
যশোর-নড়াইলের ষাটের দশকে কমিউনিস্ট আন্দোলনের পরিস্থিতি :
১৯৬৭ সালের ডিসেম্বরে কমরেড অমল সেনের কারামুক্তির পর কমরেড মমতাজ উদ্দীন, সাইফ হাফিজুর রহমান খোকন ও আমি কমরেড অমল সেনের সঙ্গে ১৯৬৭ সালের ১৯শে ডিসেম্বর বিকেলে সাক্ষাৎ করতে বাকড়িতে গিয়েছিলাম। সাক্ষাৎ হলো কিন্তু ওই দিন খুব বেশি আলোচনা হতে পারেনি। দীর্ঘ ১০ বছর পর কমরেড অমল সেন কারামুক্ত হন। আমাদেরকে তিনি চিনতেনও না। আমরা পরিচয় দিয়ে কমরেড অমল সেনের সাথে কিছু কথা বলার চেষ্টা করেছিলাম। পরবর্তীতে আলোচনা হবে বলে সেদিন বিদায় নিয়েছিলাম। কমরেড অমল সেন কারাগার থেকে বের হওয়ার পর তৎকালীন ইপিসিপি এম-এলের কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল কমরেড অমল সেন যেন কেন্দ্রীয় কমিটিতে সংযুক্ত হয়ে পার্টির দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু কমরেড অমল সেন কেন্দ্রীয় কমিটিকে বলেছিলেন, দীর্ঘ ১০ বছর কারারুদ্ধ ছিলাম। জনগণ থেকে একেবারেই বিচ্ছিন্ন ছিলাম তাই আমাকে সময় দিন। কমরেড অমল সেন সাংগঠনিক ভাবে যুক্ত হলেন বৃহত্তর যশোর জেলা কমিটিতে। কমরেড অমল সেনকে তৎকালীন নড়াইল মহকুমাসহ খুলনার দিঘলিয়া থানার কোলাপাটগাতি অঞ্চল পর্যন্ত দায়িত্ব দেওয়া হলো। পাকিস্তান আমলে গাজীরহাটের একাংশ ও আবালগাতি, মাঝিরগাতি, কোলাপাটগাতি এইসব অঞ্চলে যশোর পার্টির পক্ষ থেকে পার্টি গড়ে তোলা হয়েছিল।
নড়াইল সদরের দক্ষিণ থেকে এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলে পার্টির একটি মাত্র সেল বা শাখা কমিটি ছিল। কমরেড সন্তোষ মজুমদার ছিলেন ওই শাখা কমিটির সম্পাদক। পার্টি সদস্য কমরেড বৈদ্যনাথ বিশ্বাস আমিসহ কয়েকজন ওই শাখা কমিটিতে ছিলাম। এই ধরনের সাংগঠনিক কাঠামোকে বলা হতো সেল কাম গ্রæপ। গ্রেফতার এড়াবার জন্য কমরেড অমল সেন শুরু থেকেই আত্মগোপনে থেকে পার্টির কাজ করেছেন। আমি ছিলাম পার্টির কাজে কমরেড অমল সেনের সার্বক্ষণিক সহযোগী। ১৯৬৮ সালে নড়াইল মহকুমায় কৃষক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তৎকালীন স্বর্ণপট্টি বলে খ্যাত সেখানে বটগাছতলায় সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ওই সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসাবে যোগ দিয়েছিলেন তৎকালীন কৃষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মৌলভীবাজার মহকুমা কোলাউড়া সম্মেলনে নির্বাচিত কমরেড আব্দুল হক। শুনেছি ওই সম্মেলনে সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার জন্য উভয়পক্ষ সদস্য সংগ্রহের বইয়ে ভুয়া সদস্য সংগ্রহ করেছিল। কোলাউড়া সম্মেলনেই মস্কোপন্থী পিকিংপন্থীদের দ্ব›েদ্ব কৃষক সমিতি ভেঙ্গে যায়। নড়াইল মহকুমা সম্মেলনে কমরেড অমল সেনই ছিলেন সকলের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেছিলেন তেভাগা আন্দোলনের অন্যতম প্রখ্যাত নেতা কমরেড নুর জালাল। আমরা ছাত্র আন্দোলনের কাজে ব্যস্ত থাকলেও পার্টির নির্দেশে ওই সময়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে কৃষক সংগঠনকে দাঁড় করাতে চেষ্টা করেছিলাম। নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজে তখন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন মেনন গ্রæপের দূর্ভেধ্য ঘাঁটি। নড়াইল সদর থানার কিছু কিছু অঞ্চলে তৎকালীন কৃষক সমিতির সংযোগ থাকলেও ওই সময়ে লোহাগড়া থানা ও কালিয়া থানায় কৃষক সমিতির ঐ অর্থে কোনো সংগঠন ও কর্মতৎপরতা ছিল না। কালিয়া থানার পেড়লী অঞ্চলে কমরেড বৈদ্যনাথ বিশ্বাস, কমরেড মঞ্জু, কমরেড বাকিবিল্লাহ, কমরেড কায়সার, কমরেড গোলাম ও কমরেড আজিজুর রহমান এদের প্রচেষ্টায় কৃষক সংগঠন গড়ে উঠে। কমরেড গোলাম ছিলেন কমরেড জাকির হোসেন হবির বড় ভাই। ১৯৭১ সালে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছিলেন। কোথায় কিভাবে নিখোঁজ হয়েছিলেন তা আমরা এখনো পর্যন্ত জানিনা। কেউ কেউ বলেন ভারতে ট্রেনিং দিতে গিয়ে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের হাতে নিহত হয়েছিলেন। লোহাগড়া থানায় প্রথম দিকে মল্লিকপুর, সিঙ্গিয়া, বাকা এসব গ্রামে কমরেড দবিরকে নিয়ে প্রাথমিক ভাবে কৃষক সংগঠনের যে কাঠামো তৈরির চেষ্টা আমরা করেছিলাম সেক্ষেত্রে ওই সকল গ্রামে কমরেড অমল সেন আত্মগোপনে থেকে পার্টিতে কর্মী রিক্রুট করবার জন্য উদ্যোগী ছিলেন। কমরেড অমল সেন কারাগার থেকে বের হওয়ার পর আত্মগোপনে থেকে পার্টিতে কাজ করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তাই লোহাগড়ায় প্রথম যখন যান তখন মল্লিকপুরের আনোয়ারদের বাসায় বেশ কয়েকদিন ছিলেন। পার-মল্লিকপুরে বাদশাহদের বাসায়, বড়দিয়ার হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক আব্দুস সাত্তারের বাসায় থেকে ওই অঞ্চলে পার্টি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছেন। দূর্গাপুর, ডুমুরতলা, চাঁদপুর অঞ্চলে কমরেড নুর জালাল, কমরেড মোদাচ্ছের মুন্সী, কমরেড আজিজকে নিয়ে একটি সেল ছিল। ওই সেল পরিচালনা করতেন কমরেড অমল সেন। তাছাড়া দুর্গাপুর গ্রামের কমরেড নুরুল আকবর ও কমরেড নুরুল হক খান (মোদাচ্ছের মুন্সীর একমাত্র জামাতা) কৃষক সংগঠনে কাজ করতেন।
এগারোখান অঞ্চলে কমরেড রসিক ঘোষ, কমরেড প্রভাত শিকদার, কমরেড নিরোদ লস্কর, তেভাগা আন্দোলনের এইসকল সংগঠকদের একটি পার্টি কাঠামোয় সংগঠিত করেছিলেন কমরেড অমল সেন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই কমরেড অমল সেন আবার গ্রেফতার হয়ে যান। ১৯৬৯ এর গণ অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে কমরেড অমল সেন কারামুক্ত হলে আবারও জেলা কমিটির পক্ষ থেকে নড়াইল অঞ্চলের দায়িত্বপালন করতেন। ১৯৬৯ সালের গণ অভ্যুত্থানের আগে ও পরে ব্যাপক সংখ্যক ছাত্রকর্মী তাদেরকে পার্টির সংগঠনের পার্টি গ্রæপে সংগঠিত করা হয়েছিল। যারা পার্টি গ্রæপে সংগঠিত ছিলেন তাদের মধ্যে কমরেড মমতাজ উদ্দীন, সাইফ হাফিজুর রহমান খোকন, আব্দুস সবুর, হেমায়েত উদ্দীন, তবিবুর রহমান, তবিবুর রহমান মনু, শেখ আজিজুল হক, সুভাষ বিশ্বাস (কোড়গ্রাম) এদের নাম বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। তাছাড়া শালিখা থানার পুলুম অঞ্চলের পার্টিতে সংগঠিত ছিলেন কমরেড নিরঞ্জন সরকার, ফজলে এলাহী, আবুল কালাম, তবিবুর রহমান, আব্দুল মালেকসহ আরও কেউ কেউ। কমরেড অমল সেন এদের সাথেও জেলা কমিটির পক্ষ থেকে সংযোগ রক্ষা করতেন।
১৯৬৯ সালের গণ অভ্যুত্থানের পর ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যারা পুরোভাগে এসে দাঁড়িয়েছিলেন তাদের মধ্য থেকে পার্টির সার্বক্ষণিক কর্মী হিসেবে জেলা কমিটির পক্ষ থেকে অনেককেই প্রস্তাব দিয়েছিলেন। যশোর জেলায় কমরেড নুর মোহাম্মদ সার্বক্ষণিক কর্মী হতে চেয়েছিলেন শর্তসাপেক্ষে। তিনি বলেছিলেন আমি সার্বক্ষণিক কর্মী হতে রাজী আছি কিন্তু আমার পরিবারের আর্থিক দূরাবস্থার কারণে ৫০ টাকা এবং আমার পার্টি কর্মকাÐের জন্য আরও ৫০ টাকা ভাতা প্রয়োজন। তিনি আরও বলেছিলেন, এই ১০০ টাকা বা তারও কিছু বেশি আমি সংগ্রহ করে পার্টিতে জমা দেবো। এব্যাপারে জেলা কমিটির পক্ষ থেকে কমরেড অমল সেনকে কমরেড নুর মোহাম্মদের সাথে আলোচনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। কমরেড অমল সেন কমরেড নুর মোহাম্মদের সাথে আলোচনা করে জেলা কমিটির সভায় প্রশ্ন তুলেছিলেন, এই ভাতা নির্ধারণের ব্যাপারে দায়িত্ব জেলা কমিটির। কমরেড নুর মোহাম্মদ কেন ভাতার ব্যাপারে এভাবে প্রস্তাবনা উত্থাপন করলেন?
পরবর্তীতে কমরেড নুর মোহাম্মদকে জেলা কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয় আপনি কেন ভাতার বিষয়টি নির্ধারণ করবেন? এই ধরনের পরিস্থিতিতে কমরেড নুর মোহাম্মদ সার্বক্ষণিক কর্মী হওয়ার ইচ্ছা পরিত্যাগ করে বন্দ বিলের হাইস্কুলে শিক্ষকতার চাকরি নিয়ে চলে গেলেন। আমাকে সার্বক্ষণিক কর্মী হিসাবে পাওয়ার জন্য কমরেড অমল সেন প্রশ্ন করেছিলেন, তুমি কি করতে চাও? আমি বলেছিলাম কৃষক আন্দোলন করতে চাই। কমরেড অমল সেন প্রশ্ন করলেন, কৃষক আন্দোলনে জন্য তোমাকে কেন উকিল হতে হবে? আমার অবুঝ জীবনে আকাক্সক্ষা ছিল একজন প্রকৌশলী হওয়ার কিন্তু পার্টির সিদ্ধান্তে ঢাকায় এসে আহসান উল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হওয়ার সকল যোগ্যতা থাকার পরেও পার্টির সিদ্ধান্তে নড়াইলে ছাত্র সংগঠন ও ছাত্র আন্দোলনের কাজে থেকে যেতে হলো। আমার আরেকটি আকাক্সক্ষা ছিল প্রকৌশলী না হতে পারলে একজন আইনজীবী হবো। কিন্তু কমরেড অমল সেন যখন কৃষক আন্দোলনের জন্য আইনজীবী হওয়ার প্রয়োজনীয়তা জিজ্ঞাসা করলেন তখন আমি ছিলাম নিরুত্তর। আমার সার্বক্ষণিক হওয়ার ব্যাপারে কমরেড হেমন্ত সরকারসহ আরও কেউ কেউ আমাকে বলেছিলেন। কিন্তু কমরেড অমল সেনের বক্তব্যের সারবত্তাকে উপলব্ধি করে আমি বলেছিলাম, আমি খুলনা ’ল’ কলেজে ভর্তি হই আর নড়াইলে সার্বক্ষণিক ভাবে পার্টির কাজে নিয়োজিত থাকবো। আমাদের সময়ই আইনের সব বিষয়গুলির বাংলা বই পাওয়া যেতো। ভর্তি হওয়ার আগেই আইনের বই হিন্দু ল, মুসলিম ল, রোমান ল এগুলোর পাতা উল্টিয়ে আমি বুঝেছিলাম ক্লাস না করেও পাশ করা সম্ভব হবে। কমরেড অমল সেনের সঙ্গে আমার এই আলোচনা হয়েছিল বড়েন্দারের কমরেড জ্ঞান সরকারের কুড়িগ্রামের বাড়িতে। রাতে ঐ বাড়িতে কমরেড অমল সেনের সাথেই ছিলাম। পরদিন সকালে বাড়িতে গিয়ে আমার অতি আপনজন মাতৃ-পিতৃস্নেহ দিয়ে আমাকে লালন-পালন করেছেন সেই বড় পিসিমাকে আমি সংসার ত্যাগ করে পার্টি বিপ্লবের কাজে আত্মনিয়োগ করার সংকল্প ব্যক্ত করলাম। আমার বড় পিসিমা ১২ বছর বয়স থেকেই বৈধব্য জীবন নিয়ে আমাদের পরিবারের সাথেই ছিলেন। দুপুরের মধ্যে একটি ঝোলা ব্যাগ কাঁধে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লাম। আমার জানামতে খুলনা জেলা পার্টিতে ১৯৬৮ সালে স্বেচ্ছায় ও স্বতপ্রণোদিত হয়ে প্রয়াত কমরেড আজিজুর রহমান সার্বক্ষণিক কর্মী হয়েছিলেন। তৎকালীন ইপিসিপি এম-এলের সার্বক্ষনিক কর্মী হওয়ার উদাহরণ ঐ সময়ে আর ছিল না। পরবর্তীতে শ্রেণীশত্রæ খতমের লাইনকে প্রয়োগের সময় অনেকেই সার্বক্ষণিক কর্মী হয়েছিলেন।
যেহেতু আমি খুলনা ‘ল’ কলেজে পার্টির সার্বক্ষনিক কর্মী হওয়ার আগেই ভর্তি হয়েছিলাম সেকারণে পিসিমার লেখাপড়ার কি হবে এই প্রশ্নের কোনো যথাযথ উত্তর দিতে পারিনি। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য, স্কুল জীবনের নবম-দশম শ্রেণী থেকে আমার বেশিরভাগ সময়ই কেটেছে বাড়ির বাইরে।
চলবে/




