস ফোটানোই ছিল তার অন্যতম লক্ষ। এলাকার ছেলেমেয়েদের শিক্ষা তথা নারী শিক্ষার বিকাশে ছিলেন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। সেই লক্ষেই তিনি উত্তাল যুদ্ধের সময় এলাকায় একটি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় করার প্রত্যয় নিলেন। তারপর তাঁর নেতৃত্বে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও সুশীল সমাজের সহযোগীতায় জাবরা গ্রামে গড়ে তোলেন জাবরা শহীদ স্মরণীকা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টির প্রাথমিক নাম ছিল জে.কে.শহীদ স্মরণিকা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়,জাবরা,তরা,ঘিওর,মানিকগঞ্জ।
মুলত তাঁর রাজনৈতিক দুরদর্শিতা ও সাংগঠনিক দক্ষতায় পশ্চিম মানিকগঞ্জ যথাসময়ে হানাদার মুক্ত হয়। তাঁর পরিবার একটি মুক্তিযোদ্ধা পরিবার। তাঁর উৎসাহ ও অনুপ্রেরণায় প্রত্যেক্ষ ও পরোক্ষভাবে পরিবারের সবাই মুক্তিযোদ্ধা। তাঁর বড় ভাই প্রয়াত লোকমান হোসেন খান একজন আদর্শ কৃষক ছিলেন। তিনি সংসারের দায়িত্ব পালন করেও বিভিন্নভাবে তাদের খাবার যোগান দিতেন। মেঝ ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা মোক্তার উদ্দিন খান একজন আদর্শ কৃষক, তার অনুজ বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজবাহ উদ্দিন খান একজন ব্যবসায়ী, বীর মুক্তিযোদ্ধা মমিন উদ্দিন খান একজন (অব:) ব্যাংকার, জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার ও জেলা আওয়ামীলীদের মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক সম্পাদক, প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা কোরবান আলী খান একজন (অব:) সরকরি কর্মচারি ছিলেন, ছোট ভাই মো. শাহাদত আলী খান যুদ্ধের সময় বার্তা বাহকের কাজ করতেন এবং একজন সফল ব্যবসায়ী। একমাত্র বোন হাসিনারা আক্তার খান পারুল ভাইদের রনকৌশলে সহযোগীতা করতেন এবং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের (অব:) শিক্ষক।
সমাজ বদলের লড়াকু সৈনিক বীর মুক্তিযোদ্ধা মনসুর আলম খান একজন সার্বক্ষণিক রাজনৈতিক কর্মী হওয়ার কারনে সংসার জীবনে অগোছালো ও টানপোড়েনও কম ছিল না। শত প্রতিকূলতার মধ্যেই পরিবার ও সংসার ফেলে দিনের পর দিন মানুষের মাঝে জীবন কাটিয়েছেন। তাই যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মান ও নতুন দেশকে সাজানোর জন্য সার্বক্ষণিক রাজনীতির ব্রত নিয়ে ছাত্রলীগ থেকে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদের লাল পতাকাতলে সামিল হন।
১৯৭২ সালে ৩১ অক্টেবর জাসদের জন্ম হলে সেই উত্তাল সময়ে তিনি এই অঞ্চলে জাসদের নেতৃত্ব দেন। মুলত ১৯৭৩ সালের শুরু থেকে জাসদ হয়ে ওঠে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরকারের প্রধান বিরোধী দল। এদিকে ১০ জানুয়ারী ১৯৭৩ সালে মানিকগঞ্জের জাসদের অন্যতম নেতা ও বিএলএফ ডেপুটি কমান্ডার শাহাদত হোসেন বিশ^াস বাদল আত্মাতায়ীর গুলিতে নিহত হন। তাকে দাফনের পরই তাহার পিতার দায়ের করা মিথ্যা অভিযোগে মনুসুর আলম খানকে তৎতকালীন সদর থানায় ওসি খবর দিয়ে নিয়ে আসেন এবং ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা অভিযোগে তাঁকে গ্রেফতার করেন।
ঘটনা দু:খজনক হলেও ইতিহাসের নির্মম সত্য যে- ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কতিপয় বিপথগামী সেনা সদস্যদের গুলিতে স্বপরিবারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাহাদত বরনের প্রায় তিন বছর পর্যন্ত বাংলাদেশ শাসিত হয় অনির্বাচিত সরকার দ্বারা। ১৯৭৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর সেই সময় বন্দুকের নল কাধে নিয়ে সেনা বেরাক থেকে অবৈধভাবে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেন তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। জিয়া সরকার ক্ষমতায় আসার পর বীর মুক্তিযোদ্ধা মনসুর আলম খান জেল থেকে মুক্তি পেয়ে বিএনপির রাজনীতি করতে বাধ্য হন।
তার ছোট ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা মমিন উদ্দিন খান বলেন-তাকে মুক্ত করতে তার পরিবার ও সহযোদ্ধারা রাজপথে ও আইনি লড়াই অব্যাহত ছিল। তৎতকালীন সময়ে বড় ভাইকে মুক্ত করতে আমাদের পৈত্রিকভাবে পাওয়া নয় বিঘা জমি হারাতে হয়েছে। তারপর ১৯৭৭ সালে দীর্ঘ প্রায় পাচ বছর রাজবন্দি থাকার পর ভাইকে মুক্ত করে গণমানুষের অফুরান ভালবাসায় আমরা এগুলো ভুলে যাই এবং তাঁর আদর্শিক রাজনীতির কাছে সবসময় শিক্ষা লাভ করি।
তারপর তিনি জাতীয় সংসদ নির্বাচন করার উদ্দেশ্যে ঘিওর-দৌলতপুর তথা মানিকগঞ্জের আনাচে কানাচে ঘুরতে থাকেন। স্বাধীনতার পর মোটর সাইকেল চালানোটা একটা আভিজাত্যের বিষয় ছিল। তিনি সেই আভিজাত্য ধরে মোটর সাইকেল নিয়ে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্টির জীবন মান উন্নয়নে কাজ করতেন। দ্রæত গতিতে মোটর সাইকেল নিয়ে আসার পথে একদিন ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের মুলজান মোরে সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতরভাবে আহন হন। চারিদিকে মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লেও ডাক্তারদের সুচিকিৎসায় ভালো হয়ে উঠনে।
১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর বীর মুক্তিযোদ্ধা মনসুর আলম খানকে পুনরায় কারাবরণ করতে হয়েছে। তারপর ছয় মাস পর জামিনে মুক্তি পেয়েছিলেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শ থেকে কখনই বিচ্যুতি হননি। তিনি মূলধারার রাজনৈতিক দল থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন না পাওয়াসহ রাজনৈতিক ও পারিপাশি^ক নানা কারনে জিয়াউর রহমান মৃত্যুর পর বিএনপির রাজনীতি ত্যাগ করেন। তারপর দলীয় রাজনীতি থেকে দূরে থাকলেও এরশাদ সরকার ক্ষমতায় এলে তাঁকে পুনরায় গ্রেফতার করে কারাগারে প্রেরণ করেন। তারপর জামিনে মুক্তি পেয়ে তিনি আবার রাজনীতি করতে থাকেন।
তিনি বৈশি^ক পূজিবাদী অর্থব্যবস্থায় পুজির মালিকদের হাতে রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ও আদর্শিক রাজনীতির স্থলন দেখে দলীয় রাজনীতি থেকে নিজেকে বেশ কিছুদিন দূরে রাখেন। তিনি মনে প্রাণে একজন বঙ্গবন্ধুর আদর্শের লড়াকু সৈনিক তাই আশির দশকে এরশাদ সরকারে শুরুর দিকে মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনা বাস্তবায়নে স্বতন্ত্র ধারার রাজনীতি শুরু করেন।
বীর মুক্তিযোদ্ধা মনসুর আলম খান ব্যপক জনপ্রিয়তার মুখে জনতার অনুরোধে স্বতন্ত্র ধারা থেকেই ১৯৮৪ সালে বালিয়াখোড়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন করেন। অত্র ইউনিয়নের তৎতকালীন প্রতাপশালী চেয়ারম্যান আব্দুল জব্বার শিকদারকে পরাজিত করে বিপুল ভোটে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তিনি প্রান্তিক পর্যায়ের একটি বালিয়াখোড়া ইউনিয়ন কে ঢেলে সাজাতে সফলতার সহিত দায়িত্ব পালন করেন। তিনি এরশাদ সরকারের আমলে চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় ১৯৮৭ সালে ঘিওর কলেজের এক অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের উপস্থিতিতে জনতার দাবি নিয়ে এক জ¦ালাময়ী বক্তৃতা করেন। তিনি বক্তৃতার এক পর্যায়ে প্রধান অতিথি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদকে উদ্দেশ্য করে বলেন লেখন স্যার ঘিওর কলেজ সরকারি করা হলো। তার বস্তুনিষ্ঠ বক্তৃতায় জনতা উল্লসিত হয়ে হাত তালি দিতে থাকেন এবং রাষ্ট্রপতি এরশাদ তাঁর বক্তৃতা ও জনতার চাপে ঘিওর কলেজ সরকারি করতে বাধ্য হন।
তারপর অত্র এলাকার জনতা তাকে জাতীয় সংসদে দেখতে চান। তিনিও তাঁর বিপ্লবী চেতনার লড়াইয়ের অংশ হিসেবে ১৯৮৮ সালে চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঘিওর দৌলতপুর নির্বাচনী এলাকা হতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে হাঁস মার্কা নিয়ে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করেন। জনতার ভোটে তিনি নির্বাচিত হলেও এরশাদ সরকার সেই ফলাফল বাতিল করে জাতীয় পার্টি মনোনিত সিদ্দিকুর রহমান মাস্টারকে বিজয়ী ঘোষনা করেন। এই খবরে তাঁর নির্বাচনী এলাকায় স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে জনরোষ তৈরী করেন। তারপর তিনি ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনতে জনতাকে সাথে নিয়ে স্বৈরাচার এরশাদ সরকার বিরোধী আন্দোলন সংগ্রামে নিজেকে নিয়োজিত করেন। ১৯৯০ সালে প্রবল আন্দোলন সংগ্রামের মুখে এরশাদ সরকারে পতন হয় এবং বিচারপতি সাহাব উদ্দিন রাষ্ট্রপতি হন। তারপর পুনরায় জনতার অনুরোধে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহন করেন। তিনি ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদের মশাল প্রতিক নিয়ে জাতীয় সংসদে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করেন।
গণমূখী চরিত্রের একজন মনসুর আলম খান মুলতই গণমানুষের নেতা ছিলেন। প্রতিদ্ব›িদ্ব প্রার্থীদের অর্থের প্রতিযোগিতায় তিনি পেছনে থাকলেও মানুষের ভালবাসা ও ভোটের রাজনীতিতে তিনি সবার আগে। এজন্য প্রতিদ্ব›িদ্ব প্রার্থীরা তাকে প্রচুর ভয় পেতেন। তিনি জনতার ভোটে ১৯৯১ সালের নির্বাচনেও বিজয়ী হন। কিন্তু রাজনীতির জটিল সমিকরনে তাকে পরাজিত ঘোষনা করেন এবং বিএনপি মনোনিত খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনকে বিজয়ী ঘোষনা করেন। তিনি আবারও জনতাকে সাথে নিয়ে তৎকালীন বিএনপি সরকরের এই অনিয়ম দুর্নিতীর বিরুদ্ধে লড়াই সংগ্রাম অব্যাহত রাখেন। ১৯৯২ সালে বিএনপির আমলে বাবরী মসজিদকে কেন্দ্র করে দেশে উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর মন্দির ভাঙ্গার বিরুদ্ধে জেলা আওয়ামীলীগের বর্তমান সাধারন সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা এ্যাডভোকেট আব্দুস সালামের নেতৃত্বে স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ও প্রগতিশীল জনতাকে সাথে নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে তিনি গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
অন্যায়ের কাছে আপষহীন লড়াকু যোদ্ধা মনসুর আলম খান শত প্রতিকূলতার মাঝেও কখনই হতাশ ছিলেন না। তাই তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সোনার বাংলা ও মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক শোষনমুক্ত সমাজ বিনির্মানে সবসময়ই বদ্ধপরিকর ছিলেন। রাজনৈতিক নানা টানপোড়েনে তিনি ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজেকে বিরত রাখেন। নির্বাচনে আওয়ামীলীগ বিজয় লাভ করার পর সরকার গঠন করলে আওয়ামীলীগে যোগ দিতে স্থানীয় ও জাতীয় নেতাদের অনুরোধ আসতে থাকেন। বিশেষ করে ঢাকার সাবেক মেয়র কর্ণেল এম এ মালেক সাহেবের সাথে তাঁর বেশ ঘনিষ্ঠতা ছিল। তারপর কর্ণেল মালেক সাহেবের সাথে তিনি পুনারায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর আগর্শের গড়া তার প্রাণের দল বাংলাদেশ আওয়ামীলীগে যোগদান করেন। এবং যুদ্ধঅপরাধের বিচারের দাবিসহ বিএনপি জামায়াতের বিরুদ্ধে সত্রিæয় রাজনীতি শুরু করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এই দলের ছায়াতলে থেকেই আন্দোলন সংংগ্রাম করেছেন।
ক্ষণজন্মা প্রবাদ পুরুষ একজন মনসুর আলম খান এই সময়কালে রাজনীতির পাশাপশি, শিক্ষা সংস্কৃতি পরিবেশ সংরক্ষণে সমাজে ব্যপক ভূমিকা পালন করেন। তিনি ১৯৭১ সালে তাঁর নিজ এলাকায় জাবরা শহীদ স্মরণীকা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। যৌবনে কাউটিয়া শরীর চর্চা সংঘের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কুস্তা কফিল উদ্দিন দর্জি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষকের দায়িত¦ পালন করেন। ঘিওর কলেজ সরকারি করনে প্রধান ভূমিকা পালন করেন। এছাড়াও তিনি অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন ও এমপিও ভুক্তির কাজে অবদান রাখেন। যেমন- বালিয়াখোড়া ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়, বালিয়াবাধা কেবিএম উচ্চ বিদ্যালয়, গিলন্ড উচ্চ বিদ্যালয়, কর্জনা উচ্চ বিদ্যালয়সহ অসংখ্য ক্লাব ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রেজিষ্টেশন ও এমপিও ভুক্তকরনে সার্বিক সহযোগীতা করেন।
উল্লেখ্য যে ১৯৯৬ সালে আওয়ামীলীগ সরকার গঠনের পর উপজেলা ব্যবস্থাকে পুনরায় ফিরিয়ে আনেন এবং উপজেলা নির্বাচনের জন্য নেতাকর্মীদের প্রস্তুতি গ্রহনের আহবান জানান। তিনি সরকারের এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানান এবং ঘিওর উপজেলা নির্বাচনের জন্য জনমত মাঠে নেমে পড়েন। তিনি মোটর সাইকেল নিয়ে গরিব দু:খি মানুষের মুখে হাসি ফুটাতে সারা জেলা চষে বেরাতে থাকেন। তিনি এতটাই জনপ্রিয় ছিলেন যে, জেলার যেকোন হাট বাজার খেলার মাঠ ও জনকাকির্ন জায়গায় দাড়ালেই মুহুর্তের মধ্যে মানুষের ভীর জমে যেত। আসলে তিনি নিজেই নিজের প্রতিদ্ব›িদ্ব বলেই জনতার এমপি ছিলেন। জেলার প্রতিটি অঞ্চলসহ সারা দেশে তার একটি ব্যাপক পরিচিতি ও নেটওয়ার্ক ছিলো। তিনি একজন কর্মীবান্ধব নেতা হিসেবে প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাকর্মীদের খোজ খবর রাখতেন। নিজের সর্বস্ব উজার করে দিয়ে তিনি নেতাকর্মীদে আগলে রাখতেন।
তখন বানিয়াজুরী ইউনিয়ন আওয়ামীলীগ সভাপতি জনাব নূরে আলম। রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভিন্ন আলাপন নিয়ে তিনি মাঝে মধ্যেই তাঁর বাসায় আসতেন। সেদিন ২৪ নভেম্বর ১৯৯৯ সাল। বীর মুক্তিযোদ্ধা মনসুর আলম খান মোটরসইকেলে বানিয়াজুরী বাসস্টন্ডে বসে নেতা কর্মীদের সাথে কথা বলতে ছিলেন। হঠাৎ দূরপাল্লার সোহাগ পরিবহন নামে একটি বাসের ধাক্কায় মর্মান্তিকভাবে আহত হন এবং হাসপাতালে নেয়ার পথেই শেষ নি:স্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর মা, স্ত্রী,কণ্যা,পুত্র,ভাই,ভাতিজাসহ অসংখ্য গুণগ্রাহীকে শোক সাগরে ভাসিয়ে না ফেরার দেশে পারি দেন।
যুগের শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধা মনসুর আলম খান মাত্র ৪৯ বছর বয়সে এই ধরনীতে কেবল দিয়ে গেছেন কিছুই নিয়ে যেতে পারেননি। এই অল্প সময়ে পরিবার ও সংসারের শৃঙ্খল ভেদ করে মুক্তিযুদ্ধের অসামপ্রদায়িক চেতনা ধারন করে বঙ্গবন্ধুর শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মান করতে গিয়ে অসংখ্যবার হামলা মামলা হুলিয়া ও জেল জুলুমের শিকার হয়েছেন। বৈষম্যহীন ন্যয্যতার সমাজ প্রতিষ্ঠার আমরণ লড়াই বুকে নিয়ে স্কুল কলেজ,ক্লাব,মাদ্রাসা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়তে নিজের জীবন ও যৌবনকে উৎসর্গ করেছেন। আমরা এই দেশ ও সমাজের প্রতিনিধি হয়ে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান হিসেবে তোমাকে উপযুক্ত সম্মান ও মর্যাদা দিতে পারিনি। তবে তোমার আদর্শের উত্তরসূরী হয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারন করে অসম বৈষম্যের বিরুদ্ধে স্বপ্নের শোষণমুক্ত বহুত্ববাদি ন্যয্যতার সমাজ প্রতিষ্ঠায় আমরণ লড়েই যাব। জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু, জয় হোক বাংলার মেহনতি মানুষের।
[ সংকলন ও সম্পাদনায় : মো. নজরুল ইসলাম,সাধারণ সম্পাদক বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘ,মানিকগঞ্জ জেলা শাখা, যোগাযোগ: nozorali1985@gmail.com # ]
তথ্যদাতা: মরহুমের ছোট ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা মোমিন উদ্দিন খান]




