sliderজাতীয়রাজনীতি

খালেদা জিয়ার সাজা বিএনপির রাজনীতিতে যে প্রভাব ফেলেছে

বাংলাদেশে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া পাঁচ বছর আগে ২০১৮ সালের ৮ জানুয়ারি পাঁচ বছরের সাজা মাথায় নিয়ে কারাবন্দী হয়েছিলেন। দু’বছর পর ২০২০ সালে তাকে বিদেশে না যাওয়া এবং নিজ বাসায় থেকে চিকিৎসা নেয়া-এই দু’শর্তে কারাগার থেকে নির্বাহী আদেশে সাময়িক মুক্তি দেয়া হয়। পরে কয়েক দফায় ওই মুক্তির মেয়াদ বাড়িয়েছে সরকার।

কিন্তু কারাগারে যাওয়া বা পরে মুক্তির পর থেকে প্রত্যক্ষ রাজনীতির বাইরে রয়েছেন খালেদা জিয়া। বাসায় আসার পর থেকেও তাকে আর সরাসরি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে দেখা যায়নি। এরপর অসুস্থতার কারণে তাকে কয়েক দফায় হাসপাতালেও কাটাতে হয়েছে।

রাজনীতিতে আসা
গৃহবধূ থেকে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দলের প্রধান এবং বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন খালেদা জিয়া।

সাবেক সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর ১৯৮২ সালে খালেদা জিয়া বিএনপির হাল ধরেন এমন অবস্থায়, যখন দলটি ছিল অনেকটা বিপর্যস্ত ও দিশেহারা।

ওই সময় বিএনপিতে নানারকম কোন্দল তৈরি হয়েছিল এবং অনেক নেতা এরশাদের মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন। এরপর সামরিক শাসক এরশাদ-বিরোধী আন্দোলনে তিনি ‘আপষহীন নেত্রী’ হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছিলেন।

বিএনপিকে নিয়ে লেখা গবেষণাধর্মী বইয়ের লেখক মহিউদ্দিন আহমদ সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, জিয়াউর রহমান ক্ষমতার বলয়ের ভেতরে থেকে বিএনপি তৈরি করলেও পরে খালেদা জিয়া রাজনৈতিক দল হিসেবে তা এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন।

সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘ওইভাবে এটি রাজনৈতিক দল ছিল না, যেভাবে রাজনৈতিক দল তৈরি হয় আমাদের দেশে। বিএনপির রাজনৈতিক দল হিসেবে গড়ে উঠা এরশাদ-বিরোধী আন্দোলনের সময়, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে। আজকে আমরা যে বিএনপি দেখি, যদিও তার আইকন জিয়াউর রহমান, কিন্তু দলটাকে এ পর্যায়ে এনেছেন খালেদা জিয়া।’

খালেদা জিয়ার নেতৃত্বেই বিএনপি এরশাদ-বিরোধী আন্দোলনে শক্ত অবস্থান তৈরি করে এবং ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। গৃহবধূ পটভূমি থেকে আসা খালেদা জিয়া মাত্র নয় বছরের মাথায় বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন।

এরপর তিনি আরেক দফায় প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন।

রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়া
২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করতে না পারলেও পরে রাজনৈতিক দল হিসেবে মাঠে বেশ সক্রিয় ছিল। কিন্তু ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর থেকে বিএনপিও রাজনৈতিকভাবে অনেকটা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিল। যদিও ওই সময়ে খালেদা জিয়া দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে অংশ নিতেন।

খালেদা জিয়া ২০১৭ সালে চিকিৎসার জন্য লন্ডন গেলেও দেশে ফিরে এসে দুর্নীতি মামলা মোকাবেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। বাংলাদেশে দু’বারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং একটি প্রধান রাজনৈতিক দলের চেয়ারপারসন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দায়ের করা দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে যাবেন, এটাও বিএনপির নেতাদের কাছে ওই সময় অবিশ্বাস্য ছিল। তাদের ধারণা ছিল যে কিছুদিনের মধ্যেই খালেদা জিয়া জামিনে বেরিয়ে আসবেন।

কিন্তু ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি কারাগারে যাওয়া এবং দু’বছর পর শর্ত-সাপেক্ষে মুক্তির পর থেকে রাজনৈতিকভাবে তাকে কোনো কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে দেখা যায়নি।

বিএনপি নেত্রী ও সাবেক সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেছেন, খালেদা জিয়ার কারাগারে যাওয়া বা রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতে না দেয়া বিএনপির জন্য ক্ষতির কারণ হয়েছে। বোঝাই যায়, নির্বাহী আদেশে তাকে মুক্তি দেয়া হয়েছে রাজনৈতিকভাবে দূরে রাখার জন্য, যাতে দলীয় কোনো বিষয়ে কাজ করতে না পারেন, রাজনীতিতে যাতে সক্রিয় হতে না পারেন। এগুলো সবই বিএনপির জন্য ক্ষতির কারণ হয়েছে।

রাজনীতিতে না থাকায় বিএনপির ক্ষতি?
রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি সবচেয়ে চাপে পড়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং তার পরের সময়ে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর থেকেই বিএনপি ও তাদের চার দলীয় জোট বড় ধরনের চাপে পড়তে থাকে। বিশেষ করে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর থেকে অনেকটা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিল বিএনপির কার্যক্রম।

কিন্তু সম্প্রতি দলটিকে আবার চাঙ্গা হতে দেখা যাচ্ছে। গত কয়েকমাসে দলটি বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরে বড় ধরনের সমাবেশ ও কর্মসূচি পালন করেছে। খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি বিএনপির সভা-সমাবেশের আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয়।

নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনসহ যে ১০ দফা দাবিতে আন্দোলন করছে বিএনপি, তার মধ্যে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিও রয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুহাম্মদ ইয়াহিয়া আখতার বলেছেন, এতদিন তো বিএনপি নিষ্ক্রিয় থাকতে বাধ্য হয়েছিল, কারণ বিরোধী দলগুলোকে কোনো স্পেস দেয়া হচ্ছিল না। কিন্তু এখন দেশের ভেতরের ও বিদেশী চাপে সরকার তাদের ওই স্পেস দিতে বাধ্য হচ্ছে।

তিনি আরো বলেছেন, ‘যেকোনো দলের প্রধানকেই কারাবন্দী করলে ওই দলের কর্মকাণ্ডের ওপর কিছুটা প্রভাব পড়বে। বিএনপির টপ লেভেল বা মিড লেভেল লিডারশীপ দুর্বল যে তা আমি বলবো না। তবে প্রধান নেতৃত্ব থাকলে হয়তো দলের নেতাকর্মীরা একটু বেশি চাঙ্গা হয়।’

দলের শীর্ষ নেতা মুক্ত না থাকায় বিএনপির নেতাকর্মীদের কাছে এটাও আন্দোলনের অন্যতম একটি ইস্যুতে পরিণত হয়েছে বলে মনে করেন দলটির অনেক নেতাকর্মী।

বিএনপির উপজেলা পর্যায়ের নেতা বাবু হোসেন বলেছেন, ‘আমাদের দলের শীর্ষ নেতা আমাদের সামনে আসেন না, তার বক্তব্য আমরা শুনতে পাই না, এটা তো আমাদের একটা কষ্ট। কিন্তু এটাই আবার আমাদের আন্দোলনেও প্রেরণা যোগায়। এই যে তাকে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে, ওই অধিকার আদায়ের জন্যই আমরা আন্দোলন করে যাচ্ছি।’

নেপথ্যে তারেক রহমানের ভূমিকা
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী মনে করেন, বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা সংগঠিত থাকায় দলটির মাঠ পর্যায়ে আন্দোলনে কোনো ঘাটতি হচ্ছে না।

তিনি বলেছেন, ’বিএনপির সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের তৃণমূলে যত কর্মী ও নেতা রয়েছে। তারা বর্তমান সরকারের দ্বারা নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তারা অনেক বেশি সুসংগঠিত ও আন্দোলনে উজ্জীবিত। ওই শক্তি বিএনপির আছে।’

গত কয়েকমাসে বিএনপির বিভাগীয় শহর ও ঢাকার জনসমাবেশে বিপুল নেতাকর্মীকে উপস্থিত হতে দেখা গেছে।

দিলারা চৌধুরী বলেছেন, এখন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বিদেশে থাকলেও আমি যতটা শুনেছি, তিনি সবসময়েই যোগাযোগ রাখেন এবং পার্টিকে নির্দেশনা দেন। সেই সাথে মির্জা ফখরুল ইসলাম এই আন্দোলনের জন্য পার্টির একটা ফোকাল পয়েন্টে পরিণত হয়েছেন। এটাও বিএনপির জন্য একটা শক্তি।

তবে তিনি মনে করেন, খালেদা জিয়া সরাসরি আন্দোলনে অংশ নিতে পারলে এখন যে জনসমাগম হচ্ছে, তার কয়েকগুণ বেশি হতো।

অধ্যাপক মুহাম্মদ ইয়াহিয়া আখতার বলেছেন, ‘বিএনপির ভেতর তারেক রহমান প্রভাববিস্তার করতেন, এটা সত্য এবং তার সাংগঠনিক যোগ্যতা তিনি দেখিয়েছেন। ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে তার ভালো ভূমিকা ছিল।’

তিনি বলছেন, ‘আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে রক্তের একটা প্রভাব থাকে। শুধু আমাদের দেশে নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়াতেই এটা আছে। বিএনপি, আওয়ামী লীগ বা জাতীয় পার্টিতেও এটা আছে। ফলে খালেদা জিয়া অনেকটা বন্দী অবস্থায় থাকলেও তারেক রহমানের নেতৃত্ব ভালোভাবেই দলটিকে সংগঠিত করে রাখতে পেরেছে।’

২০১৮ সালে খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পরে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন তারেক রহমান এবং লন্ডন থেকেই দল পরিচালনা করছেন। স্থায়ী কমিটির সভাগুলোও এখন তার সভাপতিত্বেই হচ্ছে। কারাগার থেকে মুক্তির পর কোনো স্থায়ী কমিটির সভায় বা জনসভায় খালেদা জিয়া অংশ নেননি।

রুমিন ফারহানা বলেছেন, ‘বিএনপির অ্যাক্টিং চেয়ারম্যান তারেক রহমান দিনরাত পরিশ্রম করে দলটিকে সুসংগঠিত করেছেন এবং এ কারণেই আমরা একটার পর একটা প্রোগ্রাম করতে পারছি। তার নেতৃত্ব, নির্দেশনা না থাকলে আমাদের পক্ষে এটা সম্ভব ছিল না।’

তিনি বলেছেন, যেহেতু রাজনৈতিক মামলার কারণে চেয়ারপারসন কাজ করতে পারছেন না, তাই অ্যাক্টিং চেয়ারম্যান ওই দায়িত্বগুলো পালন করছেন।

তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ নেতা হিসেবে পরিচিত ও বিএনপির আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক কমিটির সদস্য মীর হেলাল উদ্দিন গত বছরের ডিসেম্বরে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তারেক রহমানের ভূমিকা দুঃসময়েও বিএনপিকে চাঙ্গা করে তুলেছে।

আরো বলেন, ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে দলের দায়িত্বে তিনি যখন আসলেই নিলেন, তখন পুনর্গঠনের কাজ শুরু করেন। ইউনিয়ন থেকে তিনি এটা শুরু করেছেন, যার প্রতিফলন গত ছয় মাসে পরিষ্কারভাবে দেখা যাচ্ছে। আগে হয়তো তিনি স্থায়ী কমিটি বা ভাইস চেয়ারম্যানের সাথে কথা বলতেন। কিন্তু এখন তেমন না। তিনি নিজেই এখন ওয়ার্ড পর্যায়ের একজন নেতাকে ফোন দিয়ে কথা বলছেন। ফলে খালেদা জিয়া কারাগারে থাকলেও বা মুক্তির পর বাসায় থাকলেও দল পরিচালনায় লন্ডন থেকে তারেক রহমানই নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

যে মামলায় কারাগারে যেতে হয়েছিল খালেদা জিয়াকে
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি মামলা হয়। ২০১৮ সালের ৮ জানুয়ারি জিয়া অরফ্যানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হলে ওই দিনই তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।

মামলার অভিযোগ ছিল, এতিমদের জন্য বিদেশ থেকে পাওয়া দুই কোটি ১০ লাখ টাকা ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতার অপব্যবহার করে জিয়া অরফ্যানেজ ট্রাস্টের দেয়া হলেও, তা এতিম বা ট্রাস্টের কাজে ব্যয় করা হয়নি। বরং ওই টাকা নিজেদের হিসাবে জমা রাখার মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে।

রায়ে খালেদা জিয়ার একমাত্র জীবিত সন্তান তারেক রহমান, যিনি এখন ব্রিটেনে বসবাস করছেন এবং সেখানে বসেই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত প্রধানের দায়িত্বও পালন করছেন, তাকেও ১০ বছর কারাদণ্ড দেয়া হয়।

সূত্র : বিবিসি

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button