এটা তালা বদল হওয়ার অস্থির এক মুহূর্ত (পর্ব-৩৬)

কাজল ঘোষ
একটি নির্দিষ্ট গ্রুপ ফ্রেসনো এবং স্টকটনে ঘটনাটি ঘটিয়েছিল। স্থানীয় নেতারা ফেডারেল গভর্নমেন্টের কাছে আবেদন করেছিলেন এলাকাটিকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা করতে এবং সাহায্য পাঠাতে। ‘দুর্গত এলাকা’ ঘোষণার কারণ বর্ণনায় বলা হয়েছিল, এলাকার অধিবাসীরা দেউলিয়া হয়ে পড়েছে এবং পূর্বাভাস দেয়া হয়েছিল জাতীয় ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দুর্যোগের। মাঝে মাঝে পরিবারগুলো তাদের মর্টগেজের অর্থ পরিশোধ করতে গিয়ে এতোটাই সংগ্রামের মধ্যে পড়েছে যে তাদের আকস্মিকভাবে সবকিছু গুটিয়ে নিয়ে চলে যেতে হয়েছে। আমি শুনেছি, দেউলিয়াত্বের শিকার হয়ে চলতে না পারায় অনেক পোষা প্রাণীকে ফেলে যেতে বাধ্য হয়েছে। হিউম্যান সোসাইটিতে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে যে, এরকমটি দেশের সবখানেই ঘটেছে। লিটল রক থেকে ক্লিভল্যান্ড হয়ে অ্যালভাকারেক পর্যন্ত। আমাকে বলা হলো ফেলে যাওয়া কুকুরগুলোকে দলবেঁধে ঘুরাফেরা করতে দেখা গেছে।
আমার মনে হয়েছিল আমি প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট কোনো বিপর্যয় দেখছি। আসলে তা মানুষের তৈরি।
যখন দেউলিয়াত্বের সবকিছু স্পষ্ট হয় তখন ৮.৪ মিলিয়ন মানুষ পুরো আমেরিকায় চাকরি হারায়। ৫ মিলিয়ন বাড়ির মালিকের কমপক্ষে দু’মাসের মর্টগেজ বাকি পড়েছে। আর পূর্বাভাস দেয়া হয়েছিল ২.৫ মিলিয়ন মানুষের অবস্থা সংকটাপন্ন। পূর্বাভাস অনুযায়ী আড়াই মিলিয়ন মানুষ এ পরিস্থিতির মধ্যে আবর্তিত হয়। এখানকার অনেকেই এ পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে। দৃশ্যমান না হলেও কিছু একটার কারণে মানুষ একধরনের ট্র্যাজেডির শিকার হয়ে ট্রমায় ভুগতে শুরু করে। পূর্বাভাস কোনো পরিসংখ্যান নয়। পূর্বাভাস এমনই যেখানে স্বামী নীরবে ধ্বংসের মধ্যে আছে। তীব্র সংকটেও স্ত্রীকে কিছু না বলতে পেরে শেষ হয়ে যাচ্ছে। পূর্বাভাস এমনই যেখানে মা ব্যাংকে ফোন করে সময় চাইছে স্কুলের বকেয়া টাকা পরিশোধের সুযোগ দেয়ার জন্য। পূর্বাভাসে শেরিফ বাড়ির দরোজায় কড়া নেড়ে নোটিশ করছে বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য। দিদিমা নীরবে চোখের পানি ফেলছে অজ্ঞাত লোকেরা তার বাড়িটি নিয়ে নিচ্ছে এবং তিনি বাড়ির আঙ্গিনা ছেড়ে যাচ্ছেন। একজন প্রতিবেশীর কাছ থেকে জানা গেছে যে, আপনার বাড়িটি সিটি হলের সিঁড়ির উপরেই নিলামে ওঠেছে। এটা তালা বদল হওয়ার অস্থির এক মুহূর্ত। এটা কোনো শিশুর প্রথম শিক্ষা যে পিতামাতারাও ভীত শঙ্কিত হতে পারে। অগণিত বাড়ির মালিক আমাকে তাদের এমন বিপর্যয়ের ঘটনাগুলো বলেছে এবং মাসাধিককাল ধরে পত্রিকাগুলো সেই পূর্বাভাসের খবর প্রকাশ করতে থাকে। আমরা এমন সব বিষয় মানুষের সম্পর্কে জানিতে পারি যাদের মর্টগেজের ডকুমেন্টগুলো খুঁজে পাচ্ছিল না ব্যাংক। অনেক মানুষ ছিলেন যারা ব্যাংক থেকে যে পরিমাণ অর্থ ঋণ নিয়েছেন আকস্মিকভাবে তারা দেখতে পেলেন তাদের ঋণের পরিমাণ হাজার হাজার ডলার। ফ্লোরিডার এক ব্যক্তি দেখতে পেলেন তার বাড়িটি নিলামে তোলা হয়েছে। যদিও তিনি এ বাড়িটি নগদ টাকায় কিনেছিলেন এবং তার কোনো মর্টগেজও ছিল না। এমন সব কাহিনীর কথা বেরিয়ে এলো যেটা দ্বৈত শনাক্তকরণ বলে চিহ্নিত। কেন্দ্রীয় সরকারের একটি কর্মসূচির মাধ্যমে ব্যাংকগুলো ঋণগ্রহীতাদের সঙ্গে ঋণের শর্ত নিয়ে কথা বলছিল। ফলে তারা নিজেদের বাড়িতে সহজে থাকতে পারেন। কিন্তু ঋণ গ্রহীতারা দ্বিতীয় পদ্ধতি নিয়েও কথা বলতে থাকেন। তারা কমিয়ে দেয়া মাসিক কিস্তি পরিশোধ করতে থাকেন কয়েক মাস ধরে। বাড়ির মালিকদের কোনো ব্যাখ্যা, যোগাযোগের কোনো শর্ত অথবা অন্য কোনো উপায় বাকি রাখেনি ব্যাংকগুলো। সুস্পষ্টত, অনেক কিছুই ঘটেছে উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো। ২০১০ সালের সেপ্টেম্বর শেষ না হওয়া পর্যন্ত এমনটাই চলতে থাকে। ঐ সময় এই কেলেঙ্কারির বিষয়টি ব্যাপক আকারে প্রকাশিত হয়। তখনই আমরা জানতে পারি যে, ২০০৭ সাল থেকে লোকজনকে অবৈধভাবে তাদের বাড়ি থেকে উচ্ছেদে জড়িত ব্যাংক অব আমেরিকা, জেপি মর্গান চেস এবং ওয়েলস ফার্গোর মতো বড় বড় ব্যাংকগুলো। তারা এক্ষেত্রে এমন একটি উপায় অবলম্বন করে যেটা পরিচিতি পেয়েছে ‘রোবো সাইনিং’ নামে।
কমালা হ্যারিসের অটোবায়োগ্রাফি
‘দ্য ট্রুথ উই হোল্ড’ বই থেকে/
সুত্র : মানবজমিন



