টাইম বোমা’ কিনছে তারা

কাজল ঘোষ
৯/১১ পরবর্তী সময়ে বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তাদের সুদের হার কমিয়ে দেয়। পুঁজির ছড়াছড়ি অবস্থাতেও ব্যাংকগুলো নানান লোভনীয় প্যাকেজে ঋণ দিতে থাকে। এগুলোর মধ্যে ‘ইন্টারেস্ট অনলি’, ‘জিরো ডাউন’ ‘নিনজা- নো ইনকাম, নো জব, নো অ্যাসেট’ এমন সব অফারের ছড়াছড়ি ছিল। ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও আবাসন খাতে ঋণ নেয়ার ছড়াছড়ি লেগে যায়। সত্যি বলতে এগুলো আপাতদৃষ্টিতে ভালোই লাগছিল। ব্যাংকগুলো ঋণদাতাদের বলছিল যখনই বাড়ির মালিক ভাড়া পেতে শুরু করবে তখনই তারা ঋণ পরিশোধ শুরু করবে। এই লোভে মানুষ ঝুঁকি নিতেই পারে। কারণ তারা সবসময় দেখেছে বাড়ির দাম কখনও কমে না।
একই সময়ে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা যে টাকা দিয়েছে তার চেয়েও বেশি ফেরতের জন্য চাপ দিতে থাকে। এটি তাদেরকে আরো ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়। এই চাহিদায় ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগকারীরা সন্তুষ্ট হয়ে যান এবং তারা একই ধরনের ঋণে বিনিয়োগ করতে শুরু করেন। যেসব বিনিয়োগকারীরা ব্যাংকের কথা বিশ্বাস করে ঋণ নিয়েছিল তারা বিশ্বাস করতো ব্যাংকগুলো নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করছে। খুব সামান্য সংখ্যক মানুষই বুঝতে পারছিল তারা একটি ‘টাইম বোমা’ কিনছে। দিনশেষে এই জাতীয় ঋণ বড় ব্যাংকগুলোর ব্যালেন্সশিট হিসেবে পড়ে থাকে। এই চক্রটি নিজেই নিজেকে খেয়ে নিচ্ছিল। যতক্ষণ না পর্যন্ত এর শেষ হয়েছে ততক্ষণ শুধু গোগ্রাসে গিলেছে। ২০০৬ সালে আবাসন খাত ব্যবসায়ের শীর্ষ চূড়ায় পৌঁছায়। তবে এরপরই ব্যাংক এবং বিনিয়োগকারীরা তাদের অর্থায়ন সীমিত করে যেটি পুরো পরিস্থিতিকে আরো অবনতিশীল করে। ওয়ালস্ট্রিটের পতন হতে শুরু করে। বিয়ার স্টিয়ার্ন ব্যর্থ হয়। ক্লে ম্যান ব্রাদার্স দেউলিয়া ঘোষণা করে। পুঁজি কমে আসতে শুরু করে। অর্থনীতিতে ধস নামে। ২০০৯ সাল নাগাদ ফ্রেসনোতে বাড়ির দাম অর্ধেকে গিয়ে পৌঁছায়। জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক মন্দা শুরু হয়। একই সময়ে ফ্রেসনোর অধিবাসীরা চাকরি হারাতে শুরু করে। ২০১০ সালে নভেম্বর নাগাদ বেকারত্বের হার বেড়ে দাঁড়ায় ১৭ শতাংশ। একইসময়ে ঋণ পরিশোধের সময় শেষ হয়ে যায় এবং ঋণদাতারা তাদের সুদের হার দ্বিগুণ করে ফেলেন। এক ধরনের প্রতারক চক্র বাড়ির মালিকদেরকে সুদ মওকুফের ব্যবস্থা করে দেয়ার কথা বলে তাদের অর্থ নিয়ে ভেগে যায়। সমগ্র দেশজুড়ে একই অবস্থা চলছিল।
১৯৯৯ সালে ক্যারিনা এবং জুয়ান স্যান্টিলান লস অ্যানজেলেস থেকে বিশ কিলোমিটার দূরে একটি বাড়ি কিনেছিল। এই বাড়ি কিনতে জুয়ান বিশ বছর কালি উৎপাদন কারখানায় কাজ করে এবং ক্যারিনাকে তার ইন্স্যুরেন্স বিক্রয় করে দিতে হয়। বাড়ি কেনার কয়েক বছরের মাথায় মানুষরা তাদের দরোজায় কড়া নাড়তে শুরু করে। তারা তাদের কাছে বাড়ি বিক্রির প্রস্তাব নিয়ে আসে। সেন্টিনাল দম্পতি বলেন, এটি ছিল সহজেই লাভ। তোমার পাশের বাড়িটি কিনে নাও এবং এটি তোমাকে নিশ্চিতভাবে মুনাফা এনে দেবে। মিলিয়ন মিলিয়ন আমেরিকানদের মতো সেন্টিনাল দম্পতিও ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বাড়ি কিনে। ঐ সময়ে তাদেরকে প্রতি মাসে পরিশোধ করতে হতো ১২শ’ ডলার করে। তবে ২০০৯ সাল নাগাদ এটি বেড়ে দাঁড়ায় তিন হাজার ডলার। ঐ একই বছর ক্যারিনা তার চাকরি হারায়। ফলে ঋণ পরিশোধ করতে না পারায় তারা তাদের বাড়ি হারানোর ঝুঁকিতে পড়ে। এই সময় একটি কোম্পানি তাদের কাছে এসে তাদেরকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দেয়। বাড়ি বাঁচাতে সেই কোম্পানির সেবার জন্য ছয় হাজার আটশ’ ডলার পরিশোধ করেন সেন্টিনাল দম্পতি। এরপর তারা আবিষ্কার করেন তারা আসলে প্রতারিত হয়েছে। বাড়ি কেনার দশ বছরের মাথায় তারা তাদের সন্তানদের বলতে বাধ্য হন যে, তাদেরকে এই বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হবে।
কমালা হ্যারিসের অটোবায়োগ্রাফি
‘দ্য ট্রুথ উই হোল্ড’ বই থেকে।
সুত্র : মানবজমিন




