
।। সুরুয খান ।।
দেশে ১৩ অক্টোবর দ্বিতীয়বারের মতো পালিত হলো বিশ^ ডিম দিবস। ‘সুস্থ সবল জাতি চাই, সব বয়সেই ডিম খাই’ –প্রতিপাদ্যে এ বছর দেশে পালিত হয়েছে দিবসটি। অক্টোবর মাসের দ্বিতীয় শুক্রবারে ২০ বছর আগে থেকে বিশে^র বিভিন্ন দেশে দিবসটি পালন হয়ে আসছে। তবে বাংলাদেশে অনেকটা নিরবেই প্রথম বারের মতো পালন করা হয়েছিল এ দিবস। প্রাণি সম্পদ অধিদপ্তর কর্তৃক একটি অনুষ্ঠানে দাওয়াত না পেলে অনেক দিবসের মতোই ডিম দিবসও অনেকের মতো আমার কাছেও হয়তো অজানাই থেকে যেতো! ডিম দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে লক্ষ্য করেছি, ‘ডিম’ খাদ্য উপাদান হিসেবে বিশেষ গুরূত্বপূর্ণ হলেও এ সংক্রানÍ দিবস পালন নিয়ে অনেকেই কৌতূহল প্রকাশ করেছেন। তবে আমি বিষয়টিকে সেভাবে না দেখলেও একটা কৌতুক বলিÑ
ডিম আগে নাকি মুরগি আগে এ নিয়ে দু’ বন্ধুর মধ্যে বিতর্ক চলছে। দু’ বন্ধুই কথার ফুলঝরি ছড়াচ্ছে। মজার মজার সব যুক্তিরও অবতারণা করছে। এক পর্যায়ে মুরগি পক্ষের বন্ধু যুক্তি উপস্থাপন করলো, ডিমের আগে মুরগি এ কারণে যে, মুরগির আগে ডিম হলে সেই ডিমটি তা দিয়ে ফোটাবে কে?
ডিম পক্ষের বন্ধুটি তখন লাফ দিয়ে উঠে বলল, কেন? হাঁস!
ডিম পক্ষের বন্ধুটির মন্তব্য কথার কথা হলেও সম্প্রতি এ প্রশ্নের উত্তর পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। বিজ্ঞান বলছে, একমাত্র মুরগির শরীরের ভিতরেই ডিমের অস্তিত্ব থাকতে পারে। ওভোক্লেডিডিন-১৭ নামক একটি প্রোটিন ডিমের খোসা তৈরি হতে সাহায্য করে। কুসুমের বৃদ্ধি ও নতুন মুরগির জন্ম হতে এই খোসা ও ফ্লুইড খুবই গুরূত্বপূর্ণ। একটি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী শেফিল্ড ও ওয়ারউইক ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীরা ডিমের গঠন প্রক্রিয়ার ওপর সুপার কম্পিউটার জুম করেন। পরিক্ষা প্রমাণ করেছে ডিমের গঠনের জন্য ওসি-১৭ প্রোটিনের প্রয়োজন আবশ্যক। এই প্রোটিনের ক্যালসিয়াম কার্বোনেটকে ক্যালসাইট ক্রিস্টালে পরিণত করে যা ডিমের শক্ত খোসার গঠন তৈরি করে। অনেক প্রাণীর শরীরের হাড়ের মধ্যেও ক্যালসাইট ক্রিস্টাল পাওয়া যায়। কিন্তু মুরগির শরীর যে কোনও প্রাণীর থেকে এই ক্রিস্টাল বেশি তাড়াতাড়ি তৈরি করে। প্রতি ২৪ ঘন্টায় ৬ গ্রাম করে ক্যালসাইট ক্রিস্টাল তৈরি হয় মুরগির শরীরে। শেফিল্ড ইউনিভার্সিটির ইঞ্জিনিয়ারিং মেটিরিয়াল বিভাগের ড. কলিন ফ্রিম্যান জানিয়েছেন, অনেকদিন ধরেই মনে করা হত ডিম মুরগির আগে এসেছে। কিন্তু এখন বৈজ্ঞানিক ভাবে প্রমাণিত যে মুরগি ডিমের আগে এসেছে।
ডিম নিয়ে অনেক মজার ব্যাপার আছে। প্রতি বছর অস্বাভাবিক ও তুচ্ছ আবিষ্কারের জন্য ১০ টি ক্যাটাগরিতে প্যারোডি নোবেল খ্যাত ‘ইগ-নোবেল’ পুরস্কার দেওয়া হয়। প্রথমে মানুষকে হাসানো আর পরে চিন্তা করানোই ইগ-নোবেল পুরস্কারের উদ্দেশ্য। গেলো বছরের আগের বছর সিদ্ধ ডিমকে আবার আগের অবস্থায় ফেরত পাওয়ার হাস্যকর এক যন্ত্র আবিষ্কার করে এই পুরস্কার পেয়েছিলেন অস্ট্রেলীয় এক বিজ্ঞানী। অ্যাডিলেডের ফ্লিন্ডার্স ইউনিভার্সিটির রসায়ন বিভাগের প্রফেসর কলিন রাস্টোনের উদ্ভাবিত ওই মেশিনটির নাম ভরটেক্স ফ্লুইডিক ডিভাইস। মেশিনটির ভেতর সিদ্ধ ডিম দিলে ডিমের জমাট বাঁধা প্রোটিনগুলের বাঁধন যায় খুলে, ডিমটি ফিরে পায় তার প্রাকৃতিক দশা। কলিন রাস্টোনের উদ্ভাবিত মেশিনটি আপাতত অপ্রয়োজনীয় মনে হলেও তা ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রির জন্য অত্যন্ত গুরূত্বপূর্ণ আবিষ্কার হয়ে উঠতে পারে বলেও ধারণা করা হয়।
বিজ্ঞান সম্মত ডিম বিষয়ক আরেকটি মজার কথা বলি। আমরা বেশির ভাগ মানুষ জানি, যে ডিম পানিতে তলিয়ে যায় তা নি:সন্দেহে ভাল আর যে ডিম ভেসে থাকবে তা খারাপ! বিষয়টির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হল, খারাপ ডিমে হাইড্রোজেন সালফাইড নামের একটা গ্যাস তৈরি হয়। সেই গ্যাস ডিমের গায়ে অসংখ্য অতি ক্ষুদ্র ছিদ্র দিয়ে বের হয়ে আসে। ফলে ডিমের ভর কমে যায়। আর আমরা তো জানি যে, হালকা জিনিস পানিতে ভেসে থাকে এবং ভারী জিনিস ডুবে যায়। খারাপ ডিমের ভর কমে যাওয়ায় তা ভেসে থাকে। ভাল ডিম থেকে কোন গ্যাস নির্গত হয় না বলে ওটা তুলনামূলক ভারী থাকে এবং পানির ভেতর ডুবে যায়।
আমি আগেই বলেছি, ডিম দিবস পালনকে আমি মোটেই কৌতুক মনে করছি না। কারণ, আকৃতিগত (অনেকটা গোল) কারণেই হোক বা অন্য যে কোন কারণেই হোক ডিম নিয়ে মানুষ যতই হাস্যরস সৃষ্টি করুক না কেন, সুস্থ ভাবে বেঁচে থাকতে আমাদের জীবনে ডিমের প্রয়োজনীয়তার কথা অবশ্যই গুরূত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।
প্রতিদিন নাস্তায় ডিম না হলে আমাদের অনেকের নাস্তাই হয় ন্।া বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরাও এখন মত দেন, সকালের নাস্তায় প্রতিদিন ডিম রাখা উচিত। বিশেষ করে অন্যান্য পদ্ধতির তেলে ভাজা ডিম না খেয়ে প্রতিদিন একটি করে সিদ্ধ ডিম সকালের নাস্তার তালিকায় রাখা যায়। কারণ সিদ্ধ ডিমে আছে ভিটামিন, প্রোটিন ও শরীরের জন্য উপকারী চর্বি উপাদান। সকালের নাস্তায় একটি সিদ্ধ ডিম খেলে ৬ গ্রামের বেশি প্রোটিন পাওয়া যায়। একটি বড় সিদ্ধ ডিমে ৮০ ক্যালোরি থাকে। এর মধ্যে ৬০% ক্যালোরি আসে চর্বি থেকে। ফলে সকালের নাস্তায় একটি মাত্র সিদ্ধ ডিম খেলে সারাদিন শক্তি পাওয়া যায় এবং দুর্বলতা হ্রাস পায়।
আমরা আমাদের দেহের পুষ্টি সাধন ও শরীরকে সুস্থ রাখতে কত কিছুই না করি। অনেক অর্থ ব্যয় হয় নিজেকে সুস্থ রাখতে। তবে মানুষের দেহের পুষ্টির চাহিদা পূরণ করতে ডিমের দ্বিতীয় আর নেই বললেই চলে। প্রায় সকল ধরনের প্রয়োজনীয় পদার্থ রয়েছে ডিমের ভেতর। আর এ কারণে ডিমকে বলা হয় পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ পুষ্টিকর খাবার। ডিমে প্রায় ১১ ধরনের ভিটামিন, আমিষ ও খনিজ পদার্থ রয়েছে। ডিমের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবার যেমন কেক, পেস্ট্রি, চকোলেট, ভাজা খাবার ও কোমল পানীয় বাদ দিয়ে ডিম খেতে বলছেন। ডিমের ভেতরকার ভিটামিন এ, ভিটামিন ডি, কলিন, সালফার সমৃদ্ধ অ্যামিনো অ্যাসিড, সেলেনিয়াম, আয়রন ও জিঙ্ক চোখের স্বাস্থ্য, হাড় ও দাঁত গঠন, মস্তিষ্কের সুস্বাস্থ্য, দেহের ওজন নিয়ন্ত্রণ, নখ ও চুলের স্বাস্থ্য উন্নত করা এবং স্তনের ক্যানসার রোধে বিশেষ কাজ করে।
প্রসংগত, কোলেস্টরেলের ভয়ে অনেকে বিশেষ করে প্রবীণরা ডিম খেতে ভয় পান। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তত ভয় পাওয়ার কিছু নেই। মার্কিন ডিম বিশেষজ্ঞ ড. ডন ম্যাকনামারার মতে হৃদযন্ত্রের সুস্থতার জন্য সপ্তাহে ছয়টি করে ডিম খাওয়া উচিত। তার মতে দীর্ঘ গবেষণায় দেখা গেছে, আমাদের খাবারের কোলেস্টরেল হৃদরোগে কোন প্রভাব বিস্তার করে না। তিনি বলেন, সকালের নাস্তায় ডিম খেলে সারাদিন আরো বেশি কর্মক্ষম থাকা যায়। এটি দুপুরের খাবারের পরিমাণও হ্রাস করে। অল্প ব্যয়ে অধিক পুষ্টি নিশ্চিত করতে ডিমের জুড়ি নেই। অস্ট্রেলিয়ার ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন সাম্প্রতিক এক গবেষণায় জানিয়েছে, যারা সুষম খাদ্যাভাসে অভ্যস্ত, তাদের প্রতি সপ্তাহে ছয়টি ডিম খেতে কোন ক্ষতি নেই। ভারতীয় হার্ট ফাউন্ডেশনও সপ্তাহে ছয়টি করে ডিম খাওয়ার বিষয়টি মেনে নিয়েছে।
তবে ডিমের ব্যাপারে একটি বিষয়ে অধিকতর গুরূত্ব দিতে হবে। তা হচ্ছে, আমাদের দেশে বিভিন্ন খামারে যে পদ্ধতিতে হাঁস-মুরগির লালন-পালন হয় তা মোটেও স্বাস্থ্যকর নয়। অধিকাংশ খামারেই ক্যাফেইন, টাইলিনল, বেনাড্রাইল, নিষিদ্ধ এন্টিবায়োটিক, আর্সেণিক ইত্যাদি ক্ষতিকর উপাদানযুক্ত খাবার দেওয়া হয় মুরগিকে। ফলে এসব খামারের ডিমও বিষাক্ত উপাদানে পূর্ণ থাকে। এসব ডিম খেলে মানব দেহে মারাত্মক রকমের ক্ষতি হতে পারে। কাজেই খাওয়ার জন্য ডিম নির্বাচনের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে।
এদিকে সাম্প্রতিককালে এক ধরনের কৃত্রিম ডিমের কথা শোনা যাচ্ছে। চীন দেশে তৈরি এই ডিমের কথা বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ ছড়িয়ে পড়েছে। ইউটিউবে কৃত্রিম ডিম তৈরির একাধিক ভিডিও দেখা যায়। কোনও হাঁস বা মুরগির উৎপাদন নয়, মানুষই তৈরি করছে এই ডিম। ক্যালসিয়াম কার্বনেট দিয়ে তৈরি হচ্ছে এই ডিমের খোসা। আর কুসুমের অংশটি তৈরি হচ্ছে সোডিয়াম অ্যালজিনেট, অ্যালাম, জিলেটিন, ক্যালসিয়াম ক্লোরাইড এবং পানি ও রং দিয়ে। আপাতদৃষ্টিতে এই কৃত্রিম ডিম মুরগি ও হাঁসের ডিমের মতো হলেও এতে খাদ্যগুণ প্রায় নেই বললেই চলে। বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার পেলেও বাস্তবে বাংলাদেশে এখনো এই ডিমের অস্তিত্ব পাওয়া যায় নি। তবে এ ডিম সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। অবশ্য আমার ধারণা, কৃত্রিম বা নকল ডিম তৈরি করতে আসল ডিমের চেয়ে অনেক বেশি খরচ হওয়ার কথা। কাজেই পরিক্ষাগারে তৈরি হলেও এই ডিম বাজারজাত হওয়ার সম্ভাবনা আমি অন্তত দেখছি না।
আর একটি বিষয়ের উপর দৃষ্টি দিতে চাই। ডিমের খোসার ব্যবহার সম্পর্কে আমরা কতটা ওয়াকিবহাল ? প্রায় সময়ই ডিমের খোসার স্থান হয় ডাস্টবিনে। অথচ এই ডিমের খোসায় প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম এবং মিনারেল রয়েছে যা বাগানের উর্বরতা বৃদ্ধি করে। তাছাড়া বাসন-কুসন পরিষ্কার, দেহে জয়েন্টের ব্যথা উপশমে, কফির তেতো স্বাদ দূর করতে, বাগানের পোকামাকড় দূরীকরণে, রান্না ঘরের সিঙ্কের ময়লা পরিষ্কার করতে, ত্বকের প্যাক তৈরিতে, ঘরের টিকটিকি দূর করতে এবং নকশা করে ঘর সাজানোর জন্য ডিমের খোসা ব্যবহার করা যায়! এজন্য ব্যবহারের পদ্ধতিটা জানা থাকলেই হলো।
দেশের প্রাণী সম্পদ বিভাগ যে তথ্যটি গুরূত্ব সহকারে দিচ্ছে তা হলো, আজীবন সুস্থ থাকতে হলে প্রতিটি মানুষকে বছরে কমপক্ষে ১০৪টি ডিম খেতে হবে। কিন্তু দারিদ্রতার দরুন এ দেশের ৪০ শতাংশ মানুষ ডিম খেতে পারছে না। উন্নত বিশে^ সরকার পোল্ট্রি খামারিদের ভর্তুকি দেয়। তবে আমাদের দেশে তা দেওয়া হয় না। এ বিষয়ে সরকার ভেবে দেখতে পারে।
এ প্রতিবেদনে ডিম সংক্রান্ত যা উল্লেখ করেছি তা কিন্তু প্রধানত: হাঁস-মুরগির ডিমকেই প্রাসংগিক করে। মুখে মুখে প্রচলিত থাকলেও ঘোড়ার ডিম বলে কিছু নেই! এ সংক্রান্ত একটা কৌতুক দিয়েই শেষ করিÑ
ছাত্র : ঘোড়ার ডিমে তা দিলে কি হয় স্যার ?
শিক্ষক : ডিমের কিছু হয় না। তবে যে তা দেয়, সে গাধা হয়!
লেখক : সাংবাদিক




