
তেভাগা আন্দোলনের ভৌগোলিক পরিধি :
তেভাগা আন্দোলনের নেতা কমরেড নুর জালালের স্বহস্তে লিখিত আত্মজীবনীমূলক বইয়ের ৭৯ পৃষ্ঠায় লিখেছেন কমরেড বাচ্চু ঘোষ তৎকালীন বৃহত্তর যশোর জেলা পার্টির সম্পাদক ছিলেন। অবিভক্ত ভারতবর্ষের যশোর জেলার মহাকুমা ছিলÑ যশোর সদর, বনগাঁ, ঝিনাইদহ, মাগুরা ও নড়াইল। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সিদ্ধান্ত অনুসারে কৃষক আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য জেলা কমিটির পক্ষ থেকে বনগাঁ মহকুমার দায়িত্বে ছিলেন কমরেড অজিত গাঙ্গুলি, যশোর সদর অধীর ঘোষ, নড়াইল কমরেড অমল সেন, মাগুরা কমরেড আবদুল হক, ঝিনাইদহ মহকুমায় তেমন কেউ দায়িত্বে ছিলেন না। তেভাগা আন্দোলনটি মূলত নড়াইল মহকুমা ও যশোর সদর মহকুমাই সংগঠিত হয়েছিল। মাগুরা মহকুমার শালিখা থানার আসবা-বরই চারা অঞ্চলে কমরেড আবদুল হক কৃষক আন্দোলন গড়ে তুলতে উদ্যোগী হয়েছিলেন। কৃষকদের কিছু দাবি-দাওয়া ভিত্তিক আন্দোলন গড়ে তোলার প্রাথমিক পর্যায়ে ঐ অঞ্চলের শোষক গোষ্ঠীর দ্বারা আক্রান্ত হন। কমরেড আবদুল হক ও ঐ অঞ্চলের কৃষক সংগঠকদের বিরুদ্ধে শত্রæরা চুরি ডাকাতি ও রেইপ কেস দেয়। কমরেড আবদুল হক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হন। আত্মগোপন অবস্থায় নড়াইল ও যশোরের তেভাগা আন্দোলনের কাজে সহযোগিতার ভুমিকা পালন করেছিলেন। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির কংগ্রেসের নির্বাচিত প্রথম সম্পাদক কমরেড পূরণ চন্দ্র যোশী বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনে যশোর সদর মহকুমার কেশবপুর থানার পাঁজিয়া অঞ্চলে এসেছিলেন। তাঁকে যশোর রেলস্টেশনে হাজার হাজার লাল পতাকা নিয়ে কৃষকদের সজ্জিত স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী জেলা কমিটির পক্ষ থেকে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেনÑ কমরেড নুর জালাল কমরেড অধীর ঘোষসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। পাঁজিয়ার তেভাগা আন্দোলনের ঐ মুহুর্তে কমরেড পিসি যোশীর আসা কৃষক জনতাকে সাংঘাতিক ভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিল। নড়াইল মহকুমার ১৯৪৫ সালের আগে তেভাগা আন্দোলনের স্বপক্ষে যে সকল প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছিলেন তা ১৯৪৬ সালের নড়াইল মহকুমার কমিটির সভায় আমন ফসলের শুরুতে তেভাগার লড়াই শুরু করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সভাটি হয়েছিল প্রখ্যাত কৃষক নেতা কমরেড বটু দত্তের বাড়িতে। নড়াইল মহকুমা পার্টির সম্পাদক ছিলেন কমরেড অমল সেন। উল্লেখ্য ১৯৪৫ সালে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছিল বৃটিশ সা¤্রাজ্যবাদকে ভারতবর্ষ থেকে বিতাড়িত করতে হলে কৃষকদের আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করতে হবে। ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির প্রায় সকল প্রদেশই এই সিদ্ধান্তকে মেনে নেয়। বাংলার প্রাদেশিক কমিটির সিদ্ধান্তকে শুধু মেনে নেয়নি বাস্তবায়নের জন্য উদ্যোগী ভূমিকা নিয়েছিল। যশোর নড়াইলের পার্টি উদ্যোগী ভূমিকা নিতে একেবারেই বিলম্ব করে নাই। আমি নড়াইল তেভাগা আন্দোলনের কৃষকদের বীরোচিত লড়াইয়ের ঘটনার বিস্তারিত লেখার আগেই কমরেড অমল সেনের গেরিলা ট্রেনিংয়ের একটি ঘটনা উল্লেখ করছি। কমরেড অমল সেন ১৯৪২ সালের ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি জনযুদ্ধের লাইন গ্রহণ করলে গেরিলা ট্রেনিংয়েরও পুরোভাগে ছিলেন। ১৯৪২ সালে বরিশালের ঝালকাঠি অঞ্চলের পার্টির সদস্যদের জন্য গেরিলা ট্রেনিংয়ের ব্যাবস্থা করা হয়েছিল। বৃহত্তর যশোর জেলার পক্ষ থেকে কমরেড অমল সেন প্রশিক্ষণে অংশ নেন। ঐ ট্রেনিং-এর ট্রেনার ছিলেন বার্মা থেকে আগত কমরেড হরিপদ ঘোষাল। পুলিশের একটি টহল দল যে বাড়িতে ট্রেনিং হচ্ছিল সেই বাড়ির দিকে আসছিল। তখন ঐ বাড়ির এক মহিলার তাৎক্ষণিক বুদ্ধিতে অস্ত্রগুলি বেত ঝাড় ও বাঁশ বাগানের মধ্যে ফেলে দেন। মহিলার তাৎক্ষণিক এই বুদ্ধিতে রক্ষা পেয়ে যান।
চলবে/১৮




