শিবগঞ্জ (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) সংবাদদাতা: চাঁপাইনবাবগঞ্জে ।২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে লিগ্যাল এইড অফিসে ২ হাজার ৯২০টি আবেদনের মধ্যে ২ হাজার ৬৫৩টি বিরোধ নিষ্পত্তি হয়েছে। একই সময়ে ক্ষতিপূরণ ও পাওনা বাবদ প্রায় পৌনে ৩ কোটি টাকা আদায় করে বিচারপ্রার্থীদের দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ৪৩৪টি মামলায় আইনগত সহায়তা এবং ১ হাজার ৮৮৯ জনকে বিনা খরচে আইনগত পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পরিসংখ্যানের পাশাপাশি লিগ্যাল এইড অফিসে সেবা পেতে ব্যক্তিরা জানান আদালতের দীর্ঘ প্রক্রিয়া ও ব্যয়ের বিকল্পভাবে বিরোধ মীমাংসার এই ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্তা বাড়ছে। বিশেষ করে আর্থিকভাবে অসচ্ছল মানুষের কাছে বিনা খরচে আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগটি হয়ে উঠছে গুরুত্বপূর্ণ।
এই পরিসংখ্যানের পেছনে আছে নাসরিন খাতুনের মতো অসংখ্য মানুষের গল্প। চাঁপাইনবাবগঞ্জ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবনের তৃতীয় তলায় লিগ্যাল এইড অফিসের সামনে কোলে ছোট শিশু নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন তিনি।
দুই বছর ধরে স্বামী ভরণপোষণ দেন না, খোঁজখবরও নেন না অভিযোগ নাসরিনের। আইনজীবী নিয়োগ করে মামলা চালানোর মতো আর্থিক সামর্থ্যও নেই তাঁর। তাই সন্তানের ভবিষ্যৎ ও নিজের অধিকার নিয়ে লড়াই করতে এসেছেন সরকারি এই সহায়তার জায়গায়।
নাসরিন বলেন, “আমি গরিবের মেয়ে। টাকা-পয়সা খরচ করার সামর্থ্য নেই। এজন্য লিগ্যাল এইড অফিসে অভিযোগ জানিয়েছি। গত মাসে তারিখ ছিল, কিন্তু আমার স্বামী উপস্থিত হয়নি। আজ আবার এসেছি, দেখা যাক কী হয়।” একটি ছোট শিশুকে কোলে নিয়ে তাঁর এই অপেক্ষার মধ্যে যেমন আছে অসহায়ত্ব, তেমনি আছে শেষ পর্যন্ত ন্যায় পাওয়ার আশাও।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবনের তৃতীয় তলায় জেলা লিগ্যাল এইড অফিস। এখানে পারিবারিক কলহ, ভরণপোষণ, সামাজিক বিরোধ ও পাওনা টাকা আদায়সহ বিভিন্ন বিষয়ে মানুষ সহায়তা নিতে আসেন। বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে সংস্লিষ্ট পক্ষগুলোকে আলোচনায় বসানো হয়। উভয় পক্ষ সমঝোতায় পৌঁছালে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ায় না গিয়েই বিরোধের নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়। এতে সময় ও অর্থ দুটিই সাশ্রয় হয়।
শিবগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, আদালতে মামলা করতে গেলে টাকা-পয়সা খরচের পাশাপাশি সময়ও নষ্ট হয়। লিগ্যাল এইডে বিনা খরচে বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ থাকায় মানুষের আগ্রহ বাড়ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার মহারাজপুর এলাকার আমিনুল হকের অভিজ্ঞতাও ইতিবাচক। তাঁর মতে, প্রচলিত গ্রাম্য সালিশের তুলনায় লিগ্যাল এইডে বিরোধ মীমাংসার পরিবেশ বেশি নিয়মতান্ত্রিক।
তিনি বলেন, “গ্রামে অনেক লোকজন নিয়ে সালিশে বসলে অনেক সময় হইচই হয়, কিন্তু সমাধান হয় না। লিগ্যাল এইডে উভয় পক্ষের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে মীমাংসা হওয়ায় দুই পক্ষই উপকৃত হন।”
নাচোল উপজেলার মরিয়ম বেগমের নিজের জীবনেও বিরোধের অভিজ্ঞতা রয়েছে। ভাইদের সঙ্গে বিরোধ নিয়ে একসময় তাঁকে আদালতে ঘুরতে হয়েছে। এখন মেয়ের পারিবারিক অশান্তির সমাধানের আশায় এসেছেন লিগ্যাল এইড অফিসে।
মরিয়ম বলেন, “ভাইদের সঙ্গে বিরোধ নিয়ে আদালতে অনেক ঘুরেছি। এখন আমার মেয়ের পারিবারিক অশান্তি। তাই লিগ্যাল এইডে অভিযোগ জানাতে এসেছি।”
সুন্দরপুর ইউনিয়নের গোলাপের হাট এলাকার রুমালি বেগমের পরিবারেও তৈরি হয়েছিল জটিলতা। তাঁর স্বামী দুই স্ত্রী ও দুই পক্ষের পাঁচ সন্তান রেখে দুই বছর আগে মারা যান। এরপর সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে বিষয়টি থানা-পুলিশ পর্যন্ত গড়ায়। পরে লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমে সমস্যাটির সমাধান হয়েছে বলে জানান তিনি।
একটি বিরোধ কখনো শুধু কাগজের বিষয় থাকে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সম্পর্ক, সংসার, সন্তানের ভবিষ্যৎ কিংবা বছরের পর বছর জমে থাকা ক্ষোভ। সমঝোতার মাধ্যমে একটি বিরোধের অবসান হলে তাই শুধু একটি নথিই বন্ধ হয় না, অনেক সময় স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথও খুলে যায়। সেবা নিতে আসা মানুষের সংখ্যা ও কার্যক্রম বাড়লেও সে অনুপাতে জনবল না থাকার বিষয়টি তুলে ধরেছেন বাংলাদেশ হাইকোর্ট ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা জজ কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আসলাম-উদ-দৌলা।
তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের জন্য সরকারের এই জনবান্ধব সেবা আরও কার্যকর করতে পর্যাপ্ত জনবল ও অন্যান্য সহায়তা প্রয়োজন। চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ কয়েকটি লিগ্যাল এইড অফিসকে মডেল হিসেবে গড়ে তোলারও আহ্বান জানান তিনি।
বিনা খরচে আইনি সহায়তা,তৃণমূলের মানুষের কাছে আইনের বার্তা
আইনি অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতেও নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। এ সময় তৃণমূল পর্যায়ে সভা-সেমিনারসহ ২৫টি সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে।
শুধু আদালত ভবনে বসে নয়, প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের কাছেও আইনগত সহায়তার বার্তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এসব সভায় মানুষের আইনগত অধিকার, সরকারি সহায়তার সুযোগ এবং বিকল্প পদ্ধতিতে বিরোধ নিষ্পত্তির বিষয়ে জানানো হয়।
এসব সচেতনামূলক সভায় জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার মো. আবু সাঈদ নিজেও উপস্থিত থাকেন। তিনি বলেন, “ন্যায়বিচার কোনো দয়া নয়; এটি মানুষের সাংবিধানিক অধিকার।” সেই উপলব্ধি থেকেই সরকার ও সুপ্রিম কোর্ট বিকল্প উপায়ে বিরোধ নিষ্পত্তিকে গুরুত্ব দিচ্ছে।