
এইচ.কে রফিক উদ্দিন, উখিয়া প্রতিনিধি: সীমান্তবর্তী কক্সবাজার জেলার উখিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও অনিয়ম চললেও কার্যকর প্রতিকার না থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ। দলিল নিবন্ধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সেবাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট, যারা অতিরিক্ত অর্থ আদায় ও দালালনির্ভর ব্যবস্থার মাধ্যমে পুরো অফিস কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছে—এমন অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, অফিসের প্রবেশপথে ‘বিনা অনুমতিতে প্রবেশ নিষেধ’ সাইনবোর্ড টাঙিয়ে সাধারণ মানুষকে দূরে রাখা হয়। সিসিটিভি থাকলেও সেবাপ্রার্থীদের হয়রানি কমছে না। সময়মতো দলিল নিবন্ধন না হওয়া, অকারণে ফাইল আটকে রাখা এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে অফিস কার্যক্রম, ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, অফিস সহকারী বেবী রাণী দে-কে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এ সিন্ডিকেটের সঙ্গে মোহরার সৃদুল দাশ ও রবিউল্লাহ রবির সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগের তালিকায় সাব-রেজিস্ট্রার কর্মকর্তা মোঃ মোরশেদ আলমের নামও উঠে এসেছে। তার বিরুদ্ধে নিয়মিত অফিসে অনুপস্থিত থাকা, দালালদের প্রভাব খাটানো এবং নিজের কক্ষে প্রবেশেও অনুমতির বিধান চালুর অভিযোগ রয়েছে।
গোপন সূত্রের দাবি, সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে জমির বাজারমূল্যের শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশ (০.৫%) ঘুষ আদায় করা হয়। সে হিসেবে এক কোটি টাকার জমি নিবন্ধনে অতিরিক্ত প্রায় ৫০ হাজার টাকা গুনতে হচ্ছে সেবাগ্রহীতাদের।
এছাড়াও ‘কমিশন’, ‘অফিস খরচ’ ও অন্যান্য অঘোষিত ফি’র নামে একটি নিয়ন্ত্রিত অর্থ আদায় ব্যবস্থার অভিযোগ উঠেছে, যা পুরো অফিসকে কার্যত জিম্মি করে রেখেছে।
একাধিক সূত্র জানায়, আদায়কৃত ঘুষের একটি অংশ অফিস সহকারী নিজে রাখেন এবং বাকি অংশ সিন্ডিকেটের সদস্য ও দালালদের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। দলিল লেখকদের মাধ্যমেই এসব অতিরিক্ত অর্থ সংগ্রহ করা হয় বলে অভিযোগ।
অভিযোগ রয়েছে, জমির শ্রেণি পরিবর্তন ও বাজারমূল্য কম দেখিয়ে দলিল নিবন্ধনের মাধ্যমে সরকারকে বিপুল রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। এ প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
উখিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে কর্মরত ২০ জন দলিল লেখকের মধ্যে অধিকাংশই সিন্ডিকেটের চাপে রয়েছেন বলে অভিযোগ। সাংবাদিকদের তথ্য দিলে বা তাদের সঙ্গে কথা বললে সংশ্লিষ্ট দলিল লেখকের ‘গেট পাস’ বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। ফলে তথ্য প্রকাশে এক ধরনের ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, চাকরিতে যোগদানের পর অল্প সময়ের মধ্যেই অফিস সহকারী বেবী রাণী দে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন, যা নিয়ে এলাকায় নানা প্রশ্ন ও আলোচনা চলছে।
দুদকের অভিযানে প্রমাণ মিলেছে, চলতি বছরের ১৬ এপ্রিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক গোলসান আনোয়ারের নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি এনফোর্সমেন্ট টিম উখিয়া সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে অভিযান চালায়। অভিযানে ঘুষ, দুর্নীতি, অনিয়ম ও অতিরিক্ত ফি আদায়ের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে বলে জানা যায়।
এ বিষয়ে অফিস সহকারী বেবী রাণী দে ও মোহরার সৃদুল দাশের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। রবিউল্লাহ রবি বলেন, এ বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না।




