শিরোনাম

“বিবর্ণ ঈদ” নদী ভাঙন কবলিত মানিকগঞ্জের সহাস্রাধীক পরিবারের

আব্দুর রাজ্জাক, মানিকগঞ্জ: অবিরাম বর্ষণ। ভাঙনের শব্দে তীব্র ভয়াবহতা। আতংক, অভাব ও চরম হতাশায় নির্ঘুম ঈদ কেটে যায় যমুনাাপাড়ের সহ¯্রাধীক পরিবারের। ঈদে ছিল না আয়োজন, ছিল না তাদের আনন্দ।এমনই কঠিন পরিস্থিতি, মানিকগঞ্জের বসবাসরত যমুনার ভাঙন কবলিত বাসিন্দাদের। ঈদের দিনেও ভাঙন তাড়া করেছে তাদের। কেড়ে নিয়েছে চোখের ঘুম। এ ঈদ তাদের জন্য আনন্দের নয়; কেবলই বিবর্ণ বেদনার।
গত কয়েকদিনের অব্যাহত বর্ষণ আর পানি বৃদ্ধির ফলে ধলেশ্বরী ও যমুনা নদীর করাল গ্রাসে ইতোমধ্যে প্রায় ৫ শতাধিক পরিবারের বসত বাড়িঘর ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাট বাজার, কয়েক শত একর জমির তিল, কাউন, আমন ধানের আবাদি জমি নদী গর্ভে বিলীণ হয়ে গেছে । ভাঙন আতংকে দিনাতিপাত করছেন আরো ৫/৬ শত পরিবার।
মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার শ্রীধর নগর, কুস্তা, মাইলাঘী ও পাশ্ববর্তী দৌলতপুর উপজেলার বাচামারা, চরকাটারী ইউনিয়নে ব্যাপক ভাঙ্গন শুরু হয়েছে। নদী ভাঙ্গনে ভাঙনের হুমকীর মুখে রয়েছে ঘিওর উপজেলার মাইলাগি আশ্রয়ণ প্রকল্প ও ঘিওরের সাথে দৌলতপুর- নাগরপুর উপজেলার পুরাতন সংযোগ সড়কটি।
ঈদের পরদিন (শুক্রবার ) বাচামারা ইউনিয়নে গিয়ে দেখা গেছে, নদী ভাঙ্গণের শিকার ঐ এলাকার খেটে খাওয়া মানুষ ঘরবাড়ি, জিনিসপত্র নৌকা যোগে অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছে। ভাঙ্গণে ক্ষতিগ্রস্থ লোকজন ভিটে মাটি হারিয়ে নদীর চরে অন্যের জায়গার উপর বাড়া নিয়ে অস্থায়ী ভাবে বাড়িঘর নির্মান করে ঠাই নিয়েছে। এছাড়া স্থানীয় বাচামারা আমেনা খাতুন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে নদী ভাঙ্গণের শিকার কমপক্ষে ২০ টি পরিবার ছেলে-মেয়ে গবাদী পশু ও বাড়ির অন্যান্য মালামাল নিয়ে খোলা আকাশের নিচে পলিথিনের ডেরা (ছাউনী) দিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন । ঈদ আনন্দের ছিটে ফোটাও নেই তাদের চোখে মুখে। নদী ভাঙনে ঘরবাড়ি হারানো তাহের শেখ জানান, সর্বনাশা যমুনা তার সহায় সম্বল সব গিলে ফেলেছে, এমনকি ঘরের আসবাবপত্রও রক্ষা করতে পারেননি। নতুন জামা কাপড়তো দূরে থাক ঈদে ছেলেমেয়ের মুখে একটু ভালো খাবার তুলে দিতে পারেন নি। কথাগুলো বলার সময় ছলছল নয়নজুড়ে তরতর করে বেরিয়ে এলো তার ভেতরের চাপা কান্না।

স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে আশ্রয় নেয়অ নদী ভাঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি পরিবারের সদস্যরা জানাচ্ছেন তাদের করুন কাহিনী
স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে আশ্রয় নেয়অ নদী ভাঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি পরিবারের সদস্যরা জানাচ্ছেন তাদের করুন কাহিনী
যমুনা নদীর ভাঙ্গনে বাচামরা ইউনিয়নের চুয়াডাঙ্গা, বাচামারা জেলেপাড়া, চরবারাঙ্গা, বাচামারা উওর খন্ড, সুবুদ্দিয়া গ্রামের ভাঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্থ লোক জন যমুনা নদীর চরে নিজের ভিটে মাটি হারিয়ে হন্যে হয়ে খুঁজে বেরাচ্ছেন অন্যের জমির ওপর আশ্রয়ের আশায়। চরবারাঙ্গা গ্রামের সমেজ প্রামাণিক জানান, তিনি গত ২০ বছরে ৮ দফা ভাঙনের শিকার হয়েছেন। তার ৪০ বিঘা জমি ও ঘরবাড়ী ছিল। এখন কিছুই নেই, সবই নদীতে বিলীন হয়েছে। আমেনা খাতুন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে আশ্রয় নেয়া ভাঙ্গণের শিকার বাচামারা গ্রামের রোকেয়া বেগম জানান-সোয়ামীর (স্বামীর) ভিটা মাটি নদীতে ভাইংগা গেছে এক মাস ধইরা আমরা এই স্কুলে থাকি কেও আমাগো সাহায্য করে নাই। আমাগে খবর তো নিলো না আগে দেখছি কত সাহায্য আইছে এখন কিছুই পাইনা। চুয়াডাংগা গ্রামের ফজলাল শেকের স্ত্রী মনোয়ারা বেগম জানান-নদীতে ভাংগার পর এক মাস ধইরা আমেনা খাতুন স্কুলের মাঠে কোন মতে টিনের চাল এ্যাংগা দিয়ে গরু-ছাগল পোলাপান নিয়া আশ্রয় নিছি। আর জাগো টেকা পয়সা আছে তারা অন্যের জাগা ভাড়া নিয়া ঘরবাড়ি তুলছে। একমাস ধইরা খাইয়া না খাইয়া এই জাগা আছি । একই এলাকার হেলাল শেখ জানালেন, ঈদের একটা দিন গেলো, পুলাপানের গতরে নতুন জামা দিতে পারলাম না। দিমু কেমনে, দু বেলা খাওনই জুটে না। আট বছরের মেয়ে লতিফা খুব করে বায়না ধরছিল ঈদে তারে নতুন জামা দিউন লাগবো। পারলাম না। ছেলেপেলের চোখের জলে পার করলাম ঈদের দিনটা। এরচেয়ে বড় কষ্টের আর কি থাকতে পারে?
বাচামারা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো: আব্দুল লতিফ জানান- ভাঙনের কারণে যমুনাপাড়ের মানুষ অসহায়। ঈদ আনন্দ তাদের কাছে অধরাই থেকে গেছে। যমুনা নদীতে বর্ষার পানি বৃদ্ধির ফলে গত এক মাসে যমুনা নদীর ভাঙ্গনে বাচামারা ইউনিয়নের চুয়াডাঙ্গা, বাচামারা জেলেপাড়া, চরবারাঙ্গা, বাচামারা উওর খন্ড, বাচামারা শেক পাড়া, সুবুদ্দিয়া গ্রামের প্রায় তিনশত পরিবারের বাড়িঘর জমিজমা নদী গর্ভে বিলীণ হয়ে গেছে। ইতিমধ্যে নদী ভাঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্থ লোকজনের তালিকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে প্রেরন করা হয়েছে।
দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ শফিউর রহমান জানান-ইতিমধ্যে বাচামারা ইউনিয়নে নদী ভাঙ্গনের ক্ষতিগ্রস্থদের তালিকা পেয়েছি । তালিকা অনুযায়ী জেলা প্রশাসক মহোদয়ের অফিসে পাঠানো হবে তালিকা যাচাই বাছাই করে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সাথে আলাপ করে তাদের পুর্ণবাসন ও সাহায্য সহযোগিতা করা হবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button