উপমহাদেশশিরোনাম

আফিম বেচেই যিনি হয়েছিলেন ভারতের শীর্ষস্থানীয় ধনী!

ফারহানা করিম : স্যার জামশেঠজি জেজিভয় পার্সি-ভারতীয় ব্যবসায়ী। তিনিই প্রথম ভারতীয় যিনি ব্রিটিশদের কাছ থেকে প্রথম নাইট এবং ব্যারনেট উপাধি পান, যার ফলে তার নামের আগে স্যার ব্যবহার করা হয়। আফিম এবং কাপড় বিক্রি করেই তিনি ভারতের শীর্ষ ধনী ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছিলেন। দানশীল ব্যক্তি হিসেবেও তিনি ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।
জেজিভয় ১৭৮৩ সালে ভারতের তৎকালীন বোম্বাই (বর্তমানে মুম্বাই) নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মারওয়ানজি ম্যাকজি জেজিভয় এবং জিভিবাই কাউয়াসজি জেজিভয়ের সন্তান। তার পিতা গুজরাটের কাপড়ের ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি পরবর্তীকালে বোম্বে চলে আসেন। মাত্র ১৬ বছর বয়সেই জেজিভয় পিতামাতা হারা হন। বাবা-মা মারা যাওয়ার পর তিনি মামার কাছে চলে যান। সেখানে তিনি খালি মদের বোতল বিক্রি করতেন। ফলে তখন তাকে সকলেই বাতলিওয়ালা বা বোতল বিক্রেতা নামেই চিনতো। এই বয়সেই তিনি আফিম এবং কাপড়ের ব্যবসা করার জন্য সমুদ্রপথে চীন যান।
জেজিভয়ের চতুর্থবার চীন ভ্রমণ তার জন্য ব্যাপক সৌভাগ্য বয়ে আনে। যদিও এই ভ্রমণেই তিনি অপহরণের শিকার হয়েছিলেন। তিনি ব্রিটিশ বাণিজ্য জাহাজ বার্নসউইকে করে ভারতীয় মহাসাগর পাড়ি দিয়ে চীন যাচ্ছিলেন। বর্তমান শ্রীলঙ্কায় আসার সময় ফরাসি দুটি রণতরী তাদের জাহাজ আক্রমণ করে। সেসময় ব্রিটিশদের সঙ্গে ফরাসিদের ব্যাপক শত্রুতা ছিল। তাই ফরাসিরা ব্রিটিশ ওই বাণিজ্য জাহাজের যাত্রীদের জিম্মি করে দক্ষিণ আফ্রিকায় নিয়ে যায়। পরবর্তীকালে অবশ্য তাদের ছেড়ে দেয়া হয়। কিন্তু জেজিভয় ছেড়ে দেয়ার চার মাস পরে ভারত ফিরে আসেন। এরমধ্যেই চমকপ্রদ ঘটনা ঘটে যায় যা ইতিহাসের বাঁকই বদলে দেয়।
তিনি এসময় বার্নসউইকের তরুণ ডাক্তার উইলিয়াম জার্ডিনের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন। তাদের এই বন্ধুত্বই উভয়ের জীবনই পুরোপুরি বদলে দিয়েছিল। ঐতিহাসিক জেসি এস. পলসেটিয়া তার ‘জেমশেঠজি জেজিভয় অব বোম্বে: পার্টনারশিপ অ্যান্ড পাবলিক কালচার ইন এম্পায়ার’ বইয়ে লেখেন, জেজিভয় এবং জার্ডিনের বন্ধুত্ব উভয় মানুষের জীবন বদলে দেয়ার পাশাপাশি ইতিহাসকেও প্রভাবিত করেছে।
জেজিভয় যখন জার্ডিনের সঙ্গে সাক্ষাত করেন তখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে ডাক্তার হিসেবে তার দায়িত্ব পালনের মেয়াদ প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল। তিনি চীনের ক্যান্টনে (বর্তমানে গুয়ানঝু নামে পরিচিত) একটি টেডিং হাউস প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত হয়ে ওই টেডিং হাউসটি এখনো বাজারে টিকে আছে। বর্তমানে এটির মূলধন ৪০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।
জার্ডিনের ব্যবসা ব্যাপক সফলতা পায়। কারণ এসময় তিনি আফিম বিক্রির ব্যবসা শুরু করেন। চীনাদের কাছে নেশার এই উপকরণটির ব্যাপক চাহিদা ছিল। ফলে আফিম বিক্রি করেই তিনি ধনী ব্যক্তিতে পরিণত হন।
অবশ্য চীনাদের আফিমে আসক্ত করানোর জন্য ব্রিটিশদের ব্যাপক সমালোচনা সইতে হয়েছে। মূলত সেসময় চীন থেকে লাখ লাখ পাউন্ডের চা আমদানি করতে হতো ব্রিটিশদের। চায়ের বহুল চাহিদা থাকার কারণে এটি আমদানি করেই ব্রিটিশদের ব্যাপক অর্থ দিতে হতো চীনাদের। ফলে বাণিজ্য ঘাটতির সৃষ্টি হয়। ব্রিটিশরা চাচ্ছিল তাদের যেমন চায়ের চাহিদা রয়েছে তেমনি চীনাদেরও এমন কোন পণ্যের চাহিদা তৈরি হোক যাতে করে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো যায়। অবশেষে ব্রিটিশরা সেই পণ্যটি পেয়েও যায়। এটিই হলো সেই আফিম যা চীনাদের দীর্ঘদিন ধরে নেশার রাজ্যে ডুবিয়ে রেখেছিল।
ব্রিটিশদের উপনিবেশিক দেশ ভারত থেকে চীনে আফিম রপ্তানির পথ খুলে যায়। মালওয়াতে এই আফিম চাষ হতো। এরপর বোম্বে থেকে জাহাজে করে তা চীনে রপ্তানি করা হতো। আর ক্যান্টনে অবস্থিত জার্ডিনের ট্রেডিং হাউসের মাধ্যমেই এক তৃতীয়াংশের বেশি আফিম চীনে বিক্রি করা হতো। আর ভারতে যে ব্যক্তিটি এই আফিম বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি আর কেউ নন জার্ডিনের বন্ধু জেজিভয়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই অল্প সময়ের মধ্যেই তিনিও অসম্ভব ধনী ব্যক্তিতে পরিণত হন।
এই আফিম বিক্রি করেই ১৮২০ সালে মাত্র ৪০ বছর বয়সেই জামশেঠজি জেজিভয় দুই কোটি রুপির (ভারতীয় মুদ্রা) বেশি অর্থের মালিক বনে যান। সেসময় তিনি ভারতের অন্যতম ধনী ব্যক্তিতে পরিণত হন।
জেজিভয়ের সমগ্র জীবনকে দুই ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। প্রথম জীবনে তিনি অত্যন্ত দুঃসাহসী ছিলেন। যেকোন বিপজ্জনক কাজ করতে দ্বিধাবোধ করতেন না। পরিণত বয়সে এসে তিনি সমাজের একজন সম্মানিত ব্যক্তিতে পরিণত হন। নিজের সম্প্রদায়ের মানুষের উপকারের জন্য কাজ করতে থাকেন তিনি।
দানশীল ব্যক্তি হিসেবেও তিনি খ্যাতি লাভ করেন। তার জীবনী লেখক জে.আর.পি মুডির হিসাব অনুযায়ী তিনি সারাজীবনে ২ লাখ ৪৫ হাজার পাউন্ড (ব্রিটিশ মুদ্রা) দান করেছেন। বর্তমান হিসাব অনুযায়ী এটি প্রায় ১০০ কোটি রুপির কাছাকাছি হবে। তার সবচেয়ে বড় কাজ হচ্ছে জেজে হাসপাতাল নির্মাণ করা। এই হাসপাতাল তৈরিতে তিনি জমি এবং বিশাল অংকের অর্থ দিয়েছিলেন। সুত্র: বাংলা

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button