‘‘আমরা ফুটবলের মতো বাঁচছি। একবার এ কূল থেকে লাথি মারলে ও কূলে যাই। ও কূল থেকে লাথি মারলে এ কূলে আসি’’, বলছেন আহমেদ হোসেন। পাশ থেকে জোহরা বেগম বলছেন, ‘‘আমাদের কোনো দেশ নাই। কোনো আত্মপরিচয়ই নাই।’’
বিদেশি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আহমেদ বা জোহরা যা বলছেন, তা আসলে মিয়ানমারের লাখ লাখ উদ্বাস্তু রোহিঙ্গা মুসলমানদেরই কথা। তারা বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরে বসে রয়েছেন। জানেন না ভবিষ্যৎ কী।
এদিকে ভারতে আশ্রয় নেয়া ৪০,০০০ রোহিঙ্গা রিফিউজিকে ভারত থেকে বের করে দেয়ার সরকারি নির্দেশ জারি করে দিয়েছে নরেন্দ্র মোদি সরকার।
আইন অনুযায়ী, তাদেরকে (রোহিঙ্গা শরনার্থীদের) ফিরিয়ে দিতে হবে। কারণ তার অবৈধ অভিবাসী। আমরা মহৎ গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের দেশ। ভারত সবচেয়ে বেশি উদ্বাস্তুদের আশ্রয় দিয়েছে। কাজেই ভারত কী ভাবে উদ্বাস্তুদের বিষয়টি দেখবে তা নিয়ে কাউকে শিক্ষা দিতে হবে না।
আইন অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী কোনো ভুল কাজ করছেন না। কারণ এই ৪০ হাজার রোহিঙ্গা মুসলমান রিফিউজি আসলে অবৈধ ভাবে ভারতে ঘাঁটি গেড়ে বসে রয়েছে। কেউ দিল্লিতে, কেউ জম্মুতে আবার কেউ বা হায়দরাবাদে।
কারণ ভারতে কোনো রিফিউজি আইনই নেই। নেহরু সরকার থেকে শুরু করে মোদি সরকার, কেউই জাতিসঙ্ঘের ১৯৫১ সালের রিফিউজি কনভেনশনের ঘোষণাপত্রে সই করেনি। আলাদা করে কোনো আইনও ভারতে তৈরি হয়নি।
ইউনাইটেড নেশনস হাই কমিশনার ফর রিফিউজি (ইউএনএইচসিআর)-এর অফিস দিল্লিতে থাকলেও, তারা আলাদা করে প্রায় ১৪ হাজার রোহিঙ্গা মুসলমান শরণার্থীদের নাম পরিচয় পরীক্ষা করে নথিভুক্ত করলেও, ভারতে তার আইনত কোনো স্বীকৃতি নেই।
বছরের পর বছর ধরে মিয়ানমার সরকারের অত্যাচারে ঘর ছাড়া হয়েছেন এই রোহিঙ্গা মুসলমানরা। সম্প্রতি ২৫ অগস্ট সে দেশের সেনা চৌকিতে হামলার ফলে পাল্টা হিসেবে মিয়ানমানের সেনাবাহিনী ও বৌদ্ধ কট্টরপন্থীদের অত্যাচার আরো বেড়েছে। চলছে প্রতি আক্রমণও।
ঘর বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে, নির্বিচারে গুলি চলছে। লাখ লাখ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু হয়ে পাহাড়-জঙ্গল পেরিয়ে বাংলাদেশে ঠাঁই নিচ্ছেন। কোনো মিডিয়া রোহিঙ্গাদের বাস যেখানে, সেই রাখাইন প্রদেশে ঢুকতে পারছে না। চুপচাপ সেই গণহত্যার মদত দেওয়াতে অভিযুক্ত হয়েছেন সে দেশের শান্তি-নোবেলজয়ী নেত্রী আন সান সু চি।
ঠিক সেই সময়ে সারা বিশ্ব জুড়ে যখন রোহিঙ্গা মুসলমানদের গণহ্ত্যা নিয়ে প্রতিবাদ চলছে, তখনই নরেন্দ্র মোদি সরকারের এই ঘোষণা। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কিরেণ রিজিজুর মাধ্যমে, আইন অনুযায়ী রোহিঙ্গা মুসলমানদের এ দেশ থেকে বের করে দেয়ার কথা ঘোষণা করে এক ঢিলে দু’পাখি মারতে চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
একদিকে তিনি বর্তমান মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন। সে দেশে চীনের প্রভাব যাতে বেশি না পড়ে, তার জন্য মিয়ানমার সফরে গিয়ে সে দেশে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সরকারের লড়াইকে সমর্থন জানিয়ে এসেছেন।
নরেন্দ্র মোদি এবং আন সান সু চি যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, আমরা আশা করি সবপক্ষ এক সঙ্গে কোনও পথ বের করবে যাতে মায়ানমারের সীমানার অখণ্ডতা ও ঐক্য বজায় থাকে।
অন্যদিকে তার নিজের দক্ষিণপন্থী হিন্দু জাতীয়তাবাদের সঙ্গে মিয়ানমারের বৌদ্ধ কট্টরপন্থার আদর্শগত লাইন একদম মিলে গেছে। ঘরে বাইরে তিনি কট্টরপন্থীদের কাছে হিরো হয়ে গেছেন।
এর ফলে মোদি সরকারের দ্বিচারিতাও সামনে এসে গেছে। এই সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং, ২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে বাংলাদেশীদের সম্বন্ধে বলেছিলেন, ওখানকার হিন্দু সংখ্যালঘুরা এদেশে স্বাগত। কিন্তু সংখ্যাগুরু মুসলমানরা অনুপ্রবেশকারী হিসেবেই চিহ্নিত হবেন।
বিজেপিও ২০১৪ সালের নির্বাচনী ইস্তেহারে লিখেছিল, অত্যাচারিত হিন্দুদের কাছে ভারত স্বাভাবিক ঘর হয়ে থাকবে। তারা এখানে স্বাগত।
দেশভাগের পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান বা দেশের পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে পাকিস্তান থেকে রিফিউজিরা ভারতে গেছে। তিব্বতিরাও এ দেশে এসে আশ্রয় পেয়েছেন। তামিলরাও। এমনকী আফগানিস্তান থেকেও শরণার্থীরা এসেছেন ভারতে। সবটাই হয়েছে মানবিকতার খাতিরে।
‘১৯৪৬ সালের বিদেশি আইন’-এর মাধ্যমেই শরণার্থীরা আশ্রয় পেয়েছেন বা অবৈধ ঘোষিত হয়েছেন ভারতে। দীর্ঘমেয়াদি ভিসার মাধ্যমে রয়ে গেছেন এই দেশে।
সেই যুক্তিতে মিয়ানমানের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের স্বাগত জানাতে আপত্তি কোথায়?
বিজেপি নেতা সুব্রহ্মণ্যম স্বামী দাবি করেছেন, রোহিঙ্গা মুসলমানদের এ দেশে ঠাঁই দিলে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইতিমধ্যেই ‘জেহাদিরা’ রোহিঙ্গাদের উস্কে দিতে শুরু করেছে।
কারণ মিয়ানমার সরকারেরও বক্তব্য রাখাইন প্রদেশে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির ব্যানারে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ চলছে। তারই ফলশ্রুতি সেনা চৌকিতে আক্রমণ। পরে সেনা অভিযান।
রিফিউজি কনভেনশনে সই করলে যেকোনো শরণার্থীকেই ঠাঁই দিতে বাধ্য থাকবে ভারত। বর্তমান অর্থনৈতিক ও ছিদ্রযুক্ত সীমানার কথা ভেবেই ভারত সরকার কখনো সেই ঘোষণাপত্রে সই করেনি। কিন্তু নিজেদের রিফিউজি আইন করতে তো বাধা ছিল না।
তাহলেই আর এখন অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের এ ভাবে খুঁজতে হতো না। নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে যার দরকার তাকে আশ্রয় দেয়া যেত, যার দরকার নেই, তাকে সে দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা যেত। পূর্ববর্তী সরকার ভোটব্যাংকের রাজনীতির খাতিরে সে পথে হাঁটেনি।
রোহিঙ্গা শরণার্থীরা ইতিমধ্যেই সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন। মোদি তাদের ভারত থেকে বের করে দিয়ে পাঠাবেন কোথায় সেটাই বড় প্রশ্ন। মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের নিজেদের নাগরিক বলেই স্বীকৃতি দেয় না। সেদেশে এরা যেতেও পারবেন না।
তবে কি মোদি সরকার, থাইল্যান্ডের শাসকদের মতো ছোট ছোট ডিঙিতে করে ভারত মহাসাগরে ভাসিয়ে দেবেন এই রোহিঙ্গাদের? নাকি বাগাড়ম্বরপূর্ণ বক্তৃতা করেই নিজের ‘ভোটব্যাংক’কে সতেজ রাখবেন। উগ্র জাতীয়তাবাদের আরো একটি নিশানা তৈরি করে দেবেন শুধু।
সুত্র: নয়া দিগন্ত




