slider

নির্দোষ হয়েও জেল খেটেছেন ২০ বছর, ক্ষতিপূরণের আকুতি

মাহতাবুর রহমান, বরগুনা : খুলনা জেলার রূপসা থানার নারিকেল চানপুর গ্রামে ১৯৯৭ সালের ১৫ জানুয়ারি রাতে স্ত্রী রহিমা ও শিশু কন্যা সন্তানকে হত্যার অভিযোগে শ্বশুরের করা মামলায় ২০ বছর সাজা খেটে মুক্ত হয়েছেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শেখ জাহিদ (৫২)। সর্বোচ্চ আদালতে ২০২০ সালে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন ছয় সদস্যের আপিল বিভাগে শুনানি শেষে ২৫ আগস্ট প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ জাহিদকে খালাস দেন। ৩১ আগস্ট রাতেই খুলনা কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি।

তথ্যমতে ১৯৯৪ সালে রূপসা থানার নারিকেল চানপুর গ্রামের শেখ ইলিয়াস আহমেদের ছেলে শেখ জাহিদের সঙ্গে বাগেরহাটের ফকিরহাট এলাকার রহিমার বিয়ে হয়। নিজেকে নির্দোষ দাবি করে জাহিদ বলেন, বিয়ের পরেই শ্বশুরবাড়ির কাছেই ভাড়া বাড়িতে থাকতে শুরু করি আমাদের একটা কন্যা সন্তান হয়। ঘটনার দিন আমি যশোরে গিয়ে রাতে আর ফিরতে পারেনি। ওই রাতেই আমার স্ত্রী ও কন্যা খুন হন। পরের দিনই আমার শ্বশুর আমার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন।

মামলার পর দীর্ঘদিন পালিয়ে থাকলেও ২০০০ সালের শুরুর দিকে আদালতে আত্মসমর্পণ করেন জাহিদ। ওই বছরই বাগেরহাটের আদালত তার মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। উচ্চ আদালতে ডেথ রেফারেন্স পাঠানো হলে ২০০৪ সালে সেখানেও মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়। কারাগার থেকেই ২০০৪ সালে আপিল বিভাগে জেল পিটিশন করেন জাহিদ, যা ২০০৭ সালে জেল আপিল হিসাবে গণ্য হয়। পরবর্তীতে ২০২০ সালে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন ছয় সদস্যের আপিল বিভাগে ওই জেল আপিলের শুনানি হয়। শুনানিতে আদালত মামলায় নানা অসংগতি পান। শুনানি শেষে ওই বছরের ২৫ আগস্ট প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ জাহিদকে খালাস দেন।
রায়ে বলা হয়, স্ত্রী ও কন্যা হত্যার অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ার কারণে খালাস দেওয়া হলো শেখ জাহিদকে।

জাহিদ বলেন, ‘কনডেম সেলে থাকা অবস্থায় সব সময় মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতাম। যে সেলে থাকতাম, সেখান থেকে দেখা যেত ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার দৃশ্য। ফাঁসিতে ঝুলানোর জন্য কনডেম সেল থেকে অনেক আসামিকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যেতে দেখেছি। তখন ভাবতাম, আমাকেও হয়তো এভাবেই ফাঁসি দেওয়া হবে। এসব ভেবে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নিতাম। এখন আমার খুব জানতে ইচ্ছে হয়, কে হত্যা করল আমার স্ত্রী ও সন্তানকে।

জীবনের হারিয়ে যাওয়া ২০ বছরের ক্ষতিপূরণের মামলা করবেন, সেই অর্থও নেই তার কাছে। দুবেলা ভাতের বিনিময়ে খুলনা শহরে এক ভাঙারির দোকানে কাজ করেন জাহিদ।

ক্ষতিপূরণের মামলার বিষয়ে জানতে চাওয়া হয় সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনিরুল ইসলাম দুলালের কাছে তিনি বলেন, তার জীবন থেকে ২০ বছর হারিয়ে গেছে এটা খুবই দুঃখজনক তবে তিনি ন্যায় বিচার পেয়েছেন। এখন তিনি লিগ্যাল এইডের সহযোগিতা নিয়ে রাষ্ট্রের কাছে ক্ষতিপূরণ চেয়ে উচ্চ আদালতে রিট করতে পারেন।

জাহিদ বলেন, মামলাটি আপিল বিভাগে থাকাবস্থায় ঢাকার লিগ্যাল এইড কর্মকর্তার সহযোগিতায় আপিলে খালাস পাই। এখন সরকার যদি কিছু ক্ষতিপূরণ দেয়, তাহলে তা নিয়েই বেঁচে থাকব। কারাগার থেকে বের হয়ে খুলনা শহরের হরিণটানা এক ভাইয়ের বাড়িতে আশ্রিত অবস্থায় আছি। বর্তমানে এক ভাঙারির দোকানে দুবেলা ভাতের বিনিময়ে কাজ করছি।তিনি আরও বলেন নির্দোষ হয়েও জীবদ্দশায়ই পেয়েছি নরকের স্বাদ। কনডেম সেলে কাটানো ২০টি বছর ছিল দুর্বিষহ যা মৃত্যুর আগে ভুলতে পারবো না। মাঝেমধ্যে সেলে দম আটকে যাওয়ার উপক্রম হলে দরজার কাছে মুখ বাড়িয়ে নিশ্বাস নিতাম। অশ্রুসিক্ত চোখে তিনি বলেন, কারাগারে থাকাবস্থায় বাবা-মাকে হারিয়েছি দাফনও করতে পারিনি। ভিটেবাড়ি, জমিজমা যা ছিল সব বিক্রি করে মামলার পেছনে শেষ করেছি। কারাগারে থাকাকালীন কেউ খোঁজ নেয়নি। এমন পরিস্থিতিতে বাইরের জগতের আলো দেখার আশাও বাদ দিয়েছিলাম।

শারীরিকভাবে খুবই অসুস্থ শেখ জাহিদ জীবনের হারিয়ে যাওয়া ২০টি বছরের ক্ষতিপূরণের মামলা করতে চান। কিন্ত রায়ের কপিসহ আনুষঙ্গিক নথি সংগ্রহ করতে কমপক্ষে তার ১০ হাজার টাকা প্রয়োজন। কিন্তু দুমুঠো আহার কোন ভাবে জুটলেও ১০ হাজার টাকা তার কাছে জোগাড় করা খুবই কঠিন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button