আজ বোয়ালমারী হানাদার মুক্ত দিবস

বোয়ালমারী (ফরিদপুর) প্রতিনিধি : মহান মুক্তিযুদ্ধের শেষ প্রান্তে এসে ১৯৭১ সালের ৯ ডিসেম্বর পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার আলবদরদের পরাজিত করে ফরিদপুর জেলার বোয়ালমারীকে সম্পূর্ণ পাক হানাদার মুক্ত করে মুক্তিযোদ্ধারা। দীর্ঘ নয় মাস সশস্ত্র প্রতিরোধ, গোপন সংগঠন ও দুঃসাহসিক অভিযানের ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের তীব্র প্রতিরোধে মুখে এই দিনে (৯ ডিসেম্বর) পাক হানাদার বাহিনী ও তার দোসরা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
আজ মঙ্গলবার (৯ ডিসেম্বর) এ উপলক্ষে মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সে রণাঙ্গণের স্মৃতি চারণ ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে।
পরে এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় বোয়ালমারী সদর হাসপাতালে পাক বাহিনী একটি অস্থায়ী ক্যাম্প তৈরি করে। ওই সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার আলবদরদের নিয়ে গ্রামাঞ্চলে তল্লাশি, বাড়িঘর পোড়ানো রাজাকারদের সহায়তায় গণগ্রেপ্তার চালায়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে চতুল ইউনিয়নের হাসামদিয়া, শ্রীনগর গ্রাম, ময়েনদিয়া বাজার, রাজাপুর গ্রাম, বোয়ালমারী সদর ইউনিয়নের রামনগর, ঘোষপুর ইউনিয়নের গোহাইলবাড়ী বাজার ও মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প, পৌরসদরের গুনবহা ও চতুল ইউনিয়নের বাইখীর-বনচাকী গ্রামে গনহত্যা ও বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয় পাক হানাদারা। শুধু ১৬ মে হাসামদিয়া গ্রামে গনহত্যায় ৩৩ জন সাধারণ মানুষ শহীদ হন। তার মধ্যে বেশির ভাগই ছিল হিন্দু সম্প্রদয়ের সদস্যরা।
এক সময় মুক্তিবাহিনী ও মুজিব বাহিনীর সদস্যরা গোপনে সংগঠিত হয়ে স্থানীয়ভাবে গেরিলা দল গঠন, রাত্রিযুদ্ধ, রাস্তা-কাটিং, রেললাইন নষ্ট করা এবং পাক বাহিনীর সরবরাহ রুটে আক্রমণ করে শত্রুকে দুর্বল করে দেয়। যুদ্ধচলাকালে মুক্তিযোদ্ধাদের তীব্র প্রতিরোধের মুখে আগস্টের শেষে দিকে পাকিস্তান আর্মিরা বোয়ালমারী হাসপাতাল ক্যাম্প ছাড়তে বাধ্য হয়। পরে ৯ ডিসেম্বর ভোর রাতে ফরিদপুর ক্যাম্প থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বোয়ালমারী সদরের দিকে আসার পথে সাতৈর ইউনিয়নের মুজুরদিয়া ঘাটে মুক্তিবাহিনীরা তাদের বাধা দিলে প্রায় ৪৫ মিনিট সম্মুখ যুদ্ধ সংঘঠিত হয়। সেখান থেকে পাক বাহিনীরা পিছুহটে বেলা সাড়ে ৮টার দিকে ধোপাডাঙ্গা-চাঁদপুর ও করিমপুর এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে হামলা করলে মুক্তিবাহিনী ও পাক বাহিনীর মধ্যে সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সালাউদ্দিন ও নওফেলসহ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা মারা যায়। সেখান থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের দোসর আলবদর রাজাকাররা পালিয়ে যায়। সেইদিন বোয়ালমারী হানাদার মুক্ত হয়। শত্রুমুক্ত হওয়ার পর দিনভর শহর ও গ্রামে উল্লাসে ফেটে পড়ে মানুষ। মুক্তিযোদ্ধারা বোয়ালমারী থানায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। সাধারণ মানুষ খাবার, পানি ও আশ্রয় দিয়ে যোদ্ধাদের স্বাগত জানায়। ৯ ডিসেম্বর তাই বোয়ালমারীবাসীর কাছে চিরস্মরণীয় স্বাধীনতার দিন হয়ে আছে।
যদিও বহু ঘটনার সুনির্দিষ্ট দলিল এখনো স্থানীয় গবেষণা ও সংগ্রহের ওপর নির্ভরশীল, তবু এ কথা নিশ্চিত—বোয়ালমারীর মুক্তি ছিল ফরিদপুর অঞ্চলে স্বাধীনতার বেগ বাড়িয়ে দেওয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই অঞ্চলের অগণিত মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদের আত্মত্যাগেই বাংলাদেশ ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। তবে ফরিদপুর জেলাটি চুড়ান্তভাবে হানাদারমুক্ত হয় ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর বলে ফরিদপুর মুজিব বাহিনীর যুদ্ধকালীন কমান্ডার শাহ মো. আবু জাফর জানান। জেলার মধ্যে সর্বশেষ মিত্র বাহিনী ও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সম্মুখ যুদ্ধ বর্তমান মধুখালী উপজেলার কামারখালী-আড়কান্দি ব্রীজ এলাকায় সংঘঠিত হয়।
বোয়ালমারী উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডেপুটি কমান্ডার ও মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ৯ ডিসেম্বর সম্মুখ যোদ্ধা সৈয়দ আব্দুর রউফ সিদ্দিকী জানান, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ৯ ডিসেম্বর ভোর রাতে ফরিদপুর ক্যাম্প থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বোয়ালমারী সদরের দিকে আসার পথে সাতৈর ইউনিয়নের মুজুরদিয়া ঘাটে মুক্তিবাহিনীরা তাদের বাধা দিলে প্রায় ৪৫ মিনিট সম্মুখ যুদ্ধ সংঘঠিত হয়। সেখান থেকে পাক বাহিনীরা পিছুহটে বেলা সাড়ে ৮টার দিকে ধোপাডাঙ্গা-চাঁদপুর মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে হামলা করলে মুক্তিবাহিনী ও পাক বাহিনীর মধ্যে সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সালাউদ্দিন ও নওফেলসহ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা মারা যায়। ওইদিনই ছিলো বর্তমান বোয়ালমারী উপজেলার শেষ যুদ্ধ।
বিষয়টি নিশ্চিত করে বোয়ালমারী মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহ্বায়ক অধ্যাপক আব্দুর রশিদ জানান, আজ ৯ ডিসেম্বর বোয়ালমারী পাক হানাদার মুক্ত দিবস উপলক্ষে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সে মুক্তিযুদ্ধে রণাঙ্গনের স্মৃতিচারণ ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে সকল মুক্তিযোদ্ধাগণ উপস্থিত থাকবেন।




