Uncategorized

বরংগাইল সাব-রেজিষ্ট্রি অফিসে প্রকাশ্যে চলছে অনিয়ম

বছরে সাড়ে ৪ কোটি টাকার ঘুষ লেনদেন

মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি : মানিকগঞ্জ জেলার শিবালয় উপজেলার বরংগাইল সাব-রেজিষ্ট্রি অফিসে প্রকাশ্যে চলছে ব্যাপক ঘুষ-দূনীর্তি আর মহা অনিয়ম। কয়েক জন দলিল লেখক,অফিসের করনিক আঃ হাই,পিয়ন ফরিদ হোসেন(ডিউক),মহরার কোরবান আলী সহ দালাল চক্র দিয়েই প্রতিদিন প্রকাশ্যে দাতা-গ্রহীতার নিকট থেকে সাব-রেজিষ্ট্রার বিলকিস আরা হাজার-হাজার টাকা অবৈধ ভাবে আদায় করছে কিন্তু ু দেখার কেউ নেই।বছরে প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা থেকে প্রায় ৫ কোটি টাকা অবৈধ লেনদেন হয়।
তার নির্ধারিত ২০টি খাতে নির্দ্দিষ্ট হারে ঘুষ না দিলে তিনি দলিলে স্বাক্ষর করেন না বলে জানিয়েছেন একাধিক দলিল লেখক। তার ঘুষ চক্রের বাইরে কোন দলিল লেখকের কোন কথাই শুনেন না তিনি। কোন দলিল লেখক ঘুষের টাকা কম দিতে চাইলে তার লাইসেন্স বাতিলের হুমকি দেন সাব-রেজিষ্ট্রার বিলকিস আরা। একই অফিসের দলিল লেখক আঃ করিম মোহরির ছেলে অফিস পিয়ন ডিউক রীতিমত অফিসে মাস্তানী করে টাকা আদায় করে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী মোঃ তারিকুল ইসলাম।অফিসের করনিক আঃ হাই এই অবৈধ লেনদেনের ক্যাশিয়রের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
কেস স্টাডি: ১ ঃ
গত ০২-০৫-২০১৭তারিখে মহাদেবপুর গ্রামের মোন্তাজ উদ্দিনের ছেলে মোঃ তরিকুল ইসলাম তার বাবার দেয়া ৬৬.৩৩ শতাংশ জমি হেবা ঘোষনার মাধ্যমে নিজের নামে দলিল করতে গেলে ১৩,৭০০ টাকার এক পয়সাও কমে হবে না বলে সাব জানিয়ে দেয় করনিক আঃ হাই।আঃ হাই বলেন,দলিলের মূল্য নির্ধারন করা হয়েছে ৪০ লক্ষ টাকা ।সে হিসেবে আরও বেশি টাকা আমরা পেয়ে থাকি বরং কমই নিচ্ছি। বিষয়টি দলিল লেখক মোঃ আনোয়ারুল হক সাব-রেজিষ্ট্রার বিলকিস আরাকে জানিয়ে অনুরোধ করেন কিছু কম নিতে। কিন্তুু তাতেও কোন ফল হয়নি। পরে দলিল লেখক মোঃ আজিজুল মজিদ কাজল,দলিল লেখক মোঃ আনোয়ারুল হক,কোঠাদারা গ্রামের আওয়াল বিশ্বাস এর সামনে মোঃ তরিকুল ইসলামের হাত হতে করনিক আঃ হাই ১৩,৭০০ টাকা বুঝে নেয়।
এ ব্যাপারে গত ৯ মে সাংবাদিকরা বরংগাইল সাব-রেজিষ্ট্রি অফিসে যেয়ে বিলকিস আরাকে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন,এ দলিলে ৫০০ টাকা খরচ হবে। তাহলে কেন ১৩,৫০০ টাকা নিলেন ্? তিনি বলেন,আমি জানি না।টাকা প্রদানের সময় হাজির ব্যক্তি আওয়াল বিশ্বাস স্বাক্ষী দিলে তিনি চুপ হয়ে যান এবং বলেন,আঃ হাই টাকা নিলে আমি বিষয়টি দেখবো। এ সময় আঃ হাই অস্বীকার করে। কিন্তুু কিছুক্ষন পরই পিয়ন ডিউক সাংবাদিকদের বলে,আমি টাকা ফেরত দেয়ার ব্যাবস্থা করবো। কিন্তুু সাংবাদিকদের ম্যাডামের সাথে দেখা করতে হবে।পরে বিষয়টি রের্কড হবে ভেবে তিনি চলে যান।


কেস স্টাডি:২ ঃ
বাংলাদেশ ইসলামী ব্যাংকের প্যানেল আইনজীবী মাসুদ হাসান ১৮ এপ্রিল মানিকগঞ্জের বরংগাইল সাব রেজিষ্ট্রি অফিসে এসেছিলেন একটি মর্গেজ দলিল সম্পাদান করতে। সরকারী নিয়মের ব্যাংক ড্রাফ্টসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্রাদি দিয়ে দলিল দাখিল করেছেন দলিলে সাব রেজিষ্ট্রার স্বাক্ষরও করেছেন। কিন্তু সাব রেজিষ্ট্রার বিলকিস আরা’র দাবী এই দলিলের জন্য তাকে ৭১ হাজার টাকা দিতে হবে। ওই অফিসের প্রধান সহকারী আব্দুল হাই একটি সাদা কাগজে টাকার অংক বসিয়ে তাকে ধরিয়ে দিয়ে বলেছেন, সাব রেজিষ্ট্রার ম্যাডাম ৭১ হাজার টাকা দাবী করেছেন। এই অনৈতিক টাকা দাবি নিয়ে কয়েক দফা বাক বিতন্ডাও হয়েছে। কিন্তু নাছোরবান্দা সাব রেজিষ্ট্রি অফিসের প্রধান সহকারী আব্দুল হাই। নানান অজুহাতে শেষ পর্যন্ত সরকারী নির্ধারিত ফির বাইরে ২০ হাজার টাকা দিতে বাধ্য করা হয়েছে ওই আইনজীবীকে।
এব্যাপারে ইসলামী ব্যাংকের ওই আইনজীবী সাংবাদিকদের জানান, সরকারী একটি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে ওপেন ঘুষ দাবী তিনি দ্বিতীয়টি দেখেননি। খোলামেলা ভাবে জোড় জবরদস্তি করে টাকা আদায় করা হচ্ছে এই সাব রেজিষ্ট্রি অফিসে। এটা বন্ধ হওয়া উচিত। তিনি আরো বলেন, যে ব্যক্তি বাড়ীর জমি ব্যাংকে মর্গেজ রেখে টাকা ঋন নিচ্ছেন তার উপর সাব রেজিষ্ট্রি অফিসে শুরুতে বিপুল পরিমান ঘুষ দিতে হয়েছে “এটা জোড় জুলুম” !
অপর ভুৃক্তভোগী জানান, দলিল করতে আসলে নানান ভুল ক্রটির অজুহাত তুলে টাকা দাবী করেন। টাকা না দিলে দলিল না করার হুমকি দেয়া হয়। বাধ্য হয়ে ঘুষ দিতে হচ্ছে তাদের। প্রয়োজনের তাগিদে অনেকেই জমি বিক্রি করে থাকেন। আরএই সুযোগে নানান টানবাহানা করে তাদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে।
আমমোক্তার দলিলে রেজিস্ট্রি করার সময় প্রতি দলিলে ৫লাখ টাকা মূল্যের দলিলে সাবরেজিস্ট্রারের কমিশন রয়েছে ৫ হাজার টাকা। ৫ লাখ টাকা মূল্যের ওপরে মূল্য হলে প্রতি লাখে ১ হাজার টাকা করে কমিশন নিয়ে থাকে সাবরেজিস্ট্রার।
সাবরেজিস্ট্রি অফিসে দলিল রেজিস্ট্রি করতে হলে স্থানীয় সোনালী ব্যাংকে প্রতি লাখে ১১ হাজার টাকা জমা দিয়ে রেজিস্ট্রি করার সরকারি নিয়ম রয়েছে। এর বাইরে সাবরেজিস্ট্রি অফিসে নগদ কোনো টাকা নেয়ার নিয়ম নেই। কিন্তু কেউ এই নিয়মে দলিল করতে পেরেছেন তার কোন নজিরও নেই।
অফিসের প্রধান করনিক আব্দুল হাইয়ের সাথে কথা হলে তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘সাবরেজিস্ট্রার ম্যাডামের নির্দেশে দলিল সম্পাদনের পর পরই টাকা বুঝে নিতে হবে। আর হিসাব নিকাশ দিতে হবে চলে যাওয়ার আগে। তার করার কিছুই নাই। তিনি বাহত মাত্র।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী সাব-রেজিস্ট্রার বিলকিস আরা’র কাছে অফিসে বিভিন্ন খাতে অবৈধ ভাবে অর্থ আদায়ের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি ঘুষ গ্রহনের কথা স্বিকার করেছেন। তিনি করনিক আব্দুল হাইকে তার কক্ষে ডেকে নিয়ে প্রকাশ্যে শাসন করে ঘুষ গ্রহন থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাব-রেজিষ্ট্রার বিলকিস আরা ২০১৫ সালের ৫ এপ্রিল এ কার্যালয়ে যোগদানের পরই ঘুষের নির্ধারিত হার গুলো নির্দ্দিষ্ট করে দেন।
সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সুএ এই ঘুষ বাণিজ্যেও তথ্য ািনশ্চিত করেছেন। সাব রেজিষ্ট্রার দলিল লেখকদের জানিয়ে দিয়েছেন দলিলের সঙ্গে পরিপূর্ণ কাগজপত্র থাকার পরও তাকে দিতে প্রতি সাবকবলা দলিল প্রতি লাখে দিতে হবে ৩’শ টাকা, ঘরোয়া সাব দলিলে অতিরিক্ত এক হাজার টাকা। এছাড়া মৌজা ওয়ারী দিতে হবে এক হাজার টাকা করে। এর কম টাকা দিতে না হলে সংশ্লিষ্ট দলিল লেখক দলিল উপস্থাপন না করার জন্য নিষেধ করেছেন।
সুত্র মতে,অপর দিকে আমমোক্তার দলিলের জন্য কমপক্ষে ২ হাজার টাকা, মর্গেজ দলিলে প্রতি লাখে ৩ শ টাকা করে দিতে হবে। অথচ সরকারী মর্গেজ ফি মাত্র ৫ শত টাকা। এছাড়া হেবা দলিলে সরকার নির্ধারিত ফি ৩৫০ টাকা নেয়া বিধান থাকলেও তিনি রেট বেধে দিয়েছেন, প্রতি লাখে তিন শত টাকা। এছাড়া দলিলের প্রহীতা অনুপস্থিত থাকলে তার জন্য ২ হাজার টাকা তার জন্য বাধ্যতামুলক ভাবে রাখতে হবে। পর্চা কাচা থাকলে সাব রেজিস্ট্রারের জন্য বাড়তি ১ হাজার টাকা গুনতে হবে। এছাড়া কমিশনের মাধ্যমে দলিল হলে উপজেলার অভ্যন্তরে অন্যান্য ফির বাইরে অতিরিক্ত ৫ হাজার টাকা ক্ষেত্র বিশেষে ২০ হাজার টাকা। এছাড়া কাঁচা পরচার জন্য প্রতি দলিলের জন্য দিতে ৫’শত টাকা। বায়না পত্র দলিলের ক্ষেত্রে তাকে দিতে হচ্ছে বাড়তি ৫ হাজার টাকা। দলিলে ভুল সংশোধন করতে লাগে তিন হাজার টাকা। এদিকে হিন্দু ঘোষনা দলিলে ৩% টাকা গুনতে হয়।সাব কবলা দলিল ছাড়া অন্যান্য দলিলে খারিজ ছাড়া আরও ২০০০ টাকা দিতে হয় গ্রহীতাকে। ১৫০ শতাংশ বা তার বেশী পরিমান জমি রেজিষ্ট্রি হলে এসব নিয়মের বাইরেও প্রতি দলিলে বাড়তি ৫০,০০০ টাকা থেকে ২,০০,০০০ টাকা গুনতে হয় গ্রহীতাকে।
এদিকে দলিল প্রতি কথিত “সেরেস্তা ফি” নামে আদায় করা হচ্ছে দলিল প্রতি থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে। যদিও এই টাকার অর্ধিক যায় দলিল লেখকদের ফান্ডে।
প্রতি দলিলে গড়ে কমপক্ষে ১৫,০০০ টাকা থেকে ২০,০০০ টাকা সাব-রেজিষ্ট্রার অফিসকে প্রদান করতে হয়।বিলকিস আরা জানান,২০১৬ সালে এ অফিসে ৩১০২টি এবং গত ০৯-০৫-২০১৭ তারিখ পযর্ন্ত ১২৫২ টি দলিল সম্পাদন হয়েছে।এর মধ্যে সব মিলিয়ে সরকারী কবুলিয়াত দলিল আছে প্রায় ২৫০ টি।বছরে সাড়ে ৪ কোটি টাকা থেকে প্রায় ৫ কোটি টাকা অবৈধ লেনদেন হয় এ অফিসে।
গত ০৯-০৫-২০১৭ তারিখে যেয়ে দেখা যায় ১১.২০ টায় সাব-রেজিষ্ট্রার অফিসে নেই। বিষয়টি নিয়ে জেলা রেজিষ্ট্রার শাহাদত হোসেন ভূইয়ার সাথে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন,তার সকাল ৯ টার মধ্যে অফিসে আসার কথা।আপনার অফিসে আজ কোন মিটিং –এ আছেন কি না তিনি ? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন,আজ আমার অফিসে তিনি আসেন নাই।সাড়ে ১১ টায় সময় তিনি পিয়ন ডিউককে নিয়ে প্রাইভেট কারে অফিসে আসেন।সপ্তাহে ৫দিন অফিস করার কথা থাকলেও তিনি ৩ দিন অফিস করেন।যে কারনে দাতা-গ্রহীতাদের অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়।
প্রতিটি দলিলে দাতার টিপসহি নিতে অফিস পিয়ন ডিউক কমপক্ষে ৩০০ টাকা নিয়ে থাকে। বড় দলিল হলে ৭০০ টাকা পযর্ন্ত নিয়ে থাকে। কেউ কম দিতে চাইলে রীতিমত তার সাথে মাস্তানী করে বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছে। অফিসের ১ কিলোমিটারের মধ্যে তার নিজ বাড়ী হওয়াতে সে লোকজনকে ভয়ভীতিও প্রর্দশন করে।কয়েকজন দলিল লেখক জানান,এই ডিউককে ছাড়া সাব-রেজিষ্ট্রার কিছুই বুঝে না। ডিউক যা বলে তাই আইন।সে নিজ বাড়ী না থেকে মানিকগঞ্জ শহরে বিলাস বহুল বাসা ভাড়া করে থাকে।ঐ দালাল চক্র ছাড়া সবার সাথেই সে খারাপ আচরন করে,এমন অভিযোগ সবার।সাব-রেজিষ্ট্রারের সামনেই সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে সে ভুক্তভোগী তারিকুল ইসলামের সাথেও হুমকি দিয়ে কথা বলে।
কোন দলিলে কত খরচ হবে তার চার্ট অফিসের বাহিরের দেয়ালে টাঙ্গানো নেই।চার্ট অফিসের মধ্যে এমন জায়গায় লাগানো আছে,যা সহজে দেখা যায় না।আর শুধুৃ দলিল উপস্থাপন ও টিপ সহির সময় টুকু ছাড়া কাউকে এক মূর্হুতের জন্যে অফিসে অবস্থান করতে দেয়া হয় না। এ পরিস্থিতিতে কারো পক্ষে চার্টটি দেখা সম্ভব নয় বলে জানান,আগত জমি ক্রেতা-বিক্রেতারা।
এ সব ব্যাপারে জেলা রেজিষ্ট্রার শাহাদত হোসেন ভূঁইয়ার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন,সরকারী ফ্রির বাইরে সাব-রেজিষ্ট্রি অফিসে কোন লেনদেনের সুযোগ নেই। সাব-রেজিষ্ট্রার বিলকিস আরা ,করনিক আঃ হাই সহ অন্যান্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button