আন্তর্জাতিক সংবাদশিরোনাম

ডগ আমার দিকে তাকিয়ে বললো, আমি তোমার সঙ্গে সারা জীবন কাটাতে চাই

কাজল ঘোষ : ২০১৪ সালে মার্চের শেষ দিকে আমি দু’টি ভ্রমণ পরিকল্পনা করি। এর মধ্যে একটি হচ্ছে মেক্সিকো। আমি সেখানে পদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে সংঘবদ্ধ অপরাধী ও মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে লড়াই নিয়ে একটি বৈঠকের সমন্বয় করি। আরেকটি হচ্ছে ইতালি। সেখানে আমি এবং ডগ একটি রোমাঞ্চকর অন্তরঙ্গ সময়ে প্রবেশ করবো। এই ভ্রমণ পথটি একেবারেই অন্যরকম। আমার বাসা থেকেই এই ভ্রমণের বেশকিছু ছবি ও গাইডবুক দেখে নিয়েছিলাম। বিশেষ করে ফ্লোরেন্সে কি কি দেখা যাবে? মেক্সিকো শহরে আমি স্টেট অ্যাটর্নি জেনারেলদের একটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে নেতৃত্ব দেবো তা নিয়ে আমার অফিসেই কাজ করছিলাম।
মেক্সিকোভিত্তিক সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র বড় ধরনের হুমকি এবং ক্যালিফোর্নিয়া ছিল এর প্রথম লক্ষ্য। মার্চেই আমার অফিস থেকে একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয় যা আমি পেয়েছিলাম। ঐ রিপোর্টে বলা হয়েছে, আমেরিকায় সরবরাহকৃত ৭০ ভাগ মেথামফেটামিন আসে ক্যালিফোর্নিয়ার দক্ষিণে অবস্থিত সীমান্তবর্তী বন্দর সান ডিয়াগো দিয়ে। রিপোর্টে লক্ষণীয় যে, মেক্সিকোভিত্তিক মাদক পাচারকারীরা আমেরিকায় তা ছড়িয়ে দিতে ক্যালিফোর্নিয়ায় রাস্তায় থাকা অপরাধী এবং ক্যালিফোর্নিয়ার বন্দিদের সঙ্গে যোগসাজশে কাজ করছে আর তা নিয়ে তারা পোস্টারও করেছে।
শুধু ক্যালিফোর্নিয়ার আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর জন্য নয় বরং সারা দেশের জন্যই এটি নিয়ন্ত্রণ ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের। আমি এ নিয়ে মেক্সিকান কর্মকর্তাদের সঙ্গেও যৌথভাবে পরিকল্পনা করে কীভাবে কাজ করা যায় তা নিয়ন্ত্রণে আনতে সেজন্য কথা বলতে চেয়েছিলাম।
অন্য চারটি রাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল এবং আমি মিলে মেক্সিকোতে তিনদিন অবস্থান করি এবং এর মধ্য দিয়ে দৃঢ় পদক্ষেপের পরিকল্পনা সাজাই। আমরা অবৈধ অর্থ পাচার বন্ধে মেক্সিকোর ন্যাশনাল ব্যাংক এবং সিকিউরিটি কমিশনের সঙ্গে একটি চুক্তিতে উপনীত হই। অর্থ পাচার সংঘবদ্ধ অপরাধ সংগঠনগুলোকে উজ্জীবিত করে, লালন পালন করে। মেক্সিকোর সঙ্গে যোগাযোগ এবং সহযোগিতার মাধ্যমে আমরা আশা করছিলাম এই অর্থ পাচারের বিষয়টি তদন্ত করতে সক্ষম হবো এবং এই ধারাকে ভেঙে দিতে পারবো।
২০১৪ সালের ২৬শে মার্চ আমি আমার সান ফ্রান্সিকোর বাসায় ফিরি। এই ট্রিপটি ছিল আমার কাছে সাফল্যে ভরা ট্রিপের একটি। কিন্তু আমি যখন সন্ধ্যায় বাসায় ফিরি তখন অনেকটাই দেরি হয়ে গেছে এবং আমার কিছুটা সমস্যাও হয়েছে। আমার এবং ডগের ভ্রমণটি কাল সকালেই শুরু হতে যাচ্ছে। আর আমার হাতে গুছানোর মতো একদম সময়ও নেই।
আমি আমার অ্যাপার্টমেন্টে পৌঁছাবার কিছু সময় পরই ডগ একটি বার্তা পাঠায় যে, সে বিমানবন্দর থেকে আসছে। সে যখন আমার অ্যাপার্টমেন্টে পৌঁছায় আমি তখন উত্তেজিতভাবে কাপড় খুঁজছিলাম। আমি আমার কালো প্যান্ট খুঁজে পাচ্ছিলাম না এবং আমি এ নিয়ে তীব্র হতাশার মধ্যে পড়ে যাই।
অবশ্যই এটি ছিল আমার জন্য হাস্যকর। কিন্তু এটি ছিল সেই মুহূর্ত যখন একটি ভারসাম্যমূলক আচরণ প্রয়োজন ছিল। এমন ভারসাম্যপূর্ণ আচরণ যা কিছু নারী-পুরুষ খুব ভালোভাবেই অবগত। যেমনটি ছিলেন আমার মা। আমার ভেতরে পরিকল্পনা করি সবকিছু আমার মতো শতভাগ যেন করতে পারি। কিন্তু কখনো কখনো মনে হয় এটি শতভাগ কাজ করছে না। এটা আমার চলার জন্য যথেষ্ট নয়। এটা ছিল এমনই একটি মুহূর্ত। মেক্সিকো ট্রিপ নিয়ে আমার মধ্যে অন্তত একশ’টি বিষয় মাথায় ঘুরছে এবং একশ’টি বিষয় বাদ পড়েছে যা আমার কাজ করতে গেলে দরকার হবে। এরই মধ্যে আমি চেষ্টা করছিলাম আমার সুইটহার্টের সঙ্গে বাইরে যাবো তা ভেবে মানসিক শান্তি পাচ্ছিলাম। কিন্তু আমার মাথায় তখন এক রকম দ্বন্দ্ব চলছিল আমার কি কি গুছিয়ে নিতে হবে এবং কি কি করতে হবে তা নিয়ে। আমার আরো অনেক বেশি কিছু করার জন্য নিজেকেই তাড়া দিচ্ছিলাম। আমার মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিলো যে, আমি যথেষ্ট কিছু করছি না। এতে আমার কালো প্যান্টটি খুঁজে পাওয়ার ক্ষেত্রে আরো হতাশা দেখা দিলো। তা আমি শেষ পর্যন্ত আর খুঁজে পাইনি। আমার মধ্যে একটা জগাখিচুড়ি রয়েই গেল।
এর ফলে আমি রীতিমতো ঘামতে লাগলাম। যখন ডগ এলো তখন তাকেও একই রকম মনে হলো। সে আমার সঙ্গে অবাক হওয়ার অভিনয় করলো। সে কিছুটা কড়াকড়ি আবার কিছুটা শান্ত ভাব দেখালো। ‘তোমাকে যদি বাইরে খাওয়াতে না নেই তাহলে তুমি কি রাগ করবে?’ আমি তাকে বললাম। ‘এজন্য আমার তেমন কোনো পরিকল্পনা নেই আর তাছাড়া আমাকে গোছগাছ করতে হবে।’
‘অবশ্যই’, সে বললো। ‘আমাদের পছন্দের থাই প্লেস কতদূর।’
‘শুনে ভালো লাগলো’, আমি জবাব দিলাম। আমি রান্নাঘরের ড্রয়ার টানাটানি করতে লাগলাম এবং সেখান থেকে টেনে একটি কাগজের মেন্যু বের করলাম।
প্যাড থাই এখান থেকে কতদূর?
ডগ আমার দিকে তাকিয়ে বললো, ‘আমি তোমার সঙ্গে জীবন কাটাতে চাই।’
এই বলার ঢংটি খুবই মধুর। কিন্তু সে সমস্ত সময়ই এমন মধুর করেই বলে। সত্য কথা বলতেই হবে। সে আসলে কি বলেছিল সেদিকে আমি তেমন নজর দেইনি। এমনকি ওদিকে আমার মনই যায়নি। কারণ তখনো আমার মন পড়ে আছে কালো প্যান্টের দিকে।
খুবই চমৎকার, প্রিয়তম। তার বাহুতে হাত ঘষতে ঘষতে এবং কাগজের মেন্যুর দিকে তাকিয়ে তাকে একথা বললাম। আমরা কি চিকেন নাকি চিংড়ি থাই খেতে যাচ্ছি।
কমালা হ্যারিসের অটোবায়োগ্রাফি ‘দ্য ট্রুথ উই হোল্ড’ বই থেকে,মানবজমিন

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button