sliderস্থানিয়

রংপুরে সাংবাদিক অপহরণ ও নির্যাতনের প্রতিবাদে সংহতি সমাবেশ

রতন রায়হান, রংপুর: রংপুরের সাংবাদিক, দৈনিক সংবাদ ও একুশে টেলিভিশনের রংপুর ব্যুরো প্রধান লিয়াকত আলী বাদলকে প্রকাশ্যে অপহরণ, নির্যাতন ও অপমানের ঘটনায় তিন সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও নেপথ্যের মূল পরিকল্পনাকারীরা এখনো অধরাই রয়ে গেছেন। এ ঘটনায় রংপুরের সাংবাদিক সমাজে বিরাজ করছে তীব্র ক্ষোভ, উত্তেজনা ও অস্থিরতা।

প্রধান আসামি গ্রেপ্তার হলেও ‘প্রভাবশালী ইন্ধনদাতারা’ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতের বাইরে থাকায় সাংবাদিক সমাজের প্রতিবাদ এখন রাজপথে গর্জে উঠেছে।গত ১৭ সেপ্টেম্বর দৈনিক সংবাদ এ প্রকাশিত হয় রংপুরে জুলাই যোদ্ধাদের নামে অটোরিকশার লাইসেন্স, ৫ কোটি টাকার বাণিজ্যের পাঁয়তারা। এই প্রতিবেদনে অভিযোগ তোলা হয়, ‘জুলাই যোদ্ধা’ পরিচয়ে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি সিটি করপোরেশনের ট্রেড লাইসেন্স বাণিজ্যে অনিয়ম ও দুর্নীতি চালাচ্ছেন। ‎সংবাদ প্রকাশের চার দিন পর,২১ সেপ্টেম্বর দুপুরে নিজেকে “জুলাই যোদ্ধা” পরিচয়দানকারী এনায়েত আলী রকি মিয়ার নেতৃত্বে একদল লোক সাংবাদিক লিয়াকত আলী বাদলকে কাচারিবাজার এলাকা থেকে অপহরণ করে রংপুর সিটি করপোরেশন (রসিক) ভবনে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন, অপমান ও হেনস্তা করা হয়।

অভিযোগ উঠেছে, উপস্থিত রসিক কর্মকর্তারা প্রকাশিত সংবাদের জন্য বাদলকে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) কাছে জোরপূর্বক ক্ষমা চাইতে বাধ্য করার চেষ্টা করেন। এই সময় উপস্থিত আরও কয়েকজন সাংবাদিককেও গালাগাল ও হেনস্তা করা হয়। খবর পেয়ে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ জন সাংবাদিক ঘটনাস্থলে ছুটে গেলে রসিকের কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারী ভবনের গেট বন্ধ করে সাংবাদিকদের আটকে রেখে মারধর ও অপমান করেন। তাদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে ও ভিডিও ধারণে বাধা দেওয়ার অভিযোগও উঠে এসেছে। ‎ঘটনার পর সাংবাদিক লিয়াকত আলী বাদল রসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাসহ ১৪ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও ২০ ২৫ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে রংপুর কোতোয়ালি থানায় মামলা দায়ের করেন। র‌্যাব–১০ এর সহযোগিতায় মামলার প্রধান আসামি এনায়েত আলী রকি মিয়াকে ১ অক্টোবর ঢাকার কামরাঙ্গীরচর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। ইতিমধ্যে আরও দুইজন অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে সাংবাদিক সমাজের অভিযোগ, ঘটনার নেপথ্যের হোতারা ও প্রভাবশালী ইন্ধনদাতারা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। প্রশাসন দায়সারা মনোভাব দেখাচ্ছে, যেন একটি নাটকীয় গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়েই ঘটনা ধামাচাপা দেওয়া হচ্ছে। এই ঘটনার পর থেকেই রংপুরের সম্মিলিত সাংবাদিক সমাজের ব্যানারে চলছে লাগাতার আন্দোলন ও কর্মসূচি।

প্রতিদিনই শহরের বিভিন্ন স্থানে সাংবাদিকদের প্রতিবাদ, মানববন্ধন ও গতকাল ১১ অক্টোবর সংহতি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
‎‎
শনিবার দুপুরে রংপুর প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত সংহতি সমাবেশে সাংবাদিক নেতারা দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে বলেন,এটি কোনো ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, এটি সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি হামলা। সাংবাদিকদের নির্যাতনের দায় যারা পরিকল্পনা করেছে, প্রশাসন যদি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়, তবে রংপুরের সাংবাদিক সমাজ আরও কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবে।জুলাই যোদ্ধা পরিচয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের জেরে একজন সাংবাদিককে অপহরণ করে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা এটি নজিরবিহীন ঘটনা। দুর্নীতিবিরোধী সংবাদ প্রকাশ করলে যদি সাংবাদিকরা অপহরণের শিকার হন, তাহলে গণতন্ত্রের ভিত্তি কোথায় দাঁড়াবে? রংপুর সম্মিলিত সাংবাদিক সমাজের প্রতিনিধি দল ইতোমধ্যে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, জেলা প্রশাসক ও র‌্যাব–১৩-এর অধিনায়কের সঙ্গে বৈঠক করেছে। তবে সাংবাদিক নেতাদের অভিযোগ, এখন পর্যন্ত প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ বা দৃশ্যমান পরিবর্তন ঘটেনি। ‎

এক প্রবীণ সাংবাদিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,একজন সাংবাদিককে দিনের আলোতে অপহরণ করে মারধর করা হয়েছে, অথচ প্রশাসন এখনো ‘তদন্ত চলছে’ বলে দায় এড়াচ্ছে। এটি সাংবাদিকদের জন্য নয়, পুরো সমাজের জন্য ভয়াবহ বার্তা। রংপুরের সাংবাদিক সমাজ তাদের আন্দোলনে তিন দফা দাবি ঘোষণা করেছে, ঘটনায় জড়িত সব আসামি ও মূল পরিকল্পনাকারীর দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচার। রসিকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা–কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা ও সাময়িক বরখাস্ত। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষায় স্থায়ী নীতিমালা প্রণয়ন।

সাংবাদিকদের অভিযোগ, প্রশাসন কেবল কিছু কর্মকর্তাকে বদলির আদেশ দিয়ে দায় এড়ানোর চেষ্টা করছে তাদের ভাষায়। বদলি কোনো শাস্তি নয়, বরং দোষীদের রক্ষার উপায়। দোষীদের বরখাস্ত করে নিরপেক্ষ তদন্ত না করলে এই ঘটনা পুনরাবৃত্তি ঘটবে। ন্যায়বিচার না পাওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত রংপুরের রাস্তায় প্রতিবাদের মশাল জ্বলতে থাকবে।রংপুরের সাংবাদিক সমাজ আজ এক কণ্ঠে বলছেন, লিয়াকত আলী বাদল শুধু একজন সাংবাদিক নন, তিনি গণমাধ্যমের সাহসী কণ্ঠ। তার ওপর হামলা মানে সত্যের কণ্ঠকে স্তব্ধ করার প্রচেষ্টা। সেই প্রচেষ্টা কোনোদিন সফল হবে না।প্রধান আসামি গ্রেপ্তার হলেও ইন্ধনদাতারা এখনো অদৃশ্য। রংপুরের আকাশে তাই এখনো প্রতিধ্বনিত হচ্ছে সাংবাদিকদের স্লোগান ন্যায়বিচার না পাওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button