১৪ই আগষ্ট: ১৯০ বছরের ব্রিটিশ বিরোধী আজাদীর লড়াই ও স্বাধীন গনপ্রজাতন্ত্র গঠন
# ফুয়াদ আবদুল্লাহ #
আজ ঐতিহাসিক ১৪ অাগষ্ট। ১৯৪৭ সালের এই দিনে আমরা যেমন ১৯০ বছরের বৃটিশ কলোনি শাসন থেকে মুক্তি পেয়েছি, তেমনি কলোনি শাসকদের সহযোগী শক্তি বর্বর জমিদারদের থেকেও মুক্তি পেয়েছি। সুলতানী শাসনামলে, নবাবী শাসনামলে যেই বাংলা ছিল দুনিয়ার অন্যতম সমৃদ্ধ এলাকা, ১৯০ বছরের (১৭৫৭-১৯৪৭) ঔপনিবেশিক শাসনে সেই বাংলা হয়ে যায় একটা নি:স্ব-দরিদ্র এলাকা, ফলে পূর্ব বাংলা ও বাঙ্গালী মুসলমানকে ৪৭ সালে শুরু থেকে শুরু করতে হয়, ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের মধ্য দিয়ে। কোলকাতা কলোনীয়াল সময়ের রাজধানী হওয়ার কারনে কোলকাতা কেন্দ্রীক কিছু উন্নয়নমুলক কার্যক্রম হলেও পুর্ববঙ্গ ছিল সম্পুর্ণ অবহেলিত এলাকা। প্রশাসনিক কারনে ১৯০৫ সালে অবহেলিত পূর্ব বাংলা ও আসামকে নিয়ে আলাদা প্রদেশ ঘোষনা করে তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড কার্জন কিন্তু উচ্চ বর্ণের হিন্দুদের প্রতিবাদের মুখে সেটা বাতিল করা হয় ১৯১১ সালে – এই বাংলায় উন্নয়নের কিঞ্চিৎ সম্ভাবনাও অঙ্কুরে বিনাশ হলো।
৪৭ কেন্দ্রীক আলোচনায় ১৯০ বছরের শোষন-লুন্ঠনের তুলনায় ভাগাভাগিকেই বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়- সেজন্য আমরা আজাদী আন্দোলন না বলে ‘দেশভাগ’ পরিভাষা বেশি ব্যবহার করে থাকি! মনে হয় যেন ১৯০ বছরে একটাই ঘটনা ঘটেছে আর সেটা হচ্ছে ভাগাভাগি। আর যদি ‘আজাদী আন্দোলন’ পরিভাষা ব্যবহার করা হয় তখন স্বাভাবিকভাবেই আমরা কিভাবে আজাদী লাভ করেছি এবং কোন্ ভয়াবহ অবস্থা থেকে আজাদী লাভ করেছি সেই বিষয়ে মানুষের আগ্রহ তৈরি হবে এবং ১৯০ বছরের সম্মিলিত দু:খ কষ্টের বিষয়গুলো আসবে। ‘দেশভাগ’ বলতে কি ভারত নামক দেশ নাকি বাংলা নামক দেশ সেটাও পরিস্কার হয় না, প্রকৃতপক্ষে বৃটিশ শাসন পুর্ববর্তী সময়ে ভারত নামক কোন দেশ ছিল না; ফলে ৪৭ সালে ভারত ভাগ হয়নি, ভাগ হয়েছে বাংলা এবং পান্জাব, ভারতবর্ষের সবচেয়ে বড় দুটো প্রদেশ এবং দুটোই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ।
আবার ভাগাভাগির আলোচনায় আরেকটা সমস্যা আছে-অনেকেই অভিযোগ করেন জিন্নাহর কারনে অথবা শের-ই- বাংলা-জিন্নাহর ব্যক্তিত্বের সংঘাতের কারনে আমরা অনেক এলাকা পাইনি কিন্তু আমরা ভুলেই যাই যে ভাগাভাগিতে মুসলিম লীগের বাইরে আরো একাধিক পক্ষ ছিল- কংগ্রেস ছিল, হিন্দু মহাসভা ছিল, জমিদাররা ছিল, অসমীয়ারা ছিল, বৃটিশরা ছিল। সবাই দর কষাকষির মাধ্যমে যেখানে এসে পৌঁছেছেন সেটাই আমরা পেয়েছি। তবে একটা কথা আবারো স্মরন করিয়ে দেয়া দরকার – ‘দেশভাগ’ নয় বরং ‘আজাদী আন্দোলন’ শব্দযুগলই ৪৭ কে প্রতিনিধিত্ব করে যেভাবে মুক্তিযুদ্ধ ৭১ কে প্রতিনিধিত্ব করে। আমরা ৭১ এর প্রেক্ষাপটে যেমন ‘দেশভাগ’ ব্যবহার করি না তেমনি ৪৭ এর ক্ষেত্রেও ‘দেশভাগ’ মানানসই না। ‘দেশভাগ’ কথাটার মধ্যে হাহাকার আছে, মুক্তির আনন্দ প্রকাশ পায় না।
কলোনিয়াল বাংলাতে ১৭৭০ খৃষ্টাব্দের একটা দুর্ভিক্ষে বাংলার ১ কোটি লোক মারা যায়, সেসময় বাংলার মোট জনসংখ্যা ছিল ৩ কোটি। এতবড় একটা দুর্ভিক্ষ আমাদের আলোচনাতে খুব একটা আসে না; ১৯৪৩ এর আরেকটা দুর্ভিক্ষে বাংলার ৩৫ লাখ মানুষ মারা যায়। কলোনিয়াল সময়ে আমাদের গড় আয়ু ছিল মাত্র ২৯ বছর। ক্ষুধা-দারিদ্র, দুর্ভিক্ষ, মহামারি এসবের মধ্যেই আমাদের বসবাস ছিল। জমিদারদের অত্যাচারে আমরা জর্জরিত ছিলাম; যেই জমির মালিকানা ছিল সাধারন কৃষকদের হাতে সেসব জমি চলে যায় জমিদারদের দখলে ‘চীরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ ব্যবস্থার মাধ্যমে। তবে ১৭৯৩ খৃষ্টাব্দে চালু হওয়া চীরস্থায়ী জমিদারী ব্যবস্থাকে চীরস্থায়ী হতে দেয়নি পাকিস্তান আন্দোলন। পাকিস্তান আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী শেখ মুজিবর রহমান তার ‘অসমাপ্ত আত্বজীবনী’তে বিষয়গুলা তুলে ধরেছেন। ১৯৫১ সালের ১৬ মে জমিদারী প্রথার অফিশিয়াল উচ্ছেদ হয়েছে আর এই জমিদারী প্রথা উচ্ছেদের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপিত হয়েছে ১৯৪৭ সালের ১৪ অগাস্ট আজাদী আন্দোলনের সফলতার ভিতর দিয়ে।
৪৭ আমাদেরকে হারানো জায়গা-জমি ফেরত দিয়েছে, কলোনি শাসন থেকে মুক্তি দিয়েছে, বর্বর জমিদারি প্রথা থেকে মুক্তি দিয়েছে এবং পিছিয়ে থাকা পুর্ববঙ্গের বাঙ্গালী মুসলমান এবং নিম্ন বর্নের বাঙ্গালী হিন্দুদের ক্ষমতায়নের সুযোগ করে দিয়েছে। বর্নহিন্দুরা রাষ্ট্রের যেসব পজিশনগুলাতে ছিল তারা পশ্চিমবঙ্গে চলে যাওয়ার কারনে সেসব পজিশনে বাঙ্গালী মুসলমান এবং নিম্ন বর্নের হিন্দুরা জায়গা করে নিতে থাকে; নিজেদের জায়গা-জমি ফেরত পেলেও রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কতৃত্ব পুরোপুরি চলে যায় পশ্চিম পাকিস্তানীদের হাতে, ফলে শুরু হয় দুই পাকিস্তানের মধ্যে নানা বৈষম্য এবং আমাদেরকে আবারো নতুন আজাদীর পথে হাটতে হয়; ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পান্জাবী কতৃত্বকে হটিয়ে আমরা দ্বিতীয়বার স্বাধীনতা অর্জন করি, মাত্র ২৪ বছরের ব্যবধানে।
এবি পার্টি মনে করে, ৪৭ এবং ৭১ এই দুই স্বাধীনতার ফলাফল আজকের বাংলাদেশ। সুতরাং ৪৭ এবং ৭১ দু’টাকেই উৎযাপন করতে হবে ইতিহাসের দায় থেকে; মুক্তিযুদ্ধের মত প্রায় দুইশত বছরের আজাদী আন্দোলনকেও আমাদের পাঠ্যপুস্তকে নিয়ে এসে আমাদের পুর্ব পুরষদের ১৯০ বছরের লড়াই-সংগ্রামকে সন্মান করতে হবে, তাদের বীরত্বগাথার ইতিহাসকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌছে দিতে হবে। চীরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে বাংলাদেশের মানুষ যেভাবে তার জায়গা জমি সব হারিয়ে ফেলেছিল সেভাবে পশ্চিম পাকিস্তানের মানুষ এই জুলুমের শিকার হয়নি। ফলে আযাদীর জন্য বাংলাদেশের মানুষ যতটা মরিয়া হয়ে উঠেছিল, পাকিস্তানের মানুষ ততটা মরিয়া ছিল না; অতএব, ১৪ অাগষ্ট পাকিস্তানীদের চাইতেও বাংলাদেশীদের জন্য বেশি গৌরবের। হাজী শরিয়ত উল্লাহ, শহীদ তিতুমীর, দুদু মিয়া, ফকির মজনু শাহ, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, লিয়াকত আলী খান, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, মাওলানা ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমান সহ নেতৃবৃন্দ ছিলেন সেই ১৪ আগস্টের বিজয়ী বীর; এবি পার্টি এই ঐতিহাসিক দিনকে স্মরণ করছে, পাশাপাশি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করছে স্বাধীনতার সেইসব স্থপতিদেরকে।



