প্রবাস

প্রবাসের সুখ-দুঃখ

আরশাদ উল্লাহ্
মাস খানেক হল নজরুল ইসলাম সাত্তারের সাথে ফোনে কথা হয়। কিন্তু তিনি অনেক আগে থেকেই আমার ফেইসবুক ফ্রেন্ড। আমার লেখা পড়েন। দু’একটি কমেন্টও করেন। প্রবাস জীবন তাঁর ১৯৮৫ সাল থেকে।
কিন্তু তাঁর সাথে কোনদিন আমার সাক্ষাৎ হয়নি। প্রবাসে আমি তার পাঁচ বৎসরের সিনিয়ার। দেশে একটি চাকুরি করতেন। সে চাকুরি ছেড়ে দিয়ে জাপানে আসেন। এসব কথা পরে জেনেছি। প্রতিটি মানুষ জীবনের চড়াই-উতরাই পেরিয়ে একটি পর্যায়ে এসে দাঁড়ায়। জীবনের আরেক নাম জীবন সংগ্রাম। জীবন সংগ্রামে উত্থান-পতন তো আছেই। আজ নজরুল ইসলামের সংগ্রামী প্রবাস জীবনের উপর দু’কথা লিখব।
একদিন ফোনে তিনি বললেন, “ভাই আমি বড় অসুস্থ। জাপানে এসে এক সময় অনেক মানুষের উপকার আমার সাধ্যমত করেছি। কিন্তু আমার দুর্দিনে কেউ আমার খবর নিতেও আসে না।”
নজরুলের কথা শুনে নিজের অসুস্থতার কথা তাকে বলেছি। একদিন তাঁর বিস্তারিত ইতিহাস জেনে মনে করলাম যে তাকে গিয়ে একবার দেখা করা আমার কর্তব্য। শিক্ষিত মার্জিত লোক নজরুল ইসলাম সাত্তার। জন্ম স্থান তার ফেনী জেলার ফুলগাজি।
আজ থেকে দেড় বৎসর পূর্বে হাঠাৎ তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর দেহের বাম দিক অবশ হয়ে জবান বন্ধ হয়ে যায়।
কথা প্রসঙ্গে বললেন, “ভাই, আমি অসুস্থ হয়ে ফ্লোরের উপর পড়ে যাই। এম্বুলেন্সে আমাকে আমার মেয়ে ও ছেলেটি হাসপাতালে নিয়ে যায়। হাসপাতালে আমার ছেলেমেয়ের কান্না দেখে ডাক্তার এবং নার্সগণ অবাক হন।”
জাপানীরা কখনো চিল্লায়ে কান্নাকাটি করে না। বাবার এমন অবস্থায় তার সন্তানের কান্নাকাটি দেখে ডাক্তার ও নার্স তাদের প্রবোধ দিলেন। বললেন, ‘এমন রোগীকে সম্পূর্ণ সুস্থ করা হয়তো সম্ভব নাও হতে পারে। তবে আমরা তাকে প্রাণে বাঁচিয়ে রাখতে যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যাব।’

নজরুল ইসলাম সাত্তার ও লেখক

এই শান্তনার কথা শুনে নজরুলের সন্তান দু’জন আশ্বস্ত্ হয়।
আজ আমার এই লেখার উদ্দেশ্য শুধুমাত্র নজরুল ইসলাম সাত্তারকে নিয়ে নয়। তার সন্তান দু’টি আমার দীর্ঘ প্রবাস জীবনে বড় এক বিস্ময়। তাদের কথা জেনে আমি গতকাল ২৮ ফেব্রুয়ারী কাউয়াগুচিতে নজরুলের বাসস্থানে গেলাম। এমন সন্তান নজরুলের ভাগ্যে আছে বলেই হয়তো তিনি এমন কঠিন রোগ নিয়ে বেঁচে আছেন। আমার এই ধারণা অমূলক নয়। নতুবা তিনি বেঁচে থাকতেন কি না সন্দেহ।
নজরুলের স্ত্রী ছিলেন জাপানী। কঠিন পরিশ্রমী নজরুলের রোজগার বেশ ভাল ছিল। স্ত্রীকে নিয়ে সুখের সংসার গড়ে তুলেন। তাদের একটি কন্যা সন্তান হয়। কন্যা সন্তানটির বয়স যখন পাঁচ বৎসর তখন তাদের পুত্র সন্তানটি ভূমিষ্ঠ হয়। কন্যা ও পুত্র সন্তান নিয়ে নজরুল বড় সুখি। তিনি দিন রাত কঠিন কাজ করে রোজগার করছেন। কিন্তু মানুষের জীবনে সুখ বেশি দিন থাকে না।সম্ভবত মানুষের জীবনে সুখ ক্ষণস্থায়ী এবং দুঃখ হয় দীর্ঘস্থায়ী। পুত্র সন্তানটির যখন মাত্র এক বৎসর তখন তাদের জাপানী মা পালিয়ে গেলেন। ঘরে ফেলে যান তার দুটি ফুটফুটে শিশু সন্তান। যাবার সময় সে নজরুলের একাউন্ট ঠেকে পাঁচ মিলিয়ন ইয়েন গোপনে সরিয়ে নিয়েছে। এই টাকাতে তার সন্তানের হক রয়েছে। কিন্তু সে কথা নজরুলের স্ত্রী ভাবার প্রয়োজন বোধ করে নি। স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনতে নজরুল মকদ্দমা করে অনেক টাকা খরচ করেছে। কিন্তু ফিরিয়ে আনতে পারেনি। মহিলা টাকাও ফেরত দেয়নি। তার দুটি শিশু সন্তানের প্রতি এতটুকু মমতা ছিলনা দু’সন্তানের নিষ্ঠুর এই জাপানী জননীর হৃদয়ে। সে সেলিম খান নামে এক বাংগালিকে বিয়ে করে নতুন সংসার গড়েছে। দু’বৎসর পরে তাদের তালাকও হয়ে গেছে শুনেছি।
এই এক বৎসর বয়সের শিশু পুত্র সন্তান ও পাঁচ বৎসরের কন্যা সন্তানকে নিয়ে নজরুল জীবনের কষ্টকর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেন। তিনি আর বিয়ে করেন নি। এই বাবাটির মুখের দিকে তাকিয়ে সন্তান দুটি বড় হতে থাকে। স্কুলে পড়াশুনা করে মেয়েটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী অর্জন করে ভাল একটি চাকুরীতে যোগদান করেছে। ছোট ভাইটির পড়াশুনার খরচ সহ সমস্ত সংসারের দায়ীত্ব কাঁধে নিল নজরুলের মেয়ে এলিকা। জাপানে এমন দু’টি দৃষ্টান্তের কথা কল্পনাও করা যায় না। আমি আমার ৩৮ বৎসর প্রবাস জীবনে এমন পরিবার দেখিনি। বাবার সম্পূর্ণ চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছে সে। পুত্র সন্তান রিকির বয়স এখন ২০ বৎসর। টেকনিক্যাল কলেজে দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। পার্ট টাইম করে কিছু রোজগার করে। তা দিয়ে তার হাত খরচের টাকা আসে। উদ্বৃত্ত টাকায় সংসারে টুকটাক কিনে আনে। ধন্যবাদ এলিকা তোমাকে। ছেলেটি আগামি বৎসর ডিপ্লোমা ডিগ্রী অর্জন করবে। সুদর্শন এই যুবকটির উচ্চতা প্রায় এক মিটার আশি সেন্টিমিটার।
নজরুল ইসলাম সাত্তারে পুত্র রিকি

এখানে আমার লেখা শেষ করতে পারছি না। আরো কিছু বিস্ময়ের কথা না লিখলেই নয়। মাস দুয়েক আগে নজরুলের জবান ফিরে এসেছে। আল্হামদুলিল্লাহ। তিনি এখন সুন্দর কথা বলতে পারেন। লিখতেও পারেন। তবে হাঁটতে কিছুটা অসুবিধা হয়।
আমি বললাম, “নজরুল সাহেব, আপনার উপর আল্লাহর কৃপা রয়েছে। আপনি ভাল হয়ে যাবেন। তিনি পরম দয়ালু এবং ক্ষমাশীল। তাঁকে ডাকলে সারা দেন। তা উপলদ্ধির মাধ্যমে বুঝে নিতে হয়।’
আমার কথা শুনে তার চোখের পানি পড়তে থাকে। আমি তাকে প্রবোধ দিলাম।
নজরুলের মেয়ে এলিকা লাঞ্চ তৈরী করেছে। ছেলেটি মিল্ক কফি কিনে এনে আমার হাতে দিল। ফ্রীজ থেকে রসগোল্লা ও লালমোহন প্লেটে করে এনে সামনে রাখল। সে নিশি-কাওয়াগুচি ষ্টেশনে গিয়ে আমাকে বাসাতে নিয়ে এসেছে। নজরুলের বাসা রেল ষ্টেশন থেকে পায়ে হেঁটে ১০ মিনিটের পথ।
রিকিকে দেখতে জাপানী বেস্বল প্লেয়ারের মত হ্যান্ডসাম মনে হয়। পিতার প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা তাদের।পিতার ডাকে বুলেটের বেগে ছুটে যায় এলিকা ও রিকি। ধন্যবাদ রিকি ধন্যবাদ এলিকা। জাপানে তোমরা অদ্বিতীয়। আমি তোমাদের জন্য দোয়া করি। আল্লাহ তোমাদের সহায়।
নজরুলের কন্যাটির ফটো নিয়েছি। কিন্তু ফেইসবুকে ফটো দিতে নিষেধ করাতে দিলাম না।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button