slider

উজ্জ্বিবীত প্রজন্মের ভাবনায় মানিকগঞ্জের যুদ্ধদিনের কথা

মো.নজরুল ইসলাম,মানিকগঞ্জ : আমরা এবার সবেমাত্র মহান বিজয় দিবসের সুবর্ণজয়ন্তি অতিক্রম করলাম। “মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হারিয়ে যেতে দেব না, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জিবিত হোক আজকের প্রজন্ম” হরহামেশাই আমরা এই ¯েøাগানগুলো বলে থাকলেও ফিরে দেখার ইতিহাস কতটুকও জানি- তাই প্রজন্মের প্রতি অনুরোধ ইতিহাসের দিকে ফিরে যাওয়া নয় আরেকবার ফিরে দেখি মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারি প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তৎতকালীন আওয়ামী লীগ, কমিউনিস্ট পার্টি, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) ও গণ আজাদী লীগ এর সারাদেশেই ব্যাপক কার্যক্রম ও মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহনের ইতিহাস পাওয়া যায়। মুক্তিযুদ্ধের প্রধান তথা জাতীয় ¯েøাগান ’জয়বাংলা’,তুমি কে আমি কে বাঙ্গালী, তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা, ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার, শ্রেণী শত্রæ নির্মুল কর,সমাজতন্ত্র কায়েম কর” চলছে লড়াই গণতন্ত্রের শেষ লড়াই সমাজতন্ত্রের ইত্যাদি। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারি প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ালীগ নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপরাষ্ট্রপতি, তাজউদ্দিন আহমেদকে প্রধানমন্ত্রী, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, এইচ এম কামরুজ্জামানকে বিভিন্ন দপ্তরের মন্ত্রী করে ন্যাপ প্রধান বামপন্থী নেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, কমিউনিস্ট পার্টি প্রধান কমরেড মনি সিংহ, গণ আজাদী লীগ প্রধান মনোরঞ্জন ধর ও ন্যাপনেতা কমরেড অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদকে প্রবাসী সরকারের উপদ্রেষ্টা করে রাজনৈতিক নেতৃত্বের নির্দেশনায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর ডাকে মুক্তিযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হলে সারা দেশেই যুদ্ধের উত্তাল হাওয়া বইতে শুরু করে।
তারই ধারাবাহিকতায় ভিন্ন ধাচের এক ইতিহাস নিয়ে মানিকগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। পদ্মা মেঘনা যমুনা, ধলেশ^রী, কালিগঙ্গা বিধৌতি নদীমাতৃক হাজারো লোকায়ত সম্পদে ও সংস্কৃতিতে ভরপুর আমাদের এই সোনার বাংলার মধ্যসমতল ভূমিতে অবস্থিত মানিকগঞ্জ জেলা। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য মানিকগঞ্জে গঠিত হয়েছিলো ৭ সদস্য বিশিষ্ট বিপ্লবী কমান্ড কাউন্সিল। এই কমান্ড কাউন্সিলের প্রধান ছিলেন পাকিস্তান আমলের এম এন এ ও মন্ত্রী ভাষা সংগ্রামী জেলার প্রতাপশালী আওয়ামীলীগ নেতা এ্যাড. মোসলেম উদ্দিন খান হাবু মিয়া। মানিকগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারি রাজনৈতিক দলের অন্যন্য সদস্যদের মধ্যে ছিলেন-প্রতাপশালী আওয়ামীলীগ নেতা ও ভাষা সংগ্রামী এ্যাড.খোন্দকার মাজাহারুল হক চাঁন মিয়া, বামপন্থি সামরিক নেতা ক্যাপ্টেন (অব:) আব্দুল হালিম চৌধুরী, জেলার প্রতাপশালী ন্যাপ নেতা কমরেড সৈয়দ আনোয়ার আলী চৌধুরী, কমিউনিস্ট নেতা কমরেড ডা: মীর আবুল খায়ের ঘটু, ন্যাশনাল আওয়ামী লীগ (ন্যাপ) নেতা ও ভাষা সংগ্রামী এ্যাড.খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন, প্রতাপশালী আওয়ামী লীগ নেতা মফিজুল ইসলাম খান কামাল।
বিপ্লবী কমান্ড কাউন্সিলের নির্দেশনায় জেলার সাত উপজেলার সাথে প্রতিবেশী ঢাকা ও টাঙ্গাইলসহ ২২টি উপজেলার নেতৃত্বদেন (অব:) সামরিক কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন আব্দুল হালিম চৌধুরী, এ্যাড মোসলেম উদ্দিন খান হাবু মিয়া, এডভোকেট মাজাহারুল হক চান মিয়া। মুক্তি বাহিনীর প্রধান নেতৃত্বের মধ্যে মূলত ক্যাপ্টেন আব্দুল হালিম চৌধুরীর উদ্দিপনা ও ডাকে জেলার অধিকাংশ তরুন মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পরে। মানিকগঞ্জে বিএলএফ এর প্রধান নেতৃত্বদানকারি নেতা ছিলেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতা মফিজুল ইসলাম খান কামাল। তার ডাকেও একদল উদ্দমী তরুন মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পরেন। ন্যাপ কমিউনিস্ট ছাত্র ইউনিয়ন বিশেষ গেরিলা বাহিনীর নেতা ছিলেন সৈয়দ আনোয়ার আলী চৌধুরী,ডা: মীর আবুল খায়ের ঘটু ও এ্যাড.খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন। এছারাও শিবালয় আঞ্চলকে কেন্দ্র করে প্রিন্সিপাল এম এ রৌউফের উদ্দিপনায় কিছু তরুন যুদ্ধে ঝাপিয়ে পরে।
তারপরও আমরা নতুন প্রজন্ম উজ্জিবিত হই প্রতি বছর ১৩ ডিসেম্বর মানিকগঞ্জ পাক হানাদার মুক্ত দিবস থেকেই শুরু হওয়া ১৫ দিন ব্যাপী মুক্তিযুদ্ধের বিজয়মেলার অনুষ্ঠানমালার মাধ্যমে। বৈশি^ক মহামারী করোনাকালীন সংকট কাটিয়ে তরুণ প্রজন্ম আবার জেগে উঠছে বিজয়ের গানে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শানিত হয়ে অনুভূতির অন্তরালের গোমট থেকে বিজয় মেলার স্মরণিকা নারাচারা করছি আর বিজয় দিবসকে কেন্দ্র করে কিছু কথা লিখব বলে ভাবছি। মানিকগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধের সময়কালীন একমাত্র জীবন্ত কিংবদন্তি যুদ্ধকালীন বি এল এফ কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মফিজুল ইসলাম খান কামাল সাহেবের সাথে যুদ্ধ দিনের কথা নিয়ে একটি দীর্ঘ সাক্ষাতকার নিবো বলে ভাবছি কিন্তু সময়ের সাথে যুদ্ধ করে পেরে উঠতে পারছি না। ইতেমধ্যে তার ব্যক্তিগত সচিব প্রভাষক আমিনুর রহমান অঞ্জনের সাথে আলাপচারিতাও হয়েছে কিন্তু কবে তিনি কানাডায় গেলেন সেটি জানিনা। আমি তার সাক্ষাতকার নিতে চাই তাই প্রযুক্তির সুবাদে ভিডিও কলের মাধ্যমে গত ১০ ডিসেম্বর কিছু কথা জানা গেলো। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধকালীন জেলার বিপ্লবী কমান্ড কাউন্সিল ও জেলায় বিএলএফ গঠন বিষয়ে। তিনি বলেন যুদ্ধের উত্তাল হাওয়া দেশের অন্য জেলার চেয়ে ঢাকার নিকটবর্তী জেলা মানিকগঞ্জে একটু হলেও বেশি। মুক্তিযুদ্ধকে জনযুদ্ধে পরিনত করতে আমাদেরকে বিছিন্ন স্থানে পথসভা করতে হয়েছে। মূলত যুদ্ধে প্রধান নেতৃত্ব ও কমান্ডের দায়িত্ব পালন করেছেন ক্যাপ্টেন আব্দুল হালিম চৌধুরী, সাবেক এম এন এ মোসলেম উদ্দিন খান হাবু মিয়া ও মাজাহারুল হক চান মিয়া। আমি তাদের বয়সে ছোট হলেও সামনের সারিতেই ছিলাম। বিভিন্ন কর্মসূচিতে আমাকে সঞ্চালনা ও বক্তৃতা করতে হয়েছে। একদিন বর্তমান ডিসি অফিস সংলগ্ন মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি শিশু পার্ক এর পাশেই ছিল তখনকার এসডিও অফিস। এখানে আমরা পথসভা করলাম। আমি সঞ্চালনা করছি। মোসলেম উদ্দিন খান হাবু মিয়া,মাজাহারুল হক চান মিয়া, আক্তার উদ্দিন বিশ^াস,ক্যপ্টেন আব্দুল হালিম চৌধুরীসহ গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের উপস্থিতে পথসভাটি জনসভায় পরিনত হলো। আমার পাশেই দাড়িয়ে বক্তৃতা শুনছেন ততকালীন বিশিষ্ঠ আইনজীবি ও আদালত পাড়ার তুখোর বক্তা আনোয়ার উদ্দিন শিকদার। তিনি মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে থাকলেও লোকসংখ্যা বেশি দেখে ও আমাদের কথাগুলো যৌক্তিক বলে মনোযোগ দিয়ে শুনছেন। আমিও কৌশলে তাকে বক্তৃতা করার জন্য আহবান করলাম,তিনিও সারা দিলেন। নেতারা তো অবাক কাচুমাচু করলেও আমি তাকে কথা বলার সুযোগ করে দিলাম। সেদিন তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষেই বেশ ভালো বক্তৃতা করলেন এবং আমরা সবাই খুশি হলাম। আমি কয়েকদিন যাবত ভাবছি যুদ্ধ পরিচালনার জন্য সর্বদলীয়ভাবে একটি কমান্ড কাউন্সিল গঠন করা দরকার। সেদিনের মঞ্চ থেকেই আমি মুক্তিযুদ্ধের কমান্ড কাউন্সিল গঠনের প্রস্তাব করলাম। পথসভা থেকেই কন্ঠভোটে সেটি পাশ হলো। তারপর আমাদের প্রিয় নেতা প্রয়াত মোসলেম উদ্দিন খান হাবু মিয়ার বাসায় আমরা বৈঠক করলাম। উল্লেখ্য যে আওয়ামীলীগের সকল কাযক্রম তার বাসা থেকেই হইতো এটাই কার্যত আমাদের জেলা অফিস ছিলো। ইতেমধ্যে কমান্ড কাউন্সিল গঠনে আমরা একটি খসড়া তালিকা ও ঘোষনাপত্র করেছি। মোসলেম উদ্দিন খান হাবু মিয়ার বাসায় কমান্ড কাউন্সিলের প্রথম সভায় উপস্থিত ছিলেন আওয়ামীলীগ থেকে এ্যাড.মোসলেম উদ্দিন খান হাবু মিয়া, এ্যাড.খোন্দকার মাজাহারুল হক চান মিয়া, মতাদর্শিকভাবে বামপন্থি সামরিক নেতা (অব:) ক্যাপ্টেন আব্দুল হালিম চৌধুরী, মফিজুল ইসলাম খান কামাল, ন্যাশনাল আওয়ামী পর্টি ন্যাপ থেকে সভাপতি এ্যাড.খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন,সাধারন সম্পাদক সৈয়দ আনোয়ার আলী চৌধুরী। এই কয়েকজন নিয়েই আমরা কমিটি গঠন করতে চাই। কিন্তু রাজনৈতিক দল হিসেবে কমিউনিস্ট পার্টি থেকে একজন রাখা দরকার বলে পরবর্তীতে ডা: মীর আবুল খায়ের ঘটু সাহেবকে অন্তভুক্ত করা হয়। এই হলো সাত সদস্য বিশিষ্ট মানিকগঞ্জের গঠিত বিপ্লøবী কমান্ড কাউন্সিল। কিছুদিন পরই এই কমিটি নিয়ে আমি খুবই হতাশ যে সভা ডাকলে সবাইকে পাওয়া যায় না। মুলত যুদ্ধের প্রশিক্ষণ ও রনকৌশল নিয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন ক্যাপ্টেন অব: আব্দুল হালিম চৌধুরী,
এ্যাড.মোসলেম উদ্দিন খান হাবু মিয়া ও মফিজুল ইসলাম খান কামাল। তারপরও আমি যুদ্ধদিনের ঐ উত্তাল দিনে প্রত্যেকেই তাদের স্ব স্ব রাজনৈতিক অবস্থান থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তারপরও কামান্ড কাউন্সিলের আমিই একমাত্র জীবিত সম্মুখ যোদ্ধা জীবনের সায়াহ্নে এসে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য গঠিত মানিকগঞ্জ সাত সদস্য বিশিষ্ঠ বিপ্লবী কমান্ড কউন্সিলের প্রয়াত সকল সদস্যদের প্রতি হৃদয়ের অন্তস্থল থেকে জানাই শ্রদ্ধা ও ভালবাসা। মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় মিত্র বাহিনীর সাথে মুক্তিবাহিনী, ন্যাপ-কমিউনিস্ট ছাত্র ইউনিয়ন বিশেষ গেরিলা বহিনী,বিএলএফ (মুজিব বাহিনী) ছারাও প্রত্যেক্ষ ও পরোক্ষভাবে সামরিক ও গেরিলা বাহিনীর সাথে স্থানীয় বিভিন্ন বাহিনীও দেশপ্রেমে উদ্ভুদ্ধ হয়ে কাজ করেছে নিরলসভাবে। আমি যুদ্ধকালীন সময়ে ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসে মানিকগঞ্জ জেলা বি এল এফ এর প্রধানের দায়িত্ব গ্রহন করি এবং আমাদের কেন্দ্রীয় প্রধান নেতা শেখ ফজলুল হক মনির নির্দেশনায় মানিকগঞ্জের সাত উপজেলায় কমিটি গঠন করি। যতদূর মনে আছে-যাদের দায়িত্ব দিয়ে ধন্য হয়েছি তারা হলেন- মানিকগঞ্জ সদর: কমান্ডার- বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহাদত হোসেন বিশ^াস বাদল (প্রয়াত),ডেপুটি কমান্ডার-১.সৈয়দ সরোয়ার আলম চৌধুরী,ডেপুটি কমান্ডার-২.বীর মুক্তিযোদ্ধা ইকবাল হোসেন খান (প্রয়াত),সিংগাইর: বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহবুবুর রহমান,ডেপুটি কমান্ডার-বীর মুক্তিযোদ্ধা সেলিম খান,হরিরামপুর: কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা আক্তারুল হক খান ওরফে শাজাহান মিয়া,ডেপুটি কমান্ডার-সুকেন্দু সাহা। ঘিওর:কমান্ডার- বীর মুক্তিযোদ্ধা মনসুর আলম খান,ডেপুটি কমান্ডার-১ বীর মুক্তিযোদ্ধা গিয়াস উদ্দিন,ডেপুটি কমান্ডার-২. বীর মুক্তিযোদ্ধা আফজাল হোসেন খান জকি, সাটুরিয়া: কমান্ডার-বীর মুক্তিযোদ্ধা আজিজুল হক,ডেপুটি কমান্ডার-বলাই চন্দ্র দে,দৌলতপুর: কমান্ডার-বীর মুক্তিযোদ্ধা গিয়াস উদ্দিন ডেপুটি কমান্ডার ছিলেন বিশিষ্ট অভিনেতা নিরঞ্জন কুমার পটলা, শিবালয়: কমান্ডার: চিত্ত কুমার সাহা,ডেপুটি কমান্ডার- গঠনে জটিলতায় স্থগিত রাখা হয়।
বিশেষ করে বিজয় মেলা স্মরণিকার মাধ্যমে আমরা আরো প্রাণিত হই। বিজয় মেলার স্মরণিকা থেকে আওয়ামীলীগ জেলা সভাপডতি বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মহিউদ্দিন রুপসা-নালীর যুদ্ধ নিয়ে স্মৃতি কথা থেকে দুটি লাইন এভাবে বলা যায়- জ্যো¯œা রাত লাইন ধরে চাউল ভর্তি নৌকা গুলো আজিমনগর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পের দিকে ছুটে চললো। এক নৌকার মুক্তিযোদ্ধারা আরেক নৌকার মুক্তিযোদ্ধাদের জিজ্ঞেস করলো খবর কি? সমস্বরে উত্তর এলা জয় বাংলা,জয় বঙ্গবন্ধু,ততক্ষণে হাকিম উদ্দিন মাঝির গান জয় বাংলা বাংলার জয় বালিরটেক গোডাউনের সংগৃহিত চাউল দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের চললো বেশ অনেক মাস। কে রুখিবে স্বাধীনতা-এমন সাধ্য কার। [মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলা ২০১২,পৃষ্ঠা ২৮] একই ম্যাগাজিনে কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা কমরেড আজাহারুল ইসলাম আরজু তার স্মৃতিকথায়” ২০ শে জুন ১৯৭১ সরকারি দেবেন্দ্র কলেজে এস এস সি পরিক্ষার কেন্দ্রে বোমা হামলা একটি সফল অপারেশন” এই অপারেশনের মুল টর্গেট ছিলো পরিক্ষা বাতিল করা। আমরা বোমা ফাটানোর পর চারিদিক থমথম হয়ে গেলো পাক আর্মিমাও গুলিবর্ষন করে ,পরিক্ষার্থীরা ছোটাছুটি করলে পরিক্ষা বাতিল করতে বাধ্য হয়। সবাই প্রাণ বাঁচাতে চরিদিকে ছুটে পরে আমিও তাদের সাথে একাকার হয়ে চলে আসি পোড়রা বাজার ব্রীজের কাছে।ঐ অপারেশন সফল হয়েছিলো মুক্তিযোদ্ধা এবং স্বপক্ষের জনগন উদ্ভুদ হয়েছিলো এবং শত্রæরা হয়ে পড়েছিলো আতংকিত ও ভীত। [মু.বি.মে.২০১২.পৃষ্টা-৩২] কমিউনিস্ট পার্টির জেলা কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা এ্যাড.মিজানুর রহমান হযরত তার মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিময় দিনগুলি থেকে ’মনতলা’ বর্ডার ট্রানজিট ক্যাম্প প্রবেশ পথে তুমুল লড়াইয়ের কথা বলেন। ’মনতলা’ ক্যাম্পে কয়েকদিন অবস্থান করার পর একদিন সকালের নাস্তার পর জানলাম আজ রাতেই আমাদের দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে হবে। খুবই আনন্দিত হলাম যে দীর্ঘ ৪ মাস পর মাতৃভূমিতে ফিরে যুদ্ধ করার সুযোগের আনন্দে দিনটা কাটলো। এলো সন্ধা তারপর যাত্রা শুরু করলাম। ক্যাম্পে অবস্থানরত অন্য জেলার সহযোদ্ধারা আমাদেরকে স্যালুট দিয়ে বিদায় জানালেন।[ মু.বি.মে.পৃ.৩৪]
মানিকগঞ্জ ঘিওর অঞ্চলের কাউটিয়া গ্রামের প্রতাপশালী খান পরিবারের ¯্রষ্টা যুদ্ধকালীন কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মনসুর আলম খান এর ছোট ভাই বর্তমান জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডেপুটি কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মমিন উদ্দিন খান গত ডিসেম্বর ২০১২ বিজয় মেলা স্মরনিকায় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথা নামক প্রবন্ধের পৃষ্ঠা৩৯,৪০,৪১ এর অংশবিশেষ থেকে জানা যায়-আগেই বলেছি বড় ভাই মনসুর আলম খান ভারতের উত্তর প্রদেশের টানডুয়া ট্রেনিক কলেজে বি.এল.এফ এর ট্রেনিং গ্রহন করে কমান্ডার হিসেবে বাংলাদেশের ভিতরে যুদ্ধ ঘোষনা করেন। তার সাথে আমাদের গ্রামের গিয়াস উদ্দিন,বালিয়াখোড়ার জালাল ভাই, সোধঘাটার আফজাল হোসেন খান জকি,দৌলতপুর থানার হাতকোড়ার শমসের ভাই ছিলেন। আমার অপর তিনভাই যথাক্রমে মোক্তার উদ্দিন খান সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মোক্তার উদ্দিন খান হরিরামপুর এর প্রায় সকল যুদ্ধে অংশগ্রহন করেন। আমার ছোট ভাই শাহাদত আলী খান বড় ভাই মনসুর আলম খান এর সাথে বার্তা বাহকের কাজ করেন। আমার পরিবারটি একটি মুক্তিযোদ্ধা পরিবার।
জাতীয় তথ্য বাতায়ন থেকে মুক্তিযুদ্ধকালীন ঘটনাপ্রবাহ সমন্ধে আরো জানা যায়- যে ঐ সময় সরকারি দেবেন্দ্র কলেজ থেকে সংগৃহীত ইউ ও টি সি এর ড্যামী রাইফেল নিয়ে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ সদস্য (এম এন এ) মোসলেম উদ্দিন খান হাবু মিয়ার বাসার সামনে বর্তমান শিশু মঞ্জুরী কেজি স্কুলের পাশের উন্মুক্ত স্থানে ছাত্রদের প্রশিক্ষণের ব্যাবস্থা গ্রহন করা হয়। এই প্রশিক্ষণসহ অন্যান্য প্রশিক্ষণ ২৫ মার্চে পর্যন্ত চলছিলো বলে জানা যায়। উক্ত সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন ও ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ বিভিন্ন সভা সমাবেশে মিলিত হইতেন। ২৬ মার্চ সকালে পাকিস্থানের এক বেতারে সামরিক শাসন জারি করা হয়। আওয়ামীলীগকে নিষিদ্ধ করা হয় এবং নেতা কর্মীদের ধরপাকর শুরু করেন। ২৮ মার্চ সকালে প্রখ্যাত কেন্দ্রীয় ছাত্রনেতা শেখ ফজলুল হক মনি মফিজুল ইসলাম খান কামাল সাহেবের বাসায় আসেন। তিনি জানান- কিছুক্ষণ পরই ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, এ এইচ এম কামরুজ্জামান,তোফায়েল আহমেদ আবু হেনা তারা নদী পারি দিয়ে সিরাজগঞ্জ যাবেন। তাই মানিকগঞ্জের উপর দিয়েই যেতে হবে তাই নিরাপত্তাও যেমন জুরুরী তেমনি নির্দেশনারও প্রয়েজন। তাই জেলা আওয়ামীলীগের সহযোগীতা চেয়ে দূত হিসেবে তিনি এসেছেন। ২৯ মার্চ সন্ধায় তারা এসেই পরলো তখন মানিকগঞ্জের আপামর জনসাধারন তাদেরকে থাকা খাওয়াসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করে নজির সৃষ্টি করেন।
উল্লেখ্যযোগ্য কিছু অপারেশন যেমন-এপ্রিলের শেষ পর্যায়ে মানিকগঞ্জ শহরে পাক বাহিনী প্রবেশের পূর্বে ৫/৭ টি হেলিকপ্টারের সাহায্যে ঢাকা –আরিচা মহাসড়কের বানিয়াজুরী নামক স্থানে বিপুল সংখ্যক ছত্রী সৈন্য নামতে শুরু করেন। প্রায় দুই ঘন্টার মধ্যেই মহাসড়কটি সাজোয়া গাড়িতে আটকে যায়। পাক সৈন্যরা মানিকগঞ্জ দখলের আগে উত্তরবঙ্গ দখলের জন্য আরিচার উদ্দেশ্যে রওনা হয় এবং বিনা প্রতিরোধে আরিচা দখল করে নেয়। তারপর পাক বাহিনীরা মানিকগঞ্জ অভিমুখে অভিযান চালালে ধামরাইয়ের নয়ারহাটে বাধার সম্মুখীন হয় এবং পরবরর্তীতে হেলিকপ্টারের সাহায়্যে ছত্রী সৈন্য দ্বারা ঢাকা আরিচা সড়ক দখল করে। আরিচা দখলের সময় তারা বিপুল সংখ্যক ঘরবাড়ী জ¦ালিয়ে দেয় এবং নিরহী জনগনকে নির্বিচারে হত্যা করে। স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে পশ্চিম পাকিস্তানী সরকার আগস্ট মাসে মাধ্যমিক পরীক্ষা (এস.এস.সি) গ্রহনের সিদ্ধান্ত নেয়। উক্ত মাধ্যমিক পরীক্ষা যাতে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন না হতে পারে সেজন্য মুক্তিযোদ্ধারা পরীক্ষা বানচালের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করে এবং ঘিওর কেন্দ্রের পরীক্ষা বানচালের জন্য একদল মুক্তিবাহিনী সামান্য গোলাবারুদ নিয়ে ঘিওর উপস্থিত হয়। মুক্তিযোদ্ধারা ভোর রাতেই অতর্কিতভাবে পাক বাহিনীর ক্যাম্প আক্রমন করে গুলি ও গ্রেনেড নিক্ষেপ শুরু করে। ফলে পাক বাহিনীও গুলি বর্ষন শুরু করে। স্বল্পস্থায়ী এই যুদ্ধে কয়েকজন পাক সেনা আহত হয়। উল্লেখযোগ্য যে, মুক্তিযোদ্ধাদের মানিকগঞ্জে এটাই পাক বাহিনীর সাথে প্রথম যুদ্ধ হলেও ২০ জুন সরকারি দেবেন্দ্র কলেজের ছাত্র ইউনিয়ন নেতা কমরেড আজাহারুল ইসলাম আরজুর নেতৃত্বে এস এস সি পরিক্ষা কেন্দ্রে বোমা হামলার একটি সফল অপারেশন হয়।
১৮ আগস্ট পাক সেনা হরিরামপুরের লেছড়াগঞ্জে প্রবেশ করে। ফলে ৩ সেপ্টেম্বর পাক বাহিনী হরিনা হতে লঞ্চে সুতালড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলে সেখান মুক্তিযোদ্ধারা বীরবিক্রমে তাদের বাঁধা দেয় এবং লঞ্চের ক্ষতি সাধিত হলে তারা ফিরে যেতে বাধ্য হয়। সেপ্টেম্বর মাসেই পাক বাহিনীর সাথে সুষ্ঠু কার্যকরী ও অপরিকল্পিতভাবে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য হরিরামপুরেই চারটি কোম্পানি গঠিত হয়। এই চারটি কোম্পানি ছিল যথাক্রমে অখঋঅ, ইঊঞঅ, ঈঐঅজখঊণ, উঊখঞঅ।মানিকগঞ্জের বিভিন্ন স্থানের যুদ্ধে চার কোম্পানী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বলে জানা যায়।
২৪সেপ্টেম্বরের আজিমনগরের যুদ্ধের পর মুক্তিবাহিনী পুনরায় দৃঢ় মনোবল এবং ব্যাপকভাবে অস্ত্র-গোলাবারুদ সংগ্রহের মাধ্যমে সংগঠিত হতে থাকে। ইতিমধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নিয়মিত ভাবে ভারতে অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহ শুরু হয়। ভারত থেকে পাঠানো রাইফেল, গ্রেনেডসহ বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্রে ভর্তি একটি নৌকা ঢাকা কেরানীগঞ্জ হয়ে আসার সময় কলাতিয়া নামক স্থানে পাক বাহিনী কর্তৃকধৃত হয় এবং তারা নৌকাটি ডুবিয়ে দেয়।ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধারা কয়েকদিন অদম্য মনোবল নিয়ে বহু কষ্ট করে ডুবিয়ে রাখা অস্ত্র উদ্ধার করতে সমর্থ হয়। উক্ত অস্ত্র-গুলি পাবার পর মুক্তিযোদ্ধারা সুদৃঢ় ভিত্তির উপর দাঁড়াতে সক্ষম হয়। ১৩অক্টোবর হরিরামপুরের সি.ও. অফিসে অবস্থিত পাকবাহিনী ক্যাম্প দখলেরপরিকল্পনা গ্রহণ করে এবং প্রবল বাধার সম্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও তারা উক্ত ক্যাম্প দখল করতে সক্ষম হয়।মুক্তিযোদ্ধাদের এই ক্যাম্প দখলে ৫জন বেলুচ সৈন্য মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষ অবলম্বন করে যুদ্ধ করেছিল বলে জানা যায়। এ যুদ্ধে ৬০/৭০জন পাক সৈন্য নিহত এবং ৭০টি রাইফেল ৩টি এল.এল.জি ও ৭ বাক্সগুলি মুক্তিযোদ্ধাদের হস্তগত হয়।
হরিরামপুর ক্যাম্প দখলের পর মুক্তিযোদ্ধারা ১৪ অক্টোবর মানিকগঞ্জের বালিরটেকে অবস্থিত পাকবাহিনীর ক্যাম্প দখলের পরিকল্পনা করে। পরিকল্পনা অনুসারে রাজাকারদের সাথে গোপন চুক্তি হয় মুক্তিযোদ্ধারা ক্যাম্প দখলের জন্য গুলিবর্ষণ শুরু করলে রাজাকাররা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে পাকবাহিনীর উপর গুলিবর্ষণ করবে। কিন্তু পরে বিশ্বাসঘাতকতা করে মুক্তিবাহিনীর উপরেই গুলিবর্ষণ করেছিল। দীর্ঘক্ষণ গুলিবিনিময়ের একপর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধা নওশেদ মোল্লা ও আবুল কাশেম ঘটনাস্থলে শহীদ হন এবং হাবীব গুরুতরভাবে আহত হন। ১৫ অক্টোবর দিবাগত রাত ৯টায় পাকবাহিনী সূতালড়ী গ্রাম আক্রমণ করলে মুক্তিযোদ্ধারা প্রবল প্রতিরোধের সৃষ্টি করে এবং ঐ রাত হতে পরদিন সকাল দশটা পর্যন্ত প্রবল যুদ্ধ চলে। উপায়ান্তর না দেখে পাকসেনারা ফিরে যেতে বাধ্য হয়।
১৭ অক্টোবর পাকসেনারা পুনরায় গানবোট সহকারে ভোর সাতটায় সূতালড়ী গ্রামে পুনরায় আক্রমণ করে। মুক্তিযোদ্ধারা এসময়ে পূর্বেই প্রস্তুত থাকায় উভয়পক্ষের তীব্র ও ব্যাপক গোলা বর্ষণ শুরু হয়, প্রবল প্রতিরোধের মুখে পাকসেনারা পশ্চাদপসরণ বাধ্য হয়। ওইদিনই পাকসেনারা গানবোটে সজ্জিত হয়ে প্রায় তিনশত সৈন্য নিয়ে রংবাজ, খামার ডিঙ্গি, ইব্রাহিমপুর, দৌলতপুর প্রভৃতি স্থান দখল চেষ্টা চালায়। এ সমস্ত রণক্ষেত্র মুক্তিযোদ্ধারা প্রবল প্রতিরোধ সৃষ্টি করে সারাদিন উভয়পক্ষে প্রচন্ড যুদ্ধের পর রণ-ক্লান্ত পাকসেনারা ফিরে যেতে বাধ্য হয়।
নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে সাটুরিয়ার নীরালীতে পাক বাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের একখন্ড যুদ্ধ হয়। এখানেও পাকসেনারা টাঙ্গাইল থেকে ছত্রভঙ্গ হয়ে একটি নৌকাযোগে নিরালীর ভিতর দিয়ে আসতে চেষ্টা করলে মুক্তিযোদ্ধারা তাদের প্রতিরোধ করে। প্রবল প্রতিরোধের মুখে প্রাক সেনারা ধলেশ্বরী নদীর তীরবর্তী কেদারপুর গ্রামে অবস্থান নেয় এবং গুলিবর্ষণ করা শুরু করে। মুক্তিযোদ্ধাদের তীব্র আক্রমণে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে পিছু হটতে থাকে।
ডিসেম্বর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের প্রথমদিকে ঘিওরের নারচি কুস্তা গ্রামে এক যুদ্ধ হয়। সন্ধ্যা ৫টার দিকে একদল পাকসেনা উক্ত স্থানের মধ্য দিয়ে মানিকগঞ্জ রওনা হয়। উক্ত সংবাদ পাওয়ামাত্র শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা রাস্তার দু’পাশে এ্যামবুশ করে অবস্থান নেয় এবং পাক সেনারা তাদের মধ্যে এলে মুক্তিযোদ্ধারা অবিরাম গুলি বর্ষণ করে। রাত ৮টা পর্যন্ত গুলি বিনিময়ের পর দুজন পাকসেনা মুক্তিবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে এবং দুজন আহত হয়।এ যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা এল.এম.জি. রাইফেল, স্টেনগান প্রভৃতি অস্ত্র ব্যবহার করে এবং পাকসেনাদের কাছ থেকে বেশকিছু চাইনিজ রাইফেল উদ্ধার করে।
১৪ ডিসেম্বর সকালে লেছড়াগঞ্জ থেকে আগত একদল পাকসেনার সাথে বালিরটেক-এ এক যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে একজনপাক সৈন্য মুক্তিযোদ্ধাদের নিকট আত্মসমর্পণ করে। ১৫ ডিসেম্বর পলায়মান পাক সৈন্যদের সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের সিংগাইরের গাজিন্দা গ্রামে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। পলায়মান পাক সৈন্যদের গাজিন্দা গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধ করলে দু’দিক থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের ঘেরাও করে গুলিবর্ষণ শুরু করেন। পাকবাহিনীর আধুনিক সমরাস্ত্রের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধারা দু’ঘণ্টা যুদ্ধের পর দুর্বল হয়ে পড়লে হঠাৎ করে পিছন দিক থেকে আক্রমণের ফলে মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আনিসুর রহমান(গাজিন্দা), আক্কেল উদ্দিন (গাজিন্দা), শরিফুল ইসলাম (গাজিন্দা), রমিজ উদ্দিন (গাজিন্দা) ঘটনাস্থলেই শহীদ হন। ১৫ডিসেম্বর পাক সেনারা ঢাকা-আরিচা সড়ক দিয়ে পালিয়ে যাবার সময় একদল মুক্তিবাহিনী মানরা গ্রামে তাদের আক্রমণ করে।পাকবাহিনীর অবিরাম গুলি বর্ষণে মোঃ চান মিয়া(দক্ষিণ ডাউলি) ঘটনাস্থলে শহীদ হন।উক্ত দিনেই অন্য একটি পলায়মান পাক সেনা দলকে মুক্তিবাহিনীরা ঢাকা-আরিচা সড়কে পিছু ধাওয়া করে এবং প্রচন্ড গুলি বিনিময়ের পর পাকসেনারা বাথুলি গ্রামে নিরাপদ স্থানে চলে যাবার সময় হঠাৎ করে একটি গুলি শফিউদ্দিন ওরফে আবদুল ওহাবকে বিদ্ধ করে ফলে তিনি সেখানে শহীদ হন।
১৯৭১সালের এপ্রিল মাসে যে মানিকগঞ্জের বিনা প্রতিরোধে পতন হয়েছিল। ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকেই মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা আক্রমণের ফলে মুক্ত হতে শুরু করে এবং ১৪ ডিসেম্বর মানিকগঞ্জসহ সম্পূর্ণ এলাকা পাক হানাদার মুক্ত হয়। ১৯৭১সালের ১৫ ডিসেম্বর সকাল দশটায় দেবেন্দ্র কলেজের মাঠে বিপুল সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা ও জনগণের উপস্থিতিতে এক বিজয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় এবং স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলি হয়।
মানিকগঞ্জে যুদ্ধকালিন সময়ে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে আওয়ামীলিগ ও কমিউনিস্ট পার্টি ছারা কোন রাজনৈতিক দল ছিলো না বিধায় মুক্তিযুদ্ধে বামপন্থিদের অবদানও কম নয়। ভাষা সংগ্রামী ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকদের অন্যতম কিংবদন্তী তৎকালীন তেরশ্রী কেন এন ইনিষ্টউনিটরে প্রধান শিক্ষক কমরেড আব্দুল হাকিম মাস্টা। তিনি বলেন- নভেম্বর মাসের মাঝামাঝিতে জেলার শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র ও রেড নন্দীর এলাকা বলে খ্যাত ঘিওরের তেরশ্রীতে পাকবাহিনী একটি বড় ধরনের গন্ডগোল করবে বলে আগেই ধারনা করেছিলা আমি। তিনি বলেন তখন মোবাইল যোগাযোগ ছিলো না বিধায় আমি কাউকে সতর্ক করতে পারিনি কেবল নিজের পরিবার নিয়ে গোপনে আমার গ্রামের বাাড়ী কাকনা আসার পরেই জানতে পারলাম যে ২১ নভেম্বর রাতে তেরশ্রীর জমিদার সিদ্বেশ^রী প্রসাদ রায় চৌধুরী ও তেরশ্রী কলেজের অধ্যক্ষ আমার সহযোদ্ধা কমরেড আতিয়ার রহমানকে আগুনে পুরিয়ে হত্যা করেছে এবং সারারাত ও পরের দিন সকালে তেরশ্রী বাজারে আগুন লাগিয়ে দেয়। কলেজের পাশেই টর্চার সেল করে বিশেষ করে হিন্দুদেরকে বেশি অত্যাচার করতো।এভাবে কুষ্টিায়া,সিধুনগর,বরবিলা,বাসুদেবাড়ী,তেরশ্রী,পয়লাসহ চারপাশের গ্রামের নিরহী ৪৩ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করে এক নারকীয় গণহত্যার নিদর্শন সৃষ্টি করেন। যেটি আমাকে এখনো ব্যাথিত ও মর্মাহত করে। ইতেমধ্যে আমাদের প্রধান নেতা কমরেড প্রমথ নাথ নন্দীকে অনেক বলে কয়ে আগেই ভারতে পাঠিয়েছিলাম বলে রক্ষা হয়েছিলো। ইতেমধ্যে আমি আমার এলাকায় কাকনা হাই স্কুল মাঠে ক্যাম্প তৈরী করি। ন্যাপ নেতা কমরেড সৈয়দ আনোয়ার আলী চৌধুরী, প্রমথ নাথ সরকার ও ডা: চিত্ত সাহার নির্দেশনায় কমরেড দিলিপ দত্ত, আফসার উদ্দিন মাস্টার, কমরেড মন্তষ পাল, কমরেড মিরান উদ্দিন মাস্টার, কমরেড বেলায়েত হোসেন, আব্দুর রহমান ঠাকুর, মিজানুর রহমান দর্জি মিনু, পরিতোষ পাল, কমরেড প্রতুল সরকারসহ একদল ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী নিয়ে ন্যাপ কমিউনিস্ট ছাত্র ইউনিয়ন বিশেষ গেরিলা বাহিনীর ক্যাম্প গঠন করি এবং দেশীয় অস্ত্র দিয়েই আমরা প্রশিক্ষণ গ্রহন করি। যুদ্ধে যাওয়ার যখন সময় হলো তখন খবর এলো বিজয়ের ”জয় বাংলা” ¯েøাগানে আমরা মুখরিত হলাম।
মানিকগঞ্জ মত্ত উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক সনদ বিহীন বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জলিল মাস্টার বলেন- আমরা মুক্তিযুদ্ধের কমান্ড কাউন্সিলের অন্যতম সদস্য সৈয়দ আনোয়ার আলী চৌধুরীর অনুপ্রেরনায় ছাত্র ইউনিয়নের এক ঝাক তরুন যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নেই। আমাদেরকে ভারতের দেরাদনে প্রশিক্ষণে নেয়া হলো না,আমরা বেতিলা স্কুল মাঠেই দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মহরা দিলাম,পিটি প্যারট করতে থাকলাম। কোন অপারেশনে যাওয়ার আগেই যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলো এতে আমি আনন্দের চেয়ে কষ্টও কম পেলাম না। মানিকগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমরা আরো গভিরে যেতে চাইলে বিস্তর গবেষণা দরকার।
উল্লেখ্য যে ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন ভারতের মুর্শিদাবাদ রাজ্যের পলাশীর প্রান্তরে দেশীয় মীরজাফর তথা রাজাকার বাহীনি ও ইংরেজ বাহিনীর যৌথ ষড়যন্ত্রে বাংলার শেষ নবাব সিরাউদ্দোল্লার পরাজয়ের পর বিট্রিশরা ২১৪ বছর প্রত্যেক্ষভাবে শাসন করার পর বাংলার আকাশে বাতাসে মাটিতে সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা উর্বর ভূমির যে স্বাদ পেয়েছে তারা আজও তারা ভুলেনি এবং পরোক্ষভাবে এখনো শাসন করছে আমাদের। ভারত ও পাকিস্তানের জন্মটাও ছিলো বিতর্কিত ও নাটকিয়তার মধ্যদিয়ে তাই তারা কৌশলে অসম মানচিত্র করে পূর্ব পাকিস্তানের তিনদিকে ভারত ও তার পাশে পশ্চিম পাকিস্তান রেখে অর্থাত সিমান্ত যোগাযোগ ছারা একটি দেশের দুটি খন্ড দুই প্রান্তে কোনদিন এক থাকতে পারে না এটি সকলেই জানত না তবে ব্রিটিশরা বেশ ভালো জানতো। ব্রিটিশরা আরো জানতো যে ভারত পশ্চিম বাংলার সাথে পূর্ববাংলাকেও কোন না কোনভাবে নিয়ন্ত্রন করবেই। তাই ভারতেরও স্বপ্নসাধ পূর্ববাংলার স্বাধীনতার তাই ভারত অনেকটা আগ বাড়িয়েই আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে মিত্র বাহিনী গঠন করে যৌথ বাহিনীর সাথে কাধ মিলিয়ে পাকিস্তানি হায়েনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করেন এবং আমাদের যুদ্ধ বিধ্বস্থ লক্ষাধিক স্মরনার্থীকে আশ্রয় দিয়ে মানবতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।অন্যদিকে গণমুখি এই যুদ্ধকে বিপ্লবে রুপান্তর করে সমাজতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মানের স্বপ্নে পরাশক্তি রাশিয়াও আমাদেরকে অষ্টম নৌ বহর দিয়ে এবং ন্যাপ কমিউনিস্ট ছাত্র ইউনিয়ন বিশেষ গেরিলা বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র দিয়েও সহযোগীতা করেন। এই দুই পরাশক্তি দেশের সর্বাত্মক সহযোগীতার কারনে বলতে গেলে যুদ্ধ শুরুর আগেই যুদ্ধ শেষ হয়ে যায়। শুধু তাই নয় ভারত ও রাশিয়া থেকে প্রশিক্ষণ পেয়ে হাজারও মুক্তিযোদ্ধারা এসেই দেখে দেশের স্বাধীনতার পতাকা উড়ছে। পধানমন্ত্রি তাজউদ্দিন আহমেদে ও সর্বাধিনায়ক এম জি ওসমানির দূরদর্শিকতায় আমরা আমেরিকা ও চীনের বিরোধিতা মোকাবেলা করে পাকিস্তানি হানাদারদের রুখতে সক্ষম হই। দু:খজনক হলেও সত্য যে যারা স্বাধীনতা অর্জন করে দিলেন তারা নিজেরাও স্বাধীনততার স্বাদ ভোগ করতে পারলেন না বিশেষত ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর মুক্তিযুদ্ধের সমস্ত অর্জন প্রায় বিসর্জনের পথে যেতে লাগলো। বিএনপি জামাত জোট ও স্বৈরাচার এরশাদ সরকার দেশকে পাকিস্তানি ভাবধারায় নিতে সংবিধানে ধর্মীয় লেবাস বিসমিল্লাহ বসালেন,রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বানিয়ে এক বিতর্কিত সাংবিধানিক শাসন কায়েম করলেন। অনেক আশা আকাঙ্কার পর মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি আওয়ামীলীগ ও তার শরিক মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এসে কেবল বিপদে পরে গণজাগরণ মঞ্চের চাপে যুদ্ধাপরাধীদের বিচর করে বাহবা নিতে চাইলেও বুদ্বিজীবি ও সুশীল সমাজের মতে মহাজোট সরকার মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্কা ও অর্জনকে আরো কাদাযুক্ত করেছে যেটি জাতিকে চরমভাবে হতাশ করছে। এটি পরিস্কার যে বর্তমান আওয়ামীলীগে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ অনুপস্থিত বলতে গেলে তারা ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য খোন্দকার মোস্তাকের এবং মুক্তিযুদ্ধের বিপরীত আদর্শ গ্রহন করেই ক্ষান্ত হয়নি তারা মৌলবাদি সংগঠন হেফাজতের অযোক্তিক দাবি মেনে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের অর্জনগুলোকে বিসর্জন দিচ্ছে যেটি খুবই দু:খজনক। ১৯৭২ সালে সংবিধানের মূলনীতি গণতন্ত্র সমাজতন্ত্র ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ হলেও মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের দল ক্ষমতায় এসে তার একটিও এখন উপস্থিত করতে পারে নাই বরং আদর্শ থেকে ক্রমশই দূরে সরে যাচ্ছে। তাই অর্থনৈতিকভাবে আমরা আগের চেয়ে চুইয়ে পরা উন্নতি ঘটলেও আদর্শিক,মূল্যবোধ,ন্যায় নীতি ইনসাফ,বিজ্ঞানমনস্কতা ও প্রগতির পথে হাজার মাইল পিছিয়ে আছি। এভাবে চলতে থাকলে ধর্মান্ধ মৌলবাদীগোষ্ঠী আবার দেশকে অন্ধকারে দিকে নিয়ে যাবে। তারপরও এদেশের অধিকাংশ মানুষের মনে সাংস্কৃতিক চেতনা থাকায় এই অন্ধকারকে ভয় পাইনা এবং বিশ^াস করতে পারি না। কারন আমরা বাঙ্গালী বীরের জাতি এবং এখনো সাংস্কৃতিমনা মানুষের সংখ্যাই বেশি। তাই কালের আবর্তে একদিন সাংস্কৃতিক জাগরণ ঘটবেই। নতুন প্রজন্মের মাঝে বিজ্ঞান চর্চার মাধ্যমে যুক্তিবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার লড়াই জারি থাকবেই। আসুন মহান মুক্তিযুদ্ধের শোষনমুক্ত অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বহুত্ববাদি সামাজিক ন্যায্যতার সমাজ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে ঐক্যবদ্ধ হই। [লেখক: সাংবাদিক ও সাধারন সম্পাদক বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘ,মানিকগঞ্জ জেলা শাখা]

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button