
মোহাম্মদ আলী, মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি: “হাজারী গুড়- একটি নাম, একটি পরিচিতি, একটি ইতিহাস, একটি ঐতিহ্য” কথাটি বলেছেন মোঃ হাজারী । তিনি বলেন,আজ থেকে প্রায় ৩০০(তিনশত) বছর পূর্বে বর্তমান মানিকগঞ্জ জেলার হরিরামপুর উপজেলার বাল্লা ইউনিয়নের ঝিটকা শিকদার পাড়া গ্রামে জন্মে ছিলেন মোঃ হাজারী নামে এক ঐতিহাসিক ব্যক্তি।
যার পিতার নাম ছিল জাকির মাহামুদ। জাকির মাহামুদ ছিলেন একজন সম্ভ্রান্ত মুসলমান কৃষক। তিনি কৃষি কাজের পাশাপাশি শীত কালে খেজুর গাছের রস আহোরন করে সুস্বাদু খেজুরের গুড় উৎপাদন করতেন। তার একমাত্র পুত্র সন্তান মোঃ হাজারীর জন্ম লাভের পর থেকেই জাকির মাহামুদের সংসারের আয় উন্নতি দিন দিন বৃব্ধি পেতে থাকে। সূত্রে জানা গেছে, মোঃ হাজারী স্থানীয় পাঠশালায় প্রাথমিক শিক্ষা জীবন শেষ করে তার পিতার সাথেই কৃষি কাজে মনোনিবেশ করেন। বাল্যকাল থেকেই তিনি ছিলেন বুদ্ধিমান, ন্যায়পরায়ন,ধর্মপ্রাণ,পরহেজগার এবং নানা বিধ সৃষ্টিশীল কাজে অ্ত্যান্ত পারদর্শী। বাবার কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে খেজুরের গুড় বানানোর কাজটি তিনি ভালো ভাবেই রপ্ত করেন।
”কথিত আছে তরুণ বয়সে কোন একদিন মোঃ হাজারী তার বাড়ী থেকে একটু দূরে খেজুরের বাগানের ভিটায় সন্ধ্যার প্রাকালে খেজুর গাছ কেটে রস আহোরনের জন্য গাছে হাঁড়ি বেঁধে সবে নীচে নেমেছেন এমন সময় খেজুর বাগানের পাশ দিয়ে মেঠো পথ ধরে এক দরবেশ এসে তার পানির পিপাসা নিবারনের জন্য মোঃ হাজারীর নিকট দাবী জানালেন। আশে পাশে পানীয় জলের কোন সংস্থান নেই মর্মে মোঃ হাজারী যখন দরবেশ সাহেবকে জানালেন দরবেশ সাহেব তখন বললেন তুমি তাহলে আমাকে খেজুরের রস খাওয়াও তাতেই আমার তেষ্টা মিটবে। মোঃ হাজারী বিনয়ের সাথে বললেন আমি এই মাত্র গাছে হাড়ি দিলাম রস হবে কোথা থেকে ? দরবেশের আবদার রক্ষায় তিনি গাছে উঠে হতবাক হয়ে দেখলেন বেশ ভাল পরিমান রস হাড়িতে জমে আছে। রস পেড়ে তিনি দরবেশ সাহেবকে পান করালেন তৃপ্ত হয়ে দরবেশ হুজুর মোঃ হাজারীকে প্রান ভরে দোয়া করলেন এবং ভাল গুড় বানানোর কিছু উন্নত পদ্ধতির পরামর্শ দিলেন।
তিনি আরও নির্দেশ দিলেন তোমার ”হাজারী“ নাম টুকু তুমি সিল আকারে গুড়ে ব্যবহার করবে।” মোঃ হাজারী এর পর থেকে উক্ত দরবেশ সাহেবের পরামর্শ আনুসরন করে আরও মনোযোগ সহকারে গুড় উৎপাদনে আত্মনিয়োগ করলেন এতে করে হাজারী গুড়ের সুখ্যাতি দ্রুত চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লো। এর সুখ্যাতি এতই বিস্তার লাভ করল যে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রের উপঢৌকন হিসাবে এর ব্যবহার প্রচলিত হয়ে গেল। উপমহাদেশে ইংরেজ শাসনামলে ব্রিটেনের রাণী এলিজাবেদের নিকটও এই ”হাজারী গুড়” উপঢৌকন হিসাবে বিশেষ প্রশংসা কুড়িয়েছিল। এই উপহার উপঢৌকনের ধারাবাহিকতা আজও বিদ্যমান। মোঃ হাজারী কর্তৃক উদ্ভাবিত এই খেজুরের গুড়ের বিশেষত্ব হলো এর আকর্ষণীয় রং, সুঘ্রান এবং অতুলনীয় স্বাদ। সাধারন খেজুরের গুড়ের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন রং, ঘ্রান ও স্বাদের এই হাজারী গুড় শুধু মাত্র হাজারী পরিবারকেই বিখ্যাত করেনি বৃহত্তর ঝিটকা তথা মানিকগঞ্জ জেলাকে করেছে সমধিক প্রসিদ্ধ ও সমৃদ্ধ।
প্রায় ৩০০(তিনশত) বছর পূর্বে একজন সৃজনশীল মানুষের সৃষ্টি আজ আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্যের এক অনন্য উপাদান। ইতিহাসের এক উজ্জল নক্ষত্র হিসাবে মানিকগঞ্জ জেলার ঝিটকার মোঃ হাজারী বেচে থাকবেন তার অনন্য সৃষ্টির মাধ্যমে অনন্ত কাল ধরে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে সাথে সাথে ঘটতে পারে ইতিহাসের বিকৃতিও। সেই দায় থেকেই হাজারী পরিবারের সপ্তম প্রজন্মের একজন ক্ষুদ্র মানুষ হিসাবে সকলের সত্য উপলব্ধির জন্য ঝিটকা তথা মানিকগঞ্জ জেলার সত্য ইতিহাস ঐতিহ্যের এক মহানায়ক মোঃ হাজারীর অমোঘ সৃষ্টি ”হাজারী গুর” এর সংক্ষিপ্ত উপাখ্যান উপস্থাপনের প্রয়াস মাত্র।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক ড. মানোয়ার হোসেন মোল্লা বলেন, ইতিমধ্যে হাজারী গুড়ের সুনাম দেশের গুন্ডি পেরিয়ে দেশের বাহিরেও পৌছে গেছে, আমরা ভেজাল গুড় নির্মূলে সর্বদা তৎপর আছি, ঝিটকার হাজারী গুড় মানিকগঞ্জ জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যর বড় নির্দশন।




