
উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে গোপালগঞ্জে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বশেমুরবিপ্রবি) ।
শনিবার (২১ সেপ্টেম্বর) বেলা ১২টার দিকে ক্যাম্পাসের বাইরে বেশ কয়েকটি জায়গায় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলে পড়ে দুর্বৃত্তরা। শিক্ষার্থীরা এবং স্থানীয় লোকজন বলছেন, হামলাকারীরা স্থানীয় ভাড়াটে সন্ত্রাসী। তবে তাদের সুনির্দিষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়নি। ভিসি ড. খোন্দকার নাসিরউদ্দিনের নির্দেশেই এই হামলা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ করছেন শিক্ষার্থীরা। তবে এ ব্যাপারে ভিসি বা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কোনও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বশেমুরবিপ্রবি’র ভিসি ড. খোন্দকার নাসিরউদ্দিনের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে আজ তৃতীয় দিনের মতো আন্দোলন চলছে। শিক্ষার্থীরা শুক্রবার সারারাত ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ ও আমরণ অনশন কর্মসূচি পালন করেছেন। শনিবার বেলা ১২টার দিকে বাইরে থেকে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে প্রবেশের সময় তাদের ওপর অতর্কিতে হামলা হয়। উপজেলার মোড়, গোবড়া, হাসপাতাল মোড়, নীলার মাঠ, নবীনবাগ, সোবহান সড়ক, সোনাকুড় এলাকায় এসব হামলার ঘটনা ঘটে। এতো অন্তত ২০ জন আহত হন। তাদের মধ্যে ১০-১২ জনকে গোপালগঞ্জ সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। গুরুতর আহত কয়েকজনকে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর ড. মো. বশির উদ্দিন বলেন, ছাত্ররা তো আমাদের ছেলেমেয়ের মতো। আমাদের সঙ্গে তো তাদের ব্যক্তিগত কোনও বিরোধ নেই। তারা বহিরাগতদের হামলার শিকার হোক এটা আমরা চাই না। এ কারণে তাদের বুঝিয়ে আন্দোলন থেকে ফেরানোর চেষ্টা করছি। পুলিশ ও র্যাবও তাদের বোঝানোর চেষ্টা করছে। বাইরের কারও হামলার শিকার যাতে না হয় সেই চেষ্টা করা হচ্ছে। কারা এই হামলার সঙ্গে জড়িত এবং কেন হামলা হয়েছে এ ব্যাপারে তিনি কিছু বলতে চাননি।
গোপালগঞ্জ সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ছানোয়ার হোসেন মিয়া বলেন, আমরা ক্যাম্পাসের বাইরে অবস্থান করছি। বাইরের লোকজন যাতে হামলা চালাতে না পারে সেজন্য শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দেওয়ার চেষ্টা করছি।
গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. অসিত কুমার মল্লিক জানান, হামলার শিকার যেসব শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে আনা হয়েছে তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে দুই জন এই হাসপাতালে ভর্তি আছে। যে কোনও জরুরি পরিস্থিতির জন্য অ্যাম্বুলেন্স রেডি আছে।
এর আগে শনিবার সকালে উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে লাগাতার আন্দোলনের মধ্যেই গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বশেমুরবিপ্রবি) বন্ধ ঘোষণা করে শিক্ষার্থীদের হল খালি করার নির্দেশ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
এর পরই সব হলের পানি ও ক্যান্টিন বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ করেছে শিক্ষার্থীরা। তাদের আরও অভিযোগ, ক্যাম্পাসের সব খাবারের দোকানও কর্তৃপক্ষ জোর করে বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা সকাল থেকে না খেয়ে আছে।
যদিও এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একটি সূত্র বলেছে, আজ বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইনে সংস্কারকাজ চলার কারণে সকালে থেকে গোলাপগঞ্জে বিদ্যুৎও নেই। ফলে এর অংশ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও কোনো বিদ্যুৎ নেই। তবে শিক্ষার্থীরা বলছে, অন্য সময়ে বিদ্যুৎ না থাকলে প্রশাসন জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করে থাকে। আজকে সেই ধরনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
আগামীকাল রোববার থেকে আগামী ৩ অক্টোবর পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের ঘোষণার পাশাপাশি আজ শনিবার সকাল ১০টার মধ্যে শিক্ষার্থীদের হল খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক আশিকুজ্জামান ভূঁইয়া।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সিদ্ধান্ত ‘অযৌক্তিক ও অবৈধ’ আখ্যা দিয়ে সকাল থেকেই ক্যাম্পাসে ভিসি অধ্যাপক ড. খন্দকার নাসির উদ্দিনের পদত্যাগসহ অন্যান্য দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল অব্যাহত রেখেছে শিক্ষার্থীরা।
অপরদিকে আজ সকাল থেকেই ক্যাম্পাসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পুলিশ, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অবস্থান নিয়েছেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে। এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের একটি সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যাতে অবনতি না হয় সেজন্য বাইরের জেলা থেকে পুলিশ ও র্যাব আনা হয়েছে।
শিক্ষার্থীরা সকাল থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন ও ফটকে অবস্থান নিয়ে ভিসিবিরোধী স্লোগান দিচ্ছে। তারা বলছে, ভিসি পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
আইন বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী নজরুল ইসলাম সকাল ১১টার দিকে অভিযোগ করে বলেন, বন্ধের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় ছুটির এই সিদ্ধান্ত অযৌক্তিক ও অবৈধ। আমরা এটা মানি না। কোনো ছাত্রছাত্রী হল ছেড়ে যাবে না। ভিসির দালাল শিক্ষকরা ছাত্রীদের জোর করে হল থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
এই আন্দোলনকারী বলেন, সকাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় হলের পানি ও বিদ্যুৎ বন্ধ রয়েছে। হলের ক্যান্টিন, ক্যাম্পাসের খাবারের দোকানও বন্ধ। ক্যাম্পাসের ভিতরের ওয়াইফাই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সভাপতি শামস জেবিন দুপুরে হলে পানি, বিদ্যুৎ, খাবার না থাকার বিষয়টি নিশ্চত করেছেন। তিনি আরো বলেন, ক্যাম্পাসে আসার পথে শিক্ষার্থীদের উপর বহিরাগতরা হামলা করেছে। এতে তিন সাংবাদিকসহ প্রায় ২৫ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন।
হলের পানি, বিদ্যুৎ খাবারের ক্যান্টিন বন্ধের ব্যাপারে জানতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও কারো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সকাল থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় উত্তপ্ত অবস্থায় রয়েছে।
উল্লেখ্য, ভিসি প্রফেসর ড. খোন্দকার নাসিরউদ্দিনের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের বহিষ্কার করাসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ এনে পদত্যাগের দাবিতে বুধবার রাত থেকে আন্দোলন চলছে। বৃহস্পতিবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে শিক্ষার্থীরা। পরে বিকাল থেকে আমরন অনশন কর্মসূচি ঘোষণা করে।
শিক্ষার্থীরা জানান, তবে ভিসির পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন চলবে। ভিসি পদত্যাগ করলেই কেবল আন্দোলন থেকে সরে যাবেন তারা।
পূর্বপশ্চিম




