sliderফিচারশিরোনাম

জাতীয় কবি কাজী নজরুললের দর্শনে সমাজ ভাবনা ও প্রাসঙ্গিকতা

মো.নজরুল ইসলাম,মানিকগঞ্জ : ভুমিকা: উনবিংশ শতাব্দীর তূর্যবাদকের অবিংসবাদী নেতা ও কবি প্রেম দ্রোহ ও সাম্যের বাতিঘর জাতীয় কবি কাজী নজরুর ইসলাম। একনো তাঁর যে কবির কবিতা পাঠে হৃদয়ে স্পন্দন জাগে, রক্তে তােলে শিহরণ, তিনি আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি বিদ্রোহ ও তারুণ্যের কবি। তাঁর লেখনীতে লুকিয়ে ছিল সমগ্র ভারতবর্ষ তাথা সকল মানুষের মুক্তির সংগ্রামের বাণী। তাঁর কিছু কিছু লেখনীতে তা প্রকাশ পেয়েছে সাবলীলভাবে। যা জন্য তাঁকে কারাবরণ করতে হয়েছিল। বাংলা সাহিত্যে ধুমকেতুর মতো তার আবির্ভাব। অন্যায় অবিচার, জুলুম ও শোষণের বিরুদ্ধে তাঁর কবিতায় ধ্বনিত হয়েছে প্রচয় বিদ্রোহ। তিনিই শুনিয়েছিলেন সংগ্রাম ও বিপ্লবের কথা। জাতিকে দেখিয়েছিলেন স্বাধীনতার স্বপ্ন। পচনধরা প্রথাগত সমাজকে ভেঙ্গেচুরে স্বাস্থ্যকর নতুন এক সমাজ নির্মাণ করাই তাঁর স্বপ্ন ছিল। তাই তিনি বিদ্রোহ করেছিলেন সকল অন্যায়, অসত্য, শোষণ-নির্যাতন আর দুঃখ-দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে ।
জন্ম ও শৈশবকাল: কাজী নজরুল ইসলাম ১১ই জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬ বঙ্গাব্দে, ২৪শে মে ১৮৯৯ সালে ভারতের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। পিতার নাম কাজী ফকির আহমদ এবং মাতার নাম জাহেদা খাতুন। দাদার নাম কাজী আমিন উল্লাহ। শৈশবে মাত্র আট বছর বয়সে বাবাকে হারান। পিতার মৃত্যুর পর নজরুলের পরিবারে নেমে আসে চরম আর্থিক অভাব-অনটন দুঃখ দারিদ্র। ফলে শিক্ষাজীবন বাধাগ্রস্থ হয়। তখন থেকেই জীবিকা নির্বাহের জন্য তাকে কাজ করতে হয়। গ্রামের মক্তবে প্রাথমিক শিক্ষা লাভের পর কিছুদিন স্থানীয় মাজারে খাদেম, মসজিদে ইমামতি ও স্থানীয় মোল্লাগিরি করেন। নজরুলের জন্মের প‚র্বে তার একাধিক ভাইবোন মারা যায়। এজন্য ছোটবেলায় তাঁকে তাঁর পিতামাতা “দুখু মিয়া” বলে ডাকতেন। মাদ্রাসায় কাজ করার সুবাদে নজরুলের ভিতর ইসলামের মৌলিক আচার-অনুষ্ঠানের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হবার সুযোগ পান যা পরবর্তীকালে তার সাহিত্যকর্মে বিপুলভাবে প্রভাবিত করে। খুব অল্প বয়সে তাঁর কবিত্বশক্তির প্রকাশ পায়। তিনি মুখে মুখে ছন্দ মিলিয়ে পদ্য রচনা করতে পারতেন। গ্রামের লেটোর দলে যোগ দিয়ে নজরুল গান গেয়েছেন, অনেক পালাগান রচনা করেছেন।

শিক্ষা জীবন: ছোটবেলা থেকেই নজরুল ছিলেন মুক্তমনা। স্কুলের বাঁধাধরা জীবন তাঁর ভালো লাগতো না। তাছাড়া পারিবারিক অভাব-অনটনের কারণে তাঁর বেশি দুর পড়াশোনা করা হয়ে ওঠে নি। তার প্রাথমিক শিক্ষা ছিল ধর্মীয়, স্থানীয় এক মক্তবে তিনি পড়াশুনা করতেন। নিম্ন মাধ্যমিক পাঠ শেষ করেন মক্তবেই। ১৯১০ সালে লেটো দল ছেড়ে স্কুল জীবনে ফিরে আসেন। এই নতুন ছাত্রজীবনে তার প্রথম স্কুল ছিল রাণীগঞ্জের সিয়ারসোল রাজ স্কুলে। এরপর ভর্তি হন মাথরুন উচ্চ ইংরেজি স্কুলে যা পরবর্তীতে নবীনচন্দ্র ইনস্টিটিউশন নামে পরিচিতি লাভ করে। পারিবারিক আর্থিক সমস্যা তাঁকে বেশি দিন স্কুলে পড়তে দেয়নি। ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর তাঁকে আবার কাজে ফিরতে হয়। বাড়ি থেকে পালিয়ে তিনি মহকুমা শহর আসানসোলে গিয়ে রুটির দোকানে চাকরি নেন। রুটির দোকানের কাজের ফাঁকে নজরুল সুর করে গান গাইতেন পুঁথি করতেন। প্রতিভাবান বালক হিসেবে তাঁর গানে মুগ্ধ হয়ে আসানসোলের দারোগা কাজী রফিজ উল্লাহ নিজ বাড়ি ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশালের দরিরামপুর স্কুলে (বর্তমান নাম ত্রিশাল সরকারি নজরুল একাডেমি) সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি করে দেন। এখানে কিছুদিন পড়ালেখার পর নজরুল আবার গ্রামে ফিরে যান এবং ভর্তি হন সিয়ারসোল রাজ হাই স্কুলে। সেখানে অষ্টম শ্রেণী থেকে পড়াশোনা শুরু করেন। ১৯১৭ সালের শেষদিকে মাধ্যমিকের প্রিটেস্ট পরীক্ষার না দিয়ে তিনি সেনাবাহিনীতে সৈনিক হিসেবে যোগ দেন।

পারিবারিক জীবন: নার্গিস আসার খানম কবি নজরুল ইসলামের প্রথম স্ত্রী ছিলেন। ১৯২১ সালে কবির সাথে নার্গিসের বিয়েরন দিন ধার্য হয়। বিয়ে সম্পন্ন হলেও কাবিনে ঘর জামাই থাকার শর্ত নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হলে নজরুল বাসর সম্পন্ন না করে নার্গিসকে রেখে দৌলতপুর ত্যাগ করে কুমিল্লা শহরে বিরজাসুন্দরী দেবীর বাড়িতে চলে যান। আলী আকবর খানের সাথে পরিচিত হন। আলী আকবর খানের সাথে তিনি প্রথম কুমিল্লার বিরজাসুন্দরী দেবীর বাড়িতে আসেন। আর এখানেই পরিচিত হন প্রমীলা দেবীর সাথে। এরপর তাদের প্রনয় হন। ২৫ এপ্রিল ১৯২৪ (১২ বৈশাখ ১৩৩১) কবি নজরুলের সাথে প্রমীলা দেবীর বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এটি ছিল কবি নজরুলের দ্বিতীয় বিয়ে। বিয়েতে কাজী হিসাবে উপস্থিত ছিলেন সাহিত্যিক মইনুদ্দিন হোসেন। সাক্ষী হিসাবে কুমিল্লার আবেদনকারী আবদুস সালাম, সাংবাদিক মোঃ ওয়াজেদ আলী এবং কবি খান মুহাম্মদ মাইউদ্দিন উপস্থিত ছিলেন। কবির সাথে উপমহাদেশের প্রখ্যাত কমিউনিস্ট আন্দোলনের পুরোধা কমরেড মুজাফফর আহমদের আত্বিক সম্পর্ক ছিলো। তাই কবি তার সকল ঘটনা কমরেড মুজাফফর আহমেদকে তুলে ধরলে তিনিও তার সংসার জীবনে সর্বাত্বক সহযোগীতা করেন।

কবির শ্বশুরালয় মানিকগঞ্জের তেওতা: কাজী নজরুলের স্ত্রী প্রমীলা নজরুল ইসলামের জন্মস্থান এই তেওতা গ্রাম। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৯০৮ সালের ১০ মে। তেওতার মেয়ে আশালতা বা দুলীর সাথে নজরুলের বিয়ে হয় ১৯২৪ সালের ২৫ এপ্রিল কলিকাতায়। প্রমীলা নামটি নজরুলের দেওয়া। তার পরিবার প্রদত্ত নাম আশালতা সেনগুপ্তা ওরফে দোলোনা সংক্ষেপে দুলী। পরবর্তীকালে আশালতা সেনগুপ্তা প্রমীলা নজরুল, প্রমীলা দেবী, প্রমীলা সেনগুপ্ত ইত্যাদি নামে পরিচিতি লাভ করেন। প্রমীলার পিতার নাম বসন্ত কুমার সেনগুপ্ত। মায়ের নাম গিরিবালা সেনগুপ্তা ওরফে গিরিবালা দেবী। মা ও বাবা একই গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বসন্ত কুমার সেনগুপ্তের আরও দু’ভাই ছিলেন। তিনি ছিলেন মধ্যম। জগত কুমার সেনগুপ্ত ছিলেন তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা এবং ইন্দ্র কুমার সেনগুপ্ত ছিলেন তাঁর কনিষ্ঠ ভ্রাতা। ইন্দ্র কুমার সেন তাঁর স্ত্রী বিরজাসুন্দরী দেবীকে নিয়ে বসবাস করতেন কুমিল্লার কান্দিরপাড়ে। বসন্ত কুমার সেনের মৃত্যুর পর গিরিবালা দেবী তাঁর মেয়ে দুলিকে নিয়ে দেবর ইন্দ্রকুমার সেনের আশ্রয় গ্রহণ করেন।

এই সময় নজরুল কুমিল্লায় বেড়াতে এসে ইন্দ্রকুমার সেনের বাসায় আতিথেয়তা গ্রহণ করেন। ইন্দ্রকুমার সেনের স্ত্রী বিয়জাসুন্দরী দেবীর মাতৃস্নেহে নজরুল অভিভুত হন। আর তাঁর বড় ভাইয়ের মেয়ে আশালতা সেন দুলির গান শুনে বিমুগ্ধ হন কবি নজরুল। এমনিভাবে কুমিল্লায় কান্দিরপাড়ে বসবাসরত মানিকগঞ্জের তেওতা গ্রামের সেন পরিবারের সঙ্গে কবি নজরুলের গড়ে ওঠে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক। কবি নজরুল তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘দোলন চাঁপা’ প্রমীলার নামে উৎসর্গ করেন। ১৩৩০ সালের আশ্বিন মাসে ‘দোলনচাঁপা’ প্রথম প্রকাশিত হয়। প্রমীলার মৃত্যু হয় ৩০ জুন, ১৯৬২ সালে। নজরুল-প্রমীলার দু’ছেলে সব্যসাচী ও অনিরুদ্ধ। সব্যসাচীর দু’কন্যা খিলখিল ও মিষ্টি। প্রমীলা আমৃত্যু নজরুলের সেবা করে গেছেন।

কর্মজীবন: পারিবারিক আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে নজরুলকে অল্প বয়সে থেকেই কাজের জন্য ছুটতে হয়েছিল। যে বয়স ছিল অবাধ চঞ্চলের, হাসি-খুশির সে বয়সেই কবিকে ধরতে হয়েছিল কর্মজীবনের হাত। পিতাকে হারানোর পর পরিবারের আর্থিক অবস্থা এতই খারাপ হয়ে পড়েছিল যে কবিকে মাত্র আট বছর বয়সে জীবিকা অর্জনের জন্য কাজে নামতে হয়েছিল। মক্তবের নিন্ম মাধ্যমিকের পাঠ শেষ করার আগেই কবি সেই মক্তবেই শিক্ষকতা করেন। সেই সাথে হাজি পালোয়ানের কবরের সেবক এবং মসজিদের মুয়াযযিন হিসেবে কাজ শুরু করেন। তবে সেখানে তিনি বেশি দিন কাজ করেন নি। লেটো দল ছেড়ে আবার পড়াশুনায় মন দিলেও পরবর্তীতে তাকে আবার কাজে নামতে হয়। যোগ দেন বাসুদেবের কবি দলে। এর পর একজন খ্রিস্টান রেলওয়ে গার্ডের খানসামা এবং সবশেষে আসানসোলের চা-রুটির দোকানে রুটি বানানোর কাজ নেন। এভাবেই কষ্টে কেটেছিল জাতীয় কবি নজরুলের বাল্যকাল।

সৈনিক জীবন: ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে উঠে সমগ্র ইউরোপে। নজরুল তখন দশম শ্রেণীর ছাত্র। যুদ্ধের আহŸান শুনে স্কুল থেকে পালিয়ে তিনি ৪৯ নম্বর বাঙ্গালি পল্টনে সৈনিক হিসেবে যোগ দিয়ে চলে যান করাচি। নিজ দক্ষতায় অল্পদিনের মধ্যে নজরুল হাবিলদার পদে উন্নীত হন। সেনা শিবিরে ব্যস্ততার মাঝেও তিনি সাহিত্য চর্চার চালিয়ে যান। করাচি থেকেই তিনি কলকাতার বিভিন্ন পত্রিকায় লেখা পাঠান। তার প্রথম লেখা বাউÐুলের আত্মকাহিনী নামে একটি গল্প এবং প্রথম কবিতা মুক্তি। সৈনিক থাকা অবস্থায় তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেন। এ সময় নজরুলের বাহিনীর ইরাক যাবার কথা ছিল। কিন্তু যুদ্ধ থেমে যাওয়ায় আর যাননি। ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে যুদ্ধ শেষ হলে ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্ট ভেঙে দেয়া হয়। এরপর তিনি সৈনিক জীবন ত্যাগ করে কলকাতায় ফিরে আসেন।

সাংবাদিক জীবন: প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর নজরুল কলকাতায় এসে ৩২ নং কলেজ স্ট্রিটে বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির অফিসে বসবাস শুরু করেন। এখান থেকেই তাঁর সাহিত্য-সাংবাদিকতা জীবনের মুল কাজ শুরু হয়েছিল। বিভিন্ন পত্রিকায় যেমন মোসলেম ভারত, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, উপাসনা প্রভৃতি পত্রিকায় তাঁর বেশ কিছু লেখা প্রকাশিত হয় এবং এরই ধারাবাহিকতায় কবি ও সমালোচক মোহিতলাল মজুমদার পত্রিকায় তার খেয়া পারের তরণী এবং বাদল প্রাতের শরাব কবিতা দুইটি প্রশংসা করে একটি সমালোচনা প্রবন্ধ লিখেছেন। যার ফলে সাহিত্য ও সমালোচকদের মাঝে নজরুলের ঘনিষ্ঠ পরিচয় শুরু হয়। ১৯২১ সালের অক্টোবর মাসে তিনি শান্তিনিকেতনে যেয়ে রবীন্দ্রনাথের সাথে সাক্ষাৎ করেন। দুজনের মধ্যে বন্ধুত্বপ‚র্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠে। নজরুলের সাংবাদিকতা শুরু হয় ১৯২০ সালে। অসহযোগ ও খিলাফত আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে প্রকাশিত নবযুগ নামক একটি সান্ধ্য দৈনিক পত্রিকার নিয়মিত সাংবাদিকতা করতেন নজরুল। সওগাত পত্রিকার ১৩২৭ বঙ্গাব্দের বৈশাখ সংখ্যায় নজরুলের প্রথম গান “বাজাও প্রভু বাজাও ঘন” প্রকাশিত হয়।

রাজনৈতিক জীবন: সাহিত্যকর্ম ছাড়াও কবি নজরুল রাজনীতিতেও ছিলেন সক্রিয় ছিলেন। সৈনিক জীবন ত্যাগ করার পর উপম তার মধ্যে রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ শুরু। তাঁর নেপথ্যে ছিলেন এদেশের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন প্রতিষ্ঠার অগ্রদ‚ত মুজফ্ফর আহমেদ। তাঁরই হাত ধরে নজরুল বিভিন্ন সভা-সমিতি ও বক্তৃতায় অংশগ্রহন করতেন। রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব তাকে নানাভাবে প্রভাবিত করে। যার স্পষ্ট রূপ ফুটে উঠে তার লেখা সাম্যবাদী ও সর্বহারা কবিতায়। অনিচ্ছা থাকা সত্তে¡ও কবি নজরুল অসহযোগ ও খিলাফত আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। এর কারণ, এই সংগ্রাম দুটি ভারতীয় হিন্দু মুসলমানদের সম্মিলিত সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল। ১৯২০ এর দশকের জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে পরাজয়ের মাধ্যমে কবির রাজনৈতিক জীবন থেকে সরে গিয়ে সাহিত্যের প্রতি মনোনিবেশ করেন।

সাহিত্যকর্ম: কবি নজরুলের সাহিত্যকর্ম ছিল মাধুর্য্য, পান্ডিত্যে আর সংগ্রামে ভরা। নজরুল একধারে কবিতা, সঙ্গীত, গদ্য রচনা, গল্প ও উপন্যাসে পটু ছিলেন। নানান সময়ে তিনি দুঃখ বরণ করেও সাহিত্যচর্চা প্রাধান্য দিয়েছেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পর কলকাতায় ফিরে এসে নজরুল পুরোপুরি সাহিত্যে মনোনিবেশ করেন। এ সময় ভারতে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন চলছিল। করাচি থেকে পাঠানো কয়েকটি লেখা প‚র্বে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশের কারণে নজরুল কলকাতার কবি-সাহিত্যিক মহলে সমাদৃত হন। তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘বিদ্রোহী’ প্রকাশিত হলে নজরুলের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। তার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘ব্যথার দান’ এবং প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অগ্নিবীণা’ ১৯২২ সালে প্রকাশিত হয়। গল্প, উপন্যাস, কবিতা, নাটক, প্রবন্ধ, গানসহ প্রায় পঞ্চাশটি গ্রন্থ রচনা করেন। এছাড়াও নজরুলের ‘নবযুগ’, ‘ধ‚মকেতু’, ‘লাঙল, ‘গণবাণী’ পত্রিকা সম্পাদনা করেন। নজরুলের লেখায় নিপীড়িত মানুষের মুক্তির কথা ধ্বনিত হয়েছে। তাঁর ভাষায়। মহা বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত, আমি সেই দিন হব শান্ত, যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে-বাতাসে ধ্বনিবে নাঅত্যাচারীর খড়গ-কৃপাণ ভীম রণ-ভ‚মে রণিবে না,বিদ্রোহী রণক্লান্ত আমি সেই দিন হব শান্ত।

নজরুলের গানের সংখ্যা চার হাজারের অধিক। নজরুলের গান নজরুল সঙ্গীত নামে পরিচিত। নজরুলের প্রথম গদ্য রচনা ছিল “বাউÐুলের আত্মকাহিনী”। ১৯১৯ সালের মে মাসে এটি সওগাত পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। নজরুল ছিলেন ঔপনিবেশিক আমলের কবি। তাই ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে তিনি কবিতা লিখেছেন। তাঁর কবিতা বাজেয়াপ্ত হয়েছে। কবিতা লেখার অপরাধে তিনি জেলে গেছেন। তবু তিনি পিছপা হননি, সত্য-সুন্দর-ন্যায়ের কথা বলেছেন, জাতিকে শুনিয়েছেন মুক্তির গান। প্রার্থনা করা যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস,যেন লেখা হয় আমার রক্ত লেখায় তাদের সর্বনাশ।

বিদ্রোহী নজরুল: কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার ম‚ল বিষয়বস্তু ছিল মানুষের উপর মানুষের অত্যাচার ও সামাজিক অনাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ। নজরুল ইসলামের কবিতা দুই বাংলাতেই সমানভাবে সমাদৃত। তার কবিতায় বিদ্রোহী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তাকে বিদ্রোহী কবি নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে। একাধারে কবি, সাহিত্যিক, সংগীতজ্ঞ, সাংবাদিক, সম্পাদক, রাজনীতিবিদ এবং সৈনিক হিসেবে অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে নজরুল সর্বদাই ছিলেন সোচ্চার। তার কবিতা ও গানে এই মনোভাবই প্রতিফলিত হয়েছে। অগ্নিবীণা হাতে তার প্রবেশ, ধ‚মকেতুর মতো তার প্রকাশ। যেমন লেখাতে বিদ্রোহী, তেমনই জীবনে কাজেই “বিদ্রোহী কবি”।

কবির অসুস্থতা: সাংবাদিকতার পাশাপাশি নজরুল বেতারে কাজ করতেন। ১৯৪২ সালে কবি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন যার ফলে তিনি বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেন। এর জন্য তাঁকে জন্য হোমিওপ্যাথি ও আযুর্বেদিক চিকিৎসা করানো হয়। কিন্তু অবস্থার কোন উন্নতি হয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে উন্নত চিকিৎসার জন্য কবিকে ইউরোপ পাঠানো সম্ভব হয়নি। ১৯৪২ সালের শেষের দিকে কবি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন এবং পরবর্তী ১০ বছর অর্থাৎ ১৯৫২ সাল পর্যন্ত তিনি সপরিবারে নিভৃতে ছিলেন। ১৯৫৩ সালে নজরুল ও তার স্ত্রী প্রমীলা দেবীকে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে পাঠানো হয়। লন্ডনে পৌঁছানোর পর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তার রোগ নির্ণয়ে চেষ্টা করেন। এবং বুঝতে পারলেন নজরুল এমন এক দুরারোগ্য রোগে ভুগছেন যা আরোগ্য লাভ করা ছিল প্রায় অসম্ভব। এরপর ১৯৫৩ সালে কবিকে আরো একবার পরীক্ষা করানো হয় এবং পরীক্ষায় চিকিৎসক নিশ্চিত হন যে কবি পিক্স ডিজিজ নামক একটি নিউরন ঘটিত সমস্যায় ভুগছেন এবং এই অবস্থা থেকে আরোগ্য করে তোলা অসম্ভব বলে জানান। এরপর কবি রুম থেকে দেশে উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন।

বাংলাদেশে আগমন: ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশ বিজয় লাভ করার পর একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ভারত সরকারের অনুমতিক্রমে ১৯৭২ সালের ২৪শে মে কবি নজরুলকে সপরিবারে বাংলাদেশ নিয়ে আসা হয়। বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান এর বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এরপর বাকি জীবনট কবি বাংলাদেশে কাটান। ১৯৭৬ সালে কবি নজরুলকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদানের সরকারি আদেশ জারি করা হয়।

কবির প্রয়াণ: যথেষ্ট চিকিৎসা দেওয়া সত্তে¡ও নজরুলের স্বাস্থ্যের অবস্থার বিশেষ কোনো উন্নতি হয়নি। ১৯৭৪ সালে কবির সবচেয়ে ছোট ছেলে মৃত্যুবরণ করে। ১৯৭৬ সালের নজরুলের স্বাস্থ্যেরও অবনতি হতে শুরু করে এবং ঢাকার পিজি হাসপাতালে ভর্তি হন। ২৯ আগস্ট ১৯৭৬ (১২ ভাদ্র ১৩৮৩) ঢাকার পিজি হাসপাতালে ৭৭ বছর বয়সে কবি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের উত্তর পার্শ্বে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়। বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে। তবে প্রমিলা দেবীর মারা যাওয়ার পুর্বে ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন তাঁর কবরের পাশে জায়গা যেন স্বামীর জন্য রাখা হয়। কিন্তু প্রমিলার শেষ ইচ্ছাটা আর পুরণ হয় নি। প্রমিলা দেবীকে সমাধিস্থ করা হয় চুরুলিয়ায় নজরুলের পৈতৃক বাড়িতে।

সম্মাননা: ভারত ও বাংলাদেশ উভয় দেশ থেকে কবি অনেক সম্মাননা পেয়েছেন। খ্যাতিমান এই কবি দু’দেশের মানুষের হৃদয় মন জয় করেছিলেন তাঁর লিখনি দিয়ে। বাংলাদেশ সরকার কাজী নজরুল ইসলামকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জাতীয় কবির মর্যাদা দেওয়াা হয়। রচিত “চল্ চল্ চল্, ঊর্ধগগনে বাজে মাদল” বাংলাদেশের রণসংগীত হিসাবে গৃহীত। বাংলা সাহিত্য এবং সংস্কৃতিতে তার বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দের ৯ ডিসেম্বর তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। তাকে সম্মানসুচক ডি.লিট উপাধিতে ভুষিত করে। ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারী মাসে বাংলাদেশ সরকার কবিকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করে। ১৯৭৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাকে বাংলাদেশের সবচেয়ে সম্মানসুচক পদক একুশে পদকে ভুষিত করা হয়। নজরুলের জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী প্রতি বছর বিশেষভাবে উদযাপিত হয়। ঢাকায় কবির স্মৃতিতে নজরুল একাডেমি, বুলবুল ললিতকলা একাডেমী ও শিশু সংগঠন বাংলাদেশ নজরুল সেনা স্থাপিত হয়। কবির স্মরণে ঢাকার একটি সড়কের নামকরণ করা হয় কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ। তাছাড়া কবির নামে ত্রিশালে (বর্তমানে ময়মনসিংহ জেলায়) একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। যা নাম জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।
ভারত সরকার ১৯৪৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক বাংলা সাহিত্যের সর্বোচ্চ পুরস্কার জগত্তারিণী স্বর্ণপদক নজরুলকে প্রদান করা হয়। ১৯৬০ সালে ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদ্মভ‚ষণে ভ‚ষিত করা হয়। চুরুলিয়ার আসানসোলে ২০১২ সালে কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে। কাজী নজরুল ইসলাম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর যা কবির নামকরণে রাখা হয়েছে। কলকাতার প্রধান একটি সড়ক কাজী নজরুল ইসলাম সরণি কবির নামকরণে রাখা হয়েছে। কলকাতা মেট্রোর গাড়ি বাজার মেট্রো স্টেশনটির নাম রাখা হয়েছে কবি নজরুল মেট্রো স্টেশনসহ বেসরকারিভাবে আরো অনেক প্রতিষ্ঠানের নাম।
পরিশেষে বলতে চাই মানবতার কবি, সাম্যের কবি, সুন্দরের কবি, প্রেমের কবি নজরুল ইসলাম। ‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরি, আর হাতে রণত‚র্য– এ কেবল নজরুলের পক্ষেই বলা সম্ভব। কারণ, তিনি নিপীড়িত-লাঞ্ছিত মানুষের কথা ভেবেছেন। পরাধীন জাতির মুক্তির কথা বলেছেন। উপমহাদেশের ইতিহাসে একমাত্র নজরুলই কবিতা লেখার অপরাধে জেল খেটেছেন। নজরুল ছিলেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা। তাই বাংলাদেশ সরকার তাঁকে দিয়েচেজ আমাদের জাতীয় কবি’-র মর্যাদা। দু:খজনক হলেও সত্য আমরা জাতীয় কবির প্রেম দ্রোহ ও সাম্যবাদের অমর বাণী ও দর্শন ধারন ও লালন করতে পারিনি এবং তাঁর মতাদর্শ থেকে আমাদের বিচ্যুতির ফলেই গণতান্ত্রিক ধারায় সামাজিক কাঠামো বির্ণিমান সম্ভব হয়নি। আমরা কবির চেতনা ও মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক চেতনা বুকে ধারন করে সামাজিক মালিকানার ন্যয্যতার সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখি।
লেখক: মো. নজরুল ইসলাম,উন্নয়নকর্মী ও গবেষক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button