
ভারত সরকারের নাগরিকত্ব আইন নিয়ে দেশজুড়ে আগুন জ্বলছে প্রতিবাদের। বিরোধীরা তো বটেই, সমস্ত রাজ্যের একটা বড় সংখ্যক সাধারণ মানুষও দাবি করছেন, এ আইন জনবিরোধী। বিভাজন সৃষ্টিকারী। এ আইন মেনে নেওয়া মানে সাম্প্রদায়িকতাকে মেনে নেওয়া। রাজনীতিক থেকে ইতিহাসবিদ, বুদ্ধিজীবী থেকে ছাত্রসমাজ– সরকারের বিরুদ্ধে সরব হয়ে পথে নেমেছেন সকলে। রবিবার দিল্লির জামিয়া মিলিয়া এবং উত্তরপ্রদেশের আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবাদী পড়ুয়াদের উপর পুলিশি আক্রমণের পরে প্রতিবাদে ছেয়ে যায় সারা দেশ।
এদিকে, সে প্রতিবাদেরই একটা টুকরোর সাক্ষী হল আজ শহর কলকাতা। মিছিলের সামনের সারি যখন ধর্মতলা পৌঁছল, শেষটা তখন সবে মৌলালির মোড় পার করেছে। ওপর থেকে দেখে মনে হচ্ছিল, শহরের রাজপথ জুড়ে যেন মানুষ নয়, বয়ে চলেছে এক রঙিন সমুদ্র।
বৃহস্পতিবার (১৯ ডিসেম্বর) বেলা ১২টায় মৌলালির রামলীলা ময়দান থেকে ধর্মতলা পর্যন্ত আয়োজিত এ মিছিলে কত মানুষ হয়েছিল, এ মিছিল ঠিক কারা ডেকেছিল, মিছিলের উদ্দেশ্য কী কী– এ সব কিছুর উপরে যে কথাটা একবাক্যে বলা যায়, বহু দিন পরে এক দৃশ্যনন্দন মিছিল দেখল শহর কলকাতা। কোনও রাজনৈতিক দল, কোনও বিশেষ মত, কোনও নির্দিষ্ট সংগঠন ব্যতিরেকে শুধু নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে পথে নামল শহরবাসী।
শীতের বিকেলে আলো মরে আসে তাড়াতাড়ি। মিছিল তখন শেষের মুখে। তখনও তার এমাথা ওমাথা দেখা যায় না। জনজোয়ারে ভেসে যায় রাস্তা। সুদৃশ্য, সুশ্রাব্য। একটাই মিছিল, তার একটাই দাবি! নাগরিকত্ব আইন চলবে না। ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিক হওয়ার শর্ত মানছি না। আর এই দাবি ধ্বনিত হল হাজার ১৫ মানুষের গলায়। পুলিশের হিসেবে, আজ মিছিলে উপস্থিত মানুষের সংখ্যাটা এমনই।
মহামিছিলে শোনা গেল, এনআরসি চাই না, চাকরি চাই” স্লোগান। শোনা গেল, “আমরা সবাই ভারতীয়, আমার কোনও ধর্ম নেই। শোনা গেল, “হিন্দু মুসলিম ভাইভাই, একইসঙ্গে থাকতে চাই। এ সবের মধ্যেও কেউ বিখ্যাত ইতালীয় লোকগান ‘বেলা চাও’-এর সুরে গেয়ে উঠলেন, “অমিত শাহ, মোদী যাও, ফ্যাসিবাদ ভয় পাবে, বাংলা থেকে বিজেপি তাড়াও। ১৯৪৩ এবং ১৯৪৫ সালে ইতালিতে গৃহযুদ্ধ চলাকালীন, ফ্যাসিবাদী ইতালীয় সামাজিক প্রজাতন্ত্র এবং জার্মান নাজিদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের সময়ে এই গানটি জনপ্রিয় হয়। এটি সারা বিশ্বে ফ্যাসিবাদদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা এবং প্রতিরোধের সঙ্গীত হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আজও হল, শহর কলকাতার বুকে। এর বাইরে বামপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলির “আজাদি” স্লোগান তো আছেই!

আজকের এ মিছিলের যে চরিত্রটি সবচেয়ে বেশি করে খালি চোখে ধরা পড়ছিল, তা হল আক্ষরিক অর্থেই “নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান, বিবিধের মাঝে দেখো মিলন মহান।” শহরের মুসলিম সমাজের একটা বড় অংশ যেমন আজকের মিছিলের মুখ হয়ে উঠেছিলেন, তেমনই ছিলেন ছাত্রসমাজ। শহর ও শহরের আশপাশ থেকে ম্যাটাডোর ভর্তি করে এসে পৌঁছেছিল একাধিক শ্রমিক সংগঠন। ছিলেন অপর্ণা সেন, কৌশিক সেন, ঋদ্ধি সেনের মতো শিল্পী-অভিনেতা-বুদ্ধিজীবীরা। ছিলেন তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার বহু কর্মী। ছিলেন নেহাৎ ছাপোষা সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষও।
প্রত্যেকের পোশাক ভিন্ন, ভাষা ভিন্ন, সামাজিক স্টেটাস ভিন্ন। কিন্তু আজকের মিছিলে তাঁরা পা মিলিয়েছেন অভিন্ন এক প্রতিবাদে। এ দেশে ধর্মের ভিত্তিতে কোনও ভাগাভাগি মেনে নিতে চাইছেন না তাঁরা। একই সঙ্গে চাইছেন দু’বেলার অন্ন সংস্থান, চাকরি, শিক্ষার অধিকার। এক দিকে যেমন সরকারের আচরণকে ফ্যাসিস্ট বলে গলা তুললেন মিছিলকারীরা, অন্য দিকে তেমনই সম্প্রীতি ও সমন্বয়ের বার্তাও রাখল এই মিছিল।
শুধু তাই নয়, শাসক দলের দুই নেতার কুশপুতুল নিয়েও হাঁটতে দেখা গিয়েছে কয়েক জন মিছিলকারীকে। কিন্তু পোড়ানো হয়নি কুশপুতুল। প্রশ্ন করলে উত্তর মেলে, “আমরা হিংসা চাই না, প্রতিবাদ চাই।” না, এ কথা কেউ আলাদা করে শিখিয়ে দেয়নি এ মিছিলকে। সেই অর্থে কোনও নেতৃত্বই নেই আলাদা করে। নেই কোনও বিশেষ নিয়ন্ত্রণ। নেই কানফাটানো মাইকের আওয়াজ, নেই পুলিশের অতিসক্রিয়তা।

সোশ্যাল মিডিয়ার ডাকে জড়ো হওয়া, নাগরিক কর্তব্যের দায়ে পথ হাঁটা। এ মিছিলে আজ এমন অনেকে ছিলেন, যাঁরা হয়তো এত দিন স্বভাবসুলভ ভাবেই রাজনীতি থেকে শত হস্ত দূরে থেকেছেন। আজকের মিছিলে তাঁরা সকলেই স্বতঃস্ফূর্ত এবং অবশ্যই সহযোগী। এই শৃঙ্খলার মধ্যেই মিছিল পৌঁছল ধর্মতলায়।
এর পরে ওয়াই চ্যানেলের দিকে এগোনোর চেষ্টা করলে, বাধা দেয় পুলিশ। তবে সে বাধাকে অনুরোধ বলাই ভাল। সেখানেই অবস্থান করেন মিছিলকারীরা। স্লোগানে-গানে-বাজনায় ভরিয়ে দেন গোটা চত্বর। কারও হাতে দেখা যায় রবীন্দ্রনাথের ছবি, কারও হাতে মহাত্মা গান্ধীর!
এত বড় মিছিল অথচ শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এত সুশৃঙ্খল– এটাও শহর কলকাতার বিশেষ পাওনা বৈকী! প্রতিবাদ-বিক্ষোভের জেরে আজ রীতিমতো অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি হয়েছে দিল্লি, লখনউ, বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদে। কোথাও জ্বলেছে আগুন, ভেঙেছে যানবাহন। কোথাও আবার জলকামানের মুখে পড়েছেন বিক্ষোভকারীরা, টিয়ারগ্যাসে চালিয়েছে পুলিশ। দেশজুড়ে অশান্তির আবহে এই শহরই যেন দেখিয়ে দিল, বিশৃঙ্খলা না করেও প্রতিবাদ করা যায় গণতান্ত্রিক উপায়ে।




