কোদাল আর বেলচা নিয়ে স্বজনদের লাশ খোঁজেন তিনি

যে জায়গাটিতে বসে আছেন গার্সিয়া, সেখানেই ছিলো তাদের বাড়ি – ছবি : সংগ্রহ
রোজ সকালে একটি কোদাল ও বেলচা নিয়ে নিয়ে ধ্বংসস্তুপের কাছে যান গার্সিয়া। যেখানটাতে তাদের বাড়ি ছিলো সেখানকার ধ্বংসস্তুপ সরিয়ে একাই খোঁজেন আপনজনদের লাশ। বেশ কয়েক শ’ সদস্যের একটি স্বেচ্ছাস্বেবক ও উদ্ধারকারী দল কাজ করছে ওই এলাকাটিতে। তারা খুঁজছে নিখোঁজ লোকদের। তাবে পাগলপ্রায় গার্সিয়া তাদের অপেক্ষায় থাকতে রাজি নন। নিজেই খুঁজছেন হারিয়ে যাওয়া আপনজনদের। গুয়েতেমালায় গত সপ্তাহের ভয়াবহ অগ্ন্যুৎপাতে পরিবারের পঞ্চাশজনকে হারিয়ে পথে পথে লাশ খুজে ফিরছেন ইউফেমিয়া
গার্সিয়া নামের এক নারী। এটি তারই সেই বিয়োগাত্মক গল্প।
ওই ঘটনায় অন্তত ১১০ জন নিহত হয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার দেশটিতে। আরো অন্তত দুইশো জন এখনো নিখোঁজ রয়েছে, যারা লাভার নিচে চাপা পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আগ্নেয়গিরির কাছেই বাড়ি ছিলো গার্সিয়ার। লাভা আর ছাই উড়ে এসে পড়ে তাদের বাড়ির ওপর। ওই ঘটনায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে তাদের পরিবারটিই। বৃহত্তর পরিবারের পঞ্চাশ স্বজন নিহত হয়েছে সেদিন। তাদের মধ্যে ছিলো গার্সিয়ার সন্তান, নাতি-নাতনি। আরো আছে গার্সিয়ার নয় ভাইবোন ও তাদের স্বামী/স্ত্রী ও সন্তানেরার এবং তার মা। এখনো ধ্বংস্তুপে
নিহতদের লাশ খুঁজে ফিরছেন তিনি।
বর্তমানে একটি অস্থায়ী তাবুতে থাকছেন ৪৮ বছরের গার্সিয়া। তবে তার বেশির ভাগ সময়ই কাটে স্বজনদের লাশের খোঁজে। গার্সিয়া বলেন, ‘পরিবারে সদস্যদের খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত আমি থামবো না। তাদেরকে আমি ধর্মমতে সমাহিত করতে চাই’। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশাল যৌথ পরিবার নিয়ে ওই এলাকাটিতে বাস করতেন পেশায় ফল বিক্রেতা গার্সিয়া। কিন্তু এবারের অগ্ন্যুৎপাত তার সব কিছু কেড়ে নিয়েছে।
সেদিনের ঘটনার বর্ণনা করতে গিয়ে গার্সিয়া বলেন, আমি তখন দোকানে ডিম কিনতে গিয়েছিলাম। তখন দেখলাম কিভাবে আগ্নেয়গিরির লাভা ও ছাই এসে পড়ছে গ্রামের ওপর।
গার্সিয়া চিৎকার করে সবাইকে বাড়ির বাইরে আসতে বলেন, কিন্তু সবাই তার কথা শোনেনি। তার ৭৫ বছর বয়সী মা অন্যদের বলেছেন, তার পক্ষে দৌড়ে বাইরে যাওয়া সম্ভব নয়। তিনি ইশ্বরের ওপর ভরসা করে বাড়িতেই অবস্থান করেন। বাইরে থাকার কারনেই বেঁচে গেছেন গার্সিয়া। বাড়িতে সবাই তার জন্য অপেক্ষা করছিলো। সেদিন দুপুরের খাবারের পরই পার্শ্ববর্তী শহরে বেড়াতে যাওয়ার কথা ছিলো তাদের।
সেই ভয়াবহতার কথা স্মরণ করে গার্সিয়া বলেন, দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে ছোটেন তিনি। পেছন তাকিয়ে দেখেন বাড়ির ছাদে আছড়ে পড়েছে লাভা। সে সময় বাড়ির ভেতরেই ছিলো তার ২১ বছর বয়সী ছেলে জাইম। এরপরের দৃশ্য ছিলো আরো ভয়াবহ। গার্সিয়ার ২৩ বছর বয়সী মেয়ে ভিলমা লিলিয়ানা দৌড়ে বাড়ির বাইরে আসে; কিন্তু তার গায়ের ওপর আছড়ে পড়ে একগাদা লাভা আর ছাই। চেয়ে চেয়ে মেয়ের মৃত্যু দেখা ছাড়া কিছুই করার ছিলো না গার্সিয়ার। আরেক কন্যা শেইনি রোসমেরি(২৮) তার শিশুকন্যাকে নিয়ে ছিলো বাড়িতেই। বেড়াতে এসেছিলো তার এক বোন ও ভগ্নিপতি, তারাও চাপা পড়েছেন বাড়ির ভেতর।
পরিবারে আর কোন সদস্য বেঁচে নেই, তাই কিভাবে পরিবর্তী দিনগুলো কাটবে তা ভাবতে পারছেন না গার্সিয়া। তবে তার কাছে এখন সবচেয়ে বড় বিষয় নিখোঁজ স্বজনদের অনুসন্ধান।
পরিবারের নিহত সদস্যদের একটি তালিকা রয়েছে তার হাতে। সেখানে লেখা তিন সন্তান, মা, নাতি, নয় ভাই-বোন, তাদের স্ত্রী-সন্তানসহ পরিবারের সব নিহত সদস্যদের নাম।
দ্য গার্ডিয়ান




