
পতাকা ডেস্ক: গণভোটের ব্যালটে প্রশ্ন ছিল, ‘আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলোর প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করছেন?’ এই প্রশ্নের পক্ষে অর্থ্যাৎ ‘হ্যাঁ’ মতামত দিয়ে সম্মতি জানিয়েছেন ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯ ভোটার।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় এখন জুলাই জাতীয় সনদে একমত হওয়া বিষয়ের আওতায় সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এই কাজ করবেন সংসদ নির্বাচনে জয়ী এমপিরা। সংসদের অধিবেশন শুরুর ১৮০ দিন পর্যন্ত তারা ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ এর সদস্য হিসেবে পরিচিত হবেন। অর্থ্যাৎ, জুলাই সনদে একমত হওয়া বিষয়গুলোর আলোকে তারা সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংস্কার আনবেন। গণভোটের ফলাফলের বিস্তারিত জানতে পড়ুন: জিতেছে ‘হ্যাঁ’, গণভোট ৬০.২৬ শতাংশ
বিষয়টি ভালোভাবে বুঝতে গণভোটের প্রশ্নের আওতায় থাকা চারটি বিষয়ের দিকে নজর দেওয়া যাক;
ক. নির্বাচনকালীন সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে।
খ. আগামী সংসদ হবে দুই কক্ষ বিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে।
গ. সংসদে নারী প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য হয়েছে সেগুলোর বাস্তবায়ন।
ঘ. জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।
এটি একটি উদাহরণ দিয়ে বোঝানো যাক। বর্তমান সংবিধানের চতুর্থ ভাগে ‘প্রধানমন্ত্রী পদের মেয়াদ’ অংশে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমার কথা উল্লেখ নেই। কিন্তু গণভোটের প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণের কথা আছে। এখন গণভোট জয়ী হওয়ায় সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সংক্রান্ত অনুচ্ছেদ সংশোধন করা হবে। তখন সেখানে যুক্ত করা হবে ‘একজন ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী পদে যত মেয়াদ বা যত বারই হোক সর্বোচ্চ ১০ বছর থাকতে পারবেন।’ এই মেয়াদ সংক্রান্ত বিষয়টি উল্লেখ আছে জুলাই জাতীয় সনদে।
এই যে সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া; এটি বাস্তবায়ন করাই ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ এর দায়িত্ব।
পরিষদ কি সনদ বাস্তবায়নে বাধ্য
হ্যাঁ। গত বছরের নভেম্বরে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টাও বিষয়টি স্পষ্ট করেছিলেন। সংসদে নারী প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকারসহ জুলাই জাতীয় সনদের যে ৩০টি প্রস্তাবে রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্য হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নে নির্বাচনে বিজয়ী দল বাধ্য থাকবে।
উচ্চকক্ষ কীভাবে গঠন হবে
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলে দেশে প্রথমবারের মতো সংসদ হবে দুই কক্ষ বিশিষ্ট। গত নভেম্বরে প্রধান উপদেষ্টা তাঁর ভাষণে বলেন, উচ্চকক্ষের সদস্য হবেন ১০০ জন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে এই সংখ্যক সদস্য নিয়ে উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে।
আনুপাতিক বা পিআর পদ্ধতিতে আসন বণ্টন হয় প্রতিটি রাজনৈতিক দলের প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে। ধরুন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট পড়েছে ১০ কোটি। এর মধ্যে ‘ক’ নামের দল পেয়েছে ৫ কোটি বা ৫০ শতাংশ। তাহলে উচ্চকক্ষে এই দলের প্রতিনিধি সংখ্যা হবে ৫০। আবার ‘খ’ নামের দল পেয়েছে ভোট প্রদত্ত ভোটের ১ শতাংশ। তাহলে উচ্চকক্ষে তাদেরও একজন প্রতিনিধি থাকবেন। ১ শতাংশের কম ভোট পেলে সেই দলের প্রতিনিধি উচ্চকক্ষে থাকবে না।
ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, উচ্চকক্ষের আইন প্রণয়নের ক্ষমতা থাকবে না। তবে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে নিম্নকক্ষের কাছে আইন প্রণয়নের জন্য প্রস্তাব দিতে পারবে। নিম্নকক্ষে পাস হওয়া সব ধরনের বিল (অর্থবিল ও আস্থা ভোট বাদে) অনুমোদনের জন্য উচ্চকক্ষে পাঠানো হবে। উচ্চকক্ষ সেটি দুই মাসের বেশি আটকে রাখলে ধরে নেওয়া হবে বিলটি পাস হয়েছে।
সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত যেকোনো বিল উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাস করতে হবে।




