
:: সাইফুদ্দিন আহমেদ নান্নু :: মার্কিন সমাজের চরম বর্ণবাদী নীতিকে প্রচণ্ডভাবে ঘৃণা করতেন শতাব্দীর সেরা এই মুষ্ঠিযোদ্ধা । কথিত আছে, অলিম্পিকে স্বর্ণজয়ী তরুন ক্লে দেশে ফিরেই ঢুকেছিলেন একটি রেস্টুরেন্টেভ তখনও তাঁর গলায় শোভা পাচ্ছিল অলিম্পিকে দেশের জন্য বয়ে আনা সম্মান, স্বর্ণপদকটি।
কিন্তু তাতে কি, সেই রেস্টুরেণ্ট শেতাঙ্গদের জন্য সংরক্ষিত ছিল বলে, তাঁকে সেখান থেকে বের করে দেয়া হয়। সেই অপমানে, ক্ষোভে ক্যাসিয়াস মার্সেলাস ক্লে তাঁর অলিম্পিকে জেতা স্বর্ণপদকটি নদীতে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলেন। এরপর তিন ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলমান হয়ে যান। নাম রাখেন মোহাম্মদ আলী।
১৯৬৭ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধে যোগ দেয়ার সরকারি নির্দেশ সরাসরি অমান্য করে সেই আদেশের বিরুদ্ধে তীব্রভাষায় প্রতিবাদ করেন তিনি। পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দেন,ভিয়েতনামীরা তো কোনদিন আমাকে ‘কালো’ বলে গালি দেয়নি,আর গণহত্যার অন্যায় যুদ্ধে আমি যাব না। ফলশ্রুতিতে মার্কিন সরকার তার বিশ্বচ্যাম্পিয়নের খেতাব ও বক্সিং লাইসেন্স কেড়ে নেয়। তাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ডও দিয়েছিল আদালত। ফলে প্রায় চার বছর তাঁকে রিংয়ের বাইরে থাকতে হয়। পরে যুক্তরাষ্ট্রে ভিয়েতনাম যুদ্ধ বিরোধী আন্দোলন জোরদার হলে মোহাম্দ আলীর উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞাও উঠে যায়।
রিংয়ে ফিরে বক্সিং ইতিহাসের তিনটি বিখ্যাত লড়াইয়ে অংশ হন। ১৯৭৪ সালের ৩০ অক্টোবর জায়ারের (এখন ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো ) কিনশাসায় ‘রাম্বল ইন দ্য জাঙ্গল’ নামে পরিচিত লড়াইয়ে জর্জ ফোরম্যানকে হারিয়ে বিশ্ব হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়নের খেতাব পুনরুদ্ধার করেন আলি। আলির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লড়াই হিসেবে বিবেচিত ম্যাচটি বিশ্বের প্রায় একশটি দেশে দেখানো হয়।
১৯৪২ সালের ১৭ জানুয়ারি কেনটাকির লুয়াভিলে ক্যাসিয়াস মার্সেলাস ক্লে নামে জন্ম নেওয়া আলি বিখ্যাত হয়ে উঠেন ১৯৬০ সালে রোম অলিম্পিকে লাইট-হেভিওয়েটে সোনা জিতে।‘দ্য গ্রেটেস্ট’ ডাকনাম পাওয়া আলি ১৯৬৪ সালে সানি লিস্টনকে হারিয়ে প্রথম বিশ্ব খেতাব জেতেন।
১৯৮১ সালে পেশাদার বক্সিং থেকে অবসর নেওয়ার আগে ৬১টি পেশাদার লড়াইয়ের মধ্যে ৫৬টিতে জেতেন আলি। এর মধ্যে ৩৭টি লড়াইয়ে প্রতিপক্ষকে নকআউট করেছেন তিনি। নিজে একবারও নকডআউট হননি।
১৯৬৪ থেকে ১৯৬৭, ১৯৭৪ থেকে ১৯৭৮ ও ১৯৭৮ থেকে ১৯৮০ সালের শুরু পর্যন্ত তিনি বিশ্ব হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন ছিলেন।
১৯৭৮সালে স্ত্রী ভেরেনিকা আলীকে সাথে নিয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন কিংবদন্তী এই বক্সার। ঢাকার রাজপথপূর্ণ লাখো মানুষের ভালবাসায় সিক্ত হয়েছিলেন তিনি। সংক্ষিপ্ত সে সফরে ঢাকা স্টেডিয়ামে ৮বছরের এক শিশুর সাথে প্রীতি বক্সিং ম্যাচে রিংয়ে নেমে,মার খেয়ে নাকাল হবার প্রাণবন্ত অভিনয়,কৌতুক করে মুগ্ধ করেছিলেন স্টেডিয়ামপূর্ণ হাজারো মানুষকে। সে সময়ে তাঁকে বাংলাদেশের সম্মানসূচক নাগরিকত্ব,পাসপোর্ট,ঢাকা মহানগরীর প্রতিকী সোনার চাবি এবং চট্টগ্রামে একখণ্ড জমি আর সুন্দরবনের একটি হরিণশাবক উপহার হিসেবে দেয়া হয়েছিল।
১৯৭০এর গোর্কিতে বিপন্ন বাংলাদেশের উপকুলবাসীর জন্য আর্থিক সহায়তার হাত বাড়িয়েছিলেন বিশ্বসেরা ক্রিড়া ব্যক্তিত্ব মোহাম্মদ আলী।
মহান আল্লাহ,প্রতিবাদী চেতনার এই মানুষটিকে পারলৌকিক শান্তি দান করুন।




