শিরোনাম

ডায়েরির পাতায় পাতায় লেখা প্রেমিকের নানা প্রতারণাসহ হত্যার হুমকির কথা

রাহুল সরকার : রংপুরের কারমাইকেল কলেজের ইতহাস বিভাগের অনার্স শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী ও বদরগঞ্জ উপজেলার খোর্দবাগবাড় মিশন পাড়ার আদিবাসীদের ‘গর্ব’ রুখিয়া রাউত নিহত হওয়ার পূর্বে ডায়েরির পাতায় পাতায় লিখে গেছেন প্রেমিকের নানা প্রতারণাসহ হত্যার হুমকির কথা।
ডায়েরির এক জায়গায় রুখিয়া রাউত লিখেছেন- ‘২০১৭ সালের জুলাই মাসের ১১ তারিখের কিছুদিন আগে থেকে আনিছুল আমার সাথে কথা বলা শুরু করে। কথা বলার এক পর্যায়ে ও আমার সাথে রিলেশন করতে চায়। তখন আমি ওকে বলি যে আমি ভালোবাসা নিয়ে কারো সাথে অভিনয় করতে পারবনা। যাকে ভালোবাসব তাকে সত্যিকারভাবেই ভালোবাসব। কিন্তু তোকে আমার পক্ষে ভালোবাসা সম্ভব নয়।
তখন আনিছুল বলে কেন সম্ভব নয়। আমি তো তোকে ভালোবাসি। আমি বললাম তোমরা আলাদা জাতি আর আমরা আলাদা জাতি এটা সম্ভব নয়। তখন আনিছুল আমার সাথে জোর করে রিলেশন করতে চায়। ও বলে জাতি দিয়ে কিছু হবেনা আমি তোমার সাথে রিলেশন করব। অনেকদিন আমার সাথে ও ফোনে কথা বলে। কার কাছ থেকে ও আমার মোবাইল নাম্বার পেয়েছে জানতে চাইলে ও কিছু জানায়না। ও বলে তোমার নাম্বারটা আমি ম্যানেজ করে নিয়েছি। এভাবে অনেকদিন কথা বলার এক পর্যায়ে ও আমার সাথে অবৈধভাবে মেলামেশা করতে চায়। তখন আমি ওকে বললাম এটাতো সম্ভব না। তুই তো আমাকে ভালোবাসিস তাহলে খারাপ প্রস্তাব দিচ্ছিস কেন। আমি জানতাম না যে ও এতটা খারাপ। আমি বিশ^াস করেছিলাম ওকে, আর অনেক ভালোবেসেছিলাম। কিন্তু বুঝতে পারিনি যে ও ভালোবাসার নাম করে আমার জীবনটা এভাবে নস্ট করে দেবে।’
ডায়েরির এক জায়গায় বলা আছে- ‘২০১৭ সালের নভেম্বর মাসের ৯ তারিখে রাতে বাড়ির পাশের লিচু বাগানে জোর করে সিঁদুর পরিয়ে দেয়। তারপর জোরপূর্বক আমার সাথে শারীরীকভাবে মেলামেশা করে। আনিছুল যে সিঁদুর আমাকে পরিয়ে দিয়েছিল সেই সিঁদুরটা এখনো আমার ব্যাগে আছে। আমার সাথে মেলামেশা হয়ে যাবার পর ও অন্য মেয়ের সাথে কথা বলা শুরু করে। ওই মাসের পনের তারিখে ও সম্পর্ক শেষ করে দিতে চায়। কিছুদিন পর আবারো সে আমাকে ফোন দেয়, কথা বলে আবার জোর করে মেলামেশা করে। সে আমার কোন কথাই শুনতনা। ও আমাকে সিঁদুর পরিয়ে দেয়ার পর আমি ওকে স্বামী হিসেবেই মেনে নেই। আমার জীবনটা নস্ট করে ও আরেকজনকে বিয়ে করেছে আমার সম্মতি না নিয়ে।’
ডায়েরির আরেক জায়গায় রুখিয়া রাউত লিখেছেন- ‘অনেক আশা ছিল পড়াশোনা করে কোন একটা ভালো চাকরি করে বাবা-মা, ভাই-বোনের জন্য কিছু একটা করব। ভাল কিছু করব। কিন্তু ও আমাকে বাবা-মা, ভাই-বোনের জন্য ভাল কিছু করতে দিলনা। আমাকে শেষ করে ফেলল আনিছুল।’
রুখিয়া রাউতের শেষ লেখা- ‘আত্মহত্যা করতে গিয়ে কোনভাবে বেঁচে গেলাম। আজ ৫/১০/২০২০ আমাকে আনিছুল দূরে কোথাও ডেকেছে। সেখানে ও নিজের হাতে আমাকে হত্যা করবে। একথা ও নিজে বলেছে যে ও আমাকে নিজের হাতে হত্যা করবে। আমার সবকিছুর জন্য আনিছুল দায়ী।’
পরদিন ৬ অক্টোবর হাত-পা বাঁধা অবস্থায় তার লাশ পাওয়া যায় দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার হরিরামপুর ইউনিয়নের পাঁচপুকুরিয়ার রাস্তার ধারে একটি শালবাগানে।
নিহত রুখিয়া রাউতের বাবা দীনেশ রাউত বলেন, ছোটবেলা থেকে পড়াশোনার প্রতি রুখিয়ার প্রবল আগ্রহ থাকায় অনেক কষ্ট করে ওকে এতদূর এনেছি। কিন্তু সবকিছু নিমিষেই শেষ হয়ে গেল। মা সুমতি রাউত বলেন, রুখিয়া ছিল চাপা স্বভাবের। ওর যে এত বড় ঘটনা ঘটেছে সে কখনো তা’ কাউকে বুঝতে
দেয়নি।
বৃদ্ধ রাজদেব রাউত বলেন, রুখিয়া ছিল এখানকার আদিবাসীদের গর্ব। কারণ ওর মত মেধাবী কেউ ছিলনা। এমনকি শিক্ষায় অতদূর পর্যন্ত এখনও কেউ যেতে পারেনি।
এলাকা ঘুরে জানা গেছে- আনিছুল পেশায় একজন সবজি ব্যবসায়ী। মাস দেড়েক আগে সে বিয়ে করেছে।
লোকজনের ধারণা- এ থেকেই রুখিয়া রাউতের সাথে আনিছুলের সম্পর্কের অবনতি ঘটে এবং তা’হত্যাকাণ্ডে রূপ নেয়।
এঘটনায় পার্বতীপুর থানায় একটি হত্যা মামলা হয়েছে। পুলিশ হত্যকাণ্ডে জড়িত থাকায় তিনজনকে গ্রেফতার করেছে। এরা হলো- খোর্দবাগবাড়ের আব্দুল গফুরের ছেলে ও কথিত প্রেমিক আনিছুল (২৬), বাচ্চু মিয়ার ছেলে রাজ(২৫) এবং পার্বতীপুর উপজেলার দূর্গাপুর এলাকার নয়াপাড়ার জয়নাল আবেদীনের ছেলে আশিকুজ্জামান(৪০)। পার্বতীপুর মডেল থানার ওসি মোখলেছুর রহমান বলেন, প্রেমের সুত্র ধরেই এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। মূল আসামী আনিছুল আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী প্রদান করেছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button