Uncategorized

ভালোবাসা দিবসে দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখরিত পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার!

মো:শাকিল হোসেন বদলগাছী (নওগাঁ) প্রতিনিধি: শীতের ঘণকূয়াশায় চাদরমোড়া হিম বুড়িকে বিদায় জানিয়ে প্রকৃতিতে আজ ঋতুরাজ বসন্তের আগমন। আজ পহেলা ফাল্গুন, ফাগুনের আগুন ঝরানো দিনের শুরুতেই বসন্তের বাসন্তী রঙে রাঙ্গিয়ে আজ বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। বসন্তের আগমনের সাথে ভালোবাসা দিবসে বাড়তি উৎসবের আমেজ চলছে সর্বত্র।
নওগাঁর বদলগাছী উপজেলায় অবস্থিত প্রতœস্থলগুলোর মধ্যে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারে বিশ্ব ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। ঐতিহাসিক এ নিদর্শন দেখতে ১৪ই ফেব্রুয়ারি ভ্যালেন্টাইন’ডে’ তে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দর্শনার্থীদের আসা অব্যাহত রয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ বৌদ্ধ বিহার নওগাঁর বদলগাছীর ঐতিহাসিক পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার। এর আদি নাম সোমপুর বিহার। এটি নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার পাহাড়পুর ইউনিয়নে অবস্থিত। যা বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পেয়েছে অনেক আগেই। দর্শনার্থীদের সুযোগ সুবিধা বাড়াতে নতুন করে গড়ে তোলা হয়েছে নানা অবকাঠামো। আর ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন ইতিহাসিক পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারে বাড়ানো হয়েছে পর্যটন পুলিশ দিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা। দর্শনীয় স্থান পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারে বিশেষ করে বিভিন্ন দিবসের দিন এখানে দেশী বিদেশি নানা বয়সের দর্শনার্থীদের আগমনে ঘটে। দিবস গুলোতে এখানে পর্যটকের ভিড়ে কানায় কানায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠে বিহারের চতুরপাশ।
রাজশাহী বিভাগীয় শহর থেকে বেড়াতে আসা দর্শনার্থী মিম ও লাবনী জানান, তারা এবার নতুন জায়গা দেখতে এসেছে। এতো সুন্দর তা তারা ভাবতে পারেনি। শুধু বাবা-মায়ের কাছ থেকে পাহাড়পুরের কথা শুনেছেন। দেখার ভাগ্য এবার তাদের হয়েছে। ভালোবাসা দিবসে তারা তাদের বাবা-মার সাথে বেড়াতে এসেছে।
ঢাকা থেকে বেড়াতে আসা হাসান আলী জানান, তিনি ও তার পরিবার বছরে একবার এখানে বেড়াতে আসেন। মনমুগ্ধকর প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শনটি দেখতে পরিবার নিয়ে এবারও বেড়াতে এসেছেন। রংপুর থেকে আসা প্রিয়া ও জয়পুরহাট থেকে আসা মেঘা রানী জানান, তারা ঐতিহাসিক পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার দেখে মুগ্ধ। এতো অপূর্ব দৃশ্য নওগাঁয় আছে তা না দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে না। তাই তারা সকলকে পাহাড়পুর দেখার আহ্বান জানান। নওগাঁ সদর থেকে আসা শুভ, তানিয়া, মান্দা থেকে আসা রূপা, নদী, সূর্বণা জানান, ভালোবাসা দিবসে পাহাড়পুরে ঘুরতে এসে খুব ভালো লাগছে। বৌদ্ধ বিহারের সুন্দর্য দেখে তারা মুগ্ধ ।
এ বিষয়ে ঐতিহাসিক পাহাড়পুর (সোমপুর বিহার) কাস্টোডিয়ান ফজলুল করিম আরজু বলেন, এবার বৌদ্ধ বিহারে দর্শনার্থীদের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি বেড়েছে সরকারের রাজস্বও। সেই সাথে ব্যাপক নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে মাস্ক পরে দর্শনার্থীরা বিহারের দেখছেন। বর্তমানে পুরাতন আদলে ও আধুনিকায়নভাবে সংস্কার করা হয়েছে এই ঐতিহাসিক বৌদ্ধ বিহারটি এবং যাদুঘরে নতুন করে সংস্কার কাজ ও সেইখানে এসি ও সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। তিনি আরো বলেন, এই বৌদ্ধবিহারের ভেতর আর কখনো বৃষ্টির পানি প্রবেশ করতে পারবে না। ফলে পাহাড়ের দেওয়াল নষ্ট হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। সংস্কারের পর বৌদ্ধ বিহারের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৪ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবস থেকে ২১ শে ফেব্রুয়ারি এক সপ্তাহ পর্যন্ত এরকমই দর্শনার্থীদের সমাগম ঘটবে ও রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, পাল বংশের দ্বিতীয় রাজা ধর্মপাল অষ্টম শতকের শেষের দিকে এ বিহারটি নির্মাণ করেছিলেন। এ বিহারটির ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হওযার পূর্বে পাহাড়পুর ইউনিয়নে অবস্থিত তদানিস্তন পাহাড় (গোপালের চিতা) নামে এটি পরিচিত ছিল। ১৯২৩-১৯৩৪ সালে প্রতœতত্ত্বটি খননের ফলে এই ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়।
এরপর এ প্রতœস্থলে ১৯৮২ সাল থেকে ১৯৯০ (মাঝখানে ১৯৮৬-৮৭ বাদ দিয়ে) সাল পর্যন্ত একাধিক দফা প্রতেœাৎখনন পরিচালিত হয়। এর ফলে স্থাপত্যিক ধংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়। স্থাপত্যিক ধ্বংসাবশেষটি এমনই জরাজীর্ণ অবস্থায় ছিল যে সেটির বৈশিষ্ট্য নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। কারণ তখন কয়েকটি বিক্ষিপ্ত স্থানে কেবল একটি চওড়া দেয়ালের চিহ্নের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছিল। তবে এ বিস্তৃত স্থাপনাটির সময় নির্ধারিত হয়েছে পাঁচ-ছয় শত খ্রিষ্টাব্দ।
তৎকালে এ এলাকাটির পরিচয় ছিল বটগোহালী। সেকালে ধ্বংসাবশেষ টিকে মঠ হিসেবে ব্যবহার করা হত। পূর্ববর্তী জৈন বিহারটির ধ্বংসাবশেষের উপর একটি বৌদ্ধ মহাবিহার নির্মিত হয়েছিল। এই মহাবিহারটির নির্মাণ কাজে পূর্ববর্তী ধ্বংসাবশেষটির বহু নির্মাণ উপকরণ পুনর্ব্যবহার করা হয়েছিল। এসব উপকরণের মধ্যে কয়েকটি ভাস্কর্য উল্লেখযোগ্য। কারণ ওইসব ভাস্কর্যে খ্রিষ্টাব্দ ছয়-সাত শতকের প্রচলিত শৈল্পিক ধারা বিদ্যমান ছিল। অথচ বৌদ্ধবিহারটি বরেন্দ্র ভূ-খন্ডের পাল বংশীয় দ্বিতীয় রাজা ধর্মপাল বিক্রম শীলের (খ্রিষ্টাব্দ ৭৭১-৮১০) আমলে নির্মিত হয়েছিল। তৎকালে এটির পরিচিতি ছিল সোমপুর বা চাঁদের লোকালয় নামে। তবে স্মরণ রাখা প্রয়োজন, বর্তমানে যেটুকু অংশ টিকে আছে তা কেবল নিচের অংশের অংশবিশেষ মাত্র। এ অংশের উপরের দেয়াল ও ছাদ বিহারটি আবিষ্কারের বহু পূর্বেই ধ্বংস হয়ে গেছে।
মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী মাঝখানে একটি ছাদবিহীন চতুর ঘিরে চার বাহুতে একসারি করে ভিক্ষু কোঠার সমন্বয়ে নির্মিত হয়েছিল এই বিহারটি। এতে মোট ১১৭টি কক্ষ ছিল। এতে ভিক্ষুরা বসবাস করতো। চত্বরের মাঝখানে একটি প্রধান মন্দির ছিল। মন্দিরটির দৈর্ঘ্য ৪০০ ফুট, প্রস্থ প্রায় ৩৫০ ফুট এবং উচ্চতা ছিল ৭০ ফুট। কালের পরিক্রমায় মন্দিরের সবচেয়ে উপরের অংশ ধসে গেছে। বিহারের মূল বেষ্টনীর মধ্যে রয়েছে আরেকটি মন্দির। এটি মূল মন্দিরের ধ্বংসস্তুুপ বলে ধারণা করা হয়।
বিহারের উত্তর বাহুর মাঝমাঝি ছিল বাহিরের দিকে প্রসৃত গাড়ি বারান্দা আকারের সদর তোরণ। এ অংশে মূল প্রবেশ নির্গমন গলির দুই প্রান্তে থামযুক্ত দুটি হল ঘর এবং দু’পাশে একাধিক প্রহরি কোঠা ছিল। এর পূর্বদিকে উত্তর কোণের কাছাকাছি একটি অপ্রশস্ত সাধারণ প্রবেশ নির্গমন গলি এবং পূর্ব বাহুর মাঝামাঝি আরো অপ্রশস্ত অপর একটি গোপন গলিপথের সংস্থান রাখা হয়েছিল।
এছাড়া আশে পাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে কিছু স্থাপত্যের নিদর্শন। এখানে এক সময় যে নদী ছিল তার চিহ্ন দেখলেই বোঝা যায়। নদীর ঘাটটি সম্পর্কে এলাকায় জনশ্রুতি আছে। এই ঘাটে মৈদলন রাজার কন্যা সন্ধ্যাবতী স্নান করতো বলে এ ঘাটের নাম ছিল সন্ধ্যাবতী ঘাট। কালের সাক্ষী প্রতœতাত্ত্বিক ঐতিহাসিক পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার ভ্রমনপ্রিয় ব্যক্তিদের মন আকৃষ্ট করে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button