শিরোনামসাময়িকি

“কহিনূর হীরের টুকরো হবে”

এলিজা খাতুন
ঘরের ভেতর থেকে অন্ধকার সরেনি এখনও। টালির ফাঁক ফোঁকর দিয়ে ভোরের আলো ফুটছে কেবল। চৌকির পায়া ক্যাঁ কুঁ আর্তনাদ করে উঠলো সাত্তার আলীর আড়মোড়ায়। বাইরের বারান্দা থেকে সাত্তার আলীর মেয়ে কহিনূরের পড়ার শব্দের সাথে কটকটি ভাজার ঘ্রাণও ভেসে আসছে। কিছুক্ষণ পর পর কড়াই ভরা ডুবো তেলে খামি করা আটার গোলা ছাড়ার ছিঁর ছিঁর শব্দ, অন্যপাশে মাদুর বিছিয়ে পড়তে বসেছে কহিনূর। চোখ ডলতে ডলতে ঘর থেকে বেরিয়ে এল সাত্তার আলী।
বারান্দার এক পাশে উনুনের সামনে বসে ছাঁকনা-চামচ দিয়ে বাদামী রংয়ের কটকটি ছেঁকে তুলছে খইমন। ঝুড়ি ভরা কটকটি দেখে সাত্তার বুঝতে পারছে- আজ ডেলিভারি দেবার দিন।
খইমন স্বামীর দিকে তাকিয়ে এগুলো সকাল সকাল দিয়ে আসতে বলল। সাত্তার আলী তাৎক্ষণিক উত্তর না দিয়ে বারান্দা থেকে উঠোনে নামলো। হাত জোড়া বেঁধে ডানে বামে ঘুরিয়ে পিঠ মোড়াতে মোড়াতে কলপাড়ে গেল; কানা ভাঙ্গা প্লাস্টিকের বদনা হাতে কল চাপতে চাপতে উত্তর দিল- আজ ওসব নিয়ে যাবার সময় নেই।
খইমন বিরক্তিরপূর্ণ ঝাঁঝ মেশানো কন্ঠে বলল- ‘ইডা কিরাম কতা কল্যে ! আইজগের কি পাহাড় তুলতি যাবা?’
ততক্ষণে সাত্তার পানির বদনা হাতে ঘরের পেছনে সিমেন্টের বস্তা ঝুলনো শৌচালয়ে ঢুকেছে।
অন্যদিন সাত্তার হাত মুখ ধোবার আগেই চালার নিচ থেকে ভ্যান উঠোনে নামায়। খইমন দেখলো আজ ভ্যান বের না করে চালার নিচে খুঁটির সাথে রডে শেকল পেঁচিয়ে তালা দিচ্ছে। বারান্দায় ঘরের দেয়ালের কুঁদলি থেকে মাজনের বোতল নিয়ে হাতের তালুয় ঢালতে ঢালতে সাত্তার আলী খইমনকে তাড়াতাড়ি খেতে দিতে বলল, এক্ষুণি বের হবে সে।
উনোনে ঘুঁটে ঠেলে দিতে দিতে খইমন তাকালো সাত্তারের দিকে, চোখাচোখি হতেই সাত্তার বলল- “রেলিতি ঢুকতি না পারলি পাশশো’ডা টাকা হাত ছাড়া হয়্যে যাবে।”
খইমন কড়াইয়ের গরম তেলে ছাঁচে করে আটার গোলা ছড়াচ্ছে। সে চেঁচিয়ে কহিনূরকে পান্তা বেড়ে তার সাথে পাটালি দিতে বলল। সাত্তারকে শুনিয়ে বলল- “উসব রেলি, মিচিল, আন্দুলোন পেত্তেক বছর করে কি হত্যিছে? আমাগের খাবা-পরা তো ঝেরাম ছেলো, সেরামই রয়্যিছে। যতসোমা গতর চলে, ততসোমা ভাত জোটে।”
কোন জবাব দেয় না সাত্তার আলী, পাটালি ভেঙে আমানির সাথে চটকে নেয়। ততক্ষণে জব্বার এসে বারান্দার পটেয় বসে পড়ে, বলে- “রাস্তায় নেমে পড়েছে শ্রমিকরা, মোড়ে উঠতে পারলেও লাইনে ঢোকা যাবে”। সাত্তার জবাবের বদলে আমানিতে চুমুক দেয় জোরে।
জব্বার চুলোর পাশে খইমনের কাছে গিয়ে বসলো, বলল আজই সন্ধ্যার পরে কহিনূরকে দেখতে আসতে চায় পাত্রপক্ষ। আগে থেকেই কহিনূরের বিয়ের ব্যাপারে জব্বারের সাথে খইমনের কথা হয়ে আসছে। ছেলে কাপড়ের মিলে কাজ করে। খইমন সম্মতি দেয়; বলে তার একটা দিনও কাজ বন্ধ দেওয়ার উপায় নেই, সবদিনই একরকম, যেদিন খুশি আসুক।

জব্বার ঝুড়ি থেকে একটা কটকটি তুলে দাঁতে কাটতে কাটতে বলল ‘ভালো সম্বন্ধ’।
খইমন ঘাড় কাঁত করে সাত্তারকে বলল, ‘বিকেলে বাড়ি আসার সোমা এট্টু চিনি আর এক প্যাকেট বিস্কুট নে এস্যু। কুটুম মানষির কটকটি দোবা যায় না’।
সাত্তার ততক্ষণে আমানি শেষ করেছে। সেও তাড়াতাড়ি কটকটি ডেলিভারি দিয়ে খইমনকে বাড়ি ফিরতে বলল।
খাওয়া শেষ করে হাত ধুয়ে লুঙ্গির খুঁটে হাত মুছে বারান্দার দড়িতে ঝুলোনো কলারওয়ালা কালো গেঞ্জিটা টেনে নিলো।
জব্বার, সাত্তার দুজনে উঠোনের সীমানা ছাড়িয়ে বড় রাস্তায় উঠলো, খইমন ওদের চলে যাবার দিকে তাকিয়ে গতবারের মিছিলে যাবার ঘটনা মনে করলো। সেবারও পাঁচশো টাকা দেবার নাম করে কারা যেন নিয়ে গিয়েছিল সাত্তারকে। এখান থেকে দূরে অন্য জেলায়। যাওয়া আসার ভাড়া কেটে দু’শো টাকা দিয়েছিল। খইমন ভাবছে এবার তো দূরে নয়, শহরের মধ্যেই। পুরো টাকাটাই হাতে পাবে।
ছোট ছোট পলিথিনে কটকটি ভাজাগুলো ঢুকিয়ে মুখ বাঁধতে বাঁধতে কহিনূরকে ঘর-বারান্দা গোছায়ে রাখার কথা বলল।
ভাজার প্যাকেটগুলো দোকানে দোকানে ডেলিভারি দিয়ে বাসাবাড়ির কাজ শেষ করে প্রায় দিনই খইমনের ফিরতে সন্ধ্যা হয়। রান্নার কাজ করে রাখে কহিনূর। আজ সন্ধ্যার আগেই বাড়ি ফিরবে বলে আশ্বস্ত করে খইমন। ঘর থেকে কহিনূরের কণ্ঠ ছুটে আসে- ‘এরাম ঝেদি পেত্তেকদিন আসতে, তাইলি সন্ধের আগে এট্টু তোমার মুখ দিকা য্যাতো! দর্জিবাড়িত্তে আসেই দেখি বাড়িডা খা খা কত্তেচ।’
খইমন উত্তর দেয় না। ঝুড়িটা কাঁখে উঠিয়ে বেরিয়ে পড়ে।
শায়লা’র বাড়িতে বাজার করা ছেলেটা ব্যাগ ভর্তি মাছ এনে ঢেলে দিল খইমনের সামনে। টাইলস এর মেঝেয় ছড়িয়ে পড়ল ভেটকি আর বড় বড় বাগদা। ওগুলো জড়ো করে বঁটি নিয়ে কাটতে হবে। পাশের বেডরুম থেকে ইরফান আহমেদ ও শায়লা খানম এর জোরে জোরে কথোপকথন ভেসে আসছে খইমনের কানে। হঠাৎ ইরফানের আরেকটু জোর কণ্ঠে শোনা গেল- সময় নেই একদম, মঞ্চ থেকে ফোন করে খবর দিয়েছে দর্শকের ভিড় উপচে পড়ছে। নিচে গাড়ি রেডি, শায়লাকে তাড়াতাড়ি বের হতে তাগিদ দিচ্ছে ইরফান আহমেদ।
ইরফানদের পার্টির হয়ে মঞ্চে বিশেষ বক্তব্য পেশ করবে শায়লা, বেশ এক্সাইটিং। ইরফানের গুরুর হাত ধরে ইলেকশানের পূর্বেই কয়েকবার শায়লা’র লাইমলাইটে আসা; ইরফানের ভোটে জেতায় বেশ ভূমিকা রাখবে শায়লা। এলাকায় পরপোকারী, উদার মনের মানুষ হিসেবে শায়লা জনপ্রিয়। শায়লাকে সামনে দাঁড় করিয়ে পার্টিকে জেতানো সহজ। পার্টি জিতলেই ইরফানের ব্যবসা রমরমা। হুট করে শায়লা জানালো- ‘জানো, বসেদের গুণগান গেয়ে বক্তৃতা চালিয়ে যেতে পারবো বেশ খানিক সময়, কিন্তু শ্রমিক-মজুরদের উদ্দেশ্যে কী কী বলবো ঠিক করে লেখা হয়নি।
ইরফান সহজভাবে বুঝিয়ে দেয়- ‘কী আর বলবা? বরাবর মঞ্চে যেমনটা বলে থাকো তেমনই। এই যেমন- ‘আপনাদের দাবি-দাওয়া নিয়ে আমরা হেড অফিসে আলোচনা করবো, মিটিং-এ পাস করানোর জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করবো, আমি আপনাদের মতো খেটে খাওয়া মানুষ, আপনারা আমার পাশে থাকলে- ইত্যাদি ইত্যাদি…’।
শায়লা বলল, ‘এ তো কোন ব্যাপার না! এ কথাগুলো আগেরবারও বলেছি, তাছাড়া বস্ ‘কে খুশি করার জন্য রাত্রে ডিনারের ব্যবস্থা করেছি।’
ইরফান বউয়ের কথা শুনে মনে মনে ভাবছে- ‘এটুকু ভাবলে চলবে না ময়না! আরেকটু বেশি করে ভাবলেও আমার যে আপত্তি নেই!’ তবু আনন্দিত হলো এই ভেবে যে- দ্রুতই বউটা খুব কাজের হয়ে উঠছে, এখন আর শিখিয়ে দিতে হয় না। বুদ্ধি দিয়ে নিজেই সবটা ম্যানেজ করে।
ইরফান কলারের পাশে পারফিউম স্প্রে করে মোবাইলটা পকেটে তুলে বেরিয়ে গেল। শায়লা পিছে পিছে, হিলের খটখট শব্দ তুলে, হাতের তালুতে লোশন ঘষতে ঘষতে রান্নাঘরের সম্মুখে এসে থামলো; রাত্রে নামি দামি গেস্ট খাবে এ কথা বলে খইমনকে বুঝিয়ে গেল- দিনভর তার নৈমিত্তিক কাজসহ বাড়তি কাজের ফিরিস্তি। সন্ধে হতে হতে সব কাজ যেন গুছিয়ে ফেলে।
খইমনের কপালে চিন্তার রেখা। ছাই সমেত মাছের রক্তমাখা হাত থামিয়ে শায়লার দিকে তাকিয়ে বলল- ‘আইজগের এট্টু বেলা থাকতি চলে যাতি চাচ্ছিলাম, সন্ধেবেলা মেয়েটারে-
কথা শেষ করতে না দিয়ে শায়লা’র উত্তর- ‘সারা বছরই তো মেয়ে মেয়ে করো, আজকে ওসব বললে হবে না। রাতে অনেক মানুষ খাবে, অনেক কাজ। তাছাড়া বাড়তি টাকা তো পাবেই।’
খইমন কিছু বলার আগেই শায়লা বের হয়ে গেল।
শহরের প্রধান সড়কে একের পর এক ব্যানার হাতে বিভিন্ন পেশার শ্রমিক-মজুরের র‌্যালি যাচ্ছে। তাদের সমস্বরে স্লোগান শুনে খইমন তিনতলার জানালায় মাথা ঠেঁকিয়ে দু’একবার দেখে ভেবেছে, এদের কোন একটা দলের মধ্যে কহিনূরের বাবাও আছে, পাঁচশো টাকা পায় যদি কহিনূরের জন্য লাল দেখে একটা শাড়ি আনতে বলবে। গ্রিলে কপাল ঠেস দিয়ে আরও ভাবছে- এতো আর বিনা খাটুনির পয়সা না! এই ঝাঁ ঝাঁ রোদে শরীরের রক্ত মাংস ঝলসে দরদরিয়ে ঘাম ঝরানো পয়সা। বসে থাকার সময় নেই তারও, সন্ধের আগে এখানে গুছিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে হবে। খেজুরের রস জ্বালানো আছে। বাড়ি গিয়ে ক্ষির রান্না করতে বেশি সময় লাগবে না। এ বাড়িতে মেহমানের খাওয়ার বাগদা রান্নার জন্য কোরানো নারকেল থেকে একটু চেয়ে নেবে শায়লার কাছ থেকে। ক্ষিরের মধ্যে ছড়িয়ে দেবে।
আঁটোসাঁটো করে কোমরে ওড়না পেঁচিয়ে মায়ের নির্দেশ মতো সমস্ত ঘর উঠোনে জল ছিটিয়ে ঝাড়– দিচ্ছে কহিনূর। মাটির ঘরদোর উঠোন ভিজিয়ে ঝাড় দিলে ধুলো ওড়ে না। সংসারের, পৃথিবীর, জীবনের সব ঝড়-ঝাপটা-ধুলো নিবারণে, স্থবিরতায়, শীতলতায়, থিতানোয়, সমাধানে জলই মোক্ষম। ওপাড়ার দর্জির নাতি ছেলেটা অনেক আগে ডেকে গেছে। মা-বাবা রোজ ভোরে কাজে বেরিয়ে যাবার পরপরই দর্জিবাড়ি যায় কহিনূর। দুপুর পর্যন্ত ঘণ্টা তিনেক সেলাইয়ের কাজ করে যা পায় তা দিয়ে নিজের এটা সেটার প্রয়োজন মেটায়। কলেজে নৈশকালীন ক্লাস করায় সুবিধে। দুপুর দুটো থেকে সন্ধ্যা সাতটা। হাতে গোনা দু’চারটা কলেজে পরা জামাকাপড় আজ ছুটির দিনে কেঁচে ধুয়ে রোদে মেলেছে, সুটকেস খুলে দাদির রেখে যাওয়া একখানা সাদা মত শাড়ি বের করে ওটাও রোদে ঝুলিয়েছে। গোসল করে ভেজা কাপড় পাল্টে দাদির সাদা শাড়িটাই পরে থাকবে ভেজা জামা শুকোনো অব্দি।
অভাবের সংসারে দরকারের কথা জানিয়ে কতদিন গোলমাল-চেঁচামেচি-কান্নাকাটি হয়েছে! সেসব থেকে কহিনূরের অভিমান। অভিমান মা-বাবার প্রতি নয়, কার পরে যে অভিমান জানে না কহিনূর।
অনেকদিন আগে খইমন জোর করে কহিনূরকে নিয়ে গিয়েছিল, যে বাড়িতে বুয়ার কাজ নিয়েছে সেখানে। সারাদিন মায়ের সাথে খেটেছিল সে। তাতে বুঝেছিল খাটুনির সমান মজুরি পায় না তার মা। খইমন আশা করেছিল পরীক্ষার সময় মেয়েটার হাতে আশীর্বাদ করে ক’টা টাকা হয়তো দেবে ওরা; কিন্তু দেয়নি।
এসব দুঃখের সামনে, ব্যথার সামনে স্থির থাকতে হয় কহিনূরকে। জব্বার কাকা মা’কে বুয়ার কাজের কথা গোপন রাখতে বলেছে পাত্রপক্ষের কাছে; এ কথা শুনে ফেলার পর থেকে স্বস্তি পাচ্ছে না সে। যে শ্রমের বদলে রুজি-রোজগার, তা বলা যাবে না! এমন সম্বন্ধ করার দরকার কী? একসময় তো জানবে, তাহলে আগে লুকোনোর কী আছে? খইমনকে প্রায় বলতে শোনে- “যদি না থাকে কুপালে, কি করবে গোপালে”। কিন্তু কহিনূর বিশ্বাস করে- কপাল নয়, হাত-পা এবং মাথাই টেনে তোলে মানুষকে।
দুপুর তিনটা, পার্টির অফিসঘরে শায়লা, ইরফানসহ আরও অনেকে বসে আছে। জনসভা শেষ। লাঞ্চ প্যাকেট খুলে খেতে খেতে ইরফান কর্মীদের উদ্দেশ্যে বলল- ‘একটা বিষয়ে দেখলাম, স্যার ভীষণ উদার মনের।’
উপস্থিতগণের একজন ইরফানের তৈলমর্দনের বিষয়টা বুঝে ফিক করে হেসে ফেললো। মুখে বলল- ‘হয়েছে, এবার একটু ক্ষ্যান্ত দাও ভাই! নেতা এমনিতেই ইলেকশনে জিতবে।’
ইরফান সিরিয়াস ভঙ্গিতে জবাব দিল-
আরে ঠাট্টা নয়, মনে করে দেখো, নেতার কথার মধ্যে বার বার শোনা গেছে যে- বছরের একটা দিন এই শ্রমিক দিবসে অন্তত শ্রমিকদের খাটানোর পক্ষপাতি নন তিনি। দাবি-দাওয়া পূরণ অন্য বিষয়, কিন্তু এই দিনে তাদের খাটিয়ে নেওয়ার ঘোর বিরোধী স্যার। সত্যি উনার মতো মানুষ হয় না। যোগ্য নেতা!
উপস্থিত সবাই কথাগুলো নিয়ে সিরিয়াস হলেও, শায়লা কী যেন ভাবছে।
শায়লা বিকেলে ফিরেই রান্নাঘরে ঢুকলো, রাতের কড়া-ভোজ তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে গেল। সন্ধের আগেই নেতার সাথে সাথে পার্টির নিমন্ত্রিত লোকজন এসে পড়বে। সন্ধে থেকেই গরম কফি ও ঠান্ডা পানীয়’র সাথে হৈ চৈ চলবে। আপ্যায়নে শায়লা’র সাথে থাকতে হবে খইমনকে। শায়লা জানিয়ে দিয়েছে ডিনারের সবগুলো পদ রান্না করে তবেই ছুটি তার। বিরতিহীন কাজের মধ্যে খইমন একবার বলে ওঠে-
আফা এককান কতা আছে! সকাল বেলায় বলতি চাচ্চিলাম-
হুম, মুখে কথা বলো আর হাতে কাজ করো; শুনছি।
মেয়েডারে সন্ধের পরে দেকতি আসবে, যদি সেকেনে সম্বন্ধ হয় তালি কিছু টাকা পয়সা দে সাহায্য করতি হবেনে, একেবারে চাচ্চিনে, কাজ করে করে শোধ করে দোবো। মেলাদিন আগে আপনাগের পাটির এক সার এয়্যিলো, আমার মেয়ের কতা শুনে কয়্যেলো যে বে’র সোমা হাজার পাঁচেক টাকা দেবে, আপনিও কি এট্টা লিস্টি করা কাগজে সই নেলেন। সে সারের আর দেকিনে, আসে না?
শায়লার মনে পড়লো, পাটি অফিসের সেই বস’ই আসছে আজ।
খইমনের ব্লাউজ ভিজে জবজব, হাতে মুখে ঘাম-তেল চিটচিটে, কপালে শীতকালের মতো বিন্দু বিন্দু ঘাম। শায়লার ফোন বাজলো, খবর দিল রওনা হয়েছে। এক্ষুণি এসে পড়বে গেস্ট। ফোনে কথা শেষ করে বেডরুম থেকে ব্লাউজ-পেটিকোটসহ একটা দামি শাড়ি এনে খইমনের হাতে দিয়ে ফ্রেশ হয়ে পরে নিতে বলল। খইমন বিস্ময়ে তাকালো শায়লার দিকে। যারা আসছে শায়লা তাদের বুঝতে দেবে না এ বাড়িতে কাজ করে খইমন; বলতে হবে আত্মীয়! বোন সম্পর্ক।
শায়লা ভুল বলছে? নাকি খইমন ভুল শুনছে? কিন্তু শাড়ি! ওটা হাতে তুলে বলল- ‘আফা এত দামি শাড়ি পরে কাজ করলি ক্ষ্যায় হয়ে যাবেনে, কিছু হয়্যি গেলি স্যাকোন ক্ষতিপূরণ দোবো কিরাম কইরে? তার চেয়ে আর কী কী করতি হবে কন, তোড়ে তোড়ে গোছায়ে আমি গিয়ে-বেরোবো। সন্ধে হয়ে এসতিছে, ওদিকি মেয়েডারে-’
কথা শেষ না হতেই শায়লা কড়া মেজাজে শোনালো- ‘মেয়ের ব্যাপারে দেখা যাবে, যা বললাম তাই শোন’
‘দেখা যাবে’ কথাতে খইমনের আশার মাটিতে জলছিটে পড়ল যেন। একটু দেরি হয় হোক, মেয়ের সম্বন্ধ যদি ঠিক হয়, শায়লা আফা নিশ্চয় কোন না কোন ব্যবস্থা করবে! শায়লাও আশ্বস্ত হয়, শাড়ির মূল্যের চেয়ে বসকে সন্তুষ্ট রাখা জরুরি। এসব মহিলাদের প্রতি উনার যা আদিখ্যেতা! একবার উনার বিশ্বস্ত হয়ে উঠি, তারপর ইলেকশনে জেতা কে রোখে! রাজনীতির বাজারে এখন উনার বক্তব্য থেকে বেশ আগুন ছুটছে। তাতে নিজেকে ফুটিয়ে নেওয়া যায় যতটা।
দীর্ঘদিন পর খইমন কুঁচি দিয়ে শাড়ি পরেছে। উস্কখুস্ক চুলগুলো আঁচড়ে খোঁপা বাঁধা আর পরিপাটি পোশাকে কে ভাববে- এই সেই খইমন! ঘটনা তাইই ঘটলো। একে একে সব গেস্ট এসে পড়লে ওকে কেউ কাজের বুয়া ভাবেনি। বসও নয়। সন্ধ্যার আপ্যায়নে চা নাস্তা দিতে গিয়ে খইমন ঠিক চিনেছে শায়লার বসকে, যে স্যার খইমনের মেয়ের বিয়েতে পাঁচ হাজার টাকা দিতে চেয়েছিল। বসের স্মরণে নেই হয়তো সে কথা।
খইমন নিজের প্রকৃত পরিচয় তুলে ধরে মেয়ের বিয়ের কথাটা কী করে বলবে? এই লোকটিকে কী বলে স্মরণ করাবে? খইমন তো এখন খইমন নয়! দিনমজুর নয়! খইমন এখন শায়লা খানমের ভাষায় পরমাত্মীয়! খইমনের অঝোর ঘাম খোয়া যাচ্ছে দামি শাড়ির ঝলমলে অন্তরালে।
কথায় কথায় রাজনৈতিক আলাপ গভীর থেকে গভীরে যাচ্ছে। শায়লা মেহমানদের যত্নআত্তির মধ্যেও আলোচনায় মেতে উঠেছে-
‘স্যার টের পেয়েছেন? শ্রমিকরা কেমন সাড়া দিচ্ছিল? ওরা কিন্তু আমাদের বক্তব্যে সন্তুষ্ট আজ।’
বস্ বললেন, ‘সত্য বলতে গণতান্ত্রিক অধিকার পায়নি শ্রমিকরা।’
খইমন এসে খালি পিরিচগুলো নিয়ে গেল, ভারি পরিবেশ বুঝে সবার মধ্যে কিছু বলতে পারলো না। কফিতে চুমুক দিতে দিতে শায়লা হঠাৎ বলে উঠলো- ‘স্যার একটা ব্যাপার খেয়াল করেছেন?’
বস্ নড়েচড়ে বসে শায়লার দিকে তাকালো, শায়লা বলে চললো-
যখন দাবি-দাওয়াগুলো লিখিতভাবে কমিটির মাধ্যমে পেশ করার কথা বলা হচ্ছিল- ঠিক ঐ সময়টায় সমাবেশের মাঝে ছোট্ট একটা দল ভাগ হয়ে যায় এবং তারা হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে ওঠে। চক্রটির সাথে পার্শ্ববর্তী কয়েকজনের মধ্যে হাতাহাতি ও মারামারির ঘটনাও ঘটে।
পাশ থেকে একজন বলল- ‘হ্যাঁ বস্, বিষয়টা মোটেও হালকাভাবে নেওয়ার নয়। পরে শুনলাম ওদের দাবি পেশ নিয়ে বিতর্ক হয়েছে এবং ট্রেড ইউনিয়ন নিয়ে আপত্তিকর কথা বলেছে ঐ ছোট্ট দলটি। এই চক্রটাকে আগে দেখেছি বলে মনে হচ্ছে না।’
শায়লা প্রশ্ন করলো ‘আপত্তিকর কথা! তার মানে স্পষ্ট যে- দলটা ট্রেড ইউনিয়নের বিপক্ষে।’
ইরফান আহমেদ রাজনৈতিক আলাপের ভূমিতে স্ত্রীকে অঙ্কুরিত হতে দেখে ভেতরে ভেতরে পুলকিত হচ্ছে। বস্তুত ইরফান রাজনৈতিক কোন বিষয় নিয়ে আলাপের গভীরে যেতে আগ্রহ পায় না। ব্যবসায় লাভ ক্ষতি বোঝে ভালো। বসের সাথে তার স্ত্রীর আলাপনের চিত্র ধারণ করতে মুঠোফোন বের করলো পকেট থেকে।
রাজনৈতিক আলাপ যখন তুঙ্গে, হঠাৎ কানের কাছে ফিসফিস কথার আওয়াজে ঘোর ভাঙলো, খইমন নিচুস্বরে জানালো- আর দেরি করার উপায় নেই। শায়লা আপত্তি করেনি, চলে যাবার কথা জানিয়ে বেরিয়ে পড়লো খইমন। রাস্তায় নেমে আসতেই জব্বারের ফোন। এখনও কতদূরে জানতে চাইলো, তাড়াতাড়ি বাড়ি যেতে বলে ফোন কেটে দিল। সূর্য ডুবে গেছে। আবছা হয়ে আসছে চারদিক, খইমন জোর বাড়ালো হাঁটায়, মিনিট পাঁচেক হাঁটার পর মুদি দোকান দেখে থমকে দাঁড়ালো। আঁচলের গিট খুলে দেখলো ভাঁজ করা পঁচিশ টাকা, ভাবছে- ‘কহিনূরের বাপের চিনি আনার কথা মনে আছে কিনা’।
চিনির পলিথিন সমান তালে ঝুলছে খইমনের হাঁটার ছন্দে, বাড়ির মোড়ে পৌঁছে একটা আলাদা পরিবেশ টের পাচ্ছে, এরকম সময়ে বিশেষ করে সন্ধ্যার দিকে এই মোড়টা বেশ গরম থাকে। পেঁয়াজু, কটকটি, গজা, বুন্দিয়া, পুরি, ভুট্টার খৈ, মুড়ি-পাটালি, পান এসব ছোট ছোট দোকানগুলোয় খদ্দেরের ভিড় লেগেই থাকে। আর চা-এর দোকানের এতগুলো বেঞ্চে জায়গা ধরে না। আজ এত খালি খালি! কেমন শান্ত সুনসান, কিন্তু কেন! বিস্ময়ের সাথে মোড় পেরিয়ে এগোলো বাড়ির গলি পথে। তিন-চারটা ঘর পার হয়ে খইমনের দৃষ্টি পড়লো তার কলমি বেড়ার ভেতরে উঠোনে, আশপাশের বাড়ির বউগুলো ঘিরে দাঁড়িয়ে, ওপাশটার কিছু দেখা যায় না। খইমনের মনের মধ্যে হুড়োতাড়া বেঁধে গেল, ভাবছে- পাত্রপক্ষ এসে পড়েছে!
চটার বেড়া ঠেলে উঠোনে ঢুকে বারান্দায় চোখ যেতেই মোচড় দিয়ে উঠলো খইমনের বুকের ভেতর। হাত থেকে চিনির পলিথিন খসে পড়ল নিচে, এ কী দেখছে! কী দেখছে খইমন! বারান্দায় পাটিতে রক্তমাখা গেঞ্জি গায়ে পড়ে আছে সাত্তার আলী। পাশে ছোপ ছোপ রক্তে লাল হয়ে ওঠা শাড়ি পরা কহিনূর বাবার মাথাটা কোলে করে রেখেছে। মাথাটা ঘুরে উঠলো খইমনের; বারান্দায় উঠে পাটির কোনায় বসে গেল খুঁটিতে মাথা ঠেকিয়ে।
কিছুক্ষণ পরে জব্বার এলো, খইমনের কোলের পরে একটা প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে বলল-
মোড়ে ডাক্তারের কাছে বলে কয়ে কাটা-ব্যাথার ওষুধ নে আইছি, খাবাই দেও। তাও ভাগ্যি ভালো গন্ডগোলের মদ্দিত্তে উরির টেনে নিয়ে বেরুতি পারিলাম।
উঠোনে দাঁড়ানো মহিলাদের বেশিরভাগই পাড়ার কয়েক ঘর ভ্যানচালকের স্ত্রী, একজন বলে উঠলো পাঁচশো টাকা করে দেবার কথা ছিল, পেয়েছে তো?
জব্বার হাত নাড়িয়ে বলে উঠলো- ‘খবরদার খবরদার! ও কতা আর কেউ মুখে এনিনা য্যানো! আমাগের যারা ভাড়া করে নে গেছে, পুলিশ খুঁজতেছে তাগের। কারা কোন্ দলে নে ঢুকোইছে, কেউ কি বুঝতি পেরিলাম আগেত্তে? মজুরীর আশা বাদ থোও একোন, মিছিলে গেছাও সে কতা উচ্চারণ করা যাবে না মোটে।’
পরদিন ভোরের আবছা অন্ধকার কাটতে না কাটতেই জব্বার এলো, দড়ি দিয়ে আটকানো বাঁশের চটার গেট দুমড়ে মাড়িয়ে ঝাঁপিয়ে বারান্দায় উঠলো, দরজায় বিরতিহীন টোকায় খইমন হুড়কো খুলে বের হলো, বিস্ময়ভরা দৃষ্টি তার। জব্বারের মুখে কোন কথা নেই কেন! খইমনের অবাক চোখে মুখে প্রশ্নের ছাপ স্পষ্ট, জব্বার তাড়াতাড়ি স্বর নামিয়ে খইমনকে বোঝালো শব্দ করে ডাকাডাকি করা যাচ্ছে না। ঐ পাড়ায় সবেদ সরদারের বাড়ি পুলিশ এসেছে।
‘শোনলাম কালগের যারা ঐ দলে ছেলো তাগের নাম থানায় লিস্টি হয়েছে। তুমি এক্কুনি সাত্তার ভাইয়ের নে বাড়িত্তে গে বিরাও। ধরলি একেবারে ক্ষ্যায়, নির্দোষ প্রমাণ করতি না পারলি সোজা ক্রসফায়ারে দেবে।’
কহিনূর জব্বারের কথাগুলো শুনতে পেয়ে ধসমস করে উঠে কামরা থেকে বেরিয়ে এলো; হন্তদন্ত হয়ে রান্নাঘরের চালার নিচ থেকে ভ্যান ঠেলে বের করতে লাগলো। জব্বারের কথা শুনে খইমন হতাশ, ভাবছে সাত্তার তো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়েও চলতে পারছে না, কী করে কী করবে?
ইতোমধ্যে জব্বার ঘর থেকে সাত্তারকে ধরে বাইরে নিয়ে এসেছে, সাত্তার জব্বারের কাঁধে ভর করে ভ্যানে চড়ে বসল। কহিনূর জব্বারের দিকে তাকিয়ে বলল- ‘কাকা, তুমি না হয় ভ্যানখান ঠেলে নে চলো, পাড়ার কেউ জিজ্ঞেস করলি কবা- আব্বার নে ডাক্তারের কাছে যাতিছি’
তারপর খইমনের কাছে এসে আস্তে আস্তে বলল- ‘শায়লা আন্টির উকিনি গে ওটো, আমি পরে আসতিছি’। খইমনও ভাবলো- থানার সাথে ওদের ভালো যোগাযোগ। এত বছর কাজ করছে ওদের বাড়ি, ঠিকই একটা ব্যবস্থা করে দেবে, পুলিশির খাতা থেকে নাম কাটাবে।
কহিনূর জামা কাপড় বদলে, হাত মুখ ধুয়ে, টুকিটাকি জিনিস ঘরে উঠিয়ে গুছিয়ে, সুটকেসের ভেতরে থেকে একটু একটু করে জমানো শ’তিনেক টাকা বুকে গুঁজে, দরজার পাল্লা টেনে শিকল তুলে তালা টিপে দিল।
শায়লা খানমের বাড়ি পৌঁছাতে ঘণ্টাখানেক দেরি হলো কহিনূরের। সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে দরজার কাছে পৌঁছে যা যা শুনলো ইরফান আহমেদের মুখে-
শোন সাত্তার ভাই, থানায় আমার একটা ফোনই যথেষ্ট, আসামীর খাতায় তোমার নামগন্ধ থাকবে না। কিন্তু তারপরে আবারও যখন যারা ডাকবে তুমি না বুঝে এ দলে সে দলে ভুলভাল পাটির সাথে যোগ দিয়ে বেড়াবা, তাতে তো আমারও মান থাকবে না। শুনেছি শহরের এক দেড়শো ভ্যানচালক তোমার কথা মান্য করে, তাদের একসাথে জড়ো করতে পারবা? আগামী পরশুদিন দীঘির পাড়ের মাঠে আমাদের সমাবেশে হাজির করা লাগবে। চিন্তা নেই, জন খাটার মজুরি দেওয়া হবে সবার। ভেবে দেখ, তাহলে একটা সুযোগ দিতে পারি!
ইরফানের কথায় সাত্তার আলী খইমনের মুখের দিকে তাকালো, খইমন সম্মতি সূচক মাথা নাড়িয়ে সাত্তারকে রাজি হতে বলল। বাইরে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কহিনূর হতবাক! যে কাজের কারণে বাপের জীবন চলে যাচ্ছিল, পুলিশের খাতায় নাম উঠে গেছে, সেখান থেকে মুক্তি পাবার জন্যে সেই কাজেই আরও একশ জনের জীবন নিয়ে হাজির হতে হবে!
রান্নাঘর থেকে শায়লার ডাকে খইমনকে উঠে যেতে হলো ; দৈনন্দিন কাজে ডুবে গেলো আজও।
মায়ের সম্মতি দেবার উপরে কহিনূর কিছু বললো না। দরজায় ঝুলন্ত পর্দাটা মুঠোয় চেপে ধরে দাঁড়িয়ে ভাবছে- “আগে বাপ সেরে উঠুক, আর থানা থেকে নাম কাটানো হোক, তারপর বাপ জন-মজুর খাটতি কোন্ কোন্ জাগায় যাবে না যাবে সে আমি দ্যাখপো। ফিরতি গোণে লা কিরাম কোরে বাতি হবে দেখায় দেবানে।”

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button