
ওমর রাব্বি : বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে যখন রক্তাক্ত হয়েছিলো রাজপথ, ঠিক সেই সময়ে পুরান ঢাকার দেয়ালে উর্দু ভাষায় স্লোগান লিখেছিলেন- ‘হামারি জবান, বাংলা জবান (আমার ভাষা বাংলা ভাষা)’। নিজে উর্দুভাষী হলেও বাংলার জন্য ছিলো তার অদম্য টান। এভাবেই বাংলাকে অকৃত্রিমভাবে আজীবন ভালোবেসেছেন ভাষা সংগ্রামী, সাংবাদিক ও বিশিষ্ট চলচ্চিত্র কাহিনীকার জয়নাল আবেদীন।
পরিবারের সবাই পাকিস্তানে চলে গেলেও বাংলার টানে এ দেশেই থেকে যান তিনি । মৃত্যুর পর বাংলার মাটিতেই স্থান পেলেন। এদেশে তার আমৃত্যু ঠিকানা ছিলো রাজধানীর তোপখানা রোডের জাতীয় প্রেসক্লাব। লিভার সিরোসিসে ভুগে ৮১ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।তাকে মিরপুরে বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হয়।
সহকর্মীদের কাছে ‘ঝনু ভাই’ নামে পরিচিত জয়নাল আবেদীনের জন্ম ১৯৩৭ সালে উত্তর প্রদেশের এলাহাবাদে হলেও তার শৈশব কেটেছে বিহারে। সেখানে তার বাবা মুহাম্মদ মোস্তফা ইস্ট ইন্ডিয়ান রেলওয়ের হেড ড্রাফটসম্যান হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর তার বাবা পূর্ব পাকিস্তান রেলওয়েতে যোগ দেন, কর্মস্থল হয় বর্তমান নীলফামারীর সৈয়দপুরে। সৈয়দপুর হাইস্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন পাসের পর ঢাকা কলেজ থেকে আইকম ও বিকম পাস করেন জয়নাল আবেদীন। কলেজে থাকার সময় কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন তিনি।
১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের সময় ঢাকা কলেজে দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র ছিলেন জয়নাল আবেদীন। তখন ঢাকা কলেজ ক্যাম্পাস ছিলো ফুলবাড়িয়ায়। বামপন্থি রাজনীতিতে যুক্ত থাকার কারণে দেয়াল লিখনে বেশ দক্ষতা ছিলো তার। ঘনিষ্ঠরা তাকে বলতেন- ‘মাস্টার অব ওয়াল রাইটিং’।
বায়ান্নতে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে পুরনো ঢাকায় দেয়ালে দেয়ালে উর্দু ভাষায় ‘হামারী জবান, বাংলা জবান (আমার ভাষা বাংলা ভাষা)’ স্লোগান লিখেছিলেন তিনি। ২১ ফেব্রুয়ারির আগে পুলিশ যখন ১৪৪ ধারা জারি করে, তখন একটি বৈঠকে অনেক ভাষা সংগ্রামীর সঙ্গে তিনিও ছিলেন।
এক সাক্ষাতকারে একুশ সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, “বাংলা ভাষার জন্য এরকম রক্ত দেওয়ার ঘটনা বিশ্বে আর কখনও ঘটবে না। এজন্যই সারাবিশ্ব আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ২১ ফেব্রুয়ারিকে বিলম্বে হলেও স্বীকৃতি দিয়েছে। সেই রকম একটি দেশের মানুষের সঙ্গী আমি, এটাই আমার বড় ভাগ্য। আমি বাংলাদেশকে নিজের মায়ের দেশ মনে করি।
তিনি ইস্ট পাকিস্তান ফিল্ম জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। জনপ্রিয় উর্দু ছবি চকোরি, আনাড়ি, পায়েল ও ছোট সাহেবের মতো শতাধিক চলচ্চিত্র কাহিনীর রচয়িতা জয়নাল আবেদীনকে রুপালি জগতের অনেকে ‘গুরু’ বলে মানেন।
তার সাংবাদিকতার শুরু ১৯৫৭ সালে উর্দু দৈনিক জংয়ের মাধ্যামে। পরে তিনি মর্নিং নিউজ, বাংলাদেশ টাইমস, চলচ্চিত্র পত্রিকা চিত্রালী, ওয়াতন, সংবাদ সংস্থা এনায় কাজ করেন। সর্বশেষ ডন এর বাংলাদেশ প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন।
তিনি কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের উপন্যাস ‘খোয়াবনামা’ উর্দুতে অনুবাদ করেছেন।
৮১ বছর বয়সে বার্ধক্যজনিত নানা রোগে বেশ কিছুদিন ধরে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ছিলেন অকৃতদার জয়নাল আবেদীন।
তথ্যসূত্রঃ channel i ওয়েবসাইট।
উৎপল কান্তি ধর
https://www.facebook.com/1177479050/posts/10226923898381608/




