পীর হাবিবুর রহমান
কখন ঘুমাই কখন জাগি সব পাল্টে গেছে। কোনো আনন্দ নাই। এমন বিষাদ লাগে সব! ভোরের আলোও যা রাতের আঁধারও তা! একটি রুমেই সয়ে যায় যেনো জীবন। জীবনে কতো একাকীত্বের দহন সয়েছি! কিন্তু সে ছিলো উপভোগ্য। এমন স্বপ্নহীন দমবন্ধ নিঃসঙ্গতায় কখনো কাটাইনি। কতো আপনজনরা কল করেন, সবার ফোন ধরা হয় না। মেসেঞ্জারে কত বার্তা সব পড়াও হয় না। জবাবও দেই না। ভালো লাগে না।
এমন জাহান্নামের পৃথিবীর মুখোমুখি হবো ভাবিনি। দুনিয়ার যে প্রতাপশালীদের দাপটে দুনিয়া ভয়ে কাঁপতো আজ তারা সবাই এতিম পথ শিশুর চেয়েও অসহায়! জীবন কখন কোন বেদনায় কবে পুড়েছিলো, কার বিশ্বাসঘাতকতা প্রতারণায় কবে বিস্মিত হয়েছি, কবে দেখেছি কার কিসের মিথ্যা দম্ভ, মিথ্যাচার চতুরতা আজ ভুলে গেছি সব!
সম্পর্কিত খবর
কতবার মেজাজ বিগড়েছে কত বিচিত্র চরিত্রের মানুষের আচার আচরণ দেখে তা আর মনেই আসে না। কত লোভী জন্মের স্বার্থান্ধ বিকৃত মানুষ দেখে বিরুপ প্রতিক্রিয়া হয়েছে নিজের তা আর মনে নেই। জীবন বর্ণাঢ্য সংগ্রামমুখর এক আনন্দ বেদনার কাব্য। কতদিন কতরাত একা একা নস্টালজি হয়েছি। বিরহে রাতজাগা হয়েছে সে সব কিছুই আর মিলে না। কত অস্থির অশান্ত সময় গেছে। গেছে কতো আনন্দের মুহুর্ত, কতো স্বপ্ন দেখেছি, লড়েছি কোথাও ক্লান্তি আসেনি। কিন্তু আজ নিস্তব্ধ পৃথিবীর নিঃশব্দ অবিরাম আর্তনাদে কেমন যেনো বোধহীন জেগে থাকি একদম একা দুঃসংবাদের খবরের ভেতর। মনে হয় এক ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্নের অনিশ্চয়তা আমাকে গ্রাস করেছে। মনে হয় যদি বেঁচে যাই এ মহাপ্রলয়ে, বেঁচে যায় প্রিয় মানুষেরা, নিরাপদ হয়ে যায় পৃথিবী ও মানবজাতি তবু আমার মনের যে আবেগ প্রাণবন্ত রুপ যা আমি হারাতে শুরু করেছিলাম প্রতারিত সময়ে, তার সমাধিই হবে করোনার অভিশাপে। পৃথিবী বেঁচে গেলেও তার ঝলমলে প্রাণ ফিরে পাবে কিনা তাও জানি না।
রোজ রাত নামে নিয়মে গভীর বেদনার হিসেবের খবর নিয়ে। ভোর হয় সকাল আসে তবু কোনো সুসংবাদ নেই! যুক্ত হয় কেবল দুঃসংবাদ। সময় যতো যায় লাশের মিছিল দীর্ঘ হতে হতে ১ লাখ ১৮ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। আক্রান্ত ১৮ লাখ ছাড়িয়ে যাবার দুঃসংবাদ ছাড়া কোথাও কোনো খবর নেই। এবারও বাংলা নববর্ষে অনেকে পান্তার আয়োজন করেছেন, ফেসবুক ছবিতে ভাসিয়েছেন! তারা সেজেছেন, আমুদে হেসেছেন। চোখে পড়লেও খটকা লাগেনি। মনে তাদের রঙ আছে। মৃত্যুকেও উপভোগ করতে জানেন। হয়তো তারাও জানেন মৃত্যুই অনিবার্য সত্য, বেঁচে থাকাই অপার রহস্যের! কেবল বোঝার ক্ষমতা নাই হয়তো করোনার ভয়াবহ মৃত্যু কতো মর্মান্তিক! বেঁচে থাকার কি আকুতি আজ পৃথিবীতে! তাদেরকে আমার বড় মানসিক শক্তির অধিকারী নাকি নির্বোধ মনে হয়েছে নাকি অন্য কিছু বুঝিনি তাও। পৃথিবীর কান্না থেকে মুক্ত মানুষ আজ ভাগ্যবান। নববর্ষে হালখাতা জুড়েও তো কেবল লাশের হিসাব! তাদের উপলব্দি করার ক্ষমতাই নাই, যে মা সন্তানদের জন্য জীবনটাই শেষ করে দেন, সেই মার সর্দি জ্বর দেখেই তার নাড়ি ছেড়া সন্তানরা জঙ্গলে ফেলে যায়! হাসপাতালেও নয়। এরচেয়ে ট্র্যাজেডি আর কি হতে পারে মায়ের জীবনে! মানুষ কুড়িয়ে হাসপাতালে পাঠায়। ভালোবাসা স্নেহ দানব সৃষ্টি করেছে, অচেনা মানবিক মানুষই আপন হয়েছে! হিসেব যারা বেশি করেন এই অংক আজ মিলাবেন কি করে!
নাটোরের লালপুরে উপোস পরিবার ও প্রতিবেশির জন্য ত্রাণ চাইতে সরকারি হটলাইনে ফোন করেছিলেন শহিদুল ইসলাম। এতো বড় অপরাধে ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুস সাত্তার মেরে রক্ত ঝরিয়েছেন শরীরের। এমন মহাদুঃসময় না এলে কত নির্দয়রা জনপ্রতিনিধি হয় জানাও যেতোনা। নিরীহ গরিবের লাল রক্তে বিষাদগ্রস্ত পৃথিবীর বুকে চেয়ারম্যানের নববর্ষ বরণ। নিষ্ঠুর পৃথিবীর দানবরা প্রকৃতির এমন হিংস্র প্রতিশোধেও যখন শোধরায়না বোঝা যায় এ যাত্রায় বেঁচে গেলে আরও কতো বীভৎস চেহারায় আবির্ভূত হবে। পৃথিবীর মানবতাবাদী মানুষের পাশে ভীষণ অসুখে ক্রন্দন রত পৃথিবীর বুকে আরেকটি সংখ্যালঘু অংশ ও দৃশ্যমান হয়েছে। এরা বিকৃত আনন্দ করে। নির্দয় আচরণ করে। ধর্ষণ, হত্যা, চুরি, মিথ্যা দম্ভে বিভোর। আহারে! পৃথিবীতে মানুষ মরে যায় কান্নার সময় নাই। পৃথিবীতে মানবিক মানুষরা লড়ছে, উৎকন্ঠিত হচ্ছে, ভয়ে অস্থির মহাবিপর্যয়ে। তাই বলে অমানুষ বিকৃতরা বেঁচে থাকবে না তা কি হয়? মনে হয় না প্রকৃতির এ মহা অভিশাপ থেকে মুক্তি হলেও মানুষ তার চেহারা আয়নায় দেখবে। বদলাতে চাইবে।
ভোর হয় সকাল আসে জীবন প্রাণ ফিরে পায় না। নিস্তব্ধতায় পৃথিবীর চেহারা। লন্ডভন্ড পুথিবীজুড়ে ক্রন্দন আর্তনাদ বোবা কান্না আর নীরব শোক। কি এক ভয়ংকর দুঃসময় অতিক্রম করছে পৃথিবী। মানুষের জীবন বাঁচানোর লড়াই তামাম দুনিয়া জুড়ে চলছে। চিকিৎসকদল লড়তে লড়তে ক্লান্ত অবসন্ন। নিউইয়র্কের মতোন পৃথিবীর ব্যস্ততম বাণিজ্যিক নগরী স্তব্ধ। লাশের নগরীতে পরিণত। কবর দেবার জায়গা নাই, গণকবরে যাচ্ছে লাশ। যুক্তরাষ্ট্রই নয়, যুক্তরাজ্য, ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, জার্মানি ইউরোপসহ তামাম পৃথিবীর মানবজাতি মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করছে। ভয় উদ্বেগ উৎকন্ঠা। কি ভয়ঙ্কর মৃত্যুর মুখোমুখি পৃথিবী।
এমন বিপদগ্রস্ত পৃথিবীর কালো মুখ কেউ দেখেনি। কখনো দেখার চিন্তাই করেনি! সকাল হতেই সেই রাতের ধারায় দুঃসংবাদ আসে। একের পর এক মৃত্যুর খবর। ভয়াবহ শোকের খবর। আমার চোখে তাও ঘুম আসে না। নির্ঘুম জীবনের সাথে বাস।
সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজের মেডিসিনের সহকারী অধ্যাপক ডা. মঈন উদ্দীন শহীদ হয়েছেন। সুনামগঞ্জের সন্তান এ ডাক্তার করোনার যুদ্ধে প্রথম সারির যোদ্ধা। সিলেটে করোনায় আক্রান্ত হলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাচ্ছিলেন না। একটা ভেন্টিলেশন পাননি। ঢাকায় আসতে এয়ার এম্বুলেন্স দূরে থাক আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্সের জন্য কত আকুতি করেও পায়নি। অবশেষে আজ ভোরে ঢাকায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। ডা. মঈন উদ্দীনের বাবা যখন মারা যান তখন তার বয়স দুই বছর। মা সংগ্রাম করে ছেলেকে পড়ান। ঢাকা মেডিকেলের মেধাবি ছাত্র ছিলো। ১০ বছর আগে মাকে হারায়। ১২ ও ৭ বছরের দুটি সন্তান এতিম হলো। স্ত্রী রিফাত অকালে বিধবা, সেও ডাক্তার। বড় অমায়িক রোগীর প্রতি যত্নশীল মঈন গরিবের ফি নিতেন না। দেশ তার মেধাবি সন্তানকে হারালো।
চীনের করোনার ভয়াবহতার পর সময় পেয়েও আমাদের দুর্নীতিগ্রস্ত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কার্যকর প্রতিরোধ গড়েনি। মূল যোদ্ধা চিকিৎসক ও তাদের সহকর্মীদের পিপিই দেয়নি। সরকারি বেসরকারি হাসপাতালের সমন্বয়ে প্রয়োজনীয় আইসিইউ বেড, ভেন্টিলেশন মজুদ ও সরবরাহ করে সমন্বিত পরিকল্পিত শক্তিশালী চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়তে পারেনি। বড় বড় কথা বলেছেন কর্তারা। আমি শহীদ মঈনের শোক গাঁথা হৃদয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বরখাস্ত চাই, সচিবের অপসারণ চাই। আমি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকেরও অপসারণ চাই। এই ব্যর্থতার দায় তাদের নিতেই হবে। রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা ছাড়া কাউকে মানুষ বিশ্বাস ভরসা করে না। আমিও না। তাই এই অপদার্থদের বরখাস্ত চাই।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন
সুত্র : পূর্বপশ্চিম




