উপমহাদেশশিরোনাম

দিল্লিতে সহিংসতা : মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৩৪

হিংসার আগুনে জ্বলছে ভারতের রাজধানী দিল্লি।দেশটির বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) ও এনআরসি বিরোধী বিক্ষোভ ঘিরে দুপক্ষের সংঘর্ষ রূপ নিয়েছে ভয়াবহ। সংঘর্ষের ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪ জনে।তাদের অনেকের চোখে অ্যাসিড ঢালা হয়েছে। দৃষ্টি হারিয়েছেন চার জন।
বৃহস্পতিবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) প্রাণ গেল আরও সাতজনের। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই সাতজনের মৃত্যু হয়েছে বলে ভারতীয় একটি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এর ফলে দিল্লিতে সংঘর্ষের ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪ জনে।
জানা গেছে, আহতের সংখ্যা ২০০ ছুঁইছুঁই। অনেকেরই মাথায় গুরুতর চোট। আহতদের অন্তত ৪৬ জনের শরীরে বুলেটের ক্ষত মিলেছে। আর একটি উদ্বেগজনক বিষয়, মুস্তাফাবাদ থেকে আজ বেশ কিছু আহত এসেছেন হাসপাতালে। তাঁদের অনেকের চোখে অ্যাসিড ঢালা হয়েছে। দৃষ্টি হারিয়েছেন চার জন। খুরশিদ নামে এক জনের দু’চোখই নষ্ট হয়ে গিয়েছে। তেগ বাহাদুর হাসপাতাল থেকে লোকনায়ক জয়প্রকাশ হাসপাতালে আসার জন্য অ্যাম্বুল্যান্সও পাননি তিনি। গিয়েছেন রিকশায়। দুই চোখ-সহ পুরো মুখ ঝলসে গিয়েছে ওয়কিলের। এ সব মনে করিয়ে দিচ্ছে ২০০৩ সালের ‘গঙ্গাজল’ ফিল্মের কথা। অ্যাসিড দিয়ে চোখ গেলে দিয়ে পুলিশের বদলা নেওয়ার ভয়াবহ কাহিনি সেটি। এটা স্পষ্ট, অাগুন লাগানো, পাথরবাজি, গুলির সঙ্গে ‘গঙ্গাজল (অ্যাসিড)’-এরও আয়োজন করা হয়েছে রীতিমতো আট ঘাট বেঁধে। সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আজ দিল্লি হাইকোর্টকে জানিয়েছেন, পুলিশকে অ্যাসিড হামলার মুখে পড়তে হচ্ছে।
এদিকে,জাফরাবাদ-মৌজপুরে এখন শ্মশানের শান্তি। ফাঁকা রাস্তা জুড়ে পাথর, ইট, ভাঙা কাচ, ভাঙা লোহার রড। ভিতরের গলি থেকে আজও পাকিয়ে পাকিয়ে উঠছে কালো ধোঁয়া। মৌজপুরের গলির একটি দোকানে আগুন নেভেনি। দোকানের মালিক কোন ধর্মের, তা দেখেই আগুন লাগানো হয়েছে। এ পাড়ায় ধর্মের জোরে যাদের দোকান বেঁচে গিয়েছে, অন্য গলিতে সেই ধর্মের জেরেই দোকান পুড়েছে। জাফরাবাদের এক বাসিন্দা বলেন, ‘‘ভিতরের মহল্লায় অশান্তি চলছে। কোথায় কত জনের দেহ পড়ে রয়েছে, কেউ জানে না। পুলিশ এখনও ঢুকতে পারেনি ভিতরে।’’
চাঁদ বাগে গত দু’দিন ধরেই টানা অশান্তি চলছিল। আজ সেখানে নর্দমার মধ্যে ইন্টেলিজেন্স বুরোর তরুণ কর্মী অঙ্কিত শর্মার দেহ উদ্ধার হয়েছে। অভিযোগের আঙুল স্থানীয় আপ বিধায়ক তাহির হুসেনের দিকে। স্থানীয়দের অভিযোগ, গত কাল থেকেই হুসেনের বাড়ির ছাদ থেকে পাথর, পেট্রলবোমা ছোড়া হচ্ছিল।
খাজুরি খাসের গামরি এক্সটেনশনে মোহাম্মদ সাঈদ সালমানি গতকাল দুধ কিনতে বেরিয়েছিলেন। বাড়ি ঘিরে ফেলে হিংস্র জনতা। সালমানি ছুটে গেলেও পাড়ার লোকেরা তাকে বাড়ির দিকে যেতে দেননি। তার দর্জির দোকানে পুড়েছে। মারা গিয়েছেন ৮৫ বছরের মা আকবরি।
তেগবাহাদুর ও লোকনায়ক জয়প্রকাশ হাসপাতালের চিকিৎসকেরা বলছেন, হতাহতদের বেশির ভাগই গরিব বা মধ্যবিত্ত। ২৮ বছরের মুবারক হুসেন দ্বারভাঙা থেকে বাবরপুরে এসে শ্রমিকের কাজ করতেন। বিজয় পার্কে তার বুকে গুলি লাগে। মুদাস্‌সির খান, শাহিদ খান আলভি অটো চালাতেন। রাহুল সোলাঙ্কি, বিনোদ কুমার, বীরভান সিংহেরা কেউ বাজার করে বা কাজ সেরে ফিরছিলেন। ভজনপুরার মারুফ আলিকে কপালে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি করে মারা হয়েছে।
দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, এখনও পর্যন্ত ১৮টি এফআইআর হয়েছে। ১০৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। নিহতদের নিকটাত্মীয়কে দু’লক্ষ টাকা ও আহতদের ৫০ হাজার টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। গতকালই উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ জানিয়েছিলেন, দাঙ্গায় মৃত্যু হলে ক্ষতিপূরণের কোনও প্রশ্নই নেই। গত দু’দিন যে-সব এলাকায় অশান্তি হয়েছিল, সেখানে পরিস্থিতি তুলনামূলক ভাবে শান্ত থেকেছে।
কিন্তু ‘শান্ত’ মানে শান্তি নয়। নিরপত্তাও নয়। মুস্তাফাবাদে একমাত্র মেয়ের হাত ধরে প্রাণভয়ে মহল্লা ছাড়ছেন এক মহিলা। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ নেই তার মুখে। পিছনে ফেজ টুপি, কুর্তা-পাজামায় স্বামী। মাথায়-পিঠে ব্যাগ, লেপ-কম্বল। বাড়ি-দোকান পুড়েছে। পথে নেমেছেন নিরাপদ কোনও আশ্রয়ের খোঁজে।
দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল অশান্ত এলাকা ঘুরে দেখবেন বলে জানানো হয়েছে। বুধবার রাতের পর থেকে আর নতুন করে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি।
ইতোমধ্যে আহত ও নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ প্রদানের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। নিহতদের দুই লাখ টাকা সরকারি ক্ষতিপূরণ ও আহতদের ৫০ হাজার টাকা দেয়ার ঘোষণা দেয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।
দিল্লির যে এলাকাগুলোতে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে সেসব এলাকার বিধায়কদের সঙ্গে কথা বলেছেন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল। এলাকার পরিস্থিতি শান্ত রাখতে সচেষ্ট হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
বাইরে থেকে কেউ যেন দিল্লিতে প্রবেশ করে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করতে না পারে সে ব্যাপারে প্রশাসনকে ব্যবস্থা নিতে বলেছেন কেজরিওয়াল। পাশাপাশি বুধবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি টুইট করে শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
গত রোববার বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের (সিএএ) বিরোধী ও সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button