কিছু রাষ্ট্রদূত যানজট এড়াতে আমার পেছনে ছুটতেন

তারিক চয়ন
জর্জ ডব্লিউ. বুশ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণের বছরখানেক হয়েছে। এমন এক সময়ে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন তখন পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের উপ-রাষ্ট্রদূত প্যাট্রিসিয়া বিউটেনিস (২০০৬ সালের ১৩ই এপ্রিল)। মাত্র ১৪ মাস বাংলাদেশে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এর মধ্যেই ঘটে যায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক চিত্র পাল্টে দেয়া ঘটনা ওয়ান ইলেভেন (২০০৭ সালের ১১ই জানুয়ারি)। বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী দেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে সে সময় বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার বহু ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন বিউটেনিস। ২০১৪ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর তিনি নিজ কর্মজীবনে প্রত্যক্ষ করা নানা ঘটনা নিয়ে সাক্ষাৎকার দেন যুক্তরাষ্ট্রের এসোসিয়েশন ফর ডিপ্লোম্যাটিক স্টাডিজ অ্যান্ড ট্রেনিংয়ের ফরেন অ্যাফেয়ার্স ওরাল হিস্টরি প্রোগ্রামকে। চার্লস স্টুয়ার্ট কেনেডিকে দেয়া ওই সাক্ষাৎকারটি সমপ্রতি প্রকাশিত হয়েছে। মানবজমিনের পাঠকদের জন্য দীর্ঘ ওই সাক্ষাৎকারে উঠে আসা বাংলাদেশের অংশগুলো ধারাবাহিকভাবে ছাপানো হচ্ছে।
গতকাল ছাপা হয়েছিল প্রথম কিস্তি। আজ থাকছে দ্বিতীয় কিস্তিঃ
একটা ধারণা প্রচলিত ছিল যে, আওয়ামী লীগ ভারতের সঙ্গে আর বিএনপি পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ। আমার সময়টায় বিএনপি সরকারের কাছে ভারতীয় হাইকমিশনারের ইস্যুর অভাব ছিল না এবং আসন্ন নির্বাচনের আগে তিনি শেখ হাসিনার প্রতি অনেক বেশি আনুকূল্য দেখিয়েছিলেন, অন্তত আমার সঙ্গে কথোপকথনে। অন্যদিকে পাকিস্তানি হাইকমিশনার, আমি ইসলামাবাদ থাকার সময় থেকেই আমার বন্ধু ছিলেন। তিনি জিয়া সরকারের সান্নিধ্য বেশ উপভোগ করছিলেন। তখন পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই’র বিএনপি সরকারের উপর ভালো প্রভাব রয়েছে বলে মনে করা হতো। আর আওয়ামী লীগকে তুলনামূলকভাবে বেশি ধর্মনিরপেক্ষ মনে করা হতো এবং পশ্চিমের সঙ্গে তাদের ভালো যোগসাজশ ছিল যেখানে বিএনপি’র পাকিস্তান ঘনিষ্ঠতা প্রতিফলিত হতো। আইএসআই বিএনপিকে প্রচুর অর্থ দিচ্ছে বলেও ধারণা ছিল। একথা বলতেই হবে, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ও বাংলাদেশে সক্রিয় বলে মনে করা হতো।
পাকিস্তানের সঙ্গে আরেকটি যোগসূত্র ছিল জামায়াত নামের একটি ইসলামী দলের, যাদের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সদস্যকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে সমপ্রতি ঢাকায় ফাঁসি দেয়া হয়েছে। ১৯৭১ সালে জামায়াত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানের আক্রমণে সমর্থন করেছিল যার ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। এটা ছিল নির্মম, পাশবিক এক যুদ্ধ। অনেক বাংলাদেশি বলবেন এতো বছর পরে শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচার করা হয়েছে, যদিও আমরা মনে করি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের বিচার এবং প্রদত্ত সাজা ত্রুটিযুক্ত ছিল এবং সেগুলো আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী হয়নি।
আমার ঢাকার জীবনের অন্যতম ‘স্মরণীয়’ বিষয় যানজট। এদিক বিবেচনায় বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ শহরগুলোর মধ্যে ঢাকাকে রাখতে হবে। সেই সঙ্গে নিয়ন্ত্রণহীন সাইকেল, রিকশা, স্কুটার সহ হরেক রকমের যানবাহনের চলাচল। পাশাপাশি রাজপথে নিয়মিত বিক্ষোভ বা হরতাল (ধর্মঘট) ইতিমধ্যেই পঙ্গু হয়ে পড়া যান চলাচলকে অবশ করে ফেলতো। কোনো গন্তব্যে পৌঁছার জন্য সর্বদা এক ঘণ্টার মতো অতিরিক্ত সময় বরাদ্দ রাখতে হতো। আমার সঙ্গে একটি গাড়ি আর একজন চালক থাকতেন। যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্য এই দুই দেশের রাষ্ট্রদূতের গাড়ি পুলিশি প্রহরা পেতো। কোনো অনুষ্ঠানে যাবার সময় সাইরেন, লাইট ইত্যাদিসহ একটি পুলিশের গাড়ি আমাদের সামনে এবং আরেকটি পেছনে থাকতো। সম্ভবত এগুলো থাকতো বাড়তি নিরাপত্তার জন্য। কিন্তু বাস্তবে সেগুলো ছিল যানজটের সমস্যা কমাতে এবং সরকারও জেনে যেতো আমি কোথায় যাচ্ছি। আর এভাবেই আমি ‘কাউন্টার ফ্লো’ ধারণাটার সঙ্গে পরিচিত হই।
আমরা যানজটের মধ্যেই চলতাম, পুলিশরা যখন দেখতো যে গতি আরো কমছে তখন আমাদের বহরটি হয়তো সামনের কোনো গলিতে ঢুকে পড়তো। আমার প্রহরীরা চালাকিটা ব্যাখ্যা না করলে আমি হয়তো গাড়ি থেকে লাফিয়ে নেমেই পড়তাম। আমি কোনো অনুষ্ঠানে গেলে আমার কিছু কূটনৈতিক সহকর্মী রাস্তা সাফ করানো পুলিশি সুবিধা নিতে আমার সঙ্গেই অনুষ্ঠান থেকে বেরিয়ে পড়তো এবং আমার পিছু নিতো।
আমি যুক্তরাজ্য, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়ার হেড অফ মিশনদের নিয়ে একটি অনানুষ্ঠানিক গ্রুপ বানালাম। আমরা বিভিন্ন নীতি এবং উদ্বেগজনক বিষয় নিয়ে পরামর্শ করতাম। শেষ পর্যন্ত মানুষ এটাকে ‘টি গ্রুপ’ নাম দিয়েছিল। কারণ বাংলাদেশের রীতি হলো মানুষ একসঙ্গে বসলে চা এবং হালকা খাবার খাওয়ানো। আমরা সবাই মানবাধিকার, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন, সহিংসতাবিহীন রাজনৈতিক তৎপরতার প্রচার চালানো শুরু করি। সেগুলো অবশ্য বিপ্লবী বা অপ্রত্যাশিত ধরনের কিছু ছিল না। প্রত্যেক রাষ্ট্রদূত অবশ্যই নিজ দেশের দ্বিপক্ষীয় বিষয়গুলো অনুসরণ করতেন। কিন্তু আমরা সামগ্রিকভাবে মানবাধিকার প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ ছিলাম। পরে, যখন ইস্যুগুলো তীব্র হয়েছিল তখন এই গ্রুপটি খুব কাজে আসে। আমি এবং বৃটিশ হাইকমিশনার ছিলাম গণমাধ্যমের আকর্ষণের কেন্দ্রে। আমরা অর্থপূর্ণ কিনা তা অনুমান না করে কোনো অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারতাম না বা নিতামও না। সাধারণত বেশির ভাগই থাকতো অর্থহীন।
সুতরাং, রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়টায় কূটনীতিকরা যখন মানুষকে শান্ত করার এবং সহিংসতা এড়ানোর চেষ্টা করছিলেন, তখন আমাদের দুজনের চেয়ে কানাডিয়ান এবং অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনাররা অনেক বেশি নিবিড়ভাবে লোকজনের সঙ্গে দেখা করতে পারতেন এবং আমাদের সবার সাধারণ বার্তাগুলো পৌঁছে দিতেন। এই গ্রুপটি হয়ে উঠেছিল আমাদের বন্ধুত্বের ভিত্তি। আমি আস্থা রাখতে পারি এবং যেসব দেশগুলোর নীতিগত উদ্দেশ্য আমাদের দেশের সঙ্গে মিলে গিয়েছিল, সেরকম একদল বন্ধুবান্ধব পাওয়া আমার জন্য ছিল অমূল্য।
সুত্র : মানবজমিন



