sliderঅর্থনৈতিক সংবাদশিরোনাম

পরীক্ষামূলক ট্রেন চলাচল শুরু পদ্মা সেতুতে

ফরিদপুর প্রতিনিধি : ট্রেন উঠল পদ্মা সেতুতে। গতকাল মঙ্গলবার পরীক্ষামূলকভাবে একটি বিশেষ ট্রেন পদ্মা সেতু অতিক্রম করেছে। এর মাধ্যমে মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও মুন্সীগঞ্জের মাটিতে প্রথমবারের মতো ট্রেন যাত্রা শুরু হলো। বাংলাদেশ রেলওয়ের ৬৬২১ নম্বর ইঞ্জিন পরিচালিত পাঁচটি বগিবিশিষ্ট ট্রেনটি ভাঙ্গা স্টেশন থেকে ৪২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পদ্মা সেতু পার হয়ে মাওয়া প্রান্তে পৌঁছে।

গতকাল মঙ্গলবার বেলা ১টা ২১ মিনিটে ফরিদপুরের ভাঙ্গা স্টেশন থেকে পদ্মা সেতুর অপরপ্রান্তে মাওয়া স্টেশনের উদ্দেশ্যে পরীক্ষামূলকভাবে এ রেলযাত্রা উদ্বোধন করেন রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম। এ সময় তার সাথে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরে আলম চৌধুরী, পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীম, স্থানীয় সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান নিক্সন চৌধুরী, সংসদ সদস্য নাহিদ রাজ্জাক, সংরক্ষিত আসনের এমপি সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপ, জেলা প্রশাসক কামরুল আহসান তালুকদার, পুলিশ সুপার শাহজাহানসহ জনপ্রতিনিধি ও ঊর্ধ্বতন কর্মকতারা।

উদ্বোধনকালে রেলমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, ‘আজকে আমাদের এই প্রকল্পের প্রাথমিক সফলতা ভাঙ্গা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে মাওয়া পর্যন্ত ট্রায়াল রান করছি। আশা করছি খুব শিগগিরই ঢাকা থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত ট্রেন চলাচল শুরু হবে।’

মন্ত্রী বলেন, আগামী সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে ঢাকা থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত ট্রেন চলবে। আগামী বছর নির্ধারিত সময়ের (২০২৪-এর জুন) মধ্যে ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত ট্রেন চলাচল শুরু হবে। পরে মন্ত্রীসহ অন্যরাও পরীক্ষামূলক ট্রেনের যাত্রী হিসেবে মাওয়ার উদ্দেশে ভাঙ্গা ছাড়েন। ভাঙ্গা স্টেশন থেকে প্রথমে গ্যাংকার ট্রেন ছেড়ে দেয়। এরপর বাংলাদেশ রেলওয়ের ৬৬২১ নম্বর ইঞ্জিন দ্বারা পরিচালিত পাঁচ বগির স্পেশাল ট্রেন যাত্রা করে। যাত্রীবাহী হলেও এই স্পেশাল ট্রেনে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ওঠেন। এ রুটে আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রেন চালু হলে এ ট্রেনটিও সেই বহরে থাকবে। এই বিশেষ ট্রেনটি নীলফামারীর সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রস্তুত করা হয়েছে।

পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকা-যশোর রুটে চলাচলের জন্য চীন থেকে ১০০টি নতুন কোচ আনার কথা রয়েছে। এরই মধ্যে ৪৫টি বগি বাংলাদেশে এসেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, পরীক্ষামূলকভাবে রেলপথ ইন্সপেকশনের কাজে ব্যবহৃত একটি গ্যাংকার পাঁচটি বগি নিয়ে ৩০-৪০ কিলোমিটার বেগে ভাঙ্গা থেকে মাওয়া পর্যন্ত টেস্ট-রান চালায়। এ সময় ট্রেনে ভ্রমণ করে রেলপথ মন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজনসহ অন্যরা নির্মিত রেলপথসহ প্রকল্পের সার্বিক কাজ পরিদর্শন করেন।

আগামী সেপ্টেম্বরে ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল শুরু হতে পারে। পুরোপুরি চালু হওয়ার আগে এ রেলপথ দিয়ে প্রকল্পের মালামাল পরিবহন করা হবে বলে জানা গেছে। এ জন্য এরই মধ্যে পদ্মা সেতু হয়ে ভাঙ্গা থেকে মাওয়া স্টেশন পর্যন্ত ৪২ কিলোমিটার রেলপথ প্রস্তুত করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রকল্পের মেয়াদ অনুযায়ী ২০২৪ সালের জুনে ঢাকা থেকে ভাঙ্গা হয়ে যশোর পর্যন্ত পুরো রেলপথটি চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। ‘ওয়ান-ডিরেকশন’ বা একমুখী চলাচলের ওপর ভিত্তি করে প্রাক্কলনটি তৈরি করেছে চায়না রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি (সিআরইসি)।

জানা গেছে, ২০৩০ সাল নাগাদ রেলপথটির ঢাকা-ভাঙ্গা অংশে প্রতিদিন ১৩ জোড়া ট্রেন চলবে। একইভাবে ভাঙ্গা-কাশিয়ানী অংশে প্রতিদিন সাত জোড়া ও কাশিয়ানী-যশোর অংশে প্রতিদিন চলবে পাঁচ জোড়া ট্রেন। এ সময়ের মধ্যে ঢাকা-ভাঙ্গা অংশে বছরে ৪০ লাখ, ভাঙ্গা-কাশিয়ানী অংশে বছরে ১৭ লাখ ও কাশিয়ানী-যশোর অংশে বছরে সাড়ে ১৩ লাখ যাত্রী পরিবহনের লক্ষ্য রয়েছে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, যশোর থেকে ঢাকা পর্যন্ত ১৭২ কিলোমিটার দীর্ঘ লেভেল ক্রসিংবিহীন রেল সংযোগ প্রকল্পের বড় চ্যালেঞ্জ ছিল পদ্মা সেতুতে পাথরবিহীন রেললাইন নির্মাণ। আর সেই রেলপথ সুচারুরূপে সম্পন্ন হওয়ায় দেশের আধুনিক রেল নেটওয়ার্কে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে।
পদ্মা সেতু রেল লিংক প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, পদ্মা সেতু রেল লিংক প্রকল্পের কাজ তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে ঢাকা থেকে মাওয়া, মাওয়া থেকে পদ্মা সেতু হয়ে ফরিদপুরের ভাঙ্গা ও ভাঙ্গা থেকে যশোর।

কাজের অগ্রগতির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩০ মার্চ পর্যন্ত ঢাকা থেকে মাওয়া অংশে ৭৪ দশমিক ১৪ শতাংশ, মাওয়া থেকে ভাঙ্গা অংশে ৯২ দশমিক ৮৯ শতাংশ ও ভাঙ্গা থেকে যশোর পর্যন্ত ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। পুরো ঢাকা-যশোরের এ প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি হয়েছে ৭৫ দশমিক ৯২ শতাংশ।

যাত্রীদের ট্রেনে চলাচলের জন্য ভাঙ্গা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে মাওয়া পর্যন্ত চারটি স্টেশন ও একটি জংশন নির্মাণ করা হচ্ছে। ভাঙ্গা স্টেশন নির্মাণের অগ্রগতি ৭০ শতাংশ, ভাঙ্গা জংশনের অগ্রগতি ৫৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ, শিবচর জংশনের অগ্রগতি ৭৪ দশমিক ৫০ শতাংশ, পদ্মা স্টেশনের অগ্রগতি ৮৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ ও মাওয়া স্টেশনের কাজের অগ্রগতি হয়েছে ৮৯ শতাংশ। প্রকল্পটি সম্পন্ন করার পর রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় দেশের মধ্য ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাথে রাজধানী ঢাকা এবং পদ্মা সেতুর মাধ্যমে মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর ও নড়াইল জেলার নতুন এলাকাজুড়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হবে। প্রকল্পটির মাধ্যমে ঢাকা-যশোর-খুলনার মধ্যে ২১২ দশমিক ০৫ কিলোমিটার সংক্ষিপ্ত রুট এবং উন্নত পরিচালন সুবিধার বিকল্প রেলপথ সংযোগ স্থাপিত হবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button