slider

ঝালকাঠিতে ঋণের জালে জড়িয়ে দিশেহারা জেলেরা

মো.শাহাদাত হোসেন মনু,ঝালকাঠি প্রতিনিধি : গত ৭অক্টোবর থেকে আগামী ২৮অক্টোবর পর্যন্ত ২২দিন ইলিশের প্রজনন নির্বিঘœ করতে দেশজুড়ে চলছে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা। ইলিশের প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরায় এই সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকায় অলস সময় কাটাচ্ছেন উপকুলীয় জেলা ঝালকাঠির জেলেরা। এতে বেকার হয়ে পড়ায় এসব সংসারের ব্যয়ভার বহনে হিমশিম খাচ্ছেন
জেলেরা। এ অবস্থায় মহাজনের কাছ থেকে নেয়া দাদন ও এনজিও থেকে নেয়া ঋণ মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে দাঁড়িয়েছে । ভ’ক্তভোগী জেলেদের অভিযোগ কোনো ধরনের উপার্জন না থাকলেও কিস্তি পরিশোধে মাপ নেই। তাই মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা
চলাকালীন সময়ে এনজিওর কিস্তি বন্ধ ও বিকল্প কর্মসংস্থানের দাবি জেলেদের।
জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, গত গত ৭অক্টোবর থেকে আগামী ২২দিনের এ নিষেধাজ্ঞা চলবে ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত। এ সময় ইলিশ আহরণ, বাজারজাতকরণ, বিক্রি ও পরিবহন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সেই নিষেধাজ্ঞা মেনেই জাল ও নৌকা নিয়ে নদীতে নামছেন না জেলেরা। যারা নামছে তাদের ধরে আইনের আওতায় দন্ড দেয়া হয়েছে। ৭ অক্টোবর মধ্যরাত থেকে শুরু হওয়া অভিযানে ১৯ অক্টোবর সকাল ৭টা পর্যন্ত ৯জনকে একবছর করে এবং আরো ২জনকে ১মাস করে কারাদন্ড দেয়া হয়েছে। লক্ষাধিক মিটার জাল জব্দ করে তা জনসম্মুখে পুড়িয়ে ফেলা এবং এ সময়ে উদ্ধারকৃত ১৫০ কেজি ইলিশ বিভিন্ন এতিম খানায় বিতরণ করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন জেলা মৎস্য কর্মকর্তা রিপন কান্তি ঘোষ। বন্ধ হয়ে গেছে নদীকেন্দ্রিক সব মৎস্য আড়ৎ, মাছ ঘাট। বেকার হয়ে পড়েছেন ইলিশের ওপর নির্ভর থাকা জেলে। এ অবস্থায় কারও ভাগ্যে ঠিক মতো দুই বেলা খাবারও জুটছে না। বেকার জেলেরা এই সময়ে পুরনো ছেঁড়া জাল আর নৌকা মেরামত করে অলস সময় পার করছেন । নিষেধাজ্ঞার এই সময়ে সরকার থেকে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হলেও তা পরিমাণে খুবই অপ্রতুল।
জেলেরা জানান, ইলিশ ধরার জাল আর উপকরণ কিনতে প্রতি বছর চড়া সুদে ঋণ নিতে হয়। তারপর ঋণদাতা মহাজন আর বেপারির কাছেই তুলনামূলক কম দামে বেচতে হয় রূপালি ইলিশ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই দেনার বোঝা টানছেন অনেকে জেলে। এর মাঝে আবার এনজিওর ঋণের চাপে দিশেহারা। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, নদীতে যেতে না পারায় নদীর পাড়, বেড়িবাঁধ,
রাস্তার পাড় কিংবা বাড়ির উঠানে বসে জাল মেরামত করে অলস সময় পার করছেন জেলেরা। এ কারণে জেলে পরিবারগুলোতে বর্তমানে আর্থিক অনটন চরমভাবে দেখা দিয়েছে। নিষিদ্ধ এই সময় নিষেধাজ্ঞার এই সময় সরকারের পুনর্বাসনের সহায়তা
বৃদ্ধি ও এনজিও ঋণের কিস্তি বন্ধের অনুরোধ করেন তারা। জেলে ফোরকান গাজী বলেন, যহন ইলিশ ধরা বন্ধ থাহে তহন আপনারা আইয়্যা জিগান মোরা মাছ ধরি ক্যা। কিন্তু অবরোধ দেওয়ার আগে সরকার মোগো যে চাউল বরাদ্দ দেছে হ্যা পাইছি কিনা হেইয়ার কোন খোঁজ লন নাই। এহোন ১২দিন পরে পাইছি, আর তহোনই খবর লইতে আইছেন। খালি মাছ ধরার সময় আইলেই আমনেগোরে দেহি। তিনি আরও বলেন, মোগে দেনার শেষ নাই, ঘরে সয়সদয় যা আছেলে হ্যা শেষ, এহন খামু কি। ৬ জনের সংসার, ১২দিন পরে চাল পাইছি ২৫কেজি। কেমনে কি করমু হেয়ার দিশা পাইনা।
ষাটোর্ধব নবদীপ মালো বলেন, ‘ইলিশ ধরার মৌসুমের আয় দিয়ে কোনোরকম সংসার চলে। কিন্তু এ বছর ইলিশ ধরাও পড়েছে কম। এ পর্যন্ত আমাদের শুধু লোকসানই হয়েছে। আগামী দিনে বিপদ আরও বাড়বে বলেই মনে হচ্ছে। কী করব, বুঝে উঠতে
পারছি না। এ বছর শুধু মাছ ধরার সরঞ্জাম কিনতে ঋণ নিয়েছি প্রায় তিন লাখ টাকা। পরিবার-পরিজন নিয়ে খেয়ে-পরে বাঁচতে বাড়তি দেনাও করতে হচ্ছে। এর মাঝে কিস্তি পরিশোধ করা প্রায় অসম্ভব।’
একাধিক জেলে জানান, মাছ শিকারের জন্য প্রতি বছর বিপুল টাকা এনজিও থেকে ঋণ করতে হয়। কিন্তু বেকার এই সময়ে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে গিয়ে আবারও ঋণের আশ্রয় নিতে হয়। এভাবে একটার পর একটা ঋণে জালে আটকে পড়ার কারণে আর কখনো মিলে না মুক্তি। তাদের দাবি, এই সময়ে যদি ঋণের কিস্তি বন্ধ না করা হয়, তাহলে এই ফাঁদ থেকে আর রেহাই মেলার সুযোগ হয়তো কখনো হবে না। জেলায় ৬ হাজার ৮’শ ৮৩জন নিবন্ধিত জেলের মধ্যে সরকারী প্রণোদনার চাল পেয়েছেন ৩ হাজার ৮’শ ৫০ জনে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রণোদনার বরাদ্দ নিবন্ধিত সব জেলেদের সহায়তা পাওয়ার কথা থাকলেও এখনও অনেকে সহায়তা পাননি। ফলে তাদের অনেকটা মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button