Uncategorized

বছরজুড়ে আলোচনায় ‘কাউন্সিলর খোরশেদ’

নারায়ণগঞ্জ : করোনা মহামারিতে ঘরের মেঝেতে পড়ে আছে স্বজনের মরদেহ। কিন্তু আতঙ্কে সেই ঘরে প্রবেশ করতো না আপনজন। বাবা-মায়ের লাশের সামনে সন্তানও যেতে সাহস করেনি। কি নির্মম ও বেদনাদায়ক ঘটনা। আবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা মৃতদেহ পড়েও ছিল। শুধু তাই নয় এখনো অনেকে নিজের প্রিয়জনের লাশ কোথায় কবর দেয়া হয়েছে সেটিও জানতে চায়নি। এমন মানবিক সংকটে নিজের জীবনের মায়া তুচ্ছ করে এগিয়ে আসেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ। তার সঙ্গে যোগ দেয় একদল সাহসী মানুষ যারা এই মানবিক সংকটে করোনায় আক্রান্তদের চিকিৎসা, মারা যাওয়াদের দাফন কাফন গোসল, সৎকার, মুখাগ্নিও করেন।
সাহস জোগান মানুষের মনে, তাদের দেখে এগিয়ে আসতে শুরু করেন অনেকেই। শুধু নারায়ণগঞ্জ নয় পুরো দেশেই তারা করোনায় আক্রান্তদের সহায়তায় নিজেদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন। আর এভাবেই মরণঘাতি করোনা পরিস্থিতিতে বছরজুড়ে আলোচনায় করোনাযোদ্ধা কাউন্সিলর খোরশেদ। মানবিক কার্যক্রমের কারণে নারায়ণগঞ্জ তথা দেশ ও দেশের বাইরে আলোচিত হয়েছে তার নেতৃত্বে গঠিত টিম খোরশেদ। এজন্য নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক ও দেশের বাইরে থেকেও ধন্যবাদ পত্র পেয়েছেন তিনি। দেশে প্রথমবারের মতো গত ৮ মার্চ নারায়ণগঞ্জে দুজন করোনা পজিটিভ রোগী শনাক্ত হওয়ার দিন থেকেই তার নেতৃত্বে ‘টিম খোরশেদ’ প্রত্যক্ষভাবে করোনা প্রতিরোধে কাজ শুরু করে। ওই সময় মহানগরীতে লিফলেট ও মাস্ক বিতরণ এবং স্থানীয় পত্রিকায় বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।
১৮ই মার্চ দেশে প্রথম করোনায় একজনের মৃত্যু হয়। ফলে সারাদেশের মতো নারায়ণগঞ্জেও করোনাভীতি ছড়িয়ে পড়ে। বাজারে স্যানিটাইজারের চাহিদা বাড়ায় একদিনেই সঙ্কট সৃষ্টি হয়। টিম খোরশেদ ১৯শে মার্চ থেকে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ফর্মুলা অনুযায়ী স্যানিটাইজার বানানো শুরু করে। এ সময় প্রায় ৮০টি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি টিম খোরশেদের কাছ থেকে ফর্মুলা নিয়ে পুরো জেলায় কমপক্ষে তিন লাখ স্যানিটাইজার তৈরি করে বিতরণ করেন।
এদিকে ‘সবার উপর মানুষ সত্য, তার উপর নাই’। মানুষ, মানবতা, মানবিকতার প্রতি আস্থাই পরম ‘ধর্ম’। এই কথাগুলোকে বুকে ধারণ করে কে হিন্দু আর কে মুসলমান করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া একের পর এক লাশের সৎকার করেছেন টিম খোরশেদ। এরআগে তিনি করোনা ও করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের গোসল, জানাজা, দাফন ও সৎকার করতে ইচ্ছা প্রকাশ করে জেলা প্রশাসক, সিটি মেয়র ও সিভিল সার্জনের কাছে আবেদন করেন। তাদের অনুমোদনের পর কাজ শুরু করেন তিনি। গত ৮ই এপ্রিল প্রথম করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া আফতাব উদ্দিনের দাফনের মাধ্যমে শুরু হয় কার্যক্রম। যেখানে মারা যাওয়া ব্যক্তির স্বজনরা লাশের কাছে ভিড়ছেন না সেখানে টিম খোরশেদ পরম মমতায় সেই লাশের গোসল, জানাজা ও দাফন সম্পন্ন করেছেন। আবার হিন্দুদের রীতিনীতি মেনে ওই লাশকে গভীররাতে শ্মশানে নিয়ে দাহ করেছেন। মোটকথা সামপ্রদায়িক সমপ্রতির দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছেন নাসিকের ১৩নং ওয়ার্ডের করোনাযোদ্ধা কাউন্সিলর খোরশদ তথা টিম খোরশেদ। তিনি নারায়ণগঞ্জ মহানগর যুবদলেরও সভাপতি।
করোনাকালে মানবসেবায় বিভিন্ন কার্যক্রমের জন্য কাউন্সিলর খোরশেদ দেশ-বিদেশে আলোচিত হয়ে ওঠেন। এরই মধ্যে গত ৩০শে মে করোনা পজিটিভ রিপোর্ট আসে খোরশেদের। এরপর তার স্ত্রীরও করোনা পজেটিভ আসে। এতে খোরশেদের টিমের সদস্যরা ভেঙে পড়েছিলেন। এ অবস্থায় কাউন্সিলর খোরশেদ ঘোষণা দিলেন-মৃত্যুর আগ পর্যন্ত করোনা নিয়ে যুদ্ধ করে যাব-ইনশাআল্লাহ। যত বাধাই আসুক না কেন দলবলে আক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত আমাদের করোনা প্রতিরোধে কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। পরে ৬ই জুন স্ত্রী লুবনা ও ১৪ই জুন খোরশেদ করোনামুক্ত হন। শুরু পুরোদমে আবার তার পথচলা। নিজ ওয়ার্ডের মৃত ব্যক্তিদের দাফন ছাড়াও পার্শ্ববর্তী ওয়ার্ডের লোকজনও তাদের ওয়ার্ডে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের দাফনে টিম খোরশেদের সহায়তা চাইলে তিনি সহায়তা করছেন। টিম খোরশেদের তথ্যমতে, করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় ৯ই মার্চ থেকে সচেতনাতমূলক লিফলেট ও মাস্ক বিতরণের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করা হয়। ১৮ই মার্চ থেকে ৩০শে মার্চ পর্যন্ত ৬০ হাজার বোতল হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিতরণ, সরকারিভাবে ৭ হাজার পরিবারকে দুইবার খাদ্য সহায়তা প্রদান, সংগঠনের উদ্যোগে ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহায়তায় সাড়ে ৭ হাজার পরিবারকে ঈদ সামগ্রী প্রদান, হিন্দু ধর্মালম্বীদের দুর্গা পূজা উপলক্ষে প্রায় ২ হাজার পরিবারকে খাদ্য সহায়তা প্রদান, ১০ হাজার মানুষকে বিনামূল্যে সবজি বিতরণ, দরিদ্র জনগনের পুষ্টি চাহিদা পূরণে ৪০ হাজার ডিম বিতরণ, ১৫ হাজার মানুষকে টেলিমেডিসিন সেবা প্রদান, করোনায় মৃতের পরিবারের সন্তানদের লেখাপড়া বাবদ ১০ জনকে নগদ অর্থ সহায়তা প্রদান করা হয়। এছাড়া করোনাকালীন সময়ে কর্মহীন হয়ে পড়া অসচ্ছল ২০ পরিবারকে সেলাই মেশিন, ও টাইম টু গিভের সহায়তায় ফুড রাইডিংয়ের জন্য ১০টি বাই সাইকেল এবং ৫ জন প্রতিবন্ধীকে হুইল চেয়ার দেয়া হয়। কাজের স্কীকৃতি হিসেবে করোনাকালীন সময়ে মানুষের পাশে থাকায় ২৭শে ডিসেম্বর টিম খোরশেদকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ধন্যবাদ পত্র দিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. জসিম উদ্দিন। এছাড়া আমেরিকাসহ একাধিক বিদেশী রাষ্ট্র থেকেও প্রশংসা ও ধন্যবাদ পত্র পেয়েছেন তিনি।
কাউন্সিলর খোরশেদ জানান, এ পর্যন্ত ১৪৫ জনকে দাফন ও সৎকার করা হয়েছে। এছাড়া ১০৪ জনকে প্লাজমা ডোনেশন, ১৩৪ জনকে অক্সিজেন ও ৭৬ জন রোগীকে অ্যাম্বুলেন্স সাপোর্ট দেয়া হয়েছে।
তিনি জানান, আমার কাছে কে হিন্দু কে মুসলিম সেটা বড় বিষয় ছিল না। সবার আগে আমি একজন মানুষ। আর মানুষের সেবায় মানুষকেই এগিয়ে আসতে হবে। আমি তা-ই করেছি এবং করছি। আগামীতেও আমার এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে, যতদিন বেঁচে আছি।
মানবজমিন

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button