
রাজশাহী প্রতিনিধি : রাজশাহীতে আয়োজিত পৃথক সেমিনার ও আলোচনা সভায় বক্তারা বলেছেন, ভারতের একতরফা ও আগ্রাসী মনোভাবের কারণে ফারাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রভাবে বাংলাদেশের বৃহৎ একটি অঞ্চল মরুভূমিতে পরিণত হতে চলেছে। বিশেষ করে রাজশাহী অঞ্চল ভয়াবহ হুমকির সম্মুখীন। দেশের বৃহত্তম নদী পদ্মা আজ পানির অভাবে শুকিয়ে মরুভূমিতে পরিণত হতে চলেছে। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলসহ দক্ষিণাঞ্চলের অন্তত ৩০টি নদী আজ বিলুপ্তির পথে। বরেন্দ্র অঞ্চলের ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর অস্বাভাবিক হারে নীচে নেমে যাচ্ছে। ফারাক্কা বাঁধের কারণে বাংলাদেশের যে ক্ষতি হয়েছে, সেই ক্ষতিপূরণ ভারতের কাছ থেকে আদায়ে বাংলাদেশ সরকারকে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। জাতিসঙ্ঘের পানি প্রবাহ আইন ১৯৯৭-এর বিধান অনুযায়ী এবং জাতিসঙ্ঘের মাধ্যমেই বিষয়টির সুরাহা করতে হবে।
মঙ্গলবার (১৬ মে) বিকেলে রাজশাহী নগরীর একটি রেস্টুরেণ্টে ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চ দিবস উপলক্ষে ‘গঙ্গা চুক্তির অবসানে বাংলাদেশের করণীয়’ শীর্ষক এক সেমিনারের আয়োজন করে বাংলাদেশ নদী বাঁচাও আন্দোলন রাজশাহী শাখা ও হেরিটেজ রাজশাহী।
এতে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন আন্তর্জাতিক নদী আইন বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের প্রফেসর ড. আসিফ নজরুল। প্রধান আলোচক ছিলেন বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর ড. আব্দুর রহমান সিদ্দিকী। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশিষ্ট নদী গবেষক ও হেরিটেজ রাজশাহীর সভাপতি মাহবুব সিদ্দিকী। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ নদী বাঁচাও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সভাপতি প্রফেসর মো: আনোয়ার সাদত। সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ নদী বাঁচাও আন্দোলনের রাজশাহী শাখার সভাপতি ও রাবির আরবী বিভাগের প্রফেসর ড. ইফতিখারুল আলম মাসউদ।
সেমিনারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের প্রফেসর ড. আসিফ নজরুল বলেন, আজকে আমাদের নেতৃত্বের দুর্বলতা রয়েছে। মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মত বলিষ্ঠ নেতৃত্বের অভাব রয়েছে। তাদের মত নেতৃত্ব থাকলে ফারাক্কা চুক্তির নায্য হিস্যা আদায়ে অনেকটা সফল হওয়া যেত বলে মনে করেন তিনি।
অন্যদিকে একইদিন রাত ৮টায় নদী ও পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন বাংলাদেশ রাজশাহী নগরীর আরেকটি রেস্টুরেণ্টে ‘ অভিন্ন নদী সমূহে ভারতের পানি আগ্রাসন : অস্তিত্ব সঙ্কটে বাংলাদেশ, সমাধানের পথ’ শীর্ষক আলোচনা সভার আয়োজন করে। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডীন প্রফেসর ফজলুল হক। মুখ্য আলোচক ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যলয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের প্রফেসর সাইদুর রহমান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাংবাদিক ও লেখক সরদার আবদুর রহমান। সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট চিকিৎসক ওয়াসিম হোসেন। স্বাগত বক্তব্য দেন নদী ও পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন বাংলাদেশের সভাপতি অ্যাডভোকেট এনামুল হক।
সভায় বক্তারা বলেন, গঙ্গার উৎস থেকে ফারাক্কা পর্যন্ত বহু বাঁধ আর কৃত্রিম খালের মাধ্যমে গঙ্গার পানি প্রত্যাহার করে চলেছে ভারত। শুধু ফারাক্কা বাঁধ নয়, কানপুরের গঙ্গা ব্যারাজ ও হরিদুয়ারে গঙ্গার পানি প্রত্যাহারে নির্মিত কৃত্রিম খালসহ অসংখ্য স্থাপনা নির্মাণ করেছে তারা। এছাড়া উত্তর প্রদেশ ও বিহারে সেচের জন্য প্রায় ৪০০ পয়েণ্ট থেকে পানি সরিয়ে নেয়ায় বাংলাদেশ গঙ্গার পানির ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
তারা আরো বলেন, ফারাক্কা বাংলাদেশের কৃষি, শিল্প কারখানাসহ সব কিছুতেই মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলেছে।
বিশেষজ্ঞদের দ্বারা পরিচালিত এক সমীক্ষার কথা উল্লেখ করে বক্তারা বলেন, ১৯৭৫ থেকে ১৯৯২ পর্যন্ত ভারত কর্তৃক গঙ্গার পানি প্রত্যাহারের ফলে বাংলাদেশের সার্বিক ক্ষতি হয়েছে ১ লাখ ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। তখন থেকে আজ পর্যন্ত প্রতি বছর প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়ে চলেছে।
ফারাক্কা বাঁধের কারণে বাংলাদেশের যে ক্ষতি হয়েছে, সেই ক্ষতিপূরণ ভারতের কাছ থেকে আদায়ে বাংলাদেশ সরকারকে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। জাতিসঙ্ঘের পানি প্রবাহ আইন ১৯৯৭-এর বিধান অনুযায়ী এবং জাতিসঙ্ঘের মাধ্যমেই বিষয়টির সুরাহা করতে হবে।




