sliderমতামতশিরোনাম

অভিশপ্ত সিসিফাস ও আমাদের গণতন্ত্র

শাহীন রাজা : গ্রিক পুরাণে সিসিফাস ছিল এক অত্যাচারী, ধুরন্ধর ও দূর্বৃত্ত রাজা। সিসিফাস দেবতাদের সাথে ছলনা করে, সবসময় দেবতাদের বিপক্ষে কাজ করতো। দেবগণ ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে অভিশাপ দেয়। সিসিফাস-কে জোর করে পাতালে নিয়ে যায়। এবং তাকে শাস্তি হিসেবে খাড়া পাহাড় ঠেলে বিশাল এক পাথরকে উঠাতে বলা হয়। পাথরটাকে পাহাড়ের চুড়ায় উঠানোর পরে সেটা আবার গড়িয়ে নীচে পড়ে যায়, ফলে সিসিফাস আবার সেটাকে ঠেলে চুড়ায় তোলে। এভাবে অনন্তকাল ধরে অভিশপ্ত সিসিফাস পাথর ঠেলে উপরে তোলার মত নিস্ফল চেষ্টা করে চলছে।

এর অনেক পরের কথা। পৌরাণিক কাহিনী সিসিফাস সম্পর্কে খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতকের দার্শনিক লুকরেটিয়াসের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর কথা হলো, সিসিফাস হচ্ছে সেই রাজনীতিক। যে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য চিরকাল চেষ্টা করে। কিন্তু কোনো দিনও ক্ষমতায় যেতে পারেনি।

আর দার্শনিক সলোমন রিনাকের ব্যাখ্যা হলো, মানুষ সিদ্ধি অর্জনের জন্য সাধনা করে। কিন্তু চেষ্টা আর প্রাপ্তির মধ্যে পার্থক্য থেকেই যায়। পার্থক্য লাঘবের ব্যর্থ প্রয়াসই হলো সিসিফাসের নিয়তি।
আমাদের গণতন্ত্র-ও বোধহয় এমনটাই। বাংলাদেশ সৃষ্টির পর থেকেই আমাদের আকাঙ্খা হচ্ছে, এজটা গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা । আমাদের এই চাওয়াটা, বসন্ত বাতাসের মতোই । এই সুবাতাস ক্ষনিকের জন্য। তারপর আবার চৈত্রের তাপদহন। এবং কাল বৈশাখী ঝড়। তা-ও শুধুমাত্র ভোটাধিকারের গণতন্ত্র ! এই গণতন্ত্রে সাধারণ মানুষ কতটুকুই লাভবান হয়। সবটাই উচ্চ এবং উচ্চ মধ্যবিত্ত সুবিধাবাদীদের স্বার্থ বহন করে। এই সুবিধা প্রাপ্তিই একসময় স্বৈর মানসিকতা সৃষ্টি হয়। এ-থেকে আবারও ভোটাধিকার হারিয়ে যায়, অনেকদিনের জন্য ।

দেশটার পঞ্চাশ বছর পার হয়ে গেছে। গণতন্ত্রের এই ইদুর বেড়াল খেলা আর নয়। কিংবা সিসিফাসের গণতন্ত্রের পাথর পাহাড়ের চূড়ায় তোলার ব্যর্থ চেষ্টা নয়। সাধারণ মানুষের জন্মগত অধিকার নিশ্চয়তার গণতন্ত্র হতে হবে। রাষ্ট্রকে তার নিশ্চয়তা নিশ্চিত করতে হবে। এটা জরুরী।
সাধারণ মানুষের আজ একটাই আকাঙ্খা। আগামীর গণতন্ত্রে সিন্ডিকেট বানিজ্যিকদের কাছে সাধারণ মানুষ জিম্মি হবে না। তেল,নুন, আটা, ময়দা, চাল,ডাল সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের মূল্য তালিকার যাতাকল পিষ্ট হবে না মানুষ। এমনকি পেঁয়াজ মরিচ নিয়েও অসাধু খেলা থাকবে না। শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য এই মৌলিক অধিকার নিয়ে ব্যবসা বন্ধ হতে হবে।

ব্যবসায়ীদের মুনাফার টাকা এই দেশের উন্নয়নে ব্যয় হবে। বাইরে পাঠানো আর নয়। রাষ্ট্রের কাছ থেকে অবৈধ সুযোগ নিয়ে প্রকল্প ব্যয়ের মূল্যমান বৃদ্ধির সুযোগ আটকাতে হবে।
অবসরপ্রাপ্ত একজন প্রাথমিক শিক্ষককে তাঁর প্রাপ্তির টাকার জন্য এ জি অফিসের দ্বারে দ্বারে আর যেন ঘুরতে না হয়। বিচারের বানী যেন নিভৃতে না কাঁদে। পুলিশ হবে সাধরণ জনগণের নিরাপত্তার প্রতিক। পুলিশের হাত হবে, খাদে পড়ে যাওয়া মানুষকে তুলে ওঠানোর হাত।

দেশ প্রিয় সেনাবাহিনী হবে, দেশ এবং জাতির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের রক্ষা কবচ।
সিসিফাসের গণতন্ত্র নামের পাথরটি পাহাড়ের চূড়ায় তোলা আর পড়ে যাওয়া নিয়তির খেলায় বাংলাদেশ ক্লান্ত। বাংলাদেশ আর পারছে না। লক্ষ কোটি প্রাণের বিনিময়ে প্রাপ্ত বাংলাদেশকে আমাদের সুস্থ রাখতে হবে। আমরা যদি ব্যর্থ হই তাহলে আমার বাংলাদেশ রাগ এবং অভিমানে একদিন হয়তো। একদিন হয়তো বঙ্গোপসাগরের অথৈ জলে তলিয়ে যাবে !

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button