আন্তর্জাতিক সংবাদশিরোনাম

ভয়ঙ্কর এক মহামারির সময় যেভাবে উদ্ভাবন হলো ভেন্টিলেটরের

বর্তমান করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে বিশ্বে গুরুতর আক্রান্ত লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন বাঁচাতে এখন অপরিহার্য কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাস দিয়ে রোগীকে বাঁচিয়ে রাখার যন্ত্র ভেন্টিলেটার ।
এই জীবন বাঁচানো যন্ত্রের উদ্ভাবন হয়েছিল আরেকটি মহামারির সময় ইউরোপের ডেনমার্কে মরণাপণ্ন হাজার হাজার শিশু কিশোরের প্রাণ বাঁচাতে। আর এর হাতে ধরেই জন্ম নিয়েছিল আজকের চিকিৎসা জগতে আমরা যাকে জানি নিবিড় পরিচর্যা সেবা বা ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট।
সেটা ছিল ১৯৫২ সাল। পশ্চিমে সে বছর পোলিও ছড়িয়ে পড়েছিল মহামারি আকারে। বিশেষ করে আমেরিকা এবং ইউরোপের কিছু কিছু দেশে। এই রোগে ব্যাপকভাবে আক্রান্ত হচ্ছিল প্রচুর শিশু এমনকী প্রাপ্তবয়স্করাও।
বিশ্বের যেসব দেশে ১৯৫২-য় পোলিও মহামারি মারাত্মক আকার নিয়েছিল, তার একটি এপিসেন্টার ছিল ডেনমার্কের কোপেনহেগেন শহর।
কোপেনহেগেনে সেসময় সংক্রামক ব্যাধির একমাত্র হাসপাতাল ছিল ব্লেগডাম। কোপেনহেগেন ইউনিভার্সিটিতে ডাক্তারি পড়তেন অ্যানা হলটন, তার বয়স তখন বিশ। বিবিসিকে তিনি বলেছেন কীভাবে চিকিৎসা বিজ্ঞানের সেই ইতিহাস গড়ার মুহূর্তের সাক্ষী হয়েছিলেন তিনি।
“এখন ঠিক করোনাভাইরাস নিয়ে যেমন, তখনও ঠিক তেমনই পোলিও মহামারি ছিল একেবারে অপ্রত্যাশিত। আমরা এ রোগের কথা – রোগের উপসর্গের কথা কিছুই জানতাম না। প্রচুর সংখ্যায় শিশু আর প্রাপ্তবয়স্করা শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছিল।”
তখন জুলাই মাসের শেষ।
“প্রথম দিনে ভর্তি হলো একসাথে প্রায় তিরিশ জন রোগী। এদের মধ্যে ২৬ জন রোগীই মারা গেল। মৃত্যু হারের দিক দিয়ে সেটা ৮০ শতাংশের বেশি। আমার একজন খুব ভাল বন্ধু- তখন নার্স হবার জন্য প্রশিক্ষণ নিচ্ছিল। সে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ব্লেগডাম হাসপাতালেই পড়ত। দিনটা ছিল ১ অগাস্ট। আমার সাথে তার প্রায়ই দেখা হতো।
“সে বলল – ভয়ঙ্কর অবস্থা- ভয়ঙ্কর! ভয়ঙ্কর! প্রতিদিন জরুরি সেবার দশটা গাড়ি প্রায় ৫০ জন করে রোগী নিয়ে আসছে ভর্তি করার জন্য। আমরা হিমশিম খাচ্ছি,” বলছিলেন অ্যানা হলটন।
প্রথম কয়েক সপ্তাহে ভর্তি হওয়া রোগীদের ৮৭ শতাংশেরই মৃত্যু হয় এবং প্রত্যেকেই মারা যায় পোলিও ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে শ্বাসযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে।
ছোঁয়াচে ভাইরাসে আক্রান্তরা ছিল মূলত শিশু। ভাইরাস তাদের স্নায়ু ও মাংসপেশী এমনভাবে বিকল করে দিচ্ছিল যে তাদের অনেকের শ্বাস ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, অনেকের হাত ও পায়ের পেশী প্যারালাইজড হয়ে যাচ্ছিল। পেশী সচল করার চেষ্টায় ডাক্তাররা মালিশের চিকিৎসা দিচ্ছিলেন।
কিন্তু গুরুতর আক্রান্ত যাদের শ্বাসযন্ত্রের পেশী বিকল হয়ে যাচ্ছিল, তাদের কৃত্রিমভাবে শ্বাস নেওয়ার জন্য একটাই পদ্ধতি চালু ছিল। একে বলা হতো আয়রন লাং চিকিৎসা।
রোগীকে একটা বিশাল লোহার নলের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়া হতো। নলের ভেতর রোগীর শরীরের চারপাশে কৃত্রিমভাবে একটা শূণ্যস্থান তৈরি করা হতো, যেখানে বাতাসের নেগেটিভ চাপের কারণে রোগীর পাঁজর আর ফুসফুস ফুলে উঠত বাতাস টানার জন্য। ওই প্রযুক্তিতে রোগীকে বাতাস টানার জন্য ফুসফুসের বায়ুথলিগুলো প্রসারিত করতে হতো।
হাজার হাজার শিশুর জীবনরক্ষায় তখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল ওই আয়রন লাং বা লৌহ ফুসফুস প্রযুক্তি। কিন্তু এই আয়রন লাং-এর গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও ছিল। অনেকে ওই লোহার নলের ভেতরেই মারা যাচ্ছিল, নিজেদের লালারস ও পাকস্থলি থেকে উঠে আসা খাবার গলায় আটকে।
এছাড়াও এই প্রযুক্তি এতই ব্যয়সাপেক্ষ ছিল যে পুরো ডেনমার্কে এই যন্ত্র ছিল মাত্র একটি। পরিস্থিতি তখন দ্রুত খারাপের দিকে যাচ্ছে। প্রতিদিন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে মৃতের সংখ্যা।
এর মধ্যেই হাসপাতালের সিনিয়ার ডাক্তার হেনরিক লারসেন ডাক্তারদের ডেকে বৈঠকে বসলেন কী করা যায় তা নিয়ে আলোচনা করতে। ওই বৈঠকে তরুণ অ্যানাসথেটিস্ট ডাক্তার বিয়র্ন ইবসেন সম্পূর্ণ নতুন এক চিকিৎসার প্রস্তাব দিলেন।
অ্যানা হলটন বলছেন, বিয়র্ন ইবসেনের প্রস্তাবে অধ্যাপক লারসেনের একেবারেই মত ছিল না।
বিয়র্নের প্রস্তাব ছিল নলের ভেতর ওভাবে নেগেটিভ চাপ তৈরি না করে পোলিও আক্রান্তদের ফুসফুসে বাইরে থেকে সরাসরি অক্সিজেন ঢোকানোর ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে রোগী সহজে যন্ত্রের সাহায্যে কৃত্রিমভাবে নিঃশ্বাস নিতে পারে।
বাইরে থেকে বাতাস বা অক্সিজেন ঢোকালে তা সহজে ফুসফুসের বায়ুথলিগুলোকে ভরে তুলবে এবং রোগীর ফুসফুস যখন শিথিল হবে তখন শ্বাস ছাড়ার মত ব্যবহৃত বাতাস বেরিয়ে আসবে।
ডা. ইবসেন প্রস্তাব করলেন গলার মধ্যে ফুটো করে একটা নল ঢোকানো হবে শ্বাসনালীতে। আর ওই নলের মধ্যে দিয়ে ফুসফুসে বাতাস ঢোকানো আর বের করা হবে রবারের বেলুন পাম্প করে।
অধ্যাপক লারসেনের প্রস্তাবটা পছন্দ না হলেও অবস্থা তখন এমনই সঙ্কটজনক পর্যায় পৌঁছেছিল যে ডা. ইবসেনকে পরেরদিনই তার পদ্ধতি চেষ্টা করে দেখার অনুমতি দেয়া হলো।
তখন মৃত্যুমুখে ১২-বছরের এক কিশোরী ভিভি ইবার্ট। ২৭ অগাস্ট ১৯৫২, তার ওপরই নতুন পদ্ধতি প্রথম পরীক্ষা করলেন ডা. ইবসেন।
“তার গায়ের রং তখন নীল। মুখ থেকে প্রচুর ফেনা বেরচ্ছে। সে শ্বাস নিচ্ছে না, অজ্ঞান অবস্থা। বিয়র্ন প্রথমে তাকে অচেতন রাখার জন্য অল্পমাত্রায় ওষুধ দিল। তারপর মেয়েটির গলা ফুটো করে সেখান দিয়ে একটা নল ঢোকালো।
“বেলুন পাম্প করে তাকে ভেন্টিলেট করলো বিয়র্ন- অক্সিজেন ঢোকানো হল এবং মেয়েটি বেঁচে গেল,” বিবিসিকে বলেছেন অ্যানা হলটন।
ডা. ইবসেনের এই সাফল্যের পর অধ্যাপক লারসেন মত পাল্টিয়েছিলেন, বলেছিলেন এই নতুন পদ্ধতিতেই এগুতে হবে।
কিন্তু সমস্যা দেখা দিল চিকিৎসা দেবার মত যথেষ্ট কর্মী না থাকায়। হাত দিয়ে পাম্প করে এত রোগীকে অক্সিজেন দিতে প্রচুর চিকিৎসা কর্মী প্রয়োজন। অন্তত চারজন করে চিকিৎসা কর্মীকে প্রতি রোগীর বিছানার পাশে হাজির থাকতে হবে ২৪ ঘন্টা, সপ্তাহে সাত দিন।
শেষ পর্যন্ত সমাধান একটা বের করা হলো। তখন গরমের ছুটিতে কলেজ বন্ধ ছিল। ডেকে পাঠানো হল অ্যানা হলটনের মত শত শত মেডিকেল শিক্ষার্থীকে।
“আমরা হাসপাতালের ডাক পেয়ে কোপেনহেগেনে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে গেলাম। হাসপাতালে যেতে ওরা বলল তুমি আজ সন্ধ্যা থেকেই কাজ শুরু করো। কোনরকম প্রশিক্ষণ আমাদের দেয়া হলো না। শুধু বলা হল রোগীর পাশে বসতে আর বেলুন দিয়ে হাত পাম্প করে সমানে অক্সিজেন সরবরাহ চালিয়ে যেতে, যাতে রোগী নিঃশ্বাস নিতে পারে।”
অ্যানা বলছিলেন উঁচু ক্লাসের একজন শিক্ষার্থী তাকে দেখিয়ে দিয়েছিল কীভাবে বেলুন পাম্প করতে হবে। অ্যানার দায়িত্বে প্রথম রোগী অল্পক্ষণের মধ্যেই মারা গেল।
পরদিন আরেকজন রোগীর দায়িত্ব দেয়া হলো তাকে। বাচ্চা ছেলে – নাম পল। ৪/৫ বছর বয়স। দু হাত অবশ, প্যারালাইজড- পোলিও ভাইরাসের আক্রমণে। কিন্তু পা দুটো সচল ছিল।
“তার শ্বাসযন্ত্রের পেশীগুলোও প্যারালাইসড হয়ে গিয়েছিল। ভেন্টিলেটার ছাড়া নিঃশ্বাস নেবার ক্ষমতা তার ছিল না। আমি তাকে পাম্প করে অক্সিজেন দিতাম,” বলেন অ্যানা। “প্রায় তিন মাস তাকে আমি ভেন্টিলেট করেছি প্রতি মুহূর্ত। নিজে নিজে সে নিঃশ্বাস নিতে পারতো না।
২৪ ঘন্টা ধরে হাতে বেলুন পাম্প করে রোগীদের অক্সিজেন দেবার কাজটা তরুণ মেডিকেল শিক্ষার্থীদের জন্য খুবই কঠিন ছিল। অনেক রোগীকে সপ্তাহের পর সপ্তাহ, কখনও মাসের পর মাস একনাগাড়ে অক্সিজেন দিতে হয়েছে।
মহামারি যতদিন ছিল, প্রায় ১৫০০ শিক্ষার্থী যারা ডাক্তারি ও দাঁতের ডাক্তারি পড়ছিল কোপেনহেগেনে, তারা মোট এক লাখ ৬৫ হাজার ঘন্টা শ্রম দিয়েছিল পোলিও আক্রান্তদের ফুসফুসে অনবরত অক্সিজেন পাম্প করার জন্য।
ডা. বিয়র্ন ইবসেনের পরিকল্পনা কাজ করেছিল। মৃত্যুর হার ৮৭ ভাগ থেকে নেমে এসেছিল মাত্র ১৫ ভাগে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে তৈরি হয়েছিল ইতিহাস।
অ্যানা হলটন এত বছর পর সেই স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বললেন, “তখন বুঝিনি সেটা ছিল ইতিহাসের একটা সন্ধিক্ষণ। আমরা শুধু বুঝতে পারছিলাম আমরা যেটা করছি সেটা প্রাণ বাঁচানোর জন্য অপরিহার্য। তখন মনে হয়েছিল ডাক্তারি পড়া খুবই জরুরি। মানুষের প্রাণ বাঁচানোর জন্য ডাক্তার হওয়াই দরকার।”
ডা. ইবসেন শুধু যে যুগান্তকারী জীবন রক্ষার একটা প্রযুক্তি আবিস্কার করেছিলেন তাই নয়, চিকিৎসা জগতে নিবিড় পরিচর্যার শুরুও হয়েছিল তারই হাত ধরে। ওই হাসপাতালে ডা. বিয়র্ন ইবসেন ১৯৫৩ সালে প্রথম গড়ে তুলেছিলেন রোগীদের ২৪ ঘন্টা পর্যবেক্ষণে রাখার জন্য ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট।
পরবর্তীকালে গুরুতর অসুস্থদের ২৪ ঘন্টা চিকিৎসকদের নজরে রাখার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হাসপাতালগুলোতে তৈরি হয় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র।
ডা. ইবসেনের তত্ত্বাবধানে অ্যানাসথেটিস্ট হয়েছিলেন অ্যানা হলটন – নিবিড় পরিচর্যায় তিনি শিশুদের ডাক্তারি করতেন।
১৯৫৩ সালে সুইডেনের একটি কোম্পানি রোগীর ফুসফুসে অক্সিজেন সরবরাহ করার জন্য একটা যন্ত্র তৈরি করেছিল, যাতে মানুষকে হাত দিয়ে বেলুন পাম্প করে কায়িক শ্রমের মাধ্যমে আর ফুসফুসে অক্সিজেন ঢোকাতে না হয়।
প্রথম যন্ত্রটির নাম দেয়া হয়েছিল মেকানিকাল স্টুডেন্টস – যান্ত্রিক শিক্ষার্থী। এটাই আধুনিক কালের ভেন্টিলেটার যন্ত্র।
সূত্র : বিবিসি

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button