সিংগাইরে তিন ফসলি জমিতে ৭৫ ইটভাটা : চাষাবাদ ব্যাহত
সিংগাইর থেকে সংবাদদাতা, মানিকগঞ্জ : একসময়ের সফল কৃষক বর্তমান ইটভাটা শ্রমিক চান্দহর ইউনিয়নের রিফায়েতপুর গ্রামের শকদ আলী এখন আর ফসল ফলানোর স্বপ্ন দেখেন না। তার জমিতে বিঘাপ্রতি ৮ থেকে ১০ মণ সরিষা হতো। সরিষা শেষ হতেই ইরি-বোরো ধানের ফলন হতো ২০ থেকে ২৫ মণ। তার পর আমন ধানের ফলন হতো ১০ থেকে ১২ মণ। এখন তার সেই জমিতে গড়ে উঠেছে পরিবেশ বিধ্বংসী ইটভাটা। ফসল ফলানো শকদ আলীর কাছে এখন দুঃস্বপ্ন। তার মতোই অবস্থা গ্রামের সিরাজুল ইসলাম, হুমায়ন কবির ও নজরুল ইসলামের।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সবুজ-ছায়া সুনিবিড় এ উপজেলার ফসলি জমিতে ৭৫টি ইটভাটা গড়ে উঠেছে। এসব ইটভাটা আবাসিক এলাকা ঘেঁষে তিন ফসলি জমিতে নির্মাণ করা হয়েছে। আরো প্রায় ডজেনখানেক ইটভাটা নির্মাণের প্রক্রিয়া চলছে। উপজেলা প্রশাসনের দেয়া তথ্য মতে, ৩২টি ইটভাটা জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে লাইসেন্স নিয়েছে। বাকি ৪৩টি সম্পূর্ণ অবৈধভাবে চলছে। বৈধভাবে লাইসেন্স দেয়ার ক্ষেত্রেও রয়েছে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ।
জানা গেছে, চান্দহর ইউনিয়নের রিফায়েতপুর-মাধবপুর ও সোনাটেংরা গ্রামের ফসলি জমিতে গড়ে উঠেছে ১৭টি ইটভাটা। পুরো চক এখন ইটভাটার নগরীতে পরিণত হয়েছে। ভুক্তভোগী চাষিরা অবৈধভাবে গড়ে ওঠা এসব ইটভাটার জন্য প্রভাবশালী ভাটা মালিক ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান শওকত হোসেন বাদলকে দায়ী করেন। দু’টি ইটভাটার মালিক মোল্লাহ ব্রিকসের স্বত্বাধিকারী মোশারফ মোল্লাহ এখানে ১৭টি ইটভাটা থাকার কথা স্বীকার করে বলেন, আমরা শুরু করে মানুষকে এ ব্যবসায়ের পথ দেখিয়েছি। তাতে অসুবিধার কী আছে?
চান্দহর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শওকত হোসেন বাদল বলেন, আমিও চাই না এভাবে ইটভাটা গড়ে উঠুক। ইটভাটার কারণে ফসলি জমি নষ্ট হওয়াসহ পরিবেশ বিপর্যয় ঘটছে। কিছু মানুষের অনুরোধে জনপ্রতিনিধি হিসেবে ট্রেড লাইসেন্স ও অনাপত্তিপত্র দিয়ে থাকি। তবে সে ক্ষেত্রে সরকারি নিয়মনীতির কথা উল্লেখ থাকে।
সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে, উপজেলার বলধারা ইউনিয়নে। এ ইউনিয়নের বিভিন্ন ফসলি জমিতে গড়ে উঠেছে ব্যাঙের ছাতার মতো ৩১টি ইটভাটা। বলধারার পাশের বায়রা ইউনিয়নেও রয়েছে ১১টি ইটভাটা। এ ছাড়া জামসা ইউনিয়নে চারটি, চারিগ্রামে দু’টি, জয়মন্টপে একটি, ধল্লা ইউনিয়নে নদী তীরবর্তী চর্চা দাগে দু’টি, জামির্ত্তা ইউনিয়নে ছয়টি ও সদর ইউনিয়নে দু’টি। এ ছাড়া প্রায় ডজেনখানেক ইটভাটা নির্মাণ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এসব ইটভাটা বন্ধে প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগে লিখিত অভিযোগ দিয়েও প্রতিকার পাচ্ছেন না স্থানীয় ভুক্তভোগী বাসিন্দারা। এরই মধ্যে জামির্ত্তা এলাকায় ইটভাটা প্রতিরোধ কমিটি হয়েছে। কমিটির ব্যানারে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছেন এলাকাবাসী। তার পরও থেমে নেই ফসলি জমির মাটি বিক্রি।
এ দিকে হাইকোর্টের রুলসহ নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও বলধারা খোলাপাড়া এলাকায় নাম পরিবর্তন করে চলছে দু’টি ইটভাটার কার্যক্রম। খবর পেয়ে উপজেলা প্রশাসন গত ২০ ডিসেম্বর ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে এমএবি ইটভাটা মালিক আমিনুর মেম্বারকে জরিমানা করেন। কিন্তু অবৈধ এ ভাটা বন্ধে নেয়া হয়নি কোনো আইনগত ব্যবস্থা।
বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, শুরুতে ইটভাটা মালিকেরা সহজ-সরল কৃষকদের টাকার লোভ দেখিয়ে বছরে ফসল উৎপাদনের দ্বিগুণ লাভ দিয়ে চাষাবাদযোগ্য তিন ফসলি জমি দু-তিন বছরের জন্য ভাড়া নেয়। তার পর তারা বিশাল অঙ্কের টাকা দিয়ে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের কাছ থেকে ট্রেড লাইসেন্স ও অনাপত্তিপত্র নিয়ে ওই জমিতে ভাটার কার্যক্রম শুরু করেন। আশপাশের জমির মালিকদের লোভ-লালসা এমনকি হুমকি-ধমকি দিয়ে জমির মাটি বিক্রি করতে বাধ্য করেন। পরে তদবির ও বিশাল অঙ্কের টাকা দিয়ে পরিবেশ অধিদফতরের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বাগিয়ে নেন। সর্বশেষ জেলা প্রশাসনের লাইসেন্সও তারা পেয়ে যান।
সিংগাইর উপজেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার শাহাদৎ হোসেনের সাথে একাধিকবার তার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তবে সাধারণ সম্পাদক আবদুল কুদ্দুছ বলেন, উপজেলার বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা অবৈধ ইটভাটাগুলো ভেঙে ফেলার দাবি জানাই। তবে প্রক্রিয়াধীন ভাটাগুলোকে নিয়মানুযায়ী সুযোগ দেয়া হোক।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ টিপু সুলতান স্বপন বলেন, ইটভাটায় ফসলি জমির টপসয়েল কেটে নিয়ে যাওয়া যাচ্ছে। এতে জমি উর্বরতা হারাচ্ছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সেকেন্দার আলী মোল্লাহ বলেন, যত্রতত্র অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা ইটভাটা জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। আমি এ-সংক্রান্ত দু’টি চিঠি পেয়েছি। আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার দিয়ে তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছি।
এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক নাজমুছ সাদাত সেলিম জানান, অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। সেই সাথে তিনি সিংগাইর উপজেলায় গড়ে ওঠা এসব ইটভাটার পূর্ণাঙ্গ তালিকা দিয়ে সহযোগিতা করার অনুরোধ জানান। অবৈধভাবে নির্মাণাধীন ভাটাগুলো ভেঙে ফেলার আশ্বাস দেন তিনি।




