Uncategorized

ছাত্র আন্দোলন ও শ্রেণী সংগ্রামের লাড়াকু সৈনিক বীর মুক্তিযোদ্ধা কমরেড লুৎফর রহমান খান লোবান

মো.নজরুল ইসলাম: মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি: শৈশবে খেলাঘরে শান্তির পায়রায় আরোহন করে ছাত্র জীবন থেকেই নিষ্ঠার সহিত ঐক্য শিক্ষা শান্তি প্রগতির চার তারকা ও নীল পতাকা হাতে নিয়ে ১৯৬৯ সালে স্বৈরাচার আয়ুব বিরোধী দুর্বার গণআন্দোলনে মানিকগঞ্জ সরকারি দেবেন্দ্র কলেজ তথা জেলার ছাত্রদের মুক্তির পতাকাতলে আনতে যে সকল বীর সেনানী অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম তৎতকালীন মানিকগঞ্জ সরকারি দেবেন্দ্র কলেজের ভিপি বীর মুক্তিযোদ্ধা লুতফর রহমান খান লোবান।
আমরা জানি বাংলাদেশ জন্মের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের মাইল ফলক হয়ে আছে গেল শতকরে ষাটের দশকটি। ্এই দশকেই এদেশের ছাত্র সমাজ গণবিরোধী শিক্ষা কমিশনের বিলটি বাতিলের দাবিতে আন্দালন গড়ে তোলে, এই দশকেই ধর্মবাদি পাকিস্তানি রাষ্ট্র ব্যাবস্থার বিপরীতে ভাষাভিত্তিক বাঙালী জাতীয়তবাদের উন্মেষ ঘটে। এই দশকেই আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসনের ’ম্যাগনাকার্ট’ হিসেবে পরিচিত ৬ দফা কর্মসূচি ঘোষিত হয়। এই দশকেই গণঅভুথ্থানের মুখে প্রবল প্রতাপশালী শাসক আউব খান বিদায় নিতে বাধ্য হন। বাংলাদেশের প্রগতিশীল রাজনৈতিক ও ছাত্র আন্দোলনও বিস্তৃতি পায় এই দশকটিতে। সেই সময় কমিউনিস্ট পার্টি ছিলো নিষিদ্ধ। তাই ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) ও ছাত্র ইউনিয়ন হয়ে ওঠে রাজনীতির অন্যতম নিয়ামক শক্তি।
সেই অগ্নিগর্ভের সময়কালে ঢাকা জেলার ধামরাই উপজেলার চৌহাট ইউনিয়নের পাড়াগ্রাম গ্রামের এক প্রান্তিক কৃষক পরিবারে পিতা মৃত মোহাম্মদ আলী,মাতা মৃত ফাতেমা খাতুন এর ঘরে ১৯৪৭ সালের ৩০ নভেম্বর জন্মগ্রহন করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা কমরেড লুৎফর রহমান খান লোবান। তিনি গতকাল ৩ ডিসেম্বর ২০২১ শুক্রবার সন্ধ্যা ৬ ঘটিকায় ধামরাই উপজেলা পাড়াগ্রামে তার নিজ বাসভবনে উচ্চরক্তচাপ ও ডায়বেটিকসসহ বার্ধক্যজনিত রোগের সাথে যুদ্ধ করে শেষ নি:শ^াস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর। তিনি এক ছেলে এক মেয়ে ও তার স্ত্রী সেলিনা রহমানসহ অসংখ্য গুণগ্রাহীদের রেখে না ফেরার দেশে চলে যান।
আজ বেলা ১১ ঘটিকায় পারাগ্রাম মাঠে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার শেষকৃত্যনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। তারপর এলাকার কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। ধামরাই উপজেলা প্রশাসনের পক্ষে শ্রদ্ধা ও গার্ড অব অনার প্রদানকালে উপস্থিত ছিলেন ধামরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হোসাইন মোহাম্মদ হাই জকী, ধামরাই থানা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার বীরমুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রহমান, ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আব্দুল আলীম খান সেলিম ও মরহুমের ছেলে আশিকুর রহমান খান,মানিকগঞ্জ জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি এম আর লিটন,সাধারন সম্পাদক মো.রাসেল খান,সহ-সভাপতি রুমা আক্তার, কোষাধাক্ষ সম্পা আক্তার প্রমুখ।
অন্যদিকে বীর মুক্তিযোদ্ধা লুৎফর রহমান খান লোবান এর মৃত্যুতে তার বিদেহী আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা ও পরিবারে প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন ও শোক প্রকাশ করেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি সিপিবি কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম,সাধারন সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা কমরেড মো.শাহ আলম, গণফোরাম প্রেসিডিয়াম সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মফিজুল ইসলাম খান কামাল,কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যতম সদস্য ও মানিকগঞ্জ জেলা কমিটির সাবেক সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা কমরেড আজাহারুল ইসলাম আরজু, মানিকগঞ্জ জেরা আওয়ামলীগের সাধারন সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা এ্যাড.আব্দুস সালাম, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদের জেলা সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আফজাল হোসেন খান জকি, সিপিবি জাতীয় পরিষদের সদস্য ও জেলা কমিটির সাবেক সাধারন সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা এ্যাড. মিজানুর রহমান হযরত, সিপিবি মানিকগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি অধ্যাপক আবুল ইসলাম সিকদার ও সাধারন সম্পাদক কমরেড মুজিবুর রহমান মাস্টার, বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘ মানিকগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি অধ্যাপক শ্যামল কুমার সরকার ও সাধারন সম্পাদক মো. নজরুল ইসলাম প্রমুখ।
তিনি ছোটকাল থেকেই ঢাকা জেলার কৃষক ক্ষেতমজুর ও বামপন্থি আন্দোলনের মহান নেতা জ্ঞান চক্রবর্তী ও কমরেড জিতেন ঘোষদের সান্নিধ্য পান। ছাত্র জীবনের তিনি খুবই মেধারী ছাত্র ছিলেন। ১৯৬৬ সালে তিনি বিজ্ঞান বিভাগ থেকে তিন বিষয়ে লেটার পেয়ে প্রথম বিভাগে ম্যাট্টিকুশেন পাশ করেন। তারপর দেবতাতুল্য কমরেডদের মাধ্যমেই তিনি মানিকগঞ্জ অঞ্চলের বামপন্থি পুরোধা কমরেড প্রমথ নাথ নন্দী,ডা: শামসুর রহমান,সৈয়দ আনোয়ার আলী চৌধুরীর মতোন মহান মানুষের সাথে পরিচিত লাভ করেন। তাদের নির্দেশেই ভাষা আন্দোলনের সূতিকাগার ও ঐতিহাসিক গণঅভ¦থানের অগ্নিঝড়া উত্তাল হাওয়ার সময় মানিকগঞ্জ সরকারি দেবেন্দ্র কলেজে একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি হন। তারপর সক্রিয়ভাবে ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে জরিয়ে পরেন। তার সাংগঠনিক দক্ষতা ও বিচক্ষনতায় প্রথম বছরেই সংগঠন শক্তিশালী রুপ নেয় এবং তিনি ছাত্র ইউনিয়ন দেবেন্দ্র কলেজ সংসদের সভাপতির দয়িত্ব পালন করেন। পরের বছরই ছাত্র ইউনিয়নের প্যানেল থেকে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে ভিপি নির্বাচিত হন। তারপর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেক মুজিবুর রহমান এর ডাকে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেন এবং বীরত্বের পরিচয় দেন। তিনি ক্যাপ্টেন আব্দুল হালিম চৌধুরীর নেতৃত্বে ঢাকা ধামরাই অঞ্চলে যুদ্ধের নেতৃত্ব দেন। ছাত্রজীবন থেকে আমৃত্য তিনি শ্রেণী সংগ্রামের পথে হেটেছেন। তিনি দীর্ঘদিন কমিউনিস্ট পার্টি মানিকগঞ্জ শহর শাখার সম্পাদক ও ধামরাই উপজেলা কমিটির সহ সভাপতি এবং কৃষক সমিতির সাধারন সম্পদকের দায়িত্ব নিষ্ঠার সহিত পালন করেন।
পেশাগত জীবনে তিনি হাইস্কুলে শিক্ষকতা ও বাড়ীতে কৃষি কাজ করতেন। অর্থকড়ি,সম্মান যশ খ্যাতির লোভ লালসা একেবারেই ছিলো না বলে ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার নিয়ে কখনই ভাবেননি। সারাজীবন আদর্শের রক্ত পতাকা হাতে নিয়ে কৃষক ক্ষেতমজুরদের সংগঠিত করতে কাজ করেছেন নিরলসভাবে। শ্রেণী সংগ্রামের তত্ত¡ ও প্রয়োগের মিশ্রন বেশ ভালো জানতেন কমরেড লোবান ভাই। কাজের প্রতি তার নিষ্ঠা ও স্প্রীট আমাদেরকে এখনো হার মানায়। ট্রেড ইউনিয়ন শ্রমিক সংগঠন ও সিপিবির লাল পতাকা নিয়ে শক্ত হাতেই ছিলেন কমরেড লুৎফর রহমান খান লোবান।
সময়ের প্রয়োজনে কমরেড লোবানরা বারবার এ পৃথিবীর জঞ্জাল সরাতে না আসলেও যুগে যুগে আসবেই। মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহনের গর্বিত ভাগিদার হয়েও শোষণমুক্ত শ্রেণীহিন সমাজ দেখে যেতে পারলেন না এটাই তার বড় কষ্ট। রাজনীতির জোয়ার ভাটার যৌবন দেখলেও দ্বি দলীয় বৃত্তকে ভাঙতে পারেনি বরং বর্তমান শাসক দলের চরম ফ্যাসিবাদী চরিত্রের ঘনিভূত রুপ দেখে কষ্ট মনেই যেতে হলো কমরেড লুতফর রহমান খান লোবান ভাইকে। রাজনীতির সোনালী দিনে জন্ম হলেও সমাজ ও রাজনীতির কৃষ্ণপক্ষে বিদায় দিতে হলো আপনাকে। হে প্রিয় কমরেড জাতির শ্রেষ্ট সন্তান লুৎফর রহমান খান লোবান। আমরা আপনার রক্ত পতাকার উত্তসূরী হিসেবে অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করে অনিবার্য্য বিপ্লবের পথকে তরান্বিত করবই। সংগ্রামী লাল সালাম জাতির হে শ্রেষ্ঠ সন্তান।
[লেখক: মো. নজরুল ইসলাম,সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি,সিপিবি,মানিকগঞ্জ জেলা কমিটি]

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button