সিংড়া অবৈধ দখলদারদের কারণে সাড়ে তিন হাজার হেক্টর জমিতে স্থায়ী জলাবদ্ধতা- চাষাবাদ ব্যাহত

নাটোর প্রতিনিধি : ভূমি প্রশাসনের অবহেলায় এবং ভূমিদস্যুদের অবাধ দখলের কারণে প্রতিনিয়তই নাটোরের সিংড়া উপজেলার
গুরুত্বপূর্ণ নদী ও খালগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় স্থায়ী জলবদ্ধতায় জনদুর্ভোগ ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হচ্ছে।সরকারের স্ব স্ব দপ্তর তাদের নিয়মিত কাজকর্মের মধ্যেও নিজস্ব স¤পদ রক্ষার জন্য বিস্তারিত কার্যক্রম গ্রহণ করে থাকে কিন্তু ভূমি প্রশাসন শুধুমাত্র জমি-জমির খাজনা আদায় এবং খারিজ কার্যক্রম ছাড়া সরকারের বা দেশের প্রাণ হিসেবে খ্যাত খাল ও মরা নদীর উদ্ধার বা চিহ্নিতকরণ বা অবৈধ দখলমুক্ত করার জন্যে তেমন কোনো কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলে তেমনটি দৃষ্টিতে পড়ে না। যার কারণে বছরের পর বছর সরকারি খাল ও মরা নদী যে যার ইচ্ছামতো দখল করে নিজেদের মতো করে নিয়েছে।
ভূমি প্রশাসনের কর্মকর্তাগণ বিষয়গুলো দেখেও না দেখার ভাণ করে থাকায় জনমনে অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি।
নাটোরের সিংড়ায় মরাগাঙ্গীনা (নদী) পুঃখনন প্রকল্প অবৈধ দখলদারদের কারণে বন্ধ রয়েছে। এই নদী র জায়গা প্রভাবশালীরা দখল করে পুকুর খনন করে মাছ ও ধান চাষ করা সহ কেউ কেউ পাকা স্থাপনা তৈরি করেছেন। ফলে ৪০টি গ্রাম ও ১৫টি বিলে জলাবদ্ধতর কারণে অনেকে জমিতে চাষাবাদ করতে পারছেন না। এই বিষয়টি নিয়ে রোববার (১৩ নভেম্বর) জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে নাটোর জেলার আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় জোরালোভাবে উপস্থাপন করা হয়।
জানা যায়, বরেন্দ্র বহুমখী উন্নয়ন প্রকল্প জলাবদ্ধতা দুরীকরণ এবং নদীতে ভূ-উপরিস্থ পানি সর্বত্তোম ব্যবহার ও বৃষ্টির ধরে রাখার স্বার্থে প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে (ইআইএনডি) নামে মরাগাঙ্গীনা খনন প্রকল্প হাতে নেয়। কিন্তু প্রভাবশালীদের বাধার কারণে ঠিকাদার কাজই শুরু করতে পারেননি। কেউ কেউ ওই জায়গা নিজ নামে অবৈধ ভাবে দলিল তৈরি করে পাকাপোক্ত ভাবে জায়গা দখল করে নেয় এবং তারা মামলাও দায়ের করে। পরে আদালতের নির্দেশে ওই মামলা বাতিল হলেও ঠিকাদারের লোকজনকে ধরে মারধর ও বাঁধার মুখে কাজ করতে পারছেন না। ফলে ৪০টি গ্রামের এবং ১৫টি বিলের কমপক্ষে তিন হাজার হেক্টর জমির চাষাবাদ বিঘিœত হচ্ছে। এলাকাবাসী এর প্রতিকার চেয়ে বার বার জেলা প্রশাসক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বরাবর আবেদন করলেও মিলছেনা প্রতিকার। ফলে. বন্ধ হয়ে রয়েছে নদীর (মরা গাঙ্গীনা) খনন কাজ। আর এসব বিলের পানি নিস্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় বোরো আবাদে দেখা দিয়েছে অনিশ্চিয়তা ।স্থায়ী জলবদ্ধতার কারণে চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে ।
সরজমিনে ঘুরে দেখা যায়, সিংড়া উপজেলার লালোর, সেরকোল, হাতিয়ানদহ ও কলম ৪টি ইউনিয়ন এবং সিংড়া পৌরসভার নিঙ্গইন এলাকায় রয়েছে অসংখ্য বিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য রাখশা, ভাষাউড়া, হিয়ালা, মাইস্যাগাড়ী, লক্ষীতলা, পোচাকান্দুরা, খামাইর্যাকল, দয়ার বিল, কোমা-কামারের চোরা ও লেলিয়ার বিল সহ কমপক্ষে ১৫টি বিল । এসব পাড়ের সেরকোল, শ্রীরামপুর, কংশপুর, হারোবাড়িয়া, সোনাপুর,পমগ্রাম, পুঠিমারী, পাচবাড়িয়া, কুশাবাড়ি, খাগোরবারিয়া, নতুনপাড়া, বড়শাঐল, পাটশাঐল, হাজিপুর, শৈলমারি, ধুলাউরি, বন্দর আখপাড়া, মাঝপাড়া, পাঁচবাড়িয়া, বড়-বেলঘরিয়া, মাধারিগ্রাম মাঝগ্রামসহ ৪০টি গ্রামের হাজার হাজার কৃষকের কষ্টে অর্জিত ফসল পানিতে ভাষছে। অনেক ক্ষেতের উঠতি ফসল পানিতে নিমজ্জিত হয়ে রয়েছে। এর কারন বিলের কৃষি জমির পানি নিস্কাসেনর এক মাত্র জায়গা বন্ধ হয়ে গেছে। অপর আরেটি বড় সাঐল জোলা থাকলে অবৈধ সৌতি জাল বসিয়ে মৎস্য নিধন করাসহ বিলের নীচু জমিতে শত পুকুর খনন করায় পানি প্রবাহে বাঁধা গ্রস্থ্য হচ্ছে। এর ফলে বারছে কৃষকের দুরভোগ ও উৎপাদন খরচ। একটু ভারী বৃষ্টি হলেই সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা তলিয়ে যায় জমির কাঁচা-পাকা ধান। আবার বর্ষা মৌসমের পানি যথা সময় নিষ্কাশন না হওয়ায় কৃষকের রবি শস্য আবাদ করতে গিয়ে মারাত্বক ক্ষতি হচ্ছে।
সিংড়া পুঠিমারী গ্রামের ক্ষতিগ্রস্থ কৃষক মোক্তার আলী বলেন, বিঘাপ্রতি ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা ব্যয় করে অনেক স্বপ্ন নিয়ে প্রতি মৌসমে পাঁচ থেকে সাত বিঘা জমিতে বোরো এবং রোপা ধান রোপন করে থাকি। এবারও তাই করছি, আমার আড়াই বিঘা ইরির জমিতে ২৯ জাতের ধান করে দের বিঘা জমি থেকে দের মাস আগে ৯মন ধান পেয়েছেন। বাকি একবিঘা জমি থেকে জলাবদ্ধতার কারনে কোন ধান কাটতে পারে নাই। এমন অবস্থা এলাকার অন্য কৃষক মনজেল মোল্লা, কুদরত আলী, আসাদুল্লা, সানোয়ার, রাশেদুল, সেলিমসহ বন্দর আকপাড়ার ও পাঁচপাড়া রাজ্জাক, ছোট্র, অনুকুল মাহতাব বহু কৃষকের।
বিএমডিএ নাটোরের সহকারী প্রোকৌশলী আহসানুল করিম জানান, বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ায় এসংক্রান্ত রিপোর্ট প্রকাশ ও প্রচারিত হওয়ার পর কৃষকের কষ্ট ও এলাকাবাসির আবেদনের প্রেক্ষিতে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও তথ্য ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক সিংড়া উপজেলা প্রশাসনকে খাল খননের বিষয় নির্দেশ দেয়। স্থানীয় সহকারী কমিশনার (ভূমি) এর সাথে আলোচনা করার পর, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরিদর্শন ও উপজেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সিন্ধান্ত মোতাবেক গত মৌসমে বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ প্রায় ৪ কটি কোটি টাকা ব্যয়ে ১০টি ফোল্ডারে খালটি (মরা গাঙ্গীনা) টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পর্ণ করে এ কাজের কার্যাদেশ দেয়া হয় কিন্তু মামলা এবং প্রভাবশালীদের বাঁধার কারনে তা করতে পারেন নাই। বর্তমানে অনেকটাই আমরা অভিবাবকহীন। ২০২৩ সালের মধ্যে এ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে।
স্থানীয় ভূমি অফিসের আব্দুল কুদ্দুস সরকার জানা, অবৈধদখলকারী হিসাবে সেরকোল কংশপুরের বাবুল মৃধা, সোহরাব মৃধা, আলিম মৃধা, শ্রীরামপুরের শুকুর আলী, সেরকোলের আলাউদ্দিন সরকার,হারোবাড়িয়ার শহিদুল ইসলামসহ বেশ কিছু লোক এ মরাগাঙ্গীনা জবর দখল করে খোগ করছে। আবার কেউ কেউ বন্দোবস্ত পেয়ে তা বিক্রয়ও করছেন।
নাটোরের আইনজীবী অ্যাডভোকেট খগেন্দ্র নাথ রায় বলেন, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, যেকোনো ধরনের জলাধার বা পুকুর ভরাট স¤পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং ভরাটকারীর বিরুদ্ধে আইনের ৭ ধারায় প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ও জীববৈচিত্র্য নষ্ট করে পরিবেশগত ক্ষতি ও বিধ্বংসী কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান রয়েছে।
এব্যাপারে নাটোরের জেলা প্রশাসক বলেন, বরেন্দ্র বহুমখী উন্নয়ন কতৃপক্ষ এবং কৃষি বিভাগের মাধ্যমে বিষয়টি অবগত রয়েছেন। সরকারের উপন্নয়ন কাজে বাঁধা দেয়ার বিষয়টি তাকে কেই জানাননি। তাছারা আমাদের মাননীয় প্রধান মন্ত্রীও বলেছেন, একইঞ্চি জায়গাও অনাবাদী রাখা যাবে না সেই লক্ষে আমরা কাজ করছি। কৃষিকে উন্নয়নের জন্য যা যা করার প্রয়োজন তা করা হবে।




