বিবিধশিরোনাম

নগর পুড়লে দেবালয়ও রক্ষা পায় না

নগর যখন পোড়ে, তখন দেবালয়ও রক্ষা পায় না। ডেঙ্গুতে মারা গেছেন পুলিশের এক অতিরিক্ত আইজিপির স্ত্রী, এমন খবরে এই কথাটাই মনে এলো। অন্ধ আগুন কাউকে দেখে না, কাউকে চেনে না, মৃত্যুও তেমনি। এর আগে মারা গেছেন বোধহয় একজন উপসচিবের স্ত্রীও।
এর পাশাপাশি দেখছিলাম ছেলেকে কবরে শুইয়ে, হাসপাতালে সেই ছেলের শয্যাতেই মেয়েকে চিকিৎসা করাচ্ছেন চরম অসহায় পিতা-মাতা। অসুস্থ মা চলে গেছেন ওপারে, চিকিৎসাধীন মেয়ে খুঁজছে মাকে। নিজে আক্রান্ত হয়েও মা সেবা করছেন সন্তানের। ভয়াবহ এমনসব ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছে গণমাধ্যম।
একটা ছবি আরো বুক কাঁপিয়ে দিলো। একটি জুটি’র ছবি। গর্ভবতী স্ত্রীকে নিয়ে আগত বাচ্চার জন্য ‘সেলিব্রেশন’। দুজনের মাঝখানে লেখা “ইট’স এ বয়”। আর একমাস পড়েই বাচ্চাটির পৃথিবীতে আসার কথা। কিন্তু না, ডেঙ্গু আক্রান্ত মা তার অনাগত সন্তানকে নিয়েই চলে গেলেন না ফেরার দেশে। এই যে মৃত্যু, এই যে হাহাকার, তাকি এই সামান্য লেখায় বর্ণনা করা যায়, না করা সম্ভব!
একের পর এক মৃত্যু। এ যেন মৃত্যুর মিছিল। তারপরেও কেনো ডেঙ্গুর এই মহামারি রূপ নিয়ে লুকোছাপা আর অদ্ভুত সব কায়-কারবার! কী প্রয়োজন ছিলো নায়িকাদের সাথে নিয়ে পরিচ্ছন্নতার নামে ‘ঝাড়ুচিত্রে’র। মানুষ যখন হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে দৌড়াচ্ছে, রক্তের জন্য হাহাকার। এমন দুঃসময়ে এমনসব দৃশ্যচিত্র মানুষের মস্তিষ্ক নিতে পারে না, বিরক্ত হয়। আর বিরক্তি থেকেই অনেকে একে ‘তামাশা’ও বলছেন। সামাজিকমাধ্যম খুললেই বোঝা যায় এই বিরক্তি।
এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এডিস মশা নির্মূলের ঔষধ। এ নিয়েও রয়েছে চরম বিভ্রান্তি। একদিকে হাইকোর্ট তাগাদা দিচ্ছেন মশার ঔষধ আনার জন্য। স্বয়ং ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক বলছেন, ঔষধ আনার ব্যাপারে। এমনসব তাগাদার অর্থ দাঁড়ায়, এডিস নির্মূলের কার্যকর ঔষধ সম্ভবত নেই! তাহলে এই যে, ফিল্মি স্টাইলে রাস্তা-ঘাটে, হাসপাতালে, মানুষের উপর ধোঁয়ার মতন যা ছিটানো হচ্ছে সেটা কী?
বিভ্রান্তি আরো বাড়ছে দায়িত্বশীলদের বক্তব্যে। একজন বলছেন বিমান দিয়ে ঔষধ আনা হবে। বলা হচ্ছে ভারত থেকে ঔষধ আর বিশেষজ্ঞ আসবে। বলছেন, সেপ্টেম্বরের আগে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। সেপ্টেম্বরের পরতো এমনিতেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রিত হবে। ব্যাখ্যাটা সোজা, সেপ্টেম্বরের পরে বর্ষার প্রকোপ থাকবে না, পানিও জমবে না। জন্মাবে না এডিস মশাও। নানা মুনির এই যে নানা মত, তাতেই প্রশ্ন জন্মে, কোথাও একটা গন্ডগোল রয়েছে।
অবশ্য গন্ডগোল যে রয়েছে তার কিছুটা জানিয়েছে গণমাধ্যম। করপোরেশন এডিস মশা নিধনের যে ঔষধ কিনেছিলো, তা পরীক্ষায় ডাহা ফেল মেরেছে। অর্থাৎ কোটি কোটি টাকায় কেনা হয়েছে রদ্দি আর বাতিল মাল। যা কোনো কাজে আসবে না, আসছে না। অর্থাৎ টাকাগুলো গচ্চা বা ভোগে গেছে। অথবা কারা ডিআইজি পার্থ গোপালের মতন ‘ভোগে’র টাকা হয়ে গেছে শাশুড়ির টাকা।
টাকা গেছে যাক, কদিন আগেও শেয়ার বাজার থেকে গেছে হাজার হাজার কোটি। ডেঙ্গুতে প্রতিদিন বাড়ছে যে মৃত্যুর মিছিল, তার শুরুর কথায় আসি। এই যে বাতিল ঔষধ আনা হলো, যে ঔষধে এডিস মশা নির্মূল হলো না। ডেঙ্গু রূপ নিলো মহামারিতে। এতগুলো মানুষ মারা গেলো, প্রতিদিন যাচ্ছে। এই যে দুর্দশার চিত্র, এরজন্যে লজিক্যালি দায়ী অকার্যকর ঔষধ। অথচ বিষয়টি তেমন ফোকাসে নেই। এক অর্থে ‘আউট অব ফোকাস’!
তবে এমন দুঃসময়ে ডাক্তার ও নার্সদের কৃতজ্ঞতা না জানিয়ে উপায় নেই। তারা আক্রান্ত হবার সর্বোচ্চ ঝুকি নিয়ে রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন। ইতোমধ্যে মারাও গেছেন কয়েকজন ডাক্তার। ডা. তানিয়া সুলতানা নিজের ছোট্ট বাচ্চাটাকে ছেড়ে গেছেন অন্য ভুবনে। নিজে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে, অন্যকে বাঁচানোর কৃতিত্বটা এমন তানিয়া সুলতানাদেরই। অথচ একজন ডাক্তার যদি ভুল করেন, ভুল বা নষ্ট ঔষধ দেন। তাতে রোগী যদি মারা যায়, তবে আমরা আকাশ-পাতাল এক করে ফেলি। তাকে বলি হত্যাকান্ড। এখন যদি ডা. তানিয়ার স্বজনরা দাবী করেন, তার মৃত্যুর জন্য দায়ী নষ্ট ঔষধ, যে ঔষধে মশা মরেনি- তাহলে?
দুষ্টু লোকেরা বলেন, পরিচ্ছন্নতার নামে যে ‘ঝাড়ুচিত্র’ প্রদর্শিত হচ্ছে তাতে কি এডিস মশাদের ঝেটিয়ে বিদায় করা সম্ভব হচ্ছে? এডিস মশা তাড়াতে প্রয়োজন কার্যকর ঔষধের, যা আনতে বলছেন হাইকোর্ট। এইসব ‘ঝাড়ুচিত্র’ হয়তো খানিকটা বিতর্কের সৃষ্টি করবে। কেউ বলবেন, মানুষের দৃষ্টি ও চিন্তাকে অন্যদিকে নেয়ার জন্য এমনসব দৃশ্যের অবতারণা। কেউ হয়তো সচেতনতা সৃষ্টির পক্ষে দাঁড়াবেন। আর এমন বিতর্কে মূল দৃশ্যগুলো, মানুষের হাহাকারগুলো ক্রমে আড়ালে পড়ে যাবে। আর সেজন্যেই বিতর্কের এমন ‘ডাইভার্শন’টাও হয়তো খুব দরকারি, অন্তত এই সময়ে।
লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক।
সুত্র : বাংলা

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button