আন্তর্জাতিক কুরআন প্রতিযোগিতায় ১১১ দেশের মধ্যে ৩য় বাংলাদেশের তাকরিম

আবারো আন্তর্জাতিক হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতায় দেশের নাম উজ্জ্বল করলো ছোট্ট হাফেজ সালেহ আহমদ তাকরিম। সৌদি আরবের পবিত্র মক্কায় অনুষ্ঠিত ‘৪২তম বাদশাহ আব্দুল আজিজ আন্তর্জাতিক হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতা’য় তৃতীয় স্থান অর্জন করেছে সে।
স্থানীয় সময় বুধবার (২২ সেপ্টেম্বর) রাতে মক্কার পবিত্র হারাম শরিফে একটি বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে চূড়ান্ত বিজয়ীদের মধ্যে তৃতীয় বিজয়ী হিসেবে তাকরিমের নামও ঘোষণা করা হয়। এ সময় তার হাতে এক লাখ রিয়াল (প্রায় সাড়ে ২৭ লাখ টাকা) পুরস্কার ও সম্মাননা ক্রেস্ট তুলে দেয়া হয়।
পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আব্দুল আজিজের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তার উপদেষ্টা ও মক্কা নগরীর গভর্নর খালেদ আল ফয়সাল বিন আবদুল আজিজ এবং দেশটির ইসলাম ও দাওয়াহ বিষয়ক মন্ত্রী ড. আবদুল লতিফ বিন আবদুল আজিজ আলে শেখসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ।
কুরআন হিফজের বড় এই প্রতিযোগিতায় বিশ্বের ১১১টি দেশের ১৫৩ জন হাফেজ অংশ নেয়। তাদের মধ্যে তাকরিম এই বিরাট গৌরব অর্জন করল।
সালেহ আহমাদ তাকরিম টাঙ্গাইলের নাগরপুর থানার ভাদ্রা গ্রামের হাফেজ আব্দুর রহমানের ছেলে। সে রাজধানীর ‘মারকাযু ফয়জিল কুরআন আল ইসলামী মাদরাসা’র কিতাব বিভাগের শিক্ষার্থী।
পবিত্র কুরআন প্রতিযোগিতার বৃহৎ এ আসরে অংশ নিতে গত ৯ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টা ৩৫ মিনিটে ফয়জুল কুরআনের প্রধান শিক্ষক হাফেজ কারী মাওলানা আব্দুল্লাহ আল মামুন সালেহ আহমাদ তাকরিমকে নিয়ে সৌদি এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে জেদ্দার উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন।
এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র শিক্ষক হাফেজ মাওলানা হোসাইন রাহমানী। তিনি জানান, এর আগে লিবিয়ায় আন্তর্জাতিক হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতায় হাফেজ সালেহ আহমাদ তাকরিম সপ্তম স্থান অর্জন করে। এ বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সপ্তম স্থান অর্জন করার পাশাপাশি সর্বকনিষ্ঠ প্রতিযোগী হিসেবে বিশেষ সম্মাননা অর্জন করে সে।
একইসাথে গত ২২ মে আন্তর্জাতিক কিরাত সংস্থা বাংলাদেশের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত নির্বাচনী পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করে লিবিয়ার বন্দরনগরী বেনগাজিতে অনুষ্ঠিত ১০ম আন্তর্জাতিক হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের একমাত্র প্রতিনিধি নির্বাচিত হয় তাকরিম।
তারও আগে তেহরানের আন্দিশাহ (আল-ফিকির) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ৩৮তম আন্তর্জাতিক হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতায় তাকরিম বিশ্বে প্রথম স্থান অর্জন করে বাংলাদেশের লাল সবুজের পতাকা বিশ্ব দরবারে সমুন্নত করে। ২০২০ সালের পবিত্র রমজান মাসে বাংলাভিশন টেলিভিশন আয়োজিত হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয় সালেহ আহমাদ তাকরিম।
মক্কায় অনুষ্ঠিত এবারের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সালেহ আহমাদ তাকরিম ১৫ পারা গ্রুপে (চতুর্থ গ্রুপ) অংশ নেয়। এই গ্রুপে প্রথম স্থান অর্জন করেছে লিবিয়ার যিয়াদ মোহাম্মদ খলিল হাবিশ। পুরস্কার হিসেবে সে পেয়েছে এক লাখ ২০ হাজার সৌদি রিয়াল। দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে কেনিয়ার আব্দুর রহমান মুসা আব্দুল্লাহ। সে পেয়েছে এক লাখ ১০ হাজার সৌদি রিয়াল। আর তৃতীয় স্থান অর্জনকারী বাংলাদেশের সালেহ আহমাদ তাকরিম। সে এক লাখ সৌদি রিয়াল পুরস্কার পেয়েছে। বাংলাদেশী মুদ্রায় যা প্রায় সাড়ে ২৭ লাখ টাকা।
এবারের ‘৪২তম বাদশাহ আব্দুল আজিজ আন্তর্জাতিক হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতা’ সর্বমোট পাঁচটি গ্রুপে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে পুরস্কার দেয়া হয়েছে অন্তত ২৭ লাখ রিয়াল।
প্রথম গ্রুপ : কিরাতে সাব’আ-সহ সম্পূর্ণ কুরআন। এই গ্রুপে প্রথম হয়েছেন মিসরের বেলাল আস-সাইয়েদ মোহাম্মদ মোহাম্মদ আল সানহুরি। তিনি পেয়েছেন তিন লাখ ৫০ হাজার রিয়াল। দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছেন সুদানের আব্দুল লতিফ উসমান আব্দুল হামিদ মালিক। তিনি পেয়েছেন তিন লাখ ২৫ হাজার রিয়াল। তৃতীয় হয়েছেন সৌদি আরবের মোহাম্মদ বিন ইবরাহিম আব্দুস সালাম ইদরিস। তার পুরস্কারের অংক তিন লাখ রিয়াল।
দ্বিতীয় গ্রুপ : তাজবীদ ও তাফসীরসহ সম্পূর্ণ কুরআন। এই গ্রুপে প্রথম হয়েছেন কিরগিজস্তানের মোহাম্মদ আলি আমারুফ। পুরস্কার হিসেবে তিনি পেয়েছেন দুই লাখ ৫০ হাজার রিয়াল। দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছেন সৌদি আরবের খালিদ বিন সুলাইমান সালেহ আল বারাকানি। তিনি জিতিছেন দুই লাখ ৩০ হাজার রিয়াল। তৃতীয় হয়েছেন বাহরাইনের আব্দুর রহামান বাদী মুহাহহির মুকাররিদ কালিব। তিনি পেয়েছেন দুই লাখ ১০ হাজার রিয়াল।
তৃতীয় গ্রুপ : তাজবীদসহ সম্পূর্ণ কুরআন। এই গ্রুপে প্রথম স্থান অধিকার করেছেন মরক্কোর আহমাদ আশারি। পুরস্কার স্বরূপ তিনি পেয়েছেন দুই লাখ রিয়াল। দ্বিতীয় হয়েছেন ইন্দোনেশিয়ার জাহরান আওজান। তিনি পেয়েছেন এক লাখ ৮৫ হাজার রিয়াল এবং তৃতীয় হয়েছেন গাম্বিয়ার আব্দুল্লাহ আনজাঈ। তিনি জিতেছেন এক লাখ ৭০ হাজার রিয়াল।
পঞ্চম গ্রুপ : পাঁচ পারা গ্রুপ। (এই গ্রুপে ওআইসির সদস্য নয়- এমন দেশের হিফজ প্রতিনিধিরা অংশ নেয়) এই গ্রুপে প্রথম হয়েছে থাইল্যান্ডের আহমাদ সামুহ। সে পেয়েছে ৫৫ হাজার সৌদি রিয়াল। দ্বিতীয় হয়েছে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের ইদরিস মোহাম্মদ জেইন। সে পেয়েছে ৫০ হাজার সৌদি রিয়াল এবং তৃতীয় স্থান অর্জন করেছে জার্মানির আমিন কানান। সে ৪৫ হাজার সৌদি রিয়াল পুরস্কার পেয়েছে।
সূত্র : সাবাক ও অন্যান্য
মধ্যরাতে বিমানবন্দরে ফুলেল শুভেচ্ছা ও ভালোবাসায় সিক্ত হাফেজ তাকরীম

সৌদি আরবের পবিত্র মক্কায় অনুষ্ঠিত ‘৪২তম বাদশাহ আব্দুল আজিজ আন্তর্জাতিক হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতা’য় তৃতীয় স্থান অর্জনকারী বাংলাদেশী ক্ষুদে হাফেজ সালেহ আহমাদ তাকরিম বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত (শুক্রবার) পৌনে ২টার দিকে রাজধানীর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেছে। এ সময় তাকে অভ্যর্থনা জানাতে বিমানবন্দরে জড়ো হন অসংখ্য কুরআনপ্রেমী মানুষ।
গভীর রাত সত্ত্বেও হাফেজ তাকরিমকে বরণ করে নেয়াকে কেন্দ্র করে অনেক মানুষকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বেশ সক্রিয় দেয়া যায়। সরাসরি লাইভে এসে কিংবা তাকরিমের অভ্যর্থনার ছবি-ভিডিও পোস্ট করে অনলাইনে সক্রিয়রাও উষ্ণ সংবর্ধনা জানান তাকে।
শুধু তাই নয়; বরং বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের আন্তরিকতা ও ভালোবাসাও ছিল চোখে পড়ার মতো। হাফেজ তাকরিমের শিক্ষক ও সৌদিতে তার সফরসঙ্গী হাফেজ মাওলানা আব্দুল্লাহ আল মামুন ফেসবুকে একটি সংক্ষিপ্ত পোস্টে সেটিই উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘ভিআইপি লাউঞ্জে সকল কর্মকর্তাদের ভালোবাসায় সিক্ত’।
এর আগে তাকরিমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান‘মারকাযু ফয়জিল কুরআন আল ইসলামী মাদরাসা’র সিনিয়র শিক্ষক হাফেজ মাওলানা হোসাইন রাহমানী গভীর রাতে তার বিমানবন্দরে অবতরণের বিষয়টি নয়া দিগন্তকে নিশ্চিত করেন। তবে তিনি জানান, অভ্যর্থনায় শুধুমাত্র মাদরাসা কর্তৃপক্ষ ও নির্দিষ্ট কয়েকজন শুভাকাঙ্ক্ষী উপস্থিত থাকবেন। গভীর রাত হওয়ায় মাদরাসার পক্ষ থেকে তিনি সাধারণ শুভাকাঙ্ক্ষীদের বিমানবন্দরে উপস্থিতিকে নিরুৎসাহিত করেন। কিন্তু এরপরও মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসায় মুগ্ধ হয় তাকরিম। বিশ্বজয়ী এ হাফেজকে এক নজর দেখতে বিমানবন্দরে ভিড় জমান অসংখ্য মানুষ।
বাংলাদেশ ধর্মমন্ত্রলায়ের পক্ষ থেকেও তাকরিমকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয়। বড় রকমের সংবর্ধনার ব্যাপারে তাকরিমের শিক্ষক মাওলানা হোসাইন রাহমানী বলেন, ‘বিশ্বজয়ী এ হাফেজকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাতে বহু কুরআনপ্রেমী ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান আমাদের সাথে নানাভাবে যোগাযোগ করেছেন। আমরা তাদের আবেগকে পূর্ণ শ্রদ্ধা করি। এজন্য তাদের সংবর্ধনা প্রদানের জন্য ‘মারকাযু ফয়জিল কুরআন আল ইসলামী মাদরাসা’ আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর ‘বিশেষ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে’র আয়োজন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। আমরা ওই অনুষ্ঠানের সফলতার জন্য সকলের কাছে দোয়া চাই’
নয়া দিগন্ত




